চোরের অভিমানী চিঠি


১ জুলাই ২০২৬ ১৯:৪৭

॥ সাঈদুর রহমান লিটন ॥
ফুটবল আমার দুর্বলতা। ছোটবেলা থেকেই খেলা দেখতে ভালোবাসি। মাঠে নেমে খেলতে পারিনি কখনো। অল্প বয়সে প্যারালাইজড হয়েছিলাম। সেই আঘাতের রেশ আজও পায়ে রয়ে গেছে। মন চাইত বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়াতে, গোল দিতে, উল্লাস করতে। কিন্তু নিয়তি আমাকে দর্শক বানিয়ে রেখেছে। তাই খেলা দেখে দেখে দইয়ের সাধ ঘোলে মেটাই।
সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তেজনা তুঙ্গে। স্পেন বনাম সৌদি আরবের খেলা। আর্জেন্টিনা আমার প্রথম প্রেম হলেও স্পেনের খেলাও আমার ভীষণ পছন্দ। তাই টেলিভিশনের সামনে বসে এক মিনিটও চোখ সরাইনি।
রাত বাড়ছিল। বাড়ির সবাই একে একে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি খেলার নেশায় ডুবে আছি। বারান্দার গ্রিলে তালা দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু পাশের কিচেন রুমের দরজার কথা মাথায় ছিল না।
খেলা শেষ হলো প্রায় রাত একটা নাগাদ। স্পেনের জয়-পরাজয়ের হিসাব মাথায় নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, টেরই পাইনি।
হঠাৎ রাত ৩টার দিকে আমার স্ত্রী আমাকে ধাক্কা দিয়ে জাগাল।
স্ত্রীর নাম মনোয়ারা রহমান। তবে আমি তাকে আদর করে ভানুমতী বলি। সে নাম শুনে সে মুচকি হাসে। কোনোদিন আপত্তি করেনি।
ভানুমতীর কণ্ঠে অদ্ভুত আতঙ্ক।
শোন, আলমারির ড্রয়ার নাই!
আমি আধো ঘুমে বললাম,
কী বলো?
সত্যি বলছি, ড্রয়ারটাই নাই!
ঘুম যেন মুহূর্তেই উড়ে গেল। তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ালাম। গিয়ে দেখি সত্যিই আলমারির ড্রয়ার উধাও।
আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হলো।
বারান্দার পাশের কিচেন রুমে গিয়ে দেখি, ড্রয়ারটি সেখানে পড়ে আছে। তার ভেতরের কাগজপত্র সব এলোমেলো। আমার মানিব্যাগ খোলা অবস্থায় পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মেঝেতে। ভানুমতীর ভ্যানিটি ব্যাগও সেখানে।
ঘটনা বুঝতে আর বাকি রইল না।
চোর মহাশয় যখন আমি খেলা দেখছিলাম, তখনই নিশ্চয় ঘরে ঢুকে কোথাও লুকিয়ে ছিলেন। আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর ধীরে সুস্থে তার কর্মযজ্ঞ শুরু করেছেন।
খোঁজখবর নিয়ে দেখা গেল, খুব বেশি কিছু নেননি।
মানিব্যাগে থাকা আড়াই হাজার টাকা গেছে। কয়েক বছর ধরে মাটির ব্যাংকে জমিয়ে রাখা টাকাগুলোও উধাও। ছেলের ব্রিফকেস থেকে কিছু জামা-প্যান্ট নিয়েছেন। এমনকি ছেলের এক জোড়া বুটও ছাড়েননি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- ঘরে থাকা দুটি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ; এমনকি আরও কিছু মূল্যবান জিনিসপত্র অক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে।
চোরের রুচি যে বেশ বিচিত্র, তা বুঝতে বাকি রইল না।
আমরা যখন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছি, তখন টেবিলের নিচে একটা রঙিন কাগজ চোখে পড়ল।
ভাঁজ খুলতেই দেখি লাল কালিতে লেখা একটি চিঠি।
স্যার,
আপনার ছেলের বিয়েতে দাওয়াত পাইনি। তাই দাওয়াতের টাকা নিজ দায়িত্বে নিয়ে গেলাম। এতে কোনো অভিযোগ থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
আমরা নিজেরাই, বাজার করে, রান্না করে খেয়ে নেব, তাই চিন্তার কিছু নেই। ভবিষ্যতে এমন ভুল যেন আর না হয়, সে বিষয়ে অনুরোধ রইল।
ইতি,
একজন অবহেলিত ‘অতিথি’ (চোর নয়)
কিছুক্ষণ আমি আর ভানুমতী একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তারপর কে আগে হাসবে, সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল।
চোর টাকা নিয়েছে, বুট নিয়েছে, জামা নিয়েছে- সাথে রেখে গেছে মনে রাখার মতো গল্প।
সেই রাতের পর বহুবার ভেবেছি, জীবনে নানা ধরনের চোর দেখেছি, গল্পেও পড়েছি, কিন্তু এমন ভদ্র, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন এবং হিসাবি চোরের দেখা আর পাইনি।
সে চুরি করেছে ঠিকই, কিন্তু অভিযোগের সঙ্গে নিমন্ত্রণ না পাওয়ার অভিমানও জানিয়ে গেছে।