আতঙ্কের নগরী খুলনায় ফজরের সময় মসজিদে গুলিবিদ্ধ দুই মুসল্লি

জামায়াতের নিন্দা ও অপরাধীর দ্রুত বিচার দাবি


২০ জুন ২০২৬ ১২:৫৪

খুলনা সংবাদদাতা : খুলনা মহানগরীতে ফজরের নামাজ শেষে মসজিদের ভেতরেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দুই মুসল্লি। সন্ত্রাসীরা মজজিদের ভেতরে ঢুকে তাদের গুলি করেছেন। গত রোববার (১৪ জুন) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দৌলতপুর থানার পশ্চিম কাশিপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদে নারকীয় হামলার ঘটনা ঘটে। মসজিদের ভেতরে সন্ত্রাসীরা মুসল্লিদের গুলি করে আহত করার ঘটনা বাংলাদেশে এটিই প্রথম।
গুলিবিদ্ধরা হলেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি লোকমান হাকিম (৪৫) এবং একই এলাকার বাসিন্দা আলম মণ্ডল (৫৫)। লোকমান হাকিম উত্তর কাশিপুর এলাকার মৃত জব্বার শেখের ছেলে এবং আলম মণ্ডল মৃত আব্দুল খালেকের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ফজরের নামাজ আদায়ের সময় কয়েকজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী মসজিদে প্রবেশ করে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি লোকমান হাকিমকে লক্ষ করে গুলি ছোড়ে। এ সময় তার পাশে থাকা মুসল্লি আলম মণ্ডলও গুলিবিদ্ধ হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলিতে লোকমান হাকিমের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।
অন্যদিকে আলম মণ্ডলের মাথা, গলার বাম পাশ এবং ডান হাতের বাহুতে গুলি লাগে। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তার অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ এবং হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত শুরু করে।
খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানার ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ জামে মসজিদে ফজরের নামাজের সময় ঢুকে দুই মুসল্লিকে গুলি করার ঘটনার দুদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে ঘটনার নেপথ্যে ব্যবসায়িক বিরোধসহ একাধিক বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গুলিবিদ্ধদের মধ্যে গুরুতর আহত মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী লোকমান হাকিমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকলেও তিনি বর্তমানে শঙ্কামুক্ত বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। অপর আহত ব্যক্তি আলম মণ্ডল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় বলেন, ‘মসজিদে ঢুকে গুলির ঘটনায় রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করতে একাধিক টিম কাজ করছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, লোকমান হাকিম পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তেলের ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি কাজের সঙ্গেও জড়িত। প্রাথমিকভাবে ব্যবসায়িক শত্রুতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এ বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
দৌলতপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) জাহিদুল ইসলাম জানান, আহতদের পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এখনো কোনো এজাহার জমা দেননি। তারা মামলা করতে এলে তা গ্রহণ করা হবে। একইসঙ্গে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আহত লোকমান হাকিমের চাচাতো ভাই ও দৌলতপুর গার্লস কলেজের অধ্যাপক মো. ইব্রাহিম বলেন, লোকমান ভাই এলাকায় একজন নিরীহ ও সজ্জন মানুষ হিসেবে পরিচিত। তিনি ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। তাকে লক্ষ করে মসজিদের ভেতরে গুলি চালানোর ঘটনা ভিন্ন কোনো ইঙ্গিত বহন করে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তারা ফিরে এলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর এ হামলার ঘটনায় এই এলাকায় সাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। হামলার পেছনের কারণ এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
জামায়াতের নিন্দা : খুলনায় ফজরের নামাজ চলাকালে মসজিদের ভেতরে ঢুকে মুসল্লিদের লক্ষ করে গুলি করে মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি ও অপর এক মুসল্লিকে গুলি করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ ও তীব্র নিন্দা জানিয়ে হামলার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। গত ১৪ জুন রোববার এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান। বিবৃতিতে তিনি বলেন, মসজিদে ফজরের নামাজ চলাকালে মসজিদের ভেতরে ঢুকে মুসল্লিকে লক্ষ করে গুলি করে হত্যাচেষ্টা খুবই উদ্বেগজনক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা।
গোলাম পরওয়ার বলেন, মসজিদের মতো পবিত্র জায়গায় সন্ত্রাসীরা মুসল্লিদের হত্যাচেষ্টা চালিয়েছে, যা খুবই দুঃসাহসিক, বর্বর ও ষড়যন্ত্রমূলক। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবণতির বহ্নিঃপ্রকাশ ঘটেছে এবং সন্ত্রাসীদের দমনে সরকার ও স্বরাষ্টমন্ত্রীর ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। একইসঙ্গে সরকারের উদাসীনতাই প্রমাণ করে যে, এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরকারের মদদ রয়েছে।