ক্যালিগ্রাফি তরুণ প্রজন্মের নতুন শখ, পুরনো এক শিল্পের নবযাত্রা


২০ জুন ২০২৬ ১২:০৬

মুন্সী রহিছ উদ্দিন : শিল্পের কোনো সীমানা নেই, তবে শিল্পের একটি আত্মা থাকে। সেই আত্মার যখন আধ্যাত্মিকতা আর নান্দনিকতার মেলবন্ধন ঘটে, তখন জন্ম নেয় ‘ক্যালিগ্রাফি’ বা লিপিশিল্প। মানুষ যখন প্রথম পাথরে আঁচড় কেটে মনের কথা লিখতে শিখেছিল, সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল লেখার সঙ্গে সৌন্দর্যের এক অনন্য সম্পর্ক। সেই আদিম আকাক্সক্ষা থেকেই জন্ম নিয়েছে ক্যালিগ্রাফি, অক্ষরকে শুধু অর্থ নয়, রূপ দেওয়ার শিল্প। গ্রিক শব্দ ‘Kallos’ (সুন্দর) এবং ‘Graphia’ (লেখা) মিলে তৈরি হয়েছে ‘Calligraphy’ শব্দটি। এর অর্থ হলো ‘সুন্দর লিখন’। বাংলায় আমরা বলি ‘হস্তলিপিশিল্প’ বা ‘সুলিখনশিল্প’। তবে ক্যালিগ্রাফির বিশ্বজনীন ইতিহাসে ইসলামী ক্যালিগ্রাফি এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। কিন্তু এই শিল্পকলা কেবল হাতের কাজ নয়; এটি মনের সাধনা, আত্মার প্রকাশ এবং ঐতিহ্যের সাথে বর্তমানের সেতুবন্ধন। বর্তমান বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের মাঝে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে যখন যান্ত্রিকতা আমাদের গ্রাস করছে, তখন একদল তরুণ হাতে তুলে নিয়েছে কলম, বাঁশের কঞ্চি আর রংতুলি। তারা ক্যানভাসে জীবন্ত করে তুলছে পবিত্র কুরআনের আয়াত আর ধ্রুপদী সাহিত্য। ক্যালিগ্রাফি এখন আর কেবল চারুকলার নিভৃত কোণের কোনো চর্চা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের তরুণদের কাছে এক সৃজনশীল শখ এবং আত্মিক প্রশান্তির মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা ডিজিটাল স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াতে বেশি অভ্যস্ত, তারাই এখন নতুন করে হাতে তুলি তুলে নিচ্ছে। বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম; সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে ক্যালিগ্রাফি চর্চার এক নতুন ঢেউ। এই প্রবন্ধে আমরা জানব; কোথায় শুরু হয়েছিল এই শিল্পের যাত্রা, ইসলামী ঐতিহ্যে এর মর্যাদা কতটা গভীর, বাংলাদেশে এর শিকড় কতটা পোক্ত এবং আজকের তরুণরা কেন এই শিল্পের দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্বে ক্যালিগ্রাফির জন্মের ইতিহাস : ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকে মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয় সভ্যতায় কিউনিফর্ম লিপি এবং মিশরে হায়ারোগ্লিফিক্সে সুশৃঙ্খল ও সুন্দর লেখার প্রচলন শুরু হয়। চীনে ক্যালিগ্রাফির চর্চা শুরু হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ অব্দে। চীনা ঐতিহ্যে ক্যালিগ্রাফি কেবল লেখার পদ্ধতি নয়, এটি একটি দার্শনিক শৃঙ্খলা; সেখানে তুলির প্রতিটি আঁচড়ে ফুটে ওঠে লেখকের চরিত্র ও আত্মার গভীরতা। বিশ্বে ক্যালিগ্রাফির সূচনা মূলত প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও মিশরীয় সভ্যতায় চিত্রলিপির মাধ্যমে হলেও, পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে এর বিকাশ ঘটে চীন ও আরব ভূখণ্ডে। ইসলামী সংস্কৃতির প্রসারের সাথে সাথে ক্যালিগ্রাফি একটি ইবাদততুল্য শিল্পে পরিণত হয়। কারণ ইসলামে প্রাণীর ছবি আঁকার ক্ষেত্রে সচেতনতা থাকায় মুসলিম শিল্পীরা তাদের সমস্ত সৃজনশীলতা ঢেলে দেন আল্লাহর কালামকে সুন্দর করে লেখার পেছনে।
খলিফা হযরত আলী (রা.)-কে ক্যালিগ্রাফির অন্যতম আদি পুরুষ মনে করা হয়। কুফী শৈলী থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে আব্বাসীয় আমলে ইবনে মুকলা (মৃত্যু ৩২৮ হিজরি) ক্যালিগ্রাফিকে জ্যামিতিক রূপ দান করেন। তিনি ছয়টি প্রধান রীতি (আল-আকলাম আল-সিত্তা) প্রবর্তন করেন; সলুস, নাসখ, মুহাক্কাক, রায়হানি, তৌকি ও রিকা। বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবিদ ফিলিপ হিট্টি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ- History of the Arabs (পৃষ্ঠ-২৪১)-এ উল্লেখ করেছেন, আরবি ক্যালিগ্রাফি কেবল লেখার শিল্প নয়, এটি ছিল জ্ঞান সংরক্ষণের সবচেয়ে পবিত্র মাধ্যম। রোমান সাম্রাজ্যেও ক্যালিগ্রাফির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ইউরোপে মধ্যযুগে খ্রিষ্টান মঠগুলোয় ধর্মগ্রন্থ সুন্দর হস্তলিপিতে নকল করা ছিল একটি পবিত্র কাজ। তবে ক্যালিগ্রাফি শিল্পকলার যে রূপটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মানুষকে স্পর্শ করেছে, সেটি হলো আরবি বা ইসলামী ক্যালিগ্রাফি। ইসলামের আবির্ভাবের পর থেকে এই শিল্প পেয়েছে নতুন প্রাণ, নতুন উদ্দেশ্য এবং অভূতপূর্ব বিস্তার।
ইসলাম ও ক্যালিগ্রাফি : আল্লাহর বাণীকে সুন্দরভাবে লেখার এক অন্যন্য সাধনা: ইসলামী দৃষ্টিতে ক্যালিগ্রাফি কেবল সাধারণ কোনো শিল্প নয়, এটি ‘জিকির’ বা স্রষ্টাকে স্মরণের একটি দৃশ্যমান মাধ্যম। যখন একজন তরুণ শিল্পী ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে ‘আল্লাহ’ শব্দ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ক্যালিগ্রাফি করেন, তখন তার অন্তরে এক গভীর নিবিষ্টতা তৈরি হয়। ইসলামে ক্যালিগ্রাফির মর্যাদা নিছক শিল্পকলার সীমায় আবদ্ধ নয়। পবিত্র কুরআনের প্রথম নাজিলকৃত আয়াতটিই হলো, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আলাক : ১)। এই আয়াতে জ্ঞান অর্জন ও লেখার প্রতি গভীর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কলমের শপথ করেছেন, ‘নূন। শপথ কলমের এবং তারা যা লেখে তার।’ (সূরা কলম : ১)।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুন্দর হস্তলিপি সত্যকে আরও স্পষ্ট করে।’ (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান)। হযরত আলী (রা.) বলতেন, ‘সুন্দর হস্তলিপি হলো সৌন্দর্যের চাবিকাঠি।’ (ইবনে খালদুন, মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠ-৪১৬)। ইমাম গাজ্জালি (র.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়া উলুমুদ্দিন (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা-৫৫)-এ লিখেছেন, সুন্দর হস্তলিপি শেখা প্রতিটি জ্ঞানার্থীর জন্য অত্যাবশ্যক। ইসলামী সভ্যতার স্বর্ণযুগে, বিশেষত আব্বাসীয় খেলাফতের আমলে (৭৫০-১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দ), ক্যালিগ্রাফি পৌঁছায় তার সর্বোচ্চ শিখরে। ইবনে মুকলা (৮৮৬-৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ) প্রথম আরবি হরফের জ্যামিতিক অনুপাত নির্ধারণ করে ক্যালিগ্রাফিকে একটি বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলায় রূপ দেন। তাঁকে বলা হয় আরবি ক্যালিগ্রাফির জনক। পরবর্তীকালে ইয়াকুত আল-মুস্তাসিমি (১২২১-১২৯৮) নাসতালিক, নাসখ, সুলুসসহ বিভিন্ন আরবি লিপিশৈলী পরিশীলিত করেন।
বিশিষ্ট ইসলামী শিল্পবিশেষজ্ঞ ইয়াসিন হামিদ সাফাদি তাঁর Islamic Calligraphy (পৃষ্ঠা: ৮-১২) গ্রন্থে লিখেছেন, আরবি ক্যালিগ্রাফি ইসলামী সভ্যতার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শিল্প অবদান। মসজিদের দেয়ালে, কুরআনের পাণ্ডুলিপিতে, শাসকদের ফরমানে, সর্বত্র এই শিল্প ছিল জ্ঞান ও ঈমানের প্রতীক।
আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রধান ধরনগুলো হলো: নাসখ (সহজপাঠ্য, কুরআন লেখায় ব্যবহৃত), সুলুস (মসজিদের দেয়াল ও শিরোনামে), কুফি (প্রাচীনতম, জ্যামিতিক আকৃতির), দিওয়ানি (উসমানি সাম্রাজ্যের দরবারি লিপি), নাসতালিক (ফার্সি-উর্দু সাহিত্যে প্রচলিত) এবং রিকা (দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সহজ লিপি)।
বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস মাটির অনেক গভীরে যার শিকড়: বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফির শিকড় অনেক গভীরে। সুলতানি আমল থেকেই এ দেশে ক্যালিগ্রাফির চর্চা শুরু হয়। বাংলার বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদ ও শিলালিপিতে এর প্রমাণ মেলে। বিশেষ করে পাণ্ডুয়া ও গৌড়ের স্থাপত্যে তোগরা শৈলীর অসাধারণ ব্যবহার দেখা যায়। বাংলাদেশে ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস অনুসন্ধান করতে হলে যেতে হবে বহু শতাব্দী পেছনে। মুসলিম শাসনামলে বাংলায় ফার্সি ও আরবি ক্যালিগ্রাফির চর্চা শুরু হয়। সুলতানি আমল (১২০৪-১৫৭৬) থেকে মুঘল আমল পর্যন্ত বাংলার মসজিদ, মাদরাসা ও রাজদরবারে কুরআনের আয়াত ও ফার্সি পঙক্তি সুন্দর ক্যালিগ্রাফিতে উৎকীর্ণ করা হতো। ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট (পঞ্চদশ শতাব্দী) থেকে শুরু করে ঢাকার লালবাগ কেল্লা ও চকবাজার শাহি মসজিদ; সর্বত্র এই শিল্পের নিদর্শন আজও বিদ্যমান।
গবেষক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ (পৃষ্ঠা: ২৩৪-২৩৮) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সুলতানি আমলের বহু মসজিদের শিলালিপিতে আরবি ক্যালিগ্রাফির অপূর্ব নিদর্শন পাওয়া যায়। এই শিলালিপিগুলো সেকালের দক্ষ ক্যালিগ্রাফারদের অনন্য শিল্পকর্মের প্রমাণ। বাংলা ক্যালিগ্রাফির কথা বললে আলাদাভাবে বলতে হয় বাংলা লিপির নিজস্ব সৌন্দর্যের কথা। উনিশ শতকে বাংলা মুদ্রণশিল্পের বিকাশের সাথে সাথে বাংলা হস্তলিপির নিজস্ব একটি ধারা তৈরি হয়। পণ্ডিত ও লেখকরা সুন্দর হাতের লেখাকে শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ মনে করতেন। বিশ শতকে এসে বাংলাদেশে আরবি-বাংলা ক্যালিগ্রাফির সমন্বয়ে এক নতুন শিল্পধারার জন্ম হয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শিল্পচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। চারুকলা ইনস্টিটিউটে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ক্যালিগ্রাফিকে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হয়।
শিল্পী শাহাবুদ্দিন, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এবং শিল্পী হাশেম খান বাংলা হরফকে শিল্পের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন অভূতপূর্বভাবে। পরবর্তী প্রজন্মে শিল্পী মাহবুবুর রহমান ও অন্যরা ইসলামী ক্যালিগ্রাফিকে আধুনিক শিল্পের সাথে মিলিয়ে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ক্যালিগ্রাফি শিক্ষা ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে।
তরুণ প্রজন্ম কেন ঝুঁকছে ক্যালিগ্রাফির দিকে : আজকের তরুণরা ক্যালিগ্রাফিকে কেবল পুরনো শিল্প মনে করছে না; তারা এতে খুঁজে পাচ্ছে আত্মপ্রকাশের এক অনন্য পথ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ ও রাজশাহীর তরুণরা এখন অনলাইনে ক্যালিগ্রাফি শিখছে, ইউটিউবে টিউটোরিয়াল দেখছে, ইনস্টাগ্রামে তাদের কাজ শেয়ার করছে। এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ।
প্রথমত, মানসিক প্রশান্তির অন্বেষণ। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালিগ্রাফি চর্চা মস্তিষ্কের ‘মেডিটেশন জোন’ সক্রিয় করে। মনোবিজ্ঞানী ড. রিচার্ড ডেভিডসন তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, মনোযোগ দিয়ে হাত দিয়ে কিছু আঁকা বা লেখা উদ্বেগ ও বিষণ্নতা কমাতে সাহায্য করে (The Emotional Life of Your Brain, পৃষ্ঠা- ১৮৭)। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে, কুরআনের আয়াত সুন্দর করে লেখার মধ্যে যে তন্ময়তা আসে, সেটি একটি ইবাদতের মতোই আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল ক্লান্তি থেকে মুক্তি। দিনের বেশিরভাগ সময় স্ক্রিনের সামনে কাটানোর পর তরুণরা হাতে কিছু করার মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে। কলম বা তুলি হাতে নিয়ে কাগজে আঁচড় কাটার অনুভূতি তাদের কাছে হয়ে উঠছে এক ধরনের ডিজিটাল ডিটক্স।
তৃতীয়ত, পেশাদার সম্ভাবনা। ক্যালিগ্রাফি আজ শুধু শখের বিষয় নয়, এটি একটি লাভজনক পেশা হতে পারে। লোগো ডিজাইন, বিয়ের কার্ড, ইভেন্ট ব্যানার, গিফট কার্ড, দেয়ালচিত্র, মসজিদের শোভাবর্ধন; সর্বত্র দক্ষ ক্যালিগ্রাফারের চাহিদা বাড়ছে। ডিজিটাল ক্যালিগ্রাফিতে দক্ষ তরুণরা আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটেও কাজ পাচ্ছেন।
চতুর্থত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সন্ধান। মুসলিম তরুণদের মধ্যে নিজেদের ঐতিহ্য ও শিকড়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। কুরআনের আয়াত বা নবীজির (সা.) বাণী সুন্দরভাবে লিখে ঘর সাজানো; এটি একাধারে ধর্মীয় আনুগত্য ও শিল্পসত্তার প্রকাশ।
পঞ্চমত, বিশ্বায়নের যুগে পশ্চিমা সংস্কৃতির জোয়ারে গা না ভাসিয়ে অনেক তরুণ নিজেদের শিকড় এবং ইসলামী ঐতিহ্যের দিকে ফিরতে চাইছে। ক্যালিগ্রাফি তাদের সেই সেতুবন্ধ তৈরি করে দিচ্ছে।
ষষ্ঠত, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) ব্যবহার করে তরুণরা তাদের করা ক্যালিগ্রাফি বিক্রি করতে পারছে। ঘর সাজানোর উপকরণ হিসেবে ক্যালিগ্রাফির চাহিদা এখন তুঙ্গে। এটি তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছে।
ক্যালিগ্রাফিকে শখে পরিণত করার পথ : ক্যালিগ্রাফি শুরু করা কঠিন নয়, যদি সঠিক পথে এগোনো যায়। প্রথমে প্রয়োজন মাত্র কয়েকটি সরল উপকরণ; একটি ক্যালিগ্রাফি কলম বা তুলি, ভালো মানের কাগজ এবং কালি। শুরুতে আরবি হরফ শেখার জন্য উস্তাদ ইয়াহিয়া হোসেইনির আরবি ক্যালিগ্রাফির পাঠ বা বাংলায় অনুবাদিত যেকোনো ক্যালিগ্রাফি নির্দেশিকা সহায়ক হতে পারে। অনলাইনে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বেশকিছু ক্যালিগ্রাফি শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। ইউটিউবে বাংলা ভাষায় ক্যালিগ্রাফি শেখার ভিডিও পাওয়া যায়। ফেসবুকে ‘বাংলাদেশ ক্যালিগ্রাফি গ্রুপ’সহ বেশকিছু সক্রিয় কমিউনিটি আছে যেখানে শিক্ষার্থীরা একে অপরের কাজ দেখে অনুপ্রাণিত হয় এবং পরামর্শ নেয়।
শিল্পকলা একাডেমি ও বেশকিছু বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নিয়মিত ক্যালিগ্রাফি কর্মশালার আয়োজন করে। তরুণরা চাইলে এই কর্মশালায় যোগ দিয়ে হাতে-কলমে শিখতে পারে। ইসলামী পণ্ডিত ড. ইউসুফ আল কারযাভি তাঁর ইসলাম ও শিল্পকলা (পৃষ্ঠা-৭৮) গ্রন্থে বলেছেন, সুন্দর শিল্পকর্ম মানুষের অন্তরকে কল্যাণের দিকে টেনে নেয়। ক্যালিগ্রাফি চর্চার মাধ্যমে একজন তরুণ একই সাথে শিল্পী হচ্ছে এবং আল্লাহর কালাম ও নবীজির বাণীর সাথে গভীর সংযোগ স্থাপন করছে।
ক্যালিগ্রাফিকে শখে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা : ক্যালিগ্রাফি কেবল ড্রয়িংরুমে টাঙিয়ে রাখার বিষয় নয়, এটিকে প্রতিটি তরুণের শখে পরিণত করা প্রয়োজন। কেন?
বিপথগামিতা থেকে সুরক্ষা : একজন তরুণ যখন শিল্পের পেছনে সময় দেয়, তখন সে মাদক বা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকে।
মেধা বিকাশ : এটি মস্তিষ্কের সৃজনশীল অংশকে সক্রিয় করে এবং ধৈর্য ক্ষমতা বাড়ায়।
ইসলামী দাওয়াত : একটি সুন্দর ক্যালিগ্রাফি একজন অমুসলিম বা উদাসীন মুসলিমের মনেও ইসলামের সৌন্দর্য সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে।
পরিশেষে তুলির আঁচড়ে ভবিষ্যৎ রচনা: বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে তরুণরা যদি ক্যালিগ্রাফি চর্চা শুরু করে, তবে আমাদের সমাজ থেকে কুরুচিপূর্ণ সংস্কৃতির বিলোপ ঘটবে। কারণ একটি জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখে তার শিল্পকলা। আর সেই শিল্পকলাকে বাঁচিয়ে রাখে তার তরুণ প্রজন্ম। বাংলাদেশের তরুণরা যখন ক্যালিগ্রাফির তুলি হাতে নিচ্ছে, তখন তারা আসলে হাজার বছরের এক মহৎ ঐতিহ্যের বাহক হয়ে উঠছে। কুরআনের আয়াত থেকে কবি নজরুলের পঙক্তি, নবীজির হাদিস থেকে বিভিন্ন মুসলিম মনীষীর বাণী; সবকিছুই ক্যালিগ্রাফির তুলিতে পায় নতুন জীবন। এই শিল্প শেখা মানে শুধু সুন্দর লিখতে শেখা নয়; এই শিল্প শেখা মানে ধৈর্য শেখা, মনোযোগ শেখা, সৌন্দর্যকে ভালোবাসতে শেখা; আর সর্বোপরি, নিজের শিকড়কে চিনতে শেখা। তাই আসুন, স্ক্রিন থেকে কিছুটা সময় সরিয়ে রেখে হাতে তুলে নিই একটি কলম। লিখি বিসমিল্লাহ; আর সেই লেখায় ঢেলে দিই আমাদের মনের সবটুকু সৌন্দর্য। ক্যালিগ্রাফি হোক বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের শখ, সাধনা এবং সংস্কৃতির নতুন পরিচয়। ক্যালিগ্রাফি হোক আমাদের তারুণ্যের ইবাদত, আমাদের ঐতিহ্যের অহংকার।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
১. হিট্টি, ফিলিপকে, History of the Arabs, ম্যাকমিলান প্রেস, লন্ডন, ১০ম সংস্করণ, ১৯৭০, পৃষ্ঠা- ২৪১।
২. সাফাদি, ইয়াসিন হামিদ, Islamic Calligraphy, Thames and Hudson ১৯৭৮, পৃষ্ঠা: ৮-১২।
৩. ইবনে খালদুন, আল মুকাদ্দিমা (বাংলা অনুবাদ: আবদুস সাত্তার), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা- ৪১৬।
৪. গাজ্জালি, ইমাম আবু হামিদ; ইহইয়া উলুমুদ্দিন (বাংলা অনুবাদ), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০০৫, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা-৫৫।
৫. যাকারিয়া, আবুল কালাম মোহাম্মদ; বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা: ২৩৪-২৩৮।
৬. ড. ইউসুফ আল কারযাভী, ইসলাম ও শিল্পকলা (বাংলা অনুবাদ), আল-কুরআন একাডেমি, ঢাকা, ২০১০, পৃষ্ঠা- ৭৮।
৭. ডেভিডসন, রিচার্ড ও বেগলি, শ্যারন; The Emotional Life of Your Brain, Plume/Penguin, নিউ ইয়র্ক, ২০১২, পৃষ্ঠা- ১৮৭।
৮. বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস নং-২৩৮৯।
৯. “The Splendour of Islamic Calligraphy”, Abdelkebir Khatibi and Mohammed Sijelmassi, পৃষ্ঠা নং: ৪২-৪৫।
১০. বাংলার শিলালিপি, ড. আব্দুল করিম।