জাপানে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা

তবে কবরস্থান নির্মাণে স্থানীয়দের বাধায় লাশ দাফনে সঙ্কট


১৮ জুন ২০২৬ ১০:৩২

মুহাম্মদ আল-হেলাল
সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। বিশ্বের তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তি জাপানের লোকসংখ্যা ১২ কোটি ২৪ লাখ ২৭ হাজার ৭৩১ যেটি বিশ্বের দ্বাদশ জনবহুল দেশ। দেশটির আয়তন ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৯ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালের ৭ জানুয়ারি প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনমতে, জাপানে মুসলমানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০১০ সালে যেখানে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার; তা ২০১৯ সালে গিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজারে দাঁড়ায়। দশকের পর দশক ধরে জাপানের ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে গবেষণা করা ওয়াসাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানাদা হিরোফুমির বরাত দিয়ে দ্য ইকোনমিস্ট জানিয়েছে, দেশটিতে বর্তমান প্রায় ৬ লাখ মুসলমান রয়েছে। তবে জাপানে সরকার ও উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা ইসলামিক লাইফস্টাইলে; এমনকি মৃত্যুর পর মুসলিমদের কবরস্থ করতেও বাধাগ্রস্ত হন মুসলিমরা।
ইসলামের আগমন : জাপান এবং ইসলামিক বিশ্বের মধ্যে প্রথম যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবার তথ্য পাওয়া যায় ৯ম শতাব্দীতে। সেসময় মধ্যপ্রাচ্য এবং পারস্যের মুসলিম ব্যবসায়ী ও কূটনীতিকরা সিল্ক রোড এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ ধরে জাপানি ব্যবসায়ী এবং কর্মকর্তাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে জাপান ভ্রমণ করেছিলেন। ১৬ শতকে জাপানি ব্যবসায়ী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম বণিকদের মধ্যে বাণিজ্য শুরু হয়। জাপানের সঙ্গে মুসলমানদের পরবর্তীতে আরো দৃঢ় যোগাযোগ স্থাপিত হয় ১৭ শতকে। এই সময়কালে অটোমান তুরস্কসহ ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসলিম পেশাদারদের আগমন ঘটে। এই ব্যক্তিরা স্থানীয় জনগণের কাছে ইসলামকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৮৭০-এর দশকের শেষদিকে মহানবী (সা.)-এর একটি জীবনী জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়, আর এর মধ্য দিয়েও ইসলাম জাপানিদের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। এছাড়া মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-লাওয়াতি আল-তাঞ্জি, একজন ইয়েমেনি পণ্ডিত, জাপানে ইসলামের ইতিহাসের একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯০৯ সালে জাপানে আসেন এবং তিনিও ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও জাপানের মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি বোধ জাগানোর লক্ষ্য নিয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালের দিকে আরেকজন ভারতীয় মুসলিম পণ্ডিত ও ধর্মপ্রচারক আলীমুল্লাহ সিদ্দিকীও জাপানে ইসলাম প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ইসলাম প্রচার ও প্রসার : উসমানী খেলাফতের সময় সুলতান আব্দুল হামিদ[Abdul Hamid II (Reigned 1876-1909)] সর্বপ্রথম ১৮৯০ সালে নৌপথে কিছু জাহাজ নিয়ে শুভেচ্ছা সফরের মিশনে জাপানে পাঠিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিলো এ অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াতের সম্ভাবনা সম্পর্কে সমীক্ষা চালানো। প্রতিনিধিদলটি জাপানে খুব ভালো প্রভাব সৃষ্টি করে। কিন্তু ট্র্যাজেডি যে, প্রতিনিধিদলটি যখন তুরস্কে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন জাপানেরই সমুদ্রে প্রচণ্ড ঝড়ের আঘাতে জাহাজটি ডুবে যায়। ৬০৯ যাত্রীর মধ্যে মাত্র ৬৯ জন জীবিত ছিলেন। অবশিষ্ট সবাই শহীদ হন। এদের মধ্যে সুলতানের ভাইও ছিলেন। জাপানের তৎকালীন বাদশাহ মেইজি আহতদের চিকিৎসা ও জীবিতদের তুরস্কে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। শহীদদের দুর্ঘটনাস্থলের নিকটেই দাফন করা হয় এবং সেখানে একটি জাদুঘরও প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা উসমানী খেলাফতের সময় জাপানে ইসলাম প্রচারে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে।
প্রথম জাপানি মুসলিম : চব্বিশ বছর বয়সী এক তরুণ যুবক তুরাজিরু ইয়ামাডা (Torajiro Yamada) (যিনি একজন উচ্চশিক্ষিত সাংবাদিক ছিলেন) এ দুর্ঘটনায় অনেক দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় সুলতান আবদুল হামিদ স্বয়ং তুরাজিরুকে ডেকে নিয়ে তুরস্কের সেনা অফিসারদের জাপানি ভাষা শেখানোর প্রস্তাব দেন। তুরাজিরু তুর্কি অফিসারদের জাপানি ভাষা শেখানোর পাশাপাশি নিজেও তুর্কি ভাষা শেখেন এবং ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন শুরু করেন। কিছুদিন পরে তিনি মুসলমান হয়ে তাঁর ইসলামী নাম রেখেছিলেন ‘আব্দুল খলীল’। এই তুরাজিরু ছিলেন জাপান ভূখণ্ডের প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন। ১৯৫৭ সালে ৯১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। অন্যসূত্র থেকে জানা যায়, জাপানি প্রথম মুসলিম ছিলেন অসোতারো নোডা (Ashotaro Noda) নামে একজন সাংবাদিক। তিনি ৬৯ জন বেঁচে যাওয়া যাত্রীর সাথে তুরস্কে গিয়েছিলেন এবং সুলতানের অনুরোধে সেখানে বসবাস করতে থাকেন। সেখানে অবস্থান কালে একজন ব্রিটিশ মুসলিমের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। তাদের দুজনের মাঝে এক দীর্ঘ আলোচনা হওয়ার পর অসোতারো মুসলিম হয়ে যান এবং তার নাম রাখেন আব্দুল হালিম (Abdul Haleem Noda)। তবে K. Olgun-এর মতে, তুরাজিরু এবং অসোতারো একসাথে গিয়েছিলেন এবং মুসলমান হয়েছিলেন। এরপর ১৯০৯ সালে একজন জাপানি ইয়ামাওকা ইসলাম কবুল করে নিজের নাম রাখেন ‘ওমর ইয়ামাওকা’ এবং অন্যজন নাম রাখেন ‘আহমদ আরিগা’। এছাড়া বিভিন্ন উপায়ে জাপানে ইসলামের প্রসারতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
কৌশলগত ইসলাম : ১৯২০-এর দশকে বলসেভিক বিপ্লবের সময় রাশিয়ানদের নির্যাতনে অসহ্য হয়ে উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান থেকে বহুসংখ্যক মুসলমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো জাপানেও আসেন এবং রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইসলামের প্রতি জাপানি কর্তৃপক্ষের আগ্রহ বেড়ে যায়- তবে তা ছিল অনেকটাই কৌশলগত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল দখল ও প্রভাব বিস্তারের জন্য দেশের সামরিক সরকার ইসলামচর্চা ও গবেষণাকে উৎসাহ দেয়। যুদ্ধের পর সেই কৌশলগত আগ্রহ মিলিয়ে গেলেও দেশীয় মুসলমানদের সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে ১৯৫৩ সালে গঠিত হয় ‘জাপান মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন’, যা ১৯৬৮ সালে সরকারিভাবে সংগঠনের স্বীকৃতি লাভ করে। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এবং যুদ্ধ শেষে শিল্পের উন্নতির জন্য তেল উৎপাদনকারী মুসলিম দেশের সাথে জাপানের সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে ১৯৮০-র দশকে ইরান, পাকিস্তান থেকে অভিবাসী কর্মীরা জাপানে পাড়ি জমালে সেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠী আরো বৃদ্ধি পায়।
ইসলামিক সেন্টার-সব জাতির আশ্রয়স্থল : জাপানে বসবাসরত মুসলমানদের প্রচেষ্টায় প্রথমবার ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে কোবেতে একটি ইসলামিক সেন্টার বা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। কোবে শহরের তৎকালীন মেয়র মিস্টার গিনজিরো কাটসোদা সেন্টারটির উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেছিলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখি, মসজিদটি এখানকার মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে সহাবস্থান, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি, সর্বোপরি একটি শান্ত ও সুশৃঙ্খল সমাজ বিনির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৪৫ সালে আমেরিকান সৈন্যরা পুরো কোবে বোমা মেরে ধ্বংস করে দেয়। শহরের সবগুলো দালান ও স্থাপত্য তারা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। কিন্তু অবাক কাণ্ড হলো, কোবে শহরের এই মসজিদ স্বমহিমায় টিকে থাকে। সে সময় আমেরিকান সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য জাপানের যোদ্ধারা এই মসজিদের ভূগর্ভস্থ কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মসজিদ ছাড়া লুকানোর মতো তাদের কোনো বিকল্প ছিল না। এভাবে মসজিদটি সব জাতির মানুষের জন্য আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছিল। মসজিদটির দুর্লভ ইতিহাসের এখানেই সমাপ্তি নয়। ১৯৯৫ সালে জাপানে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, বড় হেনশিন বা কোবে ভূমিকম্প নামক ওই দুর্যোগকে জাপানের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমিকম্প হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। সেই ভূমিকম্পে আশপাশের সব বিল্ডিং মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও এই মসজিদ স্বস্থানে নিরাপদে বহাল থাকে। ১৯৩৮ সালে জাপানের টোকিও, নাগোয়া এবং ১৯৭৭ ওসাকাতেও একটি করে ইসলামিক সেন্টার বা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ওয়াসাদা ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, ১৯৯০ সালের পর থেকে জাপানের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। আর জাপান ফোকাস ডট ওআরজির তথ্যমতে, ২০০৯ সাল পর্যন্ত জাপানে ইসলামিক সেন্টার হয়েছে ৩০ থেকে ৪০টি। তবে রিটসুমেইকান এশিয়া-প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির (এপিইউ) একজন অধ্যাপক এবং বেপ্পু মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) প্রধান মুহাম্মদ তাহির আব্বাস খান বলেছেন, জাপানে বর্তমান ১১০টি ইসলামিক সেন্টার বা মসজিদ রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে জাপানে একটি ইন্টারন্যাশানাল ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৯৭৪ সালে ‘ইসলামিক সেন্টার জাপানের’ সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারটি এখনো একটি বোর্ড অব ডিরেক্টর এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। সেন্টারটির তত্ত্বাবধানে পবিত্র কুরআনুল কারীমের তরজমা ছাড়া ‘আসসালাম’ নামে কয়েকটি ত্রৈমাসিক পত্রিকাও প্রকাশিত। এই ইসলামিক সেন্টারগুলোরও জাপানে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জাপানি মুসলিম বিশিষ্টজন : জাপানে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মুসলিম রয়েছেন, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে জাপানে আজ মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন- মোহাম্মদ ফুজিতা (মোহাম্মদ ইউসোফ) : তিনি একজন জাপানি বংশোদ্ভূত মিশরীয় মুসলিম। ফুজিতা জাপানের মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি টোকিওর কামি ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক, যা জাপানের সর্ববৃহৎ মসজিদ। তিনি জাপানে মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন ও নির্দেশনা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ইমিনা চৌধুরী : একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলিম মহিলা, যিনি টোকিওর স্থানীয় সরকার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হন। ২০১৯ সালের স্থানীয় নির্বাচনে তিনি টোকিওর আদাচি ওয়ার্ডে একটি আসন জিতেছিলেন। তার নির্বাচন জাপানে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং দেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে ক্রমবর্ধমান শক্তিমত্তার বৈচিত্র্য তুলে ধরে। ঔপন্যাসিক হিরোফুমি তানাদা (কোকো তানাদা) : একজন জাপানি মুসলিম, তিনি টিভি ব্যক্তিত্ব এবং শিক্ষাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। ১৯৮০-এর দশকে তানাদা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ইসলাম প্রচার ও জাপানে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করার জন্য সোচ্চার হন। আলী ইউসুফ: আরেকজন বিশিষ্ট জাপানি মুসলিম ধর্মান্তরিত, আলী ইউসুফ অনুবাদক এবং ইসলামী পণ্ডিত হিসেবে তার কাজের জন্য পরিচিত। তিনিও জাপানি ভাষায় ইসলামী গ্রন্থ ও সাহিত্য অনুবাদের সাথে জড়িত, যা জাপানি শ্রোতাদের কাছে ইসলামী জ্ঞানকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
ইসলামী সৌন্দর্য : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন জাপানি সৈন্যরা বিভিন্ন মুসলিম দেশে অবস্থান করেছিলেন। তারা সেখানে ইসলামের সৌন্দর্য উপলব্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ওমর বোকেনা নামে একজন সেনাপ্রধান জাপান ফিরে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। তার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে জাপানে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যায়। তাছাড়া চাইনিজ মুসলিমদের জাপানে হিজরত করাও সে অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অনেক ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান যখন এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্র দখল করে নেয় সেসব দেশে অনেক জাপানি নাগরিক বিভিন্ন কর্ম উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ এবং মুসলিম সংস্কৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
বৈষম্যের লক্ষ্যবস্তু মুসলিম : কিয়োদো বার্তা সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, জাপানে কোরীয় ও কুর্দিদের পর এবার বৈষম্যের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছেন এখানকার মুসলমানরা; মসজিদগুলোয় আসছে অপমানজনক ফোন ও ইমেইলের ঢল। ছদ্মনামে ‘আলি’ নামে পরিচিত এক মসজিদ-ইমাম জানান, গত বছর থেকে তিনি দিনে পাঁচ থেকে দশটি ফোন ও ইমেইল পাচ্ছেন, যেগুলোয় লেখা থাকেÑ ‘নিজের দেশে ফিরে যাও’ কিংবা ‘জাপানের কোনো মসজিদ দরকার নেই’। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হোক্কাইদোর এবেতসুতে একটি মসজিদ ও পাকিস্তানি মালিকানাধীন একটি গাড়ির শোরুমে পরপর সন্দেহজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে; টোকিওর কাছে কানাগাওয়া প্রিফেকচারের ফুজিসাওয়ায় একটি মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। আইচি প্রিফেকচারাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মিচিতো ওহাশির মতে, স্থানীয় সমস্যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে; বিদ্বেষবিরোধী আইন কিছুটা কাজ করলেও তা যথেষ্ট প্রতিরোধক হয়ে উঠতে পারেনি। তাঁর পরামর্শ সহজ অথচ গভীর- মুসলমানদের ‘মুসলিম পরিচয়ে’ নয়, বরং মানুষ হিসেবে দেখলেই সহাবস্থানের পথ খুলবে।
‘জাপান ফার্স্ট’ : সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের সকল মুসলিমদের সাথে অভিবাসীদের মতো আচরণ করে জাপানের উগ্র বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা। জাপানের ব্যাপকতর অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির অংশ হিসেবেও বৈরিতা করে মুসলিমদের সাথে, যা ২০২৫ সালে নাটকীয়ভাবে শুরু হয়। ইউটিউবে কোভিড-যুগে টিকাবিরোধী আর ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচার দিয়ে যাত্রা শুরু করা সানসেইতো দল এবার ‘জাপান ফার্স্ট’ স্লোগান আর ‘অতিরিক্ত অভিবাসন’-এর বিরুদ্ধে প্রচার চালায়। দলটি অভিবাসনকে ‘নীরব আগ্রাসন’ আখ্যা দেয় এবং সম্পত্তির দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে নানা সমস্যার জন্য মুসলিম ও অভিবাসীদের দায়ী করে। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর সানায়ে তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, যিনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত। দলীয় নেতৃত্বের লড়াইয়ের সময় তাকাইচি মুসলিম সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে বলেছিলেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি ও পটভূমির মানুষদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অর্থাৎ মূলধারার রাজনীতিও এখন সানসেইতোর নির্ধারণ করে দেওয়া আলোচ্যসূচির দিকেই ঝুঁকছে। তবে বিশ্লেষকদের ভাষায়, জাপানি শিল্পপতিরা চিৎকার করে জাপানে আরও বিদেশি শ্রমিক আনতে চাইছে, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সেখানে মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে দরজা সংকুচিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা জাপানের জন্য অশনিসংকেত।
মুসলিমদের দাফনে বাধা : জাপানের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষকে দাহ করা হয়। কিন্তু ইসলামে লাশ দাহ করা নিষেধ। এমতাবস্থায় এটা একটা সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে দেশটিতে। পাকিস্তান বংশোদ্ভূত বেপ্পু মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) প্রধান মুহাম্মদ তাহির আব্বাস খান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মুসলিমদের কবরস্থ করা নিয়ে এখানে রয়েছে অনিশ্চয়তা। মুসলিম কবরের জন্য জায়গা নির্ধারণের পরও স্থানীয়রা এর বিরোধিতা করেছে। যদি আজ আমার মৃত্যু হয়, তাহলে আমাকে দাফন করা হবে কিনা, আমি জানি না। বিরোধিতার সুরও নানারকম। তারা বলছে, কবরস্থান থাকলে তারা নিশ্চিতে পানি পান করতে পারবেন না। কেউ আনেন জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন- আর্দ্র জলবায়ু, কেউবা আনেন ভূমিকম্পপ্রবণ ভূমিতে দাফনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন। আবার অনেকের আপত্তি নিতান্তই ‘আমার এলাকায় নয়’ যাকে গবেষকরা ‘নিম্বিইজম’ বলছেন। এক বিরোধিতাকারী সাংবাদিককে অকপটে বলেন, মুসলমানদের প্রতি তার কোনো বিদ্বেষ নেই, কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তাও তিনি বোঝেন তবে সেটি তিনি তার নিজের পাড়ায় চান না। আর সংসদে এক ধাপ এগিয়ে সানসেইতো দলের আইনপ্রণেতা মিজুহো উমেমুরা জনস্বাস্থ্যের যুক্তি দেখিয়ে মুসলিম কবরস্থানের বিরোধিতা করেছেন এবং মুসলিমদের ভিনদেশি বলে আখ্যায়িত করে পরামর্শ দিয়েছেন মৃতদেহ নিজ দেশে পাঠিয়ে দাফন করতে। অথচ জাপানের আর্থসামাজিক উন্নয়নে মুসলিমদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
মুসলিমরা মক্কার বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করে সালাত আদায় করে, কিন্তু অনেক জাপানি এই শিষ্টাচার জানেন না। ১৪ জন ব্যতীত বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সামনে ইসলামী পর্দারীতি, রমাদানের সিয়াম, হালাল খাদ্য; এমনকি মুসলিমদের ঈদ সম্পর্কেও সাধারণ জাপানিদের ধারণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। কারণ ঈদের দিনও জাপানে সরকারি ছুটি থাকে না, যা জাপান সরকারের মুসলিমদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য জাপানি যোদ্ধারা মুসলিম মসজিদের ভূগর্ভস্থ কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অথচ সেই জাপানি সরকারের মুসলিমদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে জাপানি মুসলিমরা মৃত্যুবরণ করলে তাদের কবরস্থ করতে বাধা দেওয়া হয়। অথচ এটি মুসলিমদের অধিকার। অন্যদিকে জাপানিরা ইসলামী সংস্কৃতি, রীতিনীতি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সৌন্দর্য সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে। এর ফলে বর্তমান জাপানের মুসলিম সমাজের মতো সমগ্র দেশে দেখা দেয় বিভিন্ন অসঙ্গতি। সুতরাং জাপানের আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থেই সকল ধরনের বৈষম্য বন্ধ করে মুসলিমদের কবরস্থ করাসহ মুসলিমদের ইসলামিক লাইফস্টাইলে জাপান সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।
তথ্যসূত্র : southasiajournal.net, ucanews.com, দ্য ইকোনমিস্ট, আল-জাজিরা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, কিয়োদো বার্তা সংস্থা।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com