দুবাইয়ে গ্রেফতার বেনজীরকে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু


১৮ জুন ২০২৬ ১০:১৯

স্টাফ রিপোর্টার : বেনজীর আহমেদ, বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক প্রধান। তিনি র‌্যাবপ্রধানও ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ ৬টি দুর্নীতির মামলা রয়েছে। ইতোমধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বলছেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গুম, খুন ও গণহত্যার অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে। বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমি ও বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য উঠে আসে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে থাকা তার একটি ফ্ল্যাটও জব্দ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল)। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় গত ১২ জুন শুক্রবার তাকে দুবাই পুলিশ গ্রেফতার করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে তাকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা গেলে তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হবে এবং তদন্তাধীন মামলাগুলোয় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
আরব আমিরাতকে দুদকের চিঠি
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১৬ জুন মঙ্গলবার এ চিঠি দেওয়া হয়। বেনজীর আহমেদের তথ্য নিতে দুদকে এসেছে ইন্টারপোলের স্থানীয় সমন্বয় সংস্থা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। গত ১৬ জুন মঙ্গলবার দুপুরে এনসিবির দুই সদস্যের একটি টিম দুর্নীতি দমন কমিশনে আসেন। গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতারের পর বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করছে দুদক।
এনসিবিতে ট্রাইব্যুনালের চিঠি
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গুম, খুন ও গণহত্যার অভিযোগে অন্তত ১০টি মামলার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। গত ১৫ জুন সোমবার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, চলমান প্রতিটি মামলার সঙ্গেই বেনজীর আহমেদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে এবং অধিকাংশ তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) এবং ইন্টারপোলের মাধ্যমে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের ওয়ারেন্টের কপি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। এনসিবির মাধ্যমে ইন্টারপোলে যোগাযোগ করে তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, র‌্যাবপ্রধান ও আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় একাধিক গুম ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বেনজীরের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্ত চলছে। চট্টগ্রামের একরাম হত্যা মামলাসহ আরও কয়েকটি ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি সংসদে জানান, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রসিকিউশন জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য ইতোমধ্যে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি বাহারুল ইসলাম বলেন, এনসিবির মাধ্যমে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ পাঠানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা বাস্তবায়ন করে।
বেনজীরকে দেশে ফেরাতে করণীয় জানালেন শিশির মনির
দুবাইয়ে গ্রেফতার সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব বলে মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির। তবে এজন্য শক্তিশালী আইনি প্রস্তুতি, সঠিক তথ্য উপস্থাপন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। গত ১৫ জুন সোমবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ‘বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া: একটি সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক পোস্টে তিনি এ মতামত তুলে ধরেন।
শিশির মনির বলেন, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে তাকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সরাসরি কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও ২০১৪ সালে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি এবং দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর চুক্তি দুই দেশের বিচারিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
আইনজীবী শিশির মনির জানান, ইউএইর আইনের অধীনে গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ আবেদনের সঙ্গে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা, এফআইআর, তদন্ত প্রতিবেদন, অপরাধের বিবরণ, নাগরিকত্বের তথ্য এবং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণাদি দাখিল করতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে যে মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয় এবং দেশে ফিরলে অভিযুক্ত ব্যক্তি ন্যায়সঙ্গত বিচার পাবেন। পোস্টে তিনি নরসিংদীর একটি হত্যা মামলার দুই আসামিকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনাকে সফল প্রত্যর্পণের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। সব শেষে শিশির মনির বলেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপরÑ নিখুঁত ও শক্তিশালী আইনি নথিপত্র, অভিযুক্তের পরিচয় ও মামলার তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপন এবং ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা।