বিলাসিতায় নিঃস্ব ধর্মহীন নাগরিক

ইসলামোফোবিয়ার শিকার কানাডার মুসলিমরা


১১ জুন ২০২৬ ১০:০০

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
প্রায় ৪ কোটি জনসংখ্যার ৩৮ লাখ ৫১ হাজার ৮২১ বর্গমাইল আয়তনের বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমি নিয়ে গঠিত দেশ কানাডা। দেশের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে সঙ্গে জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। দেশটির শতকরা ৪৮ ভাগ লোক ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এবং ৩১ ভাগ ফরাসি। এছাড়া জার্মান, ইতালীয় ও আমেরিকান-ভারতীয় বংশোদ্ভূতও রয়েছে। ১২টি প্রদেশ ও দুটি টেরিটরি নিয়ে ফেডারেল রাষ্ট্র কানাডা। ২০২১ সালের আদমশুমারিমতে প্রায় ৫৩.৩% খ্রিস্টান, ৩৪.৬% ধর্মহীন, ৪.৯% মুসলিম এবং ৭% অন্যান্য ধর্মের অনুসারী রয়েছে দেশটিতে। কানাডা উন্নত বিশ্ব হিসেবে পরিচিত হলেও সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভয়াবহ। অতিমাত্রায় বিলাসিতা ও অলস জীবনযাপন তাদের ক্রমে নিঃস্ব করে ফেলছে। নাগরিকদের মাঝে মানসিক রোগের বিস্তার ঘটছে। অন্যদিকে মুসলিমরা দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম সম্প্রদায় হয়েও ইসলামোফোবিয়ার শিকার।
কানাডায় ইসলামের আগমন : ১৮৭১ সালের আদমশুমারিতে প্রথম কানাডায় মুসলমানদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩। এ দেশে মুসলমানরা প্রথমে কানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ে স্থাপনের সময় আসেন। পরবর্তী সময়ে আলবার্টায় কৃষিকাজ এবং অন্যান্য প্রদেশে কল-কারখানায় কাজের জন্য মুসলমানরা ভারতীয় উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আগমন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্যও বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের এখানে দেখা যায়। ১৯৩০-এর দশকটা ছিল বড় পরিবর্তনের। ১৯৩৪ সালে সাসক্যাচোয়ানের রেজিনায় প্রথম মুসলিম সংগঠন গড়ে ওঠে। চার বছর পর ১৯৩৮ সালে কানাডার আলবার্টার রাজধানী এডমন্টনে প্রথম ঐতিহাসিক মসজিদ ‘আল-রাশিদ’ নির্মিত হয়। ১৯৬০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিয়ের ট্রুডোর দক্ষতা, পরিবার মিলন ও মানবিক সাহায্যের ভিত্তিতে পয়েন্ট সিস্টেম আইন সংস্কারের পর থেকে কানাডায় মুসলিম ইমিগ্র্যান্টের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৮১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তা ৯৮ হাজার ৯৭০ জনে উন্নীত হয়। ১০ বছর পর ১৯৯১ সালে মুসলিম জনসংখ্যা দাঁড়ায় দুই লাখ ৫৩ হাজারে। ২০০১ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখেরও বেশি। বর্তমানে মুসলমানদের এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখে। ২০৩০ সালে এই সংখ্যা তিন মিলিয়ন বা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুসলিম অবদান : কানাডার সামগ্রিক অগ্রগতিতে মুসলমানদের অবদান দৃশ্যমান। দেশটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরে বহু মুসলিম উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন। জাতীয় নির্বাচন-২০২৫ বিজয়ীদের মধ্যে ১৫ জন মুসলিম সংসদ সদস্য রয়েছেন। ১৯৯৩ সালে ১০ জন মুসলমান ব্যবসায়ী কানাডিয়ান বিজনেস অ্যাওয়ার্ড লাভ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দেশটির বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম অধ্যাপকের উপস্থিতি লক্ষ করার মতো। দেশীয় গ্রহণযোগ্যতা ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চেয়ে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে এগিয়ে রয়েছেন কানাডার মুসলমানরা। শিক্ষাঙ্গনে ৩১ শতাংশ স্নাতকধারী মুসলমান, যেখানে কানাডার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৭ শতাংশ স্নাতকধারী। মুসলিম সংগঠন এনসিসিএম বৈষম্যের বিরুদ্ধে অধিকার রক্ষায়, এমএসি শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতা, সিসিএমডব্লিউ নারীদের অধিকার আদায়ে, ইসলামিক রিলিফ বিশ্বে সাহায্য পৌঁছে এছাড়া ক্যালগারির সাবেক মেয়র নাহিদ নেনশি, এমপি সালমা জাহিদ ও অন্যদের কানাডার আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান উল্লেখযোগ্য।
রিফিউজি ফ্রেন্ডলি : ১৯৭০-৮০-এর দশকে দক্ষিণ এশিয়া (পাকিস্তান, ভারত), বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের, লেবাননের এবং ১৯৯০-এর দশকে বসনিয়া, আলবেনিয়া, সোমালিয়া ও আফগানিস্তানের এবং ৯/১১-এর পরও সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান ও সোমালিয়া থেকে শরণার্থী আসে দেশটিতে। কানাডা সরকারের নতুন পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচগুণ বেড়েছে মুসলিম জনসংখ্যা। বেসরকারি হিসাবে গত তিন বছরেও এ সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। এতে অভিবাসীদের সংখ্যাই বেশি। কানাডার শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মো. আসিউজ্জামান বলেন, ‘মুসলিম পপুলেশন বৃদ্ধির কারণ, এটি রিফিউজি ফ্রেন্ডলি দেশ।’ তবে ইসলামোফোবিয়ায় মুসলিমরা জর্জরিত দেশটিতে।
গির্জা ও মসজিদ : মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মসজিদও বৃদ্ধি পাচ্ছে কানাডায়। কয়েক বছরের আইনি লড়াইয়ের পর ওন্টারিওর চ্যাথামের মুসলিমরা সম্প্রতি ইসলামিক সেন্টার উদ্বোধন করেন। এর আগে ভবনটি সেন্ট জেমস প্রেসবিটারিয়ান গির্জা ছিল। চ্যাথাম ইসলামিক সেন্টারের প্রেসিডেন্ট আমির নাভিদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এটি হচ্ছে সমগ্র মুসলিম সংস্কৃতি ও সমাজের ভিত্তিতে আমাদের প্রতিবেশীদের জানার একটি তত্ত্ব। আপনি কেবল সালাতে আসবেন এবং চলে যাবেন- এমনটি হবে না।’ দীর্ঘদিন ধরে চ্যাথামে অবস্থানরত বাসিন্দা ও ইসলামিক সেন্টারটির সদস্য রিজওয়ান খান বলেন, তিনি এই কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত হতে পেরে গর্বিত এবং তিনি ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানান।’
বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে আইন দাবি : কানাডার টরন্টো মসজিদের মুহাম্মদ আসলিম জাফিসকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হলে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘ঘটনাটি নব্য-নাৎসিবাদ ও ইসলামোফোবিয়ায় সংশ্লিষ্ট।’ ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর কানাডিয়ান মুসলিমসের (এনসিসিএম) নেতা মোস্তফা ফারুক প্রত্যাশা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ কাজেও প্রতিফলিত হবে। তবে সেটি হয়নি। তিনি আরো বলেন, ‘শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী সংগঠন আমাদের ওপর হামলা করেছে। আমরা এর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করছি।’
মোস্তফা ফারুক মনে করেন, টরন্টো হত্যাকাণ্ড ও ২০১৭ সালে সংঘটিত কুইবেক মসজিদ হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা। সে ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ১৯ জন আহত হয়। বর্ণবাদবিরোধী সংগঠনের নেতা ইভান বলগার্ড টরন্টো হত্যাকাণ্ডের পেছনে সন্দেহভাজন নব্য-নাৎসিবাদ সংগঠন সম্পর্কে বলেন, ‘তারা প্রভুর আসনে বসিয়ে হিটলারের উপাসনা করে।’
ধর্মবিদ্বেষ : কানাডিয়ানদের মধ্যে অনেকে বিশ্বাস করেন ক্যাথলিক ধর্ম, ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টবাদ এবং ইসলাম সমাজের জন্য যতটা উপকারী তার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। গ্লোবাল নিউজে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন অ্যাশলে স্টুয়ার্ট।
ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি প্রকাশিত এঙ্গুশ রেইডের এক সমীক্ষায় কানাডায় নির্দিষ্ট কিছু ধর্মের বিষয়ে মানুষের ধারণার ওপর আলোকপাত করা হয়। আত্মোপলব্ধির প্রশ্ন এলে, সমীক্ষায় দেখা যায়, স্বাভাবিকভাবেই, ধর্মপ্রাণ হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই মনে করেন যে, সমাজে ধর্ম ইতিবাচক অবদানই রাখছে। ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টানদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৬ শতাংশ) বলেছেন, তারা অনুভব করেন যে, ধর্মবিশ্বাসের কারণে সমাজে তাদের দরজা বন্ধ, একই ধরনের অনুভূতি (২৬ শতাংশ) মুসলমান প্রকাশ করে দ্বিতীয় স্থানে। ক্যালগেরি ইউনিভার্সিটির একজন সমাজতাত্ত্বিক এবং জাতিতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান আবদি কাজেমিপুরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ধর্ম বিষয়ে কানাডায় অস্বাচ্ছন্দ্যের লক্ষণ দেখা যায়।’
আর অ্যাকশন ফর হিউমানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মুসলিম অ্যাসেসিয়েশন অব কানাডার সাবেক মুখপাত্র রনিয়া লওয়েন্ডি গ্লোবাল নিউজকে বলেন, কানাডায় ব্যাপকভাবে ইসলামভীতি বিদ্যমান। তিনি আরো বলেন, ‘আমাকে মসজিদ ঘিরে সব সময়ই ছোট-খাটো আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের (Microaggressions) মোকাবিলা করতে হয়। আর এসব পদ্ধতিগত বৈষম্য ঘটে শ্বেতাঙ্গবাদী গোষ্ঠী এবং পক্ষপাতপূর্ণ রাজনীতিকদের কাছ থেকে।’ পদ্ধতিগত বৈষম্যের প্রতিকারের ‘লক্ষ্য হলো সমাজের সঙ্গে অঙ্গীভূত হওয়া, তবে স্বতন্ত্র পরিচয় থাকতে হবে।’
Othered : অ্যাকশন ফর হিউমানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রনিয়া লওয়েন্ডি বলেন, ‘অন্য সবাই যখন আপনাকে ‘অপর’ (The others) অনুভব করতে বাধ্য করবে, তখন আপনি নিজেকে কেবল ‘অপর হয়ে যাওয়া’ (Othered) মানুষ বোধ করবেন।’ তিনি আরো বলেন, “যখন বিল ২১ নামের আইন বিদ্যমান, তখন আমি কীভাবে নিজেকে ‘অপর হয়ে যাওয়া’ মানুষ না ভেবে পারি?” কানাডায় ধর্মনিরপেক্ষাতার আইন (বিল-২১) পাস হয় ২০১৯ সালে। ঐ আইনে বলা আছে কুইবেক প্রভিন্সে সরকারি চাকরিজীবীরা; বিশেষত যারা কর্তৃত্বের অবস্থানে আছেন; যেমন শিক্ষক, বিচারক, পুলিশ বাহিনীর সদস্য প্রমুখ তাঁরা কর্মস্থলে কোনো ধর্মীয় পোশাক বা প্রতীক; যেমন হিজাব, বোরকা, পাগড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারবেন না এবং বিল ৬২ (২০১৭) সেবায় মুখ খোলা বাধ্য করে যেটি মুসলিমদের অধিকার লঙ্ঘন। তবে ইকরা খালিদের সরকারের প্রতি ইসলামোফোবিয়া এবং কানাডায় বিদ্যমান সকল ধরনের প্রথাগত বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বৈষম্য নিন্দা এম-১০৩ প্রস্তাবনা ২৩ মার্চ ২০১৭ সালে সংসদে ২০১-৯১ ভোটে গৃহীত হয়। এটি কানাডায় ঘৃণ্য অপরাধ মোকাবিলা এবং সমতা প্রচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। রনিয়া লওয়েন্ডি বলেন, ইসলাম বিষয়ে কানাডিয়ানদের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃত ইসলাম যদি কানাডিয়ানরা জানতো, তাহলে তারা মুসলিমদের অভিবাসী করে আনার বিষয়ে উৎসাহ দিতো।’
‘আধ্যাত্মিক অনিশ্চয়তা’ : এঙ্গুশ রেইডের একটি সমীক্ষা ২০২২ সালের দুটি সমীক্ষার ফলাফলের সমন্বয়। একটি সমীক্ষা চালানো হয় ২১ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যাতে বৃহত্তর অখ্রিস্টীয় ধর্মের (মুসলিম, শিখ ও ইহুদি) ১ হাজার ২৯০ জন কানাডিয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্য সমীক্ষাটি চালানো হয় ৫ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত। এতে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে ১ হাজার ৭০৮ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
উপাত্তে দেখা যায়, এক-পঞ্চমাংশ (১৯ শতাংশ) কানাডিয়ান নিজেকে ‘অবিশ্বাসী’ শ্রেণির মানুষ বলে চিহ্নিত করেন। ‘আধ্যাত্মিকভাবে অনিশ্চিত’ বা ধর্মহীন ৪৬ শতাংশ কানাডিয়ান পরবর্তীতে যাদের মধ্যে অসংখ্য নিঃস্ব এবং মানসিক রোগীও দেখা যায়। এক-তৃতীয়াংশ (৩৪ শতাংশ) নিশ্চিতভাবেই সৃষ্টিকর্তা বা একটি পরম শক্তিতে বিশ্বাস করেন। অন্যদিকে ৩১ শতাংশ কানাডিয়ান মনে করেন, একটি পরম শক্তির অস্তিত্ব আছে। রোমান ক্যাথলিকদের অর্ধেকেরও বেশি (৫২ শতাংশ) এবং মূলধারার প্রটেস্টান্টদের ৫৬ শতাংশ ‘আধ্যাত্মিকভাবে অনিশ্চিত’। মাত্র ১৬ শতাংশ কানাডিয়ান নিজেদের ‘ধর্মীয় দিক থেকে অঙ্গীকারবদ্ধ’ বলে মনে করেন। অন্যদিকে ১৯ শতাংশ কানাডিয়ান ‘একান্ত জীবনে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী।’ আর ইভাঞ্জেলিকালরা বলেন, তাদের ‘বিপথগামী’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। ধর্মপ্রাণ হিসাবে বিবেচিত হলে একসময় যেমন ‘সামাজিক সুবিধা’ পাওয়া যেত, এখন সেটির জন্য ‘সামাজিক মূল্য’ দিতে হয়। একইরকম প্রবণতার কথা বলেছে স্ট্যাটক্যানের তথ্য, খ্রিস্টীয় ধার্মিকতা যখন নজিরবিহীন নিম্নে পৌঁছে গেছে, তখন সংখ্যালঘু ধর্ম; যেমন ইসলাম এবং শিখ অভিবাসনে অব্যাহতভাবে বিকশিত হচ্ছে। স্ট্যাটক্যান পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, প্রকৃতপক্ষে ২০৩৬ সালের মধ্যে অখ্রিস্টীয় ধর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হবে।
‘ফার্স্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ : বেশ কয়েক বছর ধরে উইনিপেগের গ্র্যান্ড মসজিদে বার্ষিক ‘ফার্স্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ ইভেন্ট রমাদানে মুসলিমদের ইফতার প্রদান এবং সহযোগিতা করে। দেশটির প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসলিম রয়েছে। তবে মুসলিমদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি অন্টারিও, কুইবেক, আলবার্টা, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ও ম্যানিটোবায়। সিয়াম ইসলামী বিধান হলেও কানাডিয়ান এক অমুসলিম সাংসদ ছয় বছর ধরে সিয়াম সাধনা করছেন অভাবী মানুষকে খাওয়ানোর জন্য। দক্ষিণ-পশ্চিম অন্টারিওর আজাক্স শহরে বসবাসরত ওই সাংসদের নাম মার্ক হল্যান্ড। সিয়াম করে তিনি খাবারের টাকা গিভ ৩০’ নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দেন। এটি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-অস্ট্রেলিয়ার দরিদ্র মানুষের ‘ফুডব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত।
ইসলামোফোবিয়াবিরোধী অফিস বন্ধ : কানাডার ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস (NCCM) ইসলামোফোবিয়া ও ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় কাজ করা দুটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস বাতিল করার সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। যদিও ফেডারেল সরকার দুটি অফিসকে একীভূত করে ‘অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল অন রাইটস, ইকুয়ালিটি অ্যান্ড ইনক্লুশন’ নামে একটি কাউন্সিলের অধীনে আনার ঘোষণা দিয়েছে।
এ বিষয়ে আইডেন্টিটি বিষয়ক মন্ত্রী মার্ক মিলার বলেন, সরকার সারা দেশে সমন্বিত একটি জাতীয় উদ্যোগ গড়ে তুলতে চায়। তবে এই একীভূতকরণ মূলত খরচ কমানোর জন্য করা হচ্ছেÑ এমন ধারণাকে নাকচ করে দেন মিলার। কানাডায় আগে ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় গঠিত স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভের অফিসের নেতৃত্ব দিতেন আমিরা এলঘাওয়াবি এবং ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় স্পেশাল এনভয়ের অফিস নেতৃত্ব দিতেন ডেবোরাহ লায়ন্স। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কানাডায় ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলার জন্য আমিরা এলঘাওয়াবিকে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। উল্লেখ্য, দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে মুসলিমবিরোধী হামলার ঘটনার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
এনসিসিএম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, কানাডার মুসলিম সম্প্রদায় ‘ধারাবাহিক ও নিবেদিত নেতৃত্ব পাওয়ার যোগ্য’। তারা জোর দিয়ে আরো জানায় যে, এই দুটি অফিস বন্ধ করে দেওয়া হলে ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংগঠনটি ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী দূতের অফিস ভেঙে দেওয়া নিয়েও অস্বস্তির কথা উল্লেখ করে। সেন্টার ফর ইসরাইল অ্যান্ড জিউইশ অ্যাফেয়ার্স এবং বি’নাই ব্রিথ কানাডাসহ বিভিন্ন ইহুদি অধিকারভিত্তিক সংগঠনও সরকারকে একই আহ্বান জানিয়েছে।
উন্নত বিশ্ব হিসেবে বিবেচিত কানাডায় ৯/১১-এর পর মুসলিমদের ওপর ঘৃণামূলক অপরাধ বেড়ে ২০১২ সালের ৪৫টি থেকে ২০১৫ সালে ১৫৯টিতে পৌঁছে। নিউইয়র্ক, সিডনি, বার্লিন, প্যারিসে মুসলিমদের ওপর হামলা, ২০১৭-এ কুইবেক মসজিদে গুলিতে ছয়জন, ২০২১-এ লন্ডনে ট্রাক হামলায় আফজাল পরিবারের চারজন, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে ৫০ মুসলিম হত্যা, কানাডার মসজিদে আগুন বা আলবার্টায় বাসে মিশরীয় মুসলিম হিজাবি নারীর ওপর আক্রমনের ঘটনা প্রকৃতপক্ষে ইসলামোফোবিয়ায় এবং অপরাধীদের মানসিক রোগী বলে আখ্যায়িত করার বিষয়টিও একই সূত্রে গাঁথা বলে বিশ্বাস করা হয়, যেটির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও বিশ্বমানবতা রক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে। শত প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেও এগিয়ে যাচ্ছে কানাডার মুসলিমরা।
তথ্যসূত্র : স্ট্যাটিসটিক্স কানাডা; ইসলাম ইন কানাডা; এনসিসিএম, সিসিএমডব্লিউ ও ইসলামিক রিলিফ; রিসার্চগেট ও সেজ জার্নালস; সিবিসি, ইয়ুথরেক্স।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com

কবি সৈয়দ আলী আহসান
২৭ জুলাই ২০২৬ ১৬:০১