সম্পাদকীয়

প্রতিদিনের যাত্রাপথ হোক নিরাপদ


৪ জুন ২০২৬ ১০:৫২

প্রতি বছর ঈদ আনন্দে হরিষে বিষাদ হয়ে আসে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু। খুশির যাত্রা পরিণত হয় জীবনের শেষযাত্রা, শোকযাত্রায়। স্বজনবিয়োগে ঈদের আনন্দ হারিয়ে যায়, শত শত পরিবার আর হাজার হাজার মানুষের জীবনে নেমে আছে অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
কিন্তু কেন প্রতি বছরই ঘটছে এমন অনাকাক্সিক্ষত অঘটন? কবে এর অবসান হবে? কবে ঈদযাত্রা সত্যিকারের আনন্দযাত্রায় পরিণত হবে। এমন প্রশ্নের উত্তরে দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছর দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নানা কর্মসূচি নেয়া হয়। সচেতনতা বাড়াতে চলে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা। কিন্তু বিষয়টি একটি ‘উপলক্ষ্য’কে কেন্দ্র করে সমাধানের মতো নয়। এজন্য প্রয়োজন স্থায়ী টেকসই কর্মসূচি এবং তার বাস্তবায়ন।
কারণ সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশের নিত্যদিনের ঘটনা। বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের বিপরীতে মৃত্যুর হার প্রায় ৮৫ থেকে ১০২ জন। ঈদযাত্রায় এ সংখ্যা আরো বাড়ে।
পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে ২৫ থেকে ৩১ মে সাত দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭৯ জনের। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার সড়কে এই প্রাণহানি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ ঈদের ছুটিতে পরিবারের কাছে যাচ্ছিলেন। কেউ মোটরসাইকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিলেন। বাস-ট্রাক উল্টে কারো কারো মৃত্যু হয়েছে। মোট ৩২টি দুর্ঘটনায় এসব প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও ১৩৫ জন। গত ৩১ মে রোববার এক দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। আহত হয়েছেন অন্তত ৭৮ জন। মোট ৩২টি দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫টিই ছিল মোটরসাইকেলের। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩২ জন, যা মোট প্রাণহানির ৪০ দশমিক ৫০ শতাংশ। ঈদযাত্রার শুরুতেই গত ২৫ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ শ্রমিক নিহত হন। ছুটির সময়ে এটিই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। একই দিনে বগুড়ার শাজাহানপুরে গ্রামের বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ব্র্যাকের এক কর্মী ও তাঁর চার বছরের মেয়ে নিহত হন। নওগাঁর পত্নীতলায় ডাম্প ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে ইজিবাইকের চালকসহ দুজনের মৃত্যু হয়। ঈদের দিন গত ২৮ মে বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে। ১৮ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি এদিন আহত হন আরও ৩০ জন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, পুরো বছর সড়কে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে ঈদের সময়ে সেটি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সেফটি এমন নয় যে সারা বছর আপনি সড়কে উচ্ছৃঙ্খলতা, বিশৃঙ্খলা রাখবেন আর ঈদের সময় হুঁশিয়ারি দেবেন, রাতারাতি সব পরিবর্তন হয়ে যাবে- বিষয়টা এরকম না। এটা একটা চর্চার বিষয়। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কেবল ঈদকেন্দ্রিক তোড়জোড় না করে দীর্ঘমেয়াদি ‘সেফটি কালচার’ বা নিরাপত্তাকে অভ্যাসে পরিণত করাতে কাজ করতে হবে। সড়কের ওপর থেকে চাপ কমাতে এবং মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বন্ধ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রেলের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সিডিউল বিপর্যয়, টিকিট সঙ্কট ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেকেই ট্রেন এড়িয়ে চলেন।
এবারের ঈদেও ছিল ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যয়। অধিকাংশ ট্রেনই কমপক্ষে তিন ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে। রেল খাতের এ বিপর্যয় দূর করে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থতার নেপথ্যে বাস মালিক ও রেলের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়ী বলে অভিযোগ আছে। বিষয়টি তদন্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা প্রতিবারই বলা হয়। কিন্তু ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?’ সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে বাস মালিক। সরকারে যারা আছেন, তাদের দায়িত্ব সরকার আগে জনগণের কথা ভাবা। তবেই পরিবর্তন আসবে।
আমরা মনে করি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার নেয়া ছাড়া সড়কপথ নিরাপদ হবে না। আর বিষয়টি শুধু ঈদযাত্রা নয়, প্রতিদিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের সড়কপথ নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ আজই কার্যকর টেকসই পরিকল্পনা নেবে- এ আমাদের প্রত্যাশা।