খাদ্যসংক্রান্ত হালাল-হারামের বিধান ও কুরবানি


২২ মে ২০২৬ ২১:৩৫

॥ নূরুন্নাহার নীরু ॥
‘আল্লাহ তোমাদের যে হালাল ও উত্তম জীবিকা দিয়েছেন, তা থেকে তোমরা খাও এবং তোমরা আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় করো; যদি তোমরা কেবল তারই এবাদত করে থাকো।’ (সূরা নাহল : ১১৪)।
ইদানীং দেখা যাচ্ছে কিছু মহল কুরবানির বিরোধিতা করতে গিয়ে সুকৌশলে তা মানবসমাজে প্রচার করতে চায় অন্যভাবে। যেমন ‘গোমাংসসহ যেকোনো প্রাণীর মাংস ভক্ষণ, দুধ; এমনকি ডিম খেতেও নাকি তাদের কলিজা ছিঁড়ে যায়। ‘কারণ ওটা ওই প্রাণীটার খুব কষ্টের সরবরাহ! তাহলে আমি বলবো’, মৌমাছির সংগৃহীত মধুও তোমাদের না খাওয়াই উচিত। কারণ ওই মধু হচ্ছে মৌমাছির পেট থেকে নিংড়ানো একটি রঙিন রস, যা সে অনেক পরিশ্রম করে, বহু পথ পাড়ি দিয়ে, বিভিন্ন ফুল থেকে সংগ্রহ করে এনে জমিয়েছিল।’ (সূরা আন নাহল)। অথচ এসবই মহান আল্লাহ তার শ্রেষ্ঠ জীব মানবজাতির জন্য হালাল করে দিয়েছেন।
খাবার মূলত দুই প্রকার প্রাণিজ ও উদ্ভিজ। কিন্তু যারা প্রাণিজ খাবারের ওপরে অনুৎসাহিত করতে ও বিরত রাখতে সচেষ্ট হচ্ছেন, তাদেরকে মনে রাখতে হবে এই দুটি সৃষ্টিই আল্লাহর। আল্লাহ তা মানুষের জন্যই নেয়ামত স্বরূপ দুনিয়ায় রেখেছেন। যার ফলে সেসবের নাম উল্লেখ করে আল কুরআনে একটা খাদ্য নির্দেশিকাও দিয়ে দিয়েছেন। কুরবানি যেহেতু প্রাণিজ খাবারের সাথে যুক্ত, সেহেতু আমি এখানে প্রাণিজ খাদ্যের বিষয়টা নিয়েই আল কুরআনের আলোকে আলোচনা করছি।
আল কুরআনের বিভিন্ন সূরায় মহান আল্লাহপাক হালাল খাদ্য সম্পর্কে যা বলেছেন, ১) তারা কি দেখে না, আমরা আমাদের হাতে যেসব জিনিস তৈরি করেছি তার মধ্যে তাদের জন্য পশুও তৈরি করেছি এবং তারাই সেগুলোর মালিক হয়! আর আমরা সেগুলোকে করে দিয়েছি তাদের বশীভূত। ফলে সেগুলোর কিছু পশুকে তারা বাহন হিসেবে ব্যবহার করে, আর তারা আহার করে কিছু পশুর গোশত। সেগুলোয় তাদের জন্য রয়েছে বহু রকম মুনাফা, রয়েছে পানীয় (দুধ)। তবু কি তারা শোকর আদায় করবে না? (সূরা ইয়াসিন : ৭১-৭৩)।
২) অল্লাহ আরো বলেছেন, গবাদি পশুর মধ্যে তিনি সৃষ্টি করেছেন কিছু ভারবাহী আর কিছু ছোট পশু। আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দিয়েছেন তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো নাা। কারণ সে তোমাদের সুস্পষ্ট দুশমন। (সূরা আনআম : ১৪২)।
৩) গবাদি পশুর মধ্যেও তোমাদের জন্য রয়েছে একটি শিক্ষা। তাদের পেটের গোবর ও রক্তের মধ্যে থেকে আমরা তোমাদের পান করাই খাঁটি দুধ, যা পানকারীদের জন্য সুস্বাদু। (সূরা নাহল : ৬৬)।
৪) হে মানবকুল, তোমরা পৃথিবীর সেসব খাদ্য আহার করো, যেগুলো হালাল এবং ভালো। তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। কারণ সে তোমাদের সুস্পষ্ট শত্রু। (সূরা বাকারা : ১৬৮)।
৫) হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ তোমাদের জন্য যেসব ভালো জিনিস হালাল করেছেন, তোমরা সেগুলোকে হারাম সাব্যস্ত করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না; কারণ আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাদেরকে যেসব হালাল-উত্তম জীবিকা দিয়েছেন, তা থেকে খাও এবং সেই মহান আল্লাহকে ভয় করো,যাঁর প্রতি তোমরা মোমেন বা বিশ্বাসী। (সূরা মায়েদা : ৮৭-৮৮)।
৬) হে আদম সন্তান! মসজিদের (সালাত) সময় তোমরা তোমাদের সুন্দর পোশাক পরবে, আর আহার করবে, পান করবে কিন্তু অপচয় করবে না অমিতাচারি হবে না। কারণ আল্লাহ অপচয় বা অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।
পরের আয়াতেই আল্লাহ তায়ালা আরো বলেছেন; (হে নবী!) তুমি জিজ্ঞেস করো, ‘আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য যেসব সুন্দর বস্তু আর উত্তম জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো হারাম করলো কে? বলে দাও; সেগুলো তো তাদের জন্যই যারা পার্থিব জীবনে এবং বিশেষ করে কেয়ামত দিবসে বিশ্বাস করে।’ এমনিভাবে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনসমূহ বিশদভাবে বিবৃত করে থাকি। (সূরা আল আ’রাফ : ৩১-৩২)।
এই আয়াতে ওইসব ব্যক্তিদের দাবি খণ্ডন করা হচ্ছে, যারা পানাহার বা পরিধানের কোন জিনিস নিজের ওপর হারাম করে থাকে অথচ শরীয়তে তা হারাম নয়। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)।
এছাড়া উপরিউক্ত আয়াতগুলোয় গবাদি পশু থেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য গ্রহণসহ এর উপকারিতা বর্ণনা করা হয়েছে, যা মহান আল্লাহ তার মানব কুলের জন্য নেয়ামতস্বরূপ তৈরি করে রেখেছেন। এছাড়া খাদ্য হিসেবে আছে জলজ প্রাণী। যার বিধান সম্পর্কে আল কুরআন বলছে সূরা মায়েদার ৯৬নং আয়াতে বিশেষভাবে।
এবারে আমরা জানবো কোন কোন খাদ্য হারাম এবং খাদ্য কীভাবে গ্রহণ করতে হবে সে সম্পর্কে।
১) হে লোকেরা! যারা ঈমান এনেছো, আমি তোমাদের যেসব ভালো-পবিত্র রিজিক দিয়েছি তোমরা শুধুমাত্র সেগুলো থেকেই খাও এবং আল্লাহর শোকর আদায় করো, যদি তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে থাকো।
তিনি তোমাদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন; মৃত পশুপাখি, প্রবাহিত রক্ত, শুয়োরের মাংস এবং যেসব পশুপাখি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে যবেহ (যেমন বলি) করা হয়েছে সেগুলো। তবে কেউ যদি প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়ে এ ধরনের কিছু খায় ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা ছাড়া এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থাৎ সীমালঙ্ঘন না করে, তবে তার পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল অতিব দয়াবান। (সূরা বাকারা : ১৭২-১৭৩)।
২) হারাম করে দেয়া হলো তোমাদের জন্য মৃত পশু, রক্ত, শুয়োরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবাই করা পশু, দমবন্ধ হয়ে মরে যাওয়া, আঘাতে মৃত পশু, ওপর থেকে পড়ে মরা পশু, শিংয়ের গুঁতোয় মরা পশু, এবং সেই পশু যাকে হিংস্র জানোয়ার ছিন্ন ভিন্ন করে খেয়েছে। তবে এর মধ্যে যেগুলোকে তোমরা যাবেহ করার সুযোগ পাও, সেগুলো হালাল। আর যেগুলো আস্তানা বা বেদিতে জবাই করা হয়েছে, সেগুলো হারাম। (সূরা মায়েদা : ৩)।
৩) যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে তোমরা খাও যদি তোমরা তার আয়াতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। তোমাদের কী হয়েছে, যাতে আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে, তা কেন তোমরা খাবে না? অথচ তোমাদের জন্য যা যা হারাম করা হয়েছে, তা তোমাদের বিশদভাবেই বলে দেয়া হয়েছে। তবে তা থেকে কিছু গ্রহণ করতে তোমরা নিরুপায় হয়ে পড়লে ভিন্ন কথা। অনেকেই না জেনে নিজেদের খেয়াল খুশির ভিত্তিতে অন্যদের বিপথগামী করে। তোমার প্রভু সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোভাবেই জানেন।
তোমরা বর্জন করো জাহেরী/প্রকাশ্য। পাপ এবং বাতেনি/গোপন পাপ। যারা পাপ কামাই করে, অচিরেই তাদেরকে তাদের পাপের উচিত শাস্তি দেয়া হবে।
যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, তা তোমরা খেও না, কারণ তা ফাসেকি। শয়তানরা তাদের ওলিদের প্ররোচনা দেয় তোমাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হতে। তোমরা যদি তাদের কথামতো চলো তবে অবশ্যই মুশরিক হয়ে যাবে। (সূরা আন’আম : ১১৮-১২১)।
৮) তারা নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো যেগুলো হারাম করেছে, সেগুলো আট প্রকার। মেষের দুটি এবং ছাগলের দুটি। তাদের জিজ্ঞেস করো; তিনি নর দুটি হারাম করেছেন নাকি মাদি দুটি? নাকি মাদি দুটির গর্ভে যা আছে তা? তোমরা সত্যবাদী হলে এলেমের ভিত্তিতে অবহিত করো। পরের আয়াতে আবার বলেছেন, আর উটের দুটি এবং গরুর দুটি। তাদের জিজ্ঞেস করো; তিনি কি নর দুটি হারাম করেছেন নাকি মাদি দুটি? নাকি মাদি দুটির গর্ভে যা আছে তা? নাকি তিনি যখন এ নির্দেশ দিয়েছিলেন তখন তোমরা উপস্থিত ছিলে? ‘ওই ব্যক্তির চাইতে বড় জালেম আর কে, যে মানুষকে বিপথগামী করার জন্যে এলেম ছাড়াই আল্লাহর ওপর মিথ্যারোপ করে? নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিম লোকদের হেদায়েত করেন না। (সূরা আন’আম : ১৪৩-১৪৪)।
এ আয়াতগুলো থেকে সুস্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে আল্লাহ আমাদের জন্য কী কী খাদ্য এবং কেমন করে তা খাওয়া যাবে, তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আরো বলেছেন আল্লাহর হালাল করা বিষয় নিজ খামখেয়ালিতে হারাম করে নেয়ার কোনো এক্তিয়ার কারো নেই। এবং তার পরিণাম ফলও ভালো নয়। শেষের আয়াতগুলো সেসব অবাধ্য ব্যাক্তিদের প্রতি রীতিমতো ভর্ৎসনাস্বরূপ।
কুরবানি সংক্রান্ত বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, ১) ‘অতএব তোমরা তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানি করো।’ (সূরা আল কাউসার : ২)।
২) ‘প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমরা কুরবানির নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া জীবিকা হিসেবে পাওয়া চারপায়ী পশুর ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা আল হজ : ৩৪)।
৩) সূরা হজের ৩৬-৩৭নং আয়াতে আল্লাহ যা বলছেন, তার সারমর্ম হলোÑ চার পেয়ে এইসব জন্তু আল্লাহর নিদর্শন স্বরূপ। বিশেষ করে উট। কুরবানির পশুকে কিভাবে জবাই করতে হবে তা ও আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছেন ৩৬ নাম্বার আয়াতে। এবং আল্লাহ আরো উল্লেখ করছেন ৩৭ নাম্বার আয়াতে; ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তার কুরবানির গোশত এবং রক্ত। বরং পৌঁছায় মানুষের তাকওয়া। আল্লাহ সেগুলোকে তাদের অধীন করে দিয়েছেন, যেন তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পারো। তিনি তোমাদের যে হেদায়েত দান করেছেন তার ভিত্তিতে, সুসংবাদ দাও কল্যাণকামীদের।’
আমরা জানি, ইসলামে ইতিহাসে কুরবানি সংক্রান্ত একটি ঘটনা বিবৃত আছে, হযরত ইব্রাহিম ও তার পুত্রসন্তান হযরত ইসমাইল আ.-কে কেন্দ্র করে। এই ঘটনাটি ছিল মূলত আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্য, ভালোবাসা, সন্তুষ্টি ও নির্ভরশীলতার পরম পরাকাষ্টার পরিচয়। যা সূরা আস সাফফাতের ১০২-১০৭নং আয়াতে বর্ণিত। এই ত্যাগ তিতিক্ষা, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ভালোবাসা ইত্যাদির মূর্ত প্রতীক হিসেবেই মানবজাতির ওপর কুরবানির বিধান নাজিল করা হয়েছে। এমন কি হজ পালন ও এই কুরবানিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।
মূলত অবৈধ বিষয়গুলোই বরং আল কুরআনের দাবি অনুযায়ী পরিহারযোগ্য। যেমন মহান আল্লাহর রাব্বুল আলামিন বলছেন, হে নবী! বল, তোমাদের প্রভু তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন, তা তোমাদের তেলাওয়াত করে শুনাই। সেগুলো হলো-
ক. তোমরা তার সাথে কোনো কিছুকেই শরিক করবে না।
খ. পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করবে।
গ. দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারণ আমরাই তাদের এবং তোমাদেরও রিজিক দেই।
ঘ. প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে অশ্লীল কাজের কাছেও যেও না।
ঙ. আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন তোমরা তাকে হত্যা করো না, (তবে যথার্থ কারণ ও হক পন্থায় হলে ভিন্ন কথা)। আল্লাহ তোমাদের এসব ওছিয়ত করেছেন যাতে করে তোমরা আকল খাটাও।
চ. এতিমরা বয়োপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তম পন্থায় ছাড়া তাদের মাল সম্পদের কাছেও যেও না।
ছ. পরিমাণ ও ওজন ন্যায্যভাবে পূর্ণ করে দাও। আমরা কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের বেশি বোঝা চাপাই না।
জ. তোমরা যখন কথা বলবে ন্যায্য কথা বলবে নিকট জনের বিপক্ষে গেলেও।
ঝ. আল্লাহকে দেয়া অঙ্গীকার পূর্ণ কর। আল্লাহ এসব ওসিহত তোমাদের প্রদান করছেন যাতে করে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। (সূরা আনআম : ১৫১-১৫২)।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হালালকে বর্জন নয়, বরং হারামকে বর্জন করে আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেওয়াই প্রকৃত সফলতার জীবন। এবং কুরবানির বিরোধিতামূলক কৌশলগত চক্রান্তে লিপ্ত হওয়া বরং নিজেদেরকে দূর্ভাগ্যের দিকে ঠেলে দেয়ার শামিল।
লেখক : কলামিস্ট ও প্রবন্ধকার।