জাতির স্বার্থে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরতেই হবে
১৪ মে ২০২৬ ১০:৩৯
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
বাংলাদেশ দুর্নীতির ক্যান্সারমুক্ত হতে পারলো না অর্ধশতাব্দীতেও। যা ১৮ কোটি মানুষের পাওয়া জরুরি ছিল এবং আমাদের সাধারণ জনগণের তুলনামূলকভাবে সৎ, সহজ-সরল এবং কাজে তৎপর। আমাদের দেশের মানুষ বিদেশে নাসা থেকে শুরু করে ছোট-বড় অনেক জায়গায় ভালো ভূমিকা রাখছে। দেশের সুনাম ও রেমিট্যান্স কামাই করছে। গত ইউনূস সরকারের সময় বেশকিছু নামিদামি লোক দেশে ফিরে সরকারের সাথে কাজ করেছে। তারা মর্যাদা পেয়ে তাদের মেধা জনগণের জন্য ব্যয় করেছে। ভালো উদ্যোগ ছিল।
কিন্তু নতুন সরকার এসে তারা আবার দলীয়করণের নতুন ফাঁদে পড়ে দুর্নীতিবাজদের বিভিন্ন প্রশাসনে বসানোর কাজে হাত দিয়েছে, যা কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক হলো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক। সেখানেও আগের রেওয়াজ ভেঙে একজন ঋণখেলাপিকে গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে, শুধুমাত্র দলীয়করণের কারণে। বাংলাদেশের ৫২টি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে।
পত্রিকায় প্রকাশ, ২৮টি ব্যাংক থেকে মাত্র ৬টি গ্রুপ ২৮ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, টাকাগুলো দেখে বিনিয়োগ না করে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে, যা দেশের জন্য, দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে যাচ্ছে।
আওয়ামী আমলে দুর্নীতির রানি হাসিনা ও তার দোসররা এই ২৮টি ব্যাংক লুট করেছে। তার মধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী একাই ৯টি ব্যাংক খেয়ে ফেলেছে, যা প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে সবই ঋণখেলাপির মধ্যে পড়েছে। হাসিনার খুবই কাছের অর্থ পাচারকারী এস আলম গ্রুপ খেয়েছে প্রায় দুই লাখ পঁচিশ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের সবচেয়ে নামকরা এবং পৃথিবীজুড়ে যার অবস্থান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। এ ব্যাংক থেকেও প্রায় ৮০% টাকা লুট করে বিভিন্ন নামে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। ইসলামী ব্যাংক সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আয়ের ব্যাংক। হাজার হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী এখন চিন্তায় পড়েছে- এ ব্যাংক কি আদৌ টিকে থাকবে? ব্যাংকটি টিকে থাকার বড় দিক হলো আল্লাহর কুরআনের আলোকে পরিচালিত প্রথম এবং একমাত্র সুদহীন ব্যাংক হিসেবে চালু ইসলামী ব্যাংক। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ ব্যাংক যারা চালিয়েছে, তারা সুনাম, সততা, দক্ষতা এবং দেশে ইসলামী আইনের আলোকে পরিচালিত করে দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক বানিয়েছে।
বর্তমানে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের কব্জায় থাকার কারণে ব্যাংকের স্বাভাবিক কাজ করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। অদক্ষ লোক নিয়োগ, বাড়তি লোক নিয়োগ এবং বিদেশে টাকা পাচার করার কারণে ইসলামী ব্যাংকের পূর্বের সুনাম ধরে রাখতে পারছে না। দেশের ৯২% মুসলমান হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক হয়েছে আল্লাহয় বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ। সততা ও দক্ষতার কারণে অমুসলিম ব্যবসায়ীরাও এ ব্যাংকের গ্রাহক অনেক এবং তারা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারছে।
এছাড়া এস আলম গ্রুপ ও তাদের দোসররা আরো ৫টি ইসলামী ব্যাংক দেউলিয়া করে ফেলেছে। গত ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার এ ব্যাংক ৫টিকে সচল করার জন্য একীভূত ব্যাংক হিসেবে চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার এসে এই ব্যাংকগুলো চালানোর ব্যাপারে আবার হতাশা দেখা দিয়েছে।
ব্যাংক খালি করার আরেক গ্রুপ হলো সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ। তারা ১৭টি ব্যাংক থেকে অর্ধশত হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা শুধু জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। যার সবই ঋণখেলাপি হয়ে রয়েছে।
এছাড়া শিকদার গ্রুপ ১১টি ব্যাংক খালি করেছে। যার মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অন্যতম। এছাড়াও আরো প্রায় ১০টি গ্রুপের নাম পত্র-পত্রিকায় এসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ওপরের ব্যাংক লুট করা কোম্পানিগুলোয় তদন্ত করার এবং টাকা উদ্ধারের জন্য কমিটি করেছিল, যার তদন্ত চালু আছে।
যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তিনিই ঋণখেলাপি ছিলেন আবার প্রায় ১০০-এর কাছাকাছি সংখ্যা সদস্য ব্যাংকের ঋণখেলাপি, তাই লাখ লাখ ঋণখেলাপির টাকা উদ্ধার করা খুবই কঠিন। যদিও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, দুর্নীতিবাজদের তিনি টুঁটি চেপে ধরবেন। আমরা আশা রাখতে চাই দুর্নীতিবাজদের ধরে তাদের পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে এনে জনগণের কাজে লাগাতে।
আমাদের দেশের সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে জনসম্পদের সার্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ বানানো সম্ভব। আমাদের দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরতে হলে আমরা চাই আমাদের ৩০০ এমপি ও ৫০ জন মহিলা এমপি থেকে শুরু করতে হবে। তারা নিজেরা দুর্নীতির সাথে জড়িত হবেন না। তাদের এলাকা দুর্নীতিমুক্ত করার পদক্ষেপ নেবেন। তাদের অধীনে জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে ডিসি, এসপি, ওসি, ইউএনও সবাইকে গাইড করতে হবে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশে জনগণের সেবা করার। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান সদ্য জাপান থেকে এসে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি পাইকারি মার্কেটে যাবেন, খুচরা মার্কেটে যাবেন, এমনকি ভোগ্যপণ্য যেখানে উৎপাদিত হয়, সে এলাকা পরিদর্শন করবেন, তা যতদূরই হোক। আমরা তার এই ঘোষণার সুফল পেতে চাই, যা উদ্যোগ নিলে সম্ভব। কৃষক ও উৎপাদনকারীরা তাদের পণ্যের সঠিক মূল্য পাচ্ছে না, শুধুমাত্র যাতায়াত খাতে চাঁদাবাজির কারণে। সামনে ঈদুল আজহা। পথে পথে পশু চলাচলে যেন কোনো চাঁদাবাজি না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। ইতোমধ্যেই যোগাযোগমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, পথে যাতে চাঁদাবাজি না হয়। আমরা চাই মন্ত্রীর কথা যেন কার্যকরী হয়। তিনি যেন পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনে নজরদারির ব্যবস্থা করেন। চাঁদাবাজদের ধরিয়ে দিতে হবে, যে দলেরই হোক না কেন। আমরা জনগণের পাশে দাঁড়াতে চাই। জনগণের উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন। আসুন, আমরা জনগণের পক্ষে দাঁড়াই।
পানের দোকান থেকে প্লেনের ব্যবসায়ীর সব কাজ দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। গ্রাম-গঞ্জে, হাট-বাজারে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ করার জন্য আমার প্রস্তাব সরকারি দল ও বিরোধীদলের লোক সমন্বয়ে সরকারের গ্রামাঞ্চলের লোকসহ কমিটি করে এলাকার ও শহরের বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সরকার ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরাও কমিটি করার সাথে বাজারে জ¦ালানি তেলের সংকট কেটে গেল ম্যাজিকালী পদ্ধতিতে। তাই সরকার ও বিরোধীদলের সমন্বয়ে দেশের স্বার্থেই সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতিমুক্ত করতেই হবে।
মহান আল্লাহ আমাদের এই ছোট দেশে খাল-বিল, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, জনবল সবই দিয়েছেন। শুধুমাত্র দেশের নেতারা যদি নিজেরা দুর্নীতিমুক্ত থেকে দেশ পরিচালনা করতে পারি, তবে দেশের দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়া খুবই সহজ হয়ে যাবে।
জামায়াতে ইসলামীর লোকেরা শহর-বন্দর, রাজধানীতে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, সবগুলোই দেশের মানুষের সেবা করে যাচ্ছে। ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবই দিনে দিনে উন্নত হচ্ছে, বড় হচ্ছে। মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
জোট সরকারের সময় জামায়াতের ২ জন মন্ত্রী, যারা শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছর ৩টি মন্ত্রণালয় চালিয়ে গেছেন। আজ পর্যন্ত তাদের মন্ত্রণালয়ে কোনো দুর্নীতি খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ তাদের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে স্বৈরাচার হাসিনা ফাঁসিতে ঝুঁলিয়েছে; তা আবার প্রমাণ হলো আরেক জিন্দা শহীদ এটিএম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির মঞ্চ থেকে পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার ঘটনা থেকে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, এ ফাঁসির আদেশ ছিল আইনের জন্য কলঙ্কজনক। তাই আসুন, সত্যকে সত্য জেনেই মিথ্যার অবসান করে দেশে আইনের শাসন কায়েম করে দেশের দুর্নীতি দূর করি।
কয়েকদিন আগে সংসদে একজন মন্ত্রী বলেই বসলেন, জেনে-শুনেই তারা জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে। জুলাই সনদ দেশের প্রায় ৭০% গণভোট দিয়ে পাস করেছে। আর সরকারি দল বলছে, তারা এ ভোট মানে না। অর্থাৎ তারা জনগণের সাথে প্রতারণা করছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেয় যায় না। সংসদে এবং সংসদের বাইরে জনগণের প্রাণের দাবির পক্ষে জনগণ সরকারের এ প্রতারণার জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার কোনোভাবেই জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে যেতে পারবে না।
জাতীয় জীবনে তাই দুর্নীতির এবং মিথ্যা আশ্বাসের যে প্রতিশ্রুতির অবসান ঘটাতে হবে। দেশকে আমরা একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে পিছপা হবো না।
আমাদের দেশের টাকা যারা লুটপাট করেছে, যারা দেশের টাকা অবৈধভাবে বিদেশে পাচার করেছে, ব্যাংকের টাকা লুট করেছে, তাদের যেমন বিচার করতে হবে এবং পাচার করা টাকা ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। ব্যাংকের মালিক সেজে যে সমস্ত শেয়ার তাদের কব্জায় নিয়েছিল, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের জিম্মায় রেখে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে। তারা শেয়ারের টাকার অনেকগুণ টাকা লুট করেছে, বিদেশে পাচার করেছে। তাই তাদের কোনো অধিকার নেই শেয়ারের মালিক থাকার। সরকারের লোকজন এবং শেয়ার মালিকদের সচেতন হতে হবে- যাতে কোনোভাবেই ঐ শেয়ার পূর্ব মালিকদের কাছে না যায়।
দেশ আমাদের সবার। তাই দেশের স্বার্থেই সব ধরনের দুর্নীতি দমন করেই আমরা দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে চাই। দেশের কল্যাণই হোক আমাদের অন্যতম চাওয়া ও পাওয়া।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com