ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে কুরবানি


১৪ মে ২০২৬ ১০:৩৬

॥ আতাউর রাহমান নাদভী ॥

কুরবানির ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব
কুরবানির শিকড় হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই পাওয়া যায়। তবে এর বর্তমান রূপটি হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সেই মহান ঘটনার স্মৃতিস্মারক, যখন তিনি আল্লাহর আদেশে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার জন্য পেশ করে পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন উপমা পেশ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর এই ঈমানী জজবাকে এতটাই পছন্দ করেছিলেন যে, সেটিকে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব (বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ) হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কুরআন তাঁর সেই কুরবানিকে এভাবে উল্লেখ করেছে, ‘অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছালো, তখন সে বললো, ‘হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত’; সে বললো, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’। -সূরা আস সাফফাত : ১০২।
অতঃপর কী হচ্ছে একটু দেখুন। এক বিস্ময়কর দৃশ্য আসমানের নিচে জমিনের ওপর ঘটলো। কুরআন সেই দৃশ্যকে এভাবে ধারণ করেছে, ‘অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করলো এবং সে তাকে কাত করে শুইয়ে দিলো। তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, ‘হে ইব্রাহীম। ‘তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। নিশ্চয় আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি’। ‘নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা’। আর আমি এক মহান যবেহের বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম।’ Ñসূরা আস সাফফাত : ১০৩-১০৭।
আমরা এখন সেই হৃদয় কাঁপানো ও ঈমান জাগানো পিতা-পুত্রের সংলাপ ভুলে গিয়ে কুরবানির ঈদে গোশত খাওয়ার কথা মনে রেখেছি। কারণ কুরবানির ঘটনার গভীরে যাওয়ার এবং কুরবানি হতে শিক্ষা গ্রহণের জন্য আমাদের সময় কোথায়? আমরা এখন শুরু করেছি কার চেয়ে কে কত বড় গরু দিয়ে কুরবানি দিতে পারে সেই প্রতিযোগিতা। এটি করতে পারলেই আমি হয়ে গেলাম সব চেয়ে বড় মুসলমান ও মুত্তাকী। তবে সত্য কথা হলো, এটি হয়ত সমাজে আমাকে বড় দাতা হিসেবে প্রমাণ করতে পারে, তবে আখিরাতে শূন্যের কোটায় হবে আমার অবস্থান। এ নিয়ে সন্দেহ করার কোনো অবকাশ নেই। তাই আখেরাতে কিছু পেতে হলে কুরবানির জন্য গরু ছাগল ক্রয় করে বাসায় এসে যখন আপনার ফ্যামিলি মেম্বারদের মুখোমুখি হবেন, তখন তাদের কুরবানির প্রকৃত অর্থ বলুন, তাদের ইব্রাহীম (আ.)-এর একাকী শিরকের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সে সম্পর্কে বলুন, শিরকবিরোধী আন্দোলনের প্রাথমিক ভবিষ্যদ্বাণী নবীদের দেখানো দাওয়াতের পদ্ধতিতে তাদের সামনে বর্ণনা করুন। হিজরতের প্রাচীন ঐতিহ্য এবং এর সুবিধাগুলো ব্যাখ্যা করুন।
এক আল্লাহর দিকে যারা দাওয়াত দেয় শয়তান কীভাবে প্রতিটি যুগে তাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিলো তা নিজের পরিবারের সদস্যদের সামনে তুলে ধরুন। তাদেরকে পরিষ্কার করে বলে দিন যে, কুফর ও শিরক তথা ইসলামবিদ্বেষী শক্তি প্রতিটি যুগে এক ও একক শক্তি ছিলো, আছে এবং আগামীতেও থাকবে। ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থিত প্রতিটি আওয়াজ শয়তানের সৈন্য ও সেনাবাহিনীর সমর্থনের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ার আওয়াজ এটি বোঝার জন্য তাদেরকে সেই শিক্ষা দিন। তাদেরকে বলে দিন ঈদুল আজহা মানে শুধু গোশত খাওয়া নয়; বরং ঈদুল আজহা হলো ইসমাইল (আ.)-এর কুরবানি, হাযেরাহ (আ.)-এর কষ্ট, ইব্রাহীম (আ.)-এর স্ত্রী-পুত্রের ভালোবাসার সামনে আল্লাহ ভালোবাসার প্রমাণ, কা’বাঘরের নির্মাণের ইতিহাস, এক আল্লাহর আনুগত্যের স্লোগান, মক্কা মুকাররমার এই দিক থেকে সেই দিক পর্যন্ত ইব্রাহীম (আ.)-এর পরিবারের সাথে জড়িত ঈমান ও আনুগত্যের স্মৃতির কথাগুলো বলুন।
ইব্রাহীম (আ.)-এর পুরো পরিবারের ত্যাগের ইতিহাস, কুরবানির অর্থ, এই যুগেও সেই কুরবানি প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যতে সব ধরনের ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকার সাহস জুগিয়ে তাদেরকে জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানির জন্য উদ্বুদ্ধ করে অন্তর্দৃষ্টির ওপর আলোকপাত করে তাদের মধ্যে ঈমানী শক্তি সৃষ্টি করুন। সবাইকে জানিয়ে দিন যে, ধর্মের প্রতিটি স্লোগান এবং প্রতিটি শিক্ষার বিরুদ্ধে সকল কুফরী শক্তি ঐক্যবদ্ধ অতীতেও ছিলো বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
এই যুগে ঈমান নিয়ে বাঁচতে হলে প্রতিটি ঘরে ঘরে ইব্রাহীম ও ইসমাঈলের ঈমানের মতো দৃঢ় ঈমানের প্রয়োজন রয়েছে, তা তাদের বুঝতে শেখান। আর সেই ইব্রাহীম ও ইসমাইল তোমাকে আমাকেই হতে হবে এটি তাদের বলুন। কারণ সব ইসলামবিদ্বেষী শক্তি পুরো প্রস্তুতি নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে এখন আর ঘুমিয়ে থাকার সময় নেই। মুসলিম উম্মাহকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে হবে। আর এই দায়িত্ব আমাকে আপনাকে এবং আমার আপনার সন্তানদেরই পালন করতে হবে। লাখ লাখ টাকা দিয়ে গরু ক্রয় করা অথবা বাজারের সবচেয়ে বড় গরুটি কুরবানি দেয়ার বিলাসিতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দীন কায়েমের আন্দোলনের কাতারে এসে দাঁড়াতে হবে। আয়েশ ও আরামকে হারাম মনে করতে হবে। সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে যে, আল্লাহ অলসতাকে পছন্দ করেন না। খাও দাও ফুর্তি করাকে পছন্দ করেন না। তিনি আমাদের অবিরাম গতিতে দীনের পথে চলমান দেখতে চান।
মুসলমানদের আয়েশ ও আরাম, বিলাসী জীবন এবং বিশ্রামে থেকে জীবন পার করে দেয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। নিত্যদিনের এই জগৎ চাষাবাদের মতো, একজন কৃষক যেমন দিনরাত মাঠে কাজ করে, তেমনিভাবে আমাদের আল্লাহর সর্বোচ্চ বাণীর তথা দীনের দাওয়াত প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতে হবে। কারণ একজন মুসলমান ইসলামের বিরুদ্ধে শয়তানী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ দেখে কখনো দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারে না। সমাজের সব মুসলমানের মাঝে ঐক্যের আহ্বান জানাতে উদ্বুদ্ধ করুন। সন্তানদের পারস্পরিক অক্ষমতা, ক্ষোভ, শত্রুতা থেকে মুক্তির কথা শেখান। তাদের বুঝতে শেখান যে, তাদের উপার্জনের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ও শক্তি এই অভিযোগের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদের বলুন, ইসলাম প্রকৃতির ধর্ম, এই প্রকৃতিতে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা ধ্বংসের স্রোত ও ঢেউ থামাতে পারবো না।
কুরবানির মাধ্যমে সমাজের সকল মুসলমানদের তাদের ‘মুসলিমত্ব’ মনে করিয়ে দিতে হবে। ইসলাম ও বিশ্বাসের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য স্পষ্ট করে তাদের বোঝাতে হবে। এক লাখ চব্বিশ হাজার নবী ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবী সারাজীবন একই কাজ করেছেন। আমাদেরও সেই একই কাজে নিয়োজিত থেকে একই দাওয়াত এবং একই প্রজ্ঞার সাথে প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন মনে করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রজ্ঞা এবং শৃঙ্খলা দিয়ে আপনি এমন কীর্তি সম্পাদন করতে পারেন, যা সেনাবাহিনীও করতে পারে না। কুরবানি মুসলিম উম্মাহকে শুধু গোস্ত খাওয়ার রাস্তা বাতলে দেয় না; বরং দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার সেই শিক্ষাও দেয়। তাই পশু কুরবানির কথা মনে রেখে পিতা-পুত্রের সংলাপ ভুলে গেলে সত্যিকারের ঈমানদার দাবি করা হাস্যকর।
ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর সেই মহান কুরবানি : কল্পনা করুন, কোনো বাবা কি পারেন আপন কলিজার টুকরো সন্তানের চোখ বেঁধে, হাত-পা রশি দিয়ে শক্ত করে আটকে ধারালো ছুরি দিয়ে তার কণ্ঠনালিতে আঘাত করতে? ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর হুকুম পালনে তা-ই করেছিলেন। ছুরি চালানোর সময় যখন আল্লাহর নির্দেশে তা কাটছিলো না, তখন তিনি ক্ষোভে ছুরিটি পাথরের ওপর নিক্ষেপ করেন। বলা হয়ে থাকে, তখন সেই ছুরি বলেছিলো, ‘হে ইব্রাহীম! আপনি বলছেন কাটতে, কিন্তু আমার রব দশবার নির্দেশ দিচ্ছেন, কেট না, কেট না। আপনি যদি আল্লাহর একটি হুকুম অমান্য করতে না পারেন, তবে আমি আমার রবের দশটি নির্দেশ কীভাবে উপেক্ষা করি?’ তখনি জিবরাঈল (আ.) ঘোষণা করলেন, ‘নিশ্চয়ই ইব্রাহীম! তুমি তোমার রবের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ।’ সেই থেকেই কিয়ামত পর্যন্ত সামর্থ্যবান মুসলিমদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব করা হয়েছে।
কুরবানির আসল শিক্ষা ও বার্তা
কুরবানির ঘটনা আমাদের ৫টি মূল শিক্ষা দেয়
(১) আল্লাহর সন্তুষ্টিতে তৃপ্ত থাকা : মুমিনদের জীবনে বিপদ-আপদ আসবেই। যারা আল্লাহর যত প্রিয়, তাদের পরীক্ষাও তত কঠিন। বিপদে অভিযোগ না করে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকাই প্রকৃত মুমিনের কাজ।
(২) প্রশ্নাতীত আনুগত্য : আল্লাাহর বিধান পালনে কোনো শিথিলতা দেখানো যাবে না; এমনকি যদি সবচেয়ে প্রিয় বস্তুও বিসর্জন দিতে হয়।
(৩) সর্বস্ব ত্যাগের মানসিকতা : একজন পূর্ণাঙ্গ মুমিন সর্বদা তার জান ও মাল আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন।
(৪) ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা : জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে ধৈর্য এবং প্রাপ্ত নেয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করা।
(৫) আত্মনিবেদন : হযরত ইসমাইল (আ.) নিজেকে কুরবানির জন্য পেশ করে প্রমাণ করেছেন যে, আমাদের জীবন ও মরণ, সবই আল্লাহর জন্য।
কুরবানির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য : ইব্রাহীম (আ.) ছিলেন আল্লাহর একজন মনোনীত ও প্রিয়নবী। তাঁর জীবন ঈমান জাগানিয়া অসংখ্য ঘটনায় ভরপুর। তবে পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণ এবং কুরবানির বিধান পালনের ঘটনা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। এখানে উল্লেখ্য, এর বাইরে পিতা-পুত্রের যত সব কাহিনী আমাদের আলেমদের কেউ কেউ মাহফিলে বানিয়ে বানিয়ে শোনায়, এসবের কুরআন-হাদীসে কোনো ভিত্তি নেই। কুরবানির হাকীকাত সম্পর্কে রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এভাবে উত্তর দিয়ে বলেছেন: ‘যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে তাঁর সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই কুরবানিটা মূলত কী? উত্তরে তিনি বললেন, এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাহ। তারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতে আমাদের জন্য কী লাভ রয়েছে? উত্তরে তিনি বললেন, প্রতিটি পশমের পরিবর্তে সাওয়াব হবে। তারা আবারও পশম নিয়ে প্রশ্ন করলো। (অর্থাৎ পশুর পশম তো প্রচুর) রাসূল (স.) বললেন প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে সাওয়াব রয়েছে।’ -সুনানে ইবনে মাজাহ, সুনানে তিরমিযী।
এখানে অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য যে, রাসূল (সা.) কুরবানিকে শুধু ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাহ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন বিষয়টি এমন নয়; বরং তিনি তাঁর জীবদ্দশায় এর ওপর আমল করে বাস্তব নমুনাও পেশ করেছেন। অতএব এটি তাঁর উম্মাতকে আদায় করতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহর (সা.)-এর বাস্তব আমলেন মাধ্যমে এই কুরবানি এখন পৃথিবীর সকল মুসলমানদের জীবন ও ইবাদার একটি অবিচ্ছেদ্য বিধান হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। কুরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত, যা প্রতি বছর আইয়্যামে নহর (১০, ১১ এবং ১২ যিলহাজ) আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি এবং হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাত অনুসরণে আদায় করা হয়। এই আমলটি কেবল পশু যবাই করার নাম নয়, বরং নিজের নফস ও খাহেশাতকে (প্রবৃত্তি) আল্লাহর হুকুমের সামনে উৎসর্গ করার একটি প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ।
নবীদের জীবন ও ধৈর্যের পরীক্ষা
পৃথিবীতে আগত সোয়া লক্ষ নবী-রাসূল বিভিন্ন সময় কঠিন পরীক্ষা ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন:
আইয়ুব (আ.) : দীর্ঘকাল কঠিন অসুস্থতায় ছিলেন, কিন্তু কখনো আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে ভোলেননি।
ইউনুস (আ.) : চল্লিশ দিন মাছের পেটে বন্দি ছিলেন।
ইয়াকুব (আ.) : বিরহে কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন।
ইউসুফ (আ.) : মিশরের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি হয়েছিলেন।
মূসা (আ.) : নিজ কাউমের পক্ষ থেকে চরম লাঞ্ছনা ও জাদুকরদের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
নূহ (আ.) : স্বজাতির অবাধ্যতার কারণে মহাপ্লাবনের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) : মাক্কার মুশরিকরা তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে, তাঁর শরীরে ময়লা নিক্ষেপ করেছে। তায়েফের ময়দানে পাথরের আঘাতে তাঁর জুতা মোবারক রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো। এত কষ্ট সত্ত্বেও আল্লাহর কোনো নবী কখনো উফ শব্দটিও করেননি। তাঁরা আল্লাহর প্রতিটি পরীক্ষায় ধৈর্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
কুরবানির গুরুত্ব বা ফজিলত
আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, কুরবানির দিন আদম সন্তান এমন কোনো কাজ করতে পারে না, যা মহামহিম আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিত (কুরবানি) করার তুলনায় অধিক পছন্দনীয় হতে পারে। কুরবানির পশুগুলো কিয়ামতের দিন এদের শিং, খুর ও পশমসহ উপস্থিত হবে। কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই (কুরবানি) মহান আল্লাহর নিকট সম্মানের স্থানে পৌঁছে যায়। অতএব আনন্দ সহকারে তোমরা কুরবানি করো।’
এতসব ফজিলত থাকার পরও যে কুরবানি করবে না তার সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:, ‘আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.) বলেছেন; যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্তেও কুরবানি করবে না, সে যেন আমাদের ঈদের মাঠের কাছেও না আসে।’ Ñসুনানে ইবনে মাজাহ।
উল্লেখিত হাদীসের মধ্যে মূলত তাকে ঈদগাহে যাওয়া থেকে নিষেধ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং তাকে কুরবানির গুরুত্ব এবং কুরবানি না করলে তার ক্ষতির ও ভয়াবহতা বোঝানো হয়েছেÑ যাতে করে সে তা জেনে যেন কুরবানি করে।
কুরবানির শরয়ী বিধান : ইমাম আবু হানিফার মতে এটি ওয়াজিব। সামর্থ্যবান (যার ওপর যাকাত ফরয) ব্যক্তির ওপর কুরবানি ওয়াজিব।
ইমাম মালেকের মতেও ওয়াজিব। ওয়াজিব হওয়ার কারণ হলো উপরিউক্ত হাদীস।
জামহুরের নিকট এটি সুন্নাহ্।
সময় : কুরবানির নির্ধারিত দিনগুলো হলো ১০, ১১ এবং ১২ জিলহজ।
সুন্নাতে ইব্রাহীমি : এটি হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সুন্নাত, যা পালনের মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।
কুরবানির প্রকৃত দর্শন : পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সূরাতুল হজ, আয়াত নং-৩৭) এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, কুরবানির উদ্দেশ্য কেবল গোশত খাওয়া বা লোকদেখানো নয়, বরং আল্লাহর নিদর্শনাবলির সম্মান করা এবং অন্তরের তাকওয়া অর্জন করা। এই আমল আমাদের ত্যাগ, উৎসর্গ এবং আল্লাহর পথে নিজের সবকিছু (জান ও মাল) বিলিয়ে দেওয়ার শিক্ষা দেয়।
কুরবানির চেতনা ও সামাজিক দিক
কুরবানির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক হলো এর গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করা: এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং এক ভাগ গরিব-মিসকিনদের জন্য। এটি সমাজে ত্যাগ, সহানুভূতি এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে এভাবে ভাগ করা বাধ্যতামূলক নয়।
আমাদের বর্তমান বাস্তবতা ও আত্মোপলব্ধি
আজ আমরা লাখ টাকা দিয়ে পশু কুরবানি করছি, কিন্তু আমাদের পাশের বাড়ির প্রতিবেশী হয়তো ক্ষুধার্ত থাকছে। আমরা পশু যবেহ করে ফ্রিজ ভর্তি করে রাখছি আর মাসের পর মাস তা খাচ্ছি। অথচ কুরবানির মূল উদ্দেশ্য ছিলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেই গোশত গরিব, এতিম ও অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া।
পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনা : শুধু বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানেই প্রতি বছর প্রায় কয়েক কোটি পশু কুরবানি হয়। যদি এই গোশত সঠিকভাবে বণ্টন করা হতো, তবে কয়েক কোটি দরিদ্র মানুষ পেট ভরে খেতে পারত। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও মালয়েশিয়াসহ ধনী মুসলিম দেশগুলো যদি তাদের কুরবানির গোশত এবং চামড়ার টাকা অনুন্নত মুসলিম দেশগুলোর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করত, তবে মুসলিম বিশ্বের মানচিত্র বদলে যেত।
সারসংক্ষেপ ঃ কুরবানির উদ্দেশ্য কেবল পশু যবাই করা নয়, বরং নিজের ভেতরে থাকা অহংকার, কৃপণতা এবং নফসের কুপ্রবৃত্তিকে যবাই করা। আমাদের উচিত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এই মহান সুন্নাতটি আদায় করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা। অতএব আমরা যদি কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে অন্তর থেকে আল্লাহর জন্য ত্যাগ স্বীকার করি এবং হকদারদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিই, তবেই আমরা ইহকালে সম্মান এবং পরকালে মুক্তি লাভ করতে পারব। আসুন, শুধু পশু নয়, বরং নিজেদের অহংকার ও প্রবৃত্তিকে কুরবানি করি।