আদব : ব্যক্তিত্বের দর্পণ ও সভ্যতার সোপান
৯ মে ২০২৬ ১১:৩০
॥ এস এম মাহমুদ হাসান ॥
মানুষের জীবনে জ্ঞান, দক্ষতা ও সম্পদের গুরুত্ব যতই থাকুক না কেন, একটি বিষয় সবকিছুর ঊর্ধ্বে- তা হলো আদব। আদব মানে শুধু ভদ্রতা নয়; বরং এটি মানুষের চিন্তা, আচরণ, ভাষা, বিনয়, সহনশীলতা ও নৈতিকতার সমন্বিত প্রকাশ। একজন মানুষ কতটা শিক্ষিত- তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে কতটা আদবসম্পন্ন। কারণ আদবই মানুষকে সত্যিকার অর্থে ‘মানুষ’ হিসেবে পরিচিত করে, প্রতিষ্ঠিত করে।
ইসলামী সভ্যতায় আদবের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর আদব চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। একদা এক মজলিসে আবু বকর, ওমরসহ প্রায় সকল জলিলুল কদর সাহাবীদের উদ্দেশে রাসূল (সা.) একটা প্রশ্ন করলে কেউই জবাব দিতে পারলেন না। ঐ দিনের মতো বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে মজলিস শেষ হবার পর পথিমধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস স্বীয় পিতা হযরত আব্বাস (রা.)-কে বললেন যে রাসূল (সা.) কতৃক জিজ্ঞেসিত প্রশ্নের উত্তর তিনি জানতেন, তবে মুরুব্বি সাহাবীগণ হতচকিত হবেন বা কষ্ট পাবেন ভেবে তিনি বলেন নাই। আদবের পরাকাষ্ঠা দৃশ্যমান হয় এখানে। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম মালিক তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘জ্ঞান অর্জনের আগে আদব শেখো।’ এই উক্তি স্পষ্ট করে যে, জ্ঞান অর্জনের পূর্বশর্তই হলো সঠিক চরিত্র ও শিষ্টাচার। একইভাবে ইমাম শাফেয়ী তাঁর শিক্ষকের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করতেন, তা শুধু ব্যক্তিগত ভদ্রতার উদাহরণ নয়- বরং শিক্ষাব্যবস্থার একটি আদর্শ রূপক।
আদব মানুষের আত্মিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। হযরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আর জ্ঞান তাকে উন্নত করে।’ এই কথার গভীরে লুকিয়ে আছে এক চিরন্তন সত্য- জ্ঞান মানুষকে উচ্চতায় নিয়ে যায়, কিন্তু আদব তাকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়। অন্যদিকে হাসান আল-বাসরী আদবকে ‘হৃদয়ের সৌন্দর্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মানুষের অন্তর্গত নৈতিকতার পরিচায়ক।
বিশ্বের অন্যান্য দার্শনিক ও মনীষীরাও আদব বা নৈতিক আচরণের ওপর জোর দিয়েছেন। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন, হৃদয়ের শিক্ষা ছাড়া মনের শিক্ষা অসম্পূর্ণ। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন, ‘নিজেকে সম্মান কর, তাহলেই অন্যরা তোমাকে সম্মান করবে।’ এসব বক্তব্য প্রমাণ করে, আদব কেবল একটি ধর্মীয় শিক্ষা নয়- এটি সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও আদবের গুরুত্ব গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষের প্রতি মানুষের ব্যবহারই তার প্রকৃত পরিচয়।’ আবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানবতাকেই সর্বোচ্চ আদব হিসেবে অভিহিত করেছেন। আবার প্রখ্যাত ইমাম ইবনুল মোবারক (র.)-এর একটি বিখ্যাত উক্তিতে বলেছেন, ‘আমি ত্রিশ বছর আদব শিখেছি এবং বিশ বছর ইলম অর্জন করেছি’। এই উক্তিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আদব মানে শুধু নিয়ম মেনে চলা নয়, বরং মানবিকতার চর্চা। ইমাম শাফেয়ী ‘আমি আমার শিক্ষককে এত সম্মান করতাম যে, তাঁর সামনে পৃষ্ঠা উল্টাতাম খুব আস্তে, যেন শব্দ না হয়।’ আবার, আদবের অভাবে কি গুরুতর সমস্যা হতে পারে, ইবনে মুবারকের ভাষায়, ‘যে ব্যক্তি আদবের ব্যাপারে অলসতা করে, সে সুন্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার শাস্তিতে পড়ে। আর যে সুন্নাতের ব্যাপারে অলসতা করে, সে ফরজ ইবাদত থেকে বঞ্চিত হওয়ার শাস্তিতে পড়ে।’ অন্যদিকে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও পরিণতি নিয়ে ইমাম বলেছেন, একজন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত জ্ঞানী থাকে যতক্ষণ সে জ্ঞান অন্বেষণ করে। কিন্তু যখনই সে মনে করে যে সে সব শিখে ফেলেছে, তখনই সে মূর্খ হয়ে যায়। তাই তো তিনি উপদেশ দিয়ে বলেছেন, তোমরা নিজেদের নেক আমলগুলোকে লুকিয়ে রাখো, যেভাবে নিজেদের গুনাহগুলোকে লুকিয়ে রাখো।
বর্তমান সমাজে আদবের সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। প্রযুক্তির অগ্রগতি ও ভোগবাদী মানসিকতার প্রভাবে মানুষের মাঝে সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ ও সৌজন্যবোধ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। পরিবারে বড়দের সম্মান, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার ব্যবহার- সবখানেই আদবের অভাব স্পষ্ট। এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের জন্যই ক্ষতিকর।
এক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ- এই তিনটি স্তম্ভের ভূমিকা অপরিহার্য। পরিবার হলো আদব শিক্ষার প্রথম পাঠশালা। শিশুরা বাবা-মায়ের আচরণ থেকে শেখে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও আচরণগত প্রশিক্ষণ জরুরি। আর সমাজে যদি আদবসম্পন্ন ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হয়, তবে অন্যরাও সেই পথে উৎসাহিত হবে।
আদব চর্চার জন্য কিছু বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার- যেমন সত্যবাদিতা, ধৈর্য, বিনয়, সহনশীলতা ও অন্যের প্রতি সম্মান। একজন আদবসম্পন্ন ব্যক্তি কখনো অন্যকে ছোট করে না, অপমান করে না, বরং সহানুভূতির মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এ ধরনের মানুষই সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।
ইসলামী শরীয়াহ ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে ‘আদব’ বা শিষ্টাচারকে প্রধানত তিনটি মৌলিক ভাগে ভাগ করা যায়:
১. স্রষ্টার প্রতি আদব
এটি আদবের সর্বোচ্চ স্তর। একজন মানুষের অস্তিত্ব যেহেতু তাঁর স্রষ্টার দান, তাই তাঁর প্রতি বিনয় ও কৃতজ্ঞতা থাকা শিষ্টাচারের প্রথম দাবি।
কৃতজ্ঞতা : ভালো সময়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
ধৈর্য : বিপদে বা প্রতিকূল অবস্থায় অভিযোগ না করে ধৈর্য ধরা। ইমামগণ বলেছেন, বিপদ আসলে ধৈর্য ধারণ করা বিপদের চেয়েও বড় সওয়াবের কাজ।
একনিষ্ঠতা : যেকোনো কাজ কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য করা (ইখলাস)।
ভয় ও আশা : তাঁর শাস্তির ভয় রাখা এবং একই সাথে তাঁর দয়ার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা।
২. নিজের প্রতি আদব
নিজেকে সম্মান করা এবং নিজের আত্মাকে পাপাচার থেকে রক্ষা করাও আদবের অংশ।
আত্মসম্মান হচ্ছে এমন কোনো কাজ না করা, যা নিজের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। আর পরিচ্ছন্নত অর্থ শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা বজায় রাখা।
অসংলগ্নতা ত্যাগ, অপ্রয়োজনীয় কথা, কাজ বা চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখাও আদবের অংশ। নিজের বিবেক ও বুদ্ধিকে শাণিত করতে জ্ঞান অর্জন করা অর্থাৎ আলম অন্বেষণ আদবের অন্যতম নিয়ামক।
৩. সৃষ্টির প্রতি আদব
এই অংশটি সমাজ ও মানুষের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এটিই মূলত মানুষের সামনে আমাদের ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলে। একে আবার কয়েকটি উপভাগে ভাগ করা যায়-
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আদব : সৃষ্টিকুলের সেরা ও সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ এবং তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন।
বাবা-মায়ের প্রতি আদব : তাঁদের সাথে নম্র ভাষায় কথা বলা এবং বার্ধক্যে তাঁদের সেবা করা।
বড় ও ছোটদের প্রতি আদব : বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ করা।
প্রতিবেশীর প্রতি আদব : প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের কষ্ট না দেওয়া।
পরিবেশ ও প্রাণিকুলের প্রতি আদব : গাছপালা রক্ষা করা এবং পশুপাখির প্রতি দয়ালু হওয়া।
প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টির প্রতি আদব মানে কেবল বড়দের সালাম দেওয়া নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও পোস্টে কটু মন্তব্য না করাও বর্তমান সময়ের একটি বড় আদব।
ডিজিটাল আদব বা নেটিকেট : এটা হলো অনলাইনজগতে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার শিষ্টাচার। আমাদের বাস্তব জীবনের আচরণের প্রতিফলন যেমন সমাজে পড়ে, তেমনি ডিজিটালজগতেও আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়। বার্তার ভাষা ও স্পষ্টতা, ব্যক্তিগত সময় ও গোপনীয়তা রক্ষা, গঠনমূলক আলোচনা ও মন্তব্য সবই ডিজিটাল আদবের মধ্যে পড়ে।
আদব বনাম অতিভক্তি
মানুষের ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আদব (শিষ্টাচার, ভদ্রতা, মর্যাদাবোধ)। অন্যদিকে অতিভক্তি বলতে বোঝায় এমন এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য বা অতিরঞ্জিত শ্রদ্ধা, যা অনেক সময় যুক্তি, ন্যায়বোধ ও আত্মসম্মানকে আড়াল করে ফেলে। এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য না বুঝলে ব্যক্তি ও সমাজ- উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মূলত আদবের ভিত্তিমূল হচ্ছে নৈতিকতা ও যুক্তি। এর দৃষ্টিভঙ্গি ভারসাম্যপূর্ণ; গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণযোগ্য। ফলাফল হচ্ছে সুস্থ সম্পর্ক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। অন্যদিকে অতিভক্তির কার্যকারণ হচ্ছে আবেগ ও অন্ধ আনুগত্য, এখানে সমালোচনা অগ্রহণযোগ্য, ফলাফল হিসেবে পাওয়া যাবে স্থবিরতা ও ভুলের বিস্তার। সত্য আড়াল করে- ভুলকে সঠিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে, নেতৃত্বকে দুর্নীতিগ্রস্ত করতে পারে, জবাবদিহি কমে যায়, ব্যক্তিত্ব নষ্ট করে, নিজের চিন্তা ও বিচারক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে, ভিন্নমতকে শত্রু ভাবার প্রবণতা বাড়ে। আমাদের দেশে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলগুলো, পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো; বিশেষত অধিকাংশ পীর সাহেবদের দরবারে এবং অত্যধিক কঠোর শ্রেণিবিন্যাসিত অফিসেসহ অনেক জায়গায় আদবের নামে অতিভক্তির প্রচলন বেশ প্রকটভাবে দেখা যায়।
সব শেষে বলা যায়, আদব ছাড়া জ্ঞান অর্থহীন, ক্ষমতা বিপজ্জনক এবং সম্পদ অমূল্যহীন হয়ে পড়ে। আদবই মানুষকে সম্মানিত করে, সমাজকে স্থিতিশীল করে এবং সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত- নিজ নিজ অবস্থান থেকে আদব চর্চা করা এবং আগামী প্রজন্মকে এই মূল্যবোধে গড়ে তোলা। কারণ আদবই হলো সেই শক্তি, যা মানুষকে শুধু উন্নত নয়, মহান করে তোলে। ইমাম ইবনে মুবারক যথার্থই বলেছেন, ‘আদব ছাড়া ইলম হলো আগুনের মতো যা জ্বালানি ছাড়া জ্বলে না।’ তাই একথা বলেই যায় যে আদব হচ্ছে সফলতার অদৃশ্য কারিগর।