গণভোটের রায় অস্বীকার করে দেশকে সংকটে ঠেলে দিচ্ছে সরকার : মিয়া গোলাম পরওয়ার
৭ মে ২০২৬ ০৯:৪৭
খুলনা সংবাদদাতা : গণভোটে জনগণের প্রত্যক্ষ রায়কে পাশ কাটিয়ে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে দেশকে এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জুলাই সনদের আড়ালে গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে অবস্থান। গত শনিবার (২ মে) সকাল ১০টায় খুলনা প্রেস ক্লাবের ব্যাংকুয়েট হলে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার : সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাস্টার শফিকুল আলম এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন। ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার : সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এডভোকেট মুহাম্মদ শাহ আলম।
মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলমের পরিচালনায় প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন এবং উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব শ. ম. আবু তালিব, খুলনার সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর শামসুজ্জামান, অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রহমান, এনসিপির খুলনা মহানগরীর প্রধান সমন্বয়ক আহম্মদ হামীম রাহাত, খুলনা মহানগর খেলাফত মজলিসের সভাপতি এফ এস হারুন অর রশীদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন চঞ্চল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর সভাপতি রাকিব হাসান প্রমুখ।
সেমিনারের শুরুতে কুরআন তেলাওয়াত করেন ড. মো. তহিরুল আহসান তোহা এবং কবিতা আবৃত্তি করেন দেশজ খুলনার সেক্রেটারি গাজী শাহ মাখদুম। এছাড়া গণভোটের দলীয় সংগীত পরিবেশন করেন টাইফুন শিল্পীগোষ্ঠী খুলনার শিল্পীরা।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, সরকার সচেতনভাবেই জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়Ñ এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তার দাবি, সরকার ও মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে বারবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোটে জনগণের দেওয়া সরাসরি রায়ের বিষয়ে নীরবতা বজায় রাখছে।
তিনি বলেন, একবারও কোনো মন্ত্রী বলেননি গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে। কারণ তারা জানে, সেটি মানলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব ভেঙে পড়বে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, গণভোটের আগে দীর্ঘ চার মাস সময় থাকা সত্ত্বেও সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কেন কোনো আপত্তি তোলেনি। ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ, ২৫ নভেম্বর গণভোটের অধ্যাদেশ, ফেব্রুয়ারিতে ভোটÑ এ সময়জুড়ে কেউ বলেননি এসব অসাংবিধানিক। অথচ ক্ষমতায় বসেই সবকিছু অবৈধ বলা হচ্ছে। এটি সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা।
সংবিধান সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, যা বাস্তবে সংস্কারের মূল কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়।
তিনি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করেন, যেসব বিষয়ে বিএনপি আপত্তি তুলেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে দলপ্রধান থাকতে পারবেন না, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (চজ) পদ্ধতি মানতে অস্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না মানা, বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন কমিশনের বিরোধিতা, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান। তিনি বলেন, ‘এই ১০টি জায়গা বাদ দিলে পুরো সংস্কারই অর্থহীন হয়ে যায়। সরকার আসলে এখানেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণভোটে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে যে রায় এসেছে, সেটি সংসদের ডেলিগেটেড ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী। সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি, তারা ডেলিগেটেড পাওয়ার এক্সারসাইজ করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা মানে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা।
সরকারের বর্তমান অবস্থানকে তিনি কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
সেক্রেটারি জেনারেল সতর্ক করে বলেন, পার্লামেন্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের পথেই যেতে বাধ্য হবে সংশ্লিষ্টরা। ‘পাঁচ কোটি মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা যদি সংসদে বাস্তবায়ন না হয়, আমরা আবার জনগণের কাছে ফিরে যাব। আন্দোলনই তখন একমাত্র পথ,’ বলেন তিনি।
কুমিল্লায় শ্রমিক সমাবেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার
দেশকে বিভক্ত করার রাজনীতিতে অপশক্তি সক্রিয় কুমিল্লা সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দেশের মানুষকে বিভক্ত করার রাজনীতিতে একটি অপশক্তি তৎপর রয়েছে। তাদের অপতৎপরতার ফল হিসেবেই জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধনী) বিল-২০২৬ বর্তমান অবস্থায় রয়েছে।
গত ১ মে শুক্রবার সকাল ১০টায় বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কুমিল্লা মহানগরী আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর পুরোনো বিষয় সামনে এনে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করলে সেই জাতি কখনো এগিয়ে যেতে পারে না। বর্তমান সংসদের অধিকাংশ এমপি তরুণ, যারা স্বাধীনতার পর জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের স্বাধীনতাবিরোধী বা রাজাকার আখ্যা দিলে জনগণ তা গ্রহণ করে না, বরং উপহাস করে।
সমাবেশে বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, কমিউনিজম তত্ত্বে শ্রমিকদের কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়নি। একইভাবে একটি রাষ্ট্রে যদি পশ্চিমা গণতন্ত্র, সমাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা প্রাধান্য পায়, তবে সেখানে ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এত সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরও একটি মহল পুরোনো বিতর্ক জিইয়ে রাখতে চায়। এটি দেশপ্রেম নয়, বরং জাতিকে বিভক্ত করার বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ। দেশের স্বার্থে এসব বিতর্ক দ্রুত নিষ্পত্তি করে নতুন প্রজন্মের জন্য ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন কুমিল্লা মহানগরী সভাপতি অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মহানগরীর প্রধান উপদেষ্টা কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা মাওলানা ইয়াছিন আরাফাত এবং কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মু. মজিবুর রহমান ভুঁইয়া।
মহানগরী সেক্রেটারি এডভোকেট জিল্লুর রহমান ও সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ মাইন উদ্দিন সরকারের পরিচালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন শ্রমিক নেতা মুক্তিযোদ্ধা আক্তারুজ্জামান, মুহাম্মদ শফিউল্লাহ, নিজাম উদ্দিন, কলিম উল্লাহ ও মহিউদ্দিন রিপন প্রমুখ।