ভারতের বাঁধ : শতাধিক নদনদীর মৃত্যুঘণ্টা বাজছে


২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:১৩

আসাদুজ্জামাস আসাদ, পঞ্চগড় : পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলে শতাধিক নদী আজ মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে। নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে ভারত সরকার একতরফাভাবে পানি অন্যদিকে প্রবাহিত করছে। এমতাবস্থায় নদনদীগুলো এমন পরিণতির মুখোমুখি হয়েছে। করতোয়া, তিস্তা, মহানন্দা, তালমাসহ প্রায় সব নদী পানিশূন্য অবস্থা বিরাজ করছে। নদীর বুকে ধু-ধু বালুচর। নদী পানিশূন্য হওয়ায় পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে। নদীকেন্দ্রিক জীবন জীবিকা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। উত্তরাঞ্চলসহ দেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার পথে। ইতোমধ্যে খড়া মৌসুমে উত্তরাঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যায় পানির স্তর। ফলে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সাধারণ মানুষের জীবনে অভিশাপ নেমে এসেছে। মানবেতর জীবনযাপন করছে এ অঞ্চলের মানুষ।
ভৌগোলিকভাবে উজানে থাকা প্রতিবেশী দেশ ভারতে সব নদীর জন্ম। দেশটি আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে ভাটিতে থাকা দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে ফারাক্কাসহ অন্যান্য নদীতে নির্মাণ করেছে মরণফাঁদ বাঁধ। ফারাক্কাসহ অন্যান্য বাঁধের ভয়াবহ প্রভাবে এদেশের উত্তরাঞ্চলে শতাধিক নদনদী পানিশূন্য হয়ে মানচিত্র থেকে হারাতে বসেছে। পানিশূন্যতার কারণে অনেক নদনদী মরা খালে পরিণত হয়েছে। অনেক নদী ইতোমধ্যে অস্তিত্ব হারিয়ে আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে। বিগত ৫০ বছর পূর্বে এসব নদীতে টলমল পানির প্রবাহ ছিল, ছিল স্রোতের উত্তাল যৌবন। এখন নদীর বুকে ধু-ধুু বালুচর। মানুষের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব নেমে এসেছে। পরিবেশ, কৃষি, ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে।
পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও জেলার অসংখ্য প্রাচীনতম নদনদী বিরাজমান। এসব নদনদীতে সর্বদা পানিশূন্য অবস্থা বিরাজ করছে। উত্তরাঞ্চলে নদীসমূহের মধ্যে গাবরা, বেরং, ডাহুক, তালমা, টাঙ্গন, চাওয়াই, মহানন্দা, করতোয়া, ইছামতি, কাটাখালি, কালপানি, গাংনাই, ঘাঘট, তিস্তা, নরেয়া, যমুনা, মৎস্যমরা, মরুয়াদাহ, মাইলা, মানাস, মাশানকুড়া, বাঙালি, লেঙগা, শাখা তিস্তা, হলহলি, কালজানি, কারো কুরসা, কোটেশ্বর, খলিশাকুড়ি, অর্জনরডারা, গঙগাধর, গদ্ধর, গিরাই, গোন্ধার বোয়ালমারী, ঘড়িয়ালডাঙ্গা, ঘাগুয়া চন্ডিমারী চারিপশা, চান্দাখোল জালশিরা, তিস্তা তোর্সা, দুধকুমুর, দেউর, ধরনী ধরলা, বোয়ালমারী, ব্রক্ষপুত্র, মহিশকুড়ি, রতনাই, মিয়ালদহ, সস্কোশ, সোনাবরী, হাওয়ারবিল, হাড়িয়ার ডারা, আউলিয়াখান, কদমদার, কুমলাল, খড়খড়িয়া, খলিসাডিঙি, চারালকাঠা, চিকলি, চেকাডারা, দেওনাই, ধাজান ধুম, নাউতারা, রামন ডাঙা, বুড়িখোড়া, বুড়িতিস্তা বুলরাহ, যমুনেশ্বরী, শারকি, স্বরম, গিদারী ছড়াবিল, ব্রিমোহনি, ভেটেশ্বর সতী সাকোয়া, সিঙ্গিমারী, রংপুরের আখিরা, টেপরিরবিল, নলশীসা, ভেলুয়া, সোনামতি ইত্যাদি। এসব নদনদী মৃত মরা খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে স্রোতের প্রবাহ থাকলেও খড়া মৌসুমে পানির স্রোত বা পানির গতিধারা প্রবাহিত হয় না। নদীর আশপাশের কৃষক-চাষিরা কৃষিকাজ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।
পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ নদী এখন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। সরেজমিন দেখা যায়, তিন থেকে চারটি নদীতে সামান্য পানির স্রোত দেখা যায়। এছাড়া অধিকাংশ নদনদীতে পানিবিহীন মরা খাল হিসেবে দেখা যাচ্ছে। সব নদী পানিশূন্য মৃত খালে পরিণত হয়েছে। দূর অতীতে এ সব নদীতে পাল তোলা নৌকা চলাচল করত। ব্যবসায়ীরা নদীপথে ব্যবসা-বাণিজ্য করত। নদী পথে আত্মীয়-স্বজনের বাসা নাড়িতে যাতায়াত করতো। বর্তমানে এসব নদীতে পানিশূন্যতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ মানুষজন পায়ে হেঁটে চলাচল করছে। নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা নির্বাহকারী অসংখ্য জেলে পরিবার তাদের মাছ ধরা পেশা ছেড়ে দিয়েছে। জীবন নির্বাহের জন্য অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। পরিবার-সন্তান নিয়ে বাঁচার জন্য অন্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ করছে। জেলার জগদল দক্ষিণ গোয়াল পাড়ার জেলেদের মধ্যে হেলাল, নুরনবী, বাবুল, রবিউল, ছয়ফুল, মুন্না ও আরফানসহ অনেক জেলে রয়েছে। জেলে হেলাল বলেন, বর্ষা মৌসুমে নদীতে কিছু মাছ পাওয়া যায়। খড়া মৌসুমে নদীতে তেমন একটা মাছ পাওয়া যায় না। এখন চিন্তা করছি মাছধরা পেশা ছেড়ে দেবো। নুরনবী বলেন, নদী নাই। খরা মৌসুমে বিভিন্ন গ্রামের মানুষজনের পুকুরে মাছ ধরি। পুকুরে মাছ ধরে কোনোরকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছি।
ঐতিহ্যবাহী তিস্তা ছিল খড়স্রোতা নদী। ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের ১১২ মাইল দীর্ঘ এই নদী পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। চারদিকে এখন শুধু ধু-ধু বালুচর। করতোয়া নদীর একসময় ভয়ংকর রূপ ছিল। দিবানিশি বইত ঢেউয়ের ধারা। এখন পানিশূন্য নদী। পানিশূন্যতার কারণে নদীর অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। কোথাও দেখা যায় না খেয়া পারাপারের সেই ঐতিহ্যবাহী নৌকা। নদীর ধারে বসবাসকারী শত শত মৎস্যজীবী বেকার হয়ে পড়েছেন। পানির অভাবে নদীর বুকে রসুন, পেঁয়াজ, গম, ভুট্টা, বোরো, বাদাম, তিল, পাট, তরমুজসহ নানা জাতের ফসল চাষাবাদ হচ্ছে।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, খরার প্রভাব দূর করার জন্য হারিয়ে যাওয়া নদনদীসমূহের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা খুবেই জরুরি। আমাদের দেশের নদী গবেষকরা মনে করেন, নদীর তীরবর্তী কৃষি, প্রকৃতিক জীববৈচিত্র্য এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষায় নদনদীর উদারতা প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিভারাইন পিপল বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদীগুলো এ অঞ্চলের কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের একটি অভাবনীয় ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে। দেশের প্রত্যেক এলাকার নদনদী বাঁচাতে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে উত্তরের জীবন রেখা তিস্তা নদীকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশুতোষ বর্মণ বলেন, ভারত আমাদের পড়শি রাষ্ট্র। ভারতের ভেতরে সব নদীর জন্ম। পাহাড় থেকে নদীর স্রোতের গতিধারা এসে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ভারত সরকার আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ফারাক্কাসহ সব নদীর মুখে বাঁধ দিয়ে নদীর পানি অন্য দিকে প্রবাহিত করেছে। যার কারণে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোয় পানিশূন্যতা বিরাজ করছে।
উত্তরাঞ্চলের নদীসমূহে পানির প্রবাহ না থাকায় পশুপাখি, জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বণ্যপ্রাণী নানাবিদ বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। নদনদীর আশপাশের জমির মালিক বা চাষিরা নদীকেন্দ্রিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। পড়শি রাষ্ট্র ভারত যদি ফারাক্কাসহ উজানের সব নদীর মুখের বাঁধ খুলে না দেয়, তাহলে অতিসত্তর পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চল মরুভূমির রূপ ধারণ করবে বলে নদী গবেষকরা মনে করেন। সচেতন মহল মনে করেন, আন্তর্জাতিক মহলে অভিযোগ করে উজানের সব নদী বাঁধমুক্ত করার দাবি জানাতে হবে।