দাউদকান্দিতে ৬২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ব্যাহত পাঠদান


২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:০৫

তৌফিক রুবেল, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) : কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় চরম শিক্ষক সংকট ও প্রশাসনিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নের মোট ১৪৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬২টিতেই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যালয়গুলোয় বাড়ছে প্রশাসনিক জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়গুলোয় মাত্র তিন থেকে চারজন শিক্ষক দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বাধ্য হয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভারপ্রাপ্তদের দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হওয়ায় তারা শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না।
এছাড়া সমপর্যায়ের একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক করায় অনেক ক্ষেত্রেই অন্য শিক্ষকরা তার নির্দেশনা মানতে অনীহা দেখাচ্ছেন। এতে শিক্ষকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রমে। দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট চলতে থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।
শাহিনুর আক্তার (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, কাউয়াদি পশ্চিম) বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ে ২০১৪ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নেই। আমি ২০১৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করি। সহকারী শিক্ষক হিসেবে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজেই বেশি সময় দিতে হয়, এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
মো. শাহাদাত হোসেন (ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, গাজীপুর উত্তর) বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষকরা নির্দেশনা মানতে চান না, যা নিত্যনতুন জটিলতা তৈরি করছে।’
রবিউল ইসলাম (অভিভাবক, সেন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) বলেন, ‘শিক্ষক সংকট ও প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। এক শিক্ষককে একাধিক ক্লাস নিতে হচ্ছে, এতে শিক্ষার মান দিন দিন কমছে।’
মো. জামাল উদ্দিন (সভাপতি, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি) বলেন, প্রধান শিক্ষক স্থানীয় জনগণ ও অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই পদ শূন্য থাকায় সেই সমন্বয় ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রশাসনিক সমস্যাও বাড়ছে। বোরহান উদ্দিন ভূঁইয়া (প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) বলেন, ‘২০১৫ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের পর থেকেই এখানে প্রধান শিক্ষক নেই। এতে শিক্ষার মান নাজুক হয়ে পড়েছে এবং বিদ্যালয় পরিচালনায়ও মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে।’ এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আহসান বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদের ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ৩৫ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের কথা। কিন্তু নানা জটিলতায় বর্তমানে পদোন্নতি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে শূন্যপদের তালিকা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।’
বিদ্যালয়গুলো হলো- বাহেরচর, হাসনাবাদ, ভাজরা, গঙ্গাপ্রসাদ, নূরপুর, উত্তর গাজীপুর, নাগেরকান্দি, উত্তর নছরুদ্দী, জামালকান্দি, উজিয়ারা, পদুয়া, জুরানপুর, মোল্লাকান্দি, সেন্দি, সৈয়দখারকান্দি, দুর্গাপুর, তুলাতুলী, শ্রীরায়েরচর, বাজারখোলা (উত্তর), ভবানীপুর, পাঁচগাছিয়া, বাজারখোলা (দক্ষিণ), কাউয়াদি পূর্ব, কাউয়াদি (পশ্চিম), চিনামূড়া, মারুকা, কালাসাধারদিয়া, বিরবাগগোয়ালী, গয়েশপুর, ইছাপুর, সরকাপুর, কল্যাণপুর, ইটাখোলা, আউটবাগ, ভেলানগর, পিপাইয়াকান্দি, শায়েস্তানগর, বায়নগর, তালেরছেও, হাটখোলা, থৈরখোলা, কামাইরকান্দি (জাতীয়করণকৃত)। এছাড়া অনেকগুলো রেজিস্টার্ড বেসরকারি বিদ্যালয় রয়েছে। রেজিস্টার্ড বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো হলোÑ হাসবাদ বটতলী, নারানদিয়া, বালুচর মধ্যপাড়া, রফারদিয়া, মালিখিল বেকিনগর, কানাচোয়া, দক্ষিণ নছরুদ্দী, তালেরছেও, মাওরাবাড়ী, খোশকান্দি, দৌলতপুর, দড়িগোয়ালী খন্দকার হামিদুল হক, দৌলতেরকান্দি, সোনাকান্দা, নন্দনপুর, ওলানপাড়া, ঠেটালিয়া, আনুয়াখোলা এবং মারুকা পূর্ব প্রাথমিক বিদ্যালয়।