ট্রাম্পের অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি : আস্থা নেই ইরানের


২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:১৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, তা আর কত দিন চলছে? বিশ্ববাসীর চোখে-মুখে যখন এই একটাই প্রশ্ন, তখন কিছুটা সুখবর আসতে শুরু করেছে। যুদ্ধটি বাধিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। আর পিছুও হটছে তারাই। ইরান শুধু রক্ষণাত্মক ভূমিকায় রয়েছে। আক্রান্ত হওয়ার পর মাঝে মাঝে কড়া জবাব দিয়ে শুধু প্রতিপক্ষকে বুঝাতে চেয়েছে যে তারা সব ধরনের হামলা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর হামলার চালানোর পর টানা এক মাসের বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। ওই যুদ্ধবিরতির শেষ দিন ছিল গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার। আর এদিনই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই বৈঠককে অর্থহীন ভেবে ইরান তাতে সাড়া দেয়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ২১ এপ্রিল হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে তারা ইরানে ফের হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং যেকোনো সময় হামলা শুরু করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিছু হাটলো ট্রাম্প। তিনি হামলা না চালিয়ে ২১ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে অনির্ধারিত সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। ফলে আপাতত একটি স্বস্তির খবর পেল বিশ্ববাসী। তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে সন্দেহের মধ্যেই রেখেছে ইরান। তারা এই ঘোষণাকে বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। এর মধ্য উল্লেখযোগ্য করা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনির্ধারিত সময়ের জন্য যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করা হলেও ইরানের নৌবন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে। ফলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য যে ভালো নয়- তা-ই মনে করছেন ইরানের শীর্ষনেতারা। তারা এ প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, অবরোধ তুলে নেওয়া হলেও এ বিষয়ে আলোচনা এগোতে পারে।
ইরানে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি বাড়ালেন ট্রাম্প, তবে নৌ অবরোধ বহাল
ইরানে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ওমান উপসাগর এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকবে। এই অবরোধকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে ইরান। গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এসব তথ্য জানান। পোস্টে তিনি বলেন, ইরানের সরকার অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত, যা অপ্রত্যাশিত নয়। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের অনুরোধে ইরানের পক্ষ থেকে একটি ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব না আসা পর্যন্ত সামরিক আক্রমণ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখা এবং অন্যান্য সব ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাব জমা না দেওয়া পর্যন্ত এবং আলোচনা কোনো পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর আগে ট্রাম্প ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতির কথাও জানান। তিনি বলেন, যুদ্ধবিরতির সময়কে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ মজুদের কাজে ব্যবহার করেছে এবং কোনো সমঝোতা না হলে পুনরায় হামলা চালাতে তারা প্রস্তুত।
নৌ অবরোধ তুলে নিয়ে আলোচনায় সম্মত ইরান
বিভিন্ন ইস্যু অমীমাংসিত রেখেই অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমতাবস্থায় দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সম্ভাব্য আলোচনার আগে শর্ত জুড়ে দিয়েছে ইরান। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের দূত বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিলে তিনি মনে করেন পরবর্তী দফার আলোচনা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হবে। ইরানের জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি আমীর সাঈদ ইরাভানি গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, ওয়াশিংটন যত দ্রুত নৌ অবরোধ তুলে নেবে, আমার মনে হয়, তত দ্রুতই পরবর্তী দফার আলোচনা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ততদিন বাড়ানো হবে যতদিন না তেহরান স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসানের জন্য একটি প্রস্তাব দেয়। তবে তিনি এটিও জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ অব্যাহত রাখবে। এরপরই ইরাভানি এমন মন্তব্য করলেন।
যুদ্ধবিরতি বাড়ানোয় ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানালেন শাহবাজ
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোয় ধন্যবাদ জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। খবর বিবিসির। অনলাইনে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমি আন্তরিকভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাই, তিনি আমাদের অনুরোধ সদয়ভাবে গ্রহণ করে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো এগিয়ে নেয়ার জন্য যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়িয়েছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আমাদের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস রাখা হয়েছে, তার ভিত্তিতে পাকিস্তান সংঘাতের একটি সমঝোতামূলক সমাধানের জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। শাহবাজ বলেন, আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, উভয়পক্ষই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখবে এবং ইসলামাবাদে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় একটি পূর্ণাঙ্গ ‘শান্তি চুক্তি’ সম্পন্ন করতে পারবে, যা এই সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটাবে।
যুদ্ধবিরতি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে ইরান
তড়িঘড়ি এই যুদ্ধবিরতি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। খবর জিও নিউজের। ইরানের সঙ্গে প্রায় পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় যুদ্ধ চালানোর পর চলতি মাসের শুরুর দিকে সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আলোচনায় বসেছিল মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদল। অবশ্য ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকেও সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয় উভয়পক্ষ। এমতাবস্থায় গত ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার হঠাৎ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তবে তবে তেহরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল এ সিদ্ধান্তে সম্মত হবে কিনা, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যাতে আলোচনার জন্য আরও সময় পাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, ইরানের নেতারা একটি ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব উপস্থাপন না করা পর্যন্ত এবং আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র হামলা থেকে বিরত থাকবে। এই ঘোষণা একতরফা বলেই মনে হচ্ছে, ফলে বাস্তবে এটি কার্যকর থাকবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ উভয়পক্ষই তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। এদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেও ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর অবরোধ চালিয়ে যাবে- যা তেহরান যুদ্ধের সমতুল্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে। এতে যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর ও পরস্পরবিরোধী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান কোনো যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ করেনি। উল্টো প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ভেঙে দেয়ার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেছে তেহরান।
ট্রাম্প কঠিন সংকটে আটকে গেছেন
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের মিডিয়া কমিটির উপপ্রধান নাসরুদ্দিন আমের বলেন, আলোচনায় ইরানের অনুপস্থিতিই যথেষ্ট প্রমাণ এবং স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, বর্তমানে ইরানই প্রাধান্য ধরে রেখেছে। তিনি আরও বলেন, ইরান নতুন দফার আলোচনায় সম্মতি দেওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের তড়িঘড়ি করে ইসলামাবাদে যাওয়া এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত, এসব থেকে এটা স্পষ্ট যে, ট্রাম্প গভীর সংকটে পড়েছেন।