পানি নিষ্কাশন বন্ধে দূষণে ফসলের ক্ষতি
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০১
মো. জাকির হোসেন, সৈয়দপুর (নীলফামারী) : নীলফামারীর সৈয়দপুরে শতবর্ষী নালা দখল করে বহুমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান ‘রানু এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ’ প্রতিষ্ঠার কারণে বিশাল এলাকার পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প বর্জ্যরে দুষণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এলাকার জমির মালিক ও কৃষকরা। দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর যাবত এর মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রায় ১২-১৫ দোন (সাড়ে ৩ থেকে ৫ একর) জমির ফলন একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। এতে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। কিন্তু তারপরও নির্বিকার ওই শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষসহ কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন।
সৈয়দপুর-রংপুর মহাসড়কের সাথে কামারপুকুর কলাবাগান এলাকায় এক যুগ আগে বিশাল কৃষিজমি ও কয়েক গ্রামের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র নালা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে রানু এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রথম দিকে এখানে শুধু পাটজাত পণ্য তৈরি করা হতো। এতে প্রাথমিকভাবে সুতলি ফ্যাক্টরির ডাস্ট উড়ে গিয়ে আশপাশের জমির ফসলে পড়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে কৃষকরা। সেই সাথে বর্ষকালে বৃষ্টির পানি ও ফ্যাক্টরির পানি জমে তলিয়ে যায় পুরো দোলার ফসল। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকরা বারবার বলার পরও ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক সুশীল কুমার দাস কেনো কর্ণপাত করেনি। এমনকি এ ব্যাপারে প্রশাসনকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে এলাকার লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানায় এবং প্রতিরোধে মাঠে নামার পর সকলের টনক নড়ে। এতে ফ্যাক্টরির পেছনের সীমানা প্রাচীরের সাথে ছোট আকারে নালা খুঁড়ে দেয়া হয়।
গত ২ বছর হলো ওই সুতলি কারখানার সাথে নির্মাণ করা হয়েছে শ্যামলী সিমেন্ট ঢেউটিন কারখানা। এই কারখানার ক্যামিকেলযুক্ত বর্জ্য ও পানি সেই নালা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে পুরো নালা সিমেন্ট ও পাথর চুনের গাদ দিয়ে পূর্ণ হয়ে গেছে। এতে শক্ত স্তরের সৃষ্টি হওয়ায় কারখানার পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে নালা উপচে দূষিত পানি পাশের জমিতে পড়ায় উর্বরা শক্তি নষ্ট হয়ে পড়েছে। শুকনো মৌসুমেই জমিতে হাঁটু পানি জমে থাকছে। আর বর্ষাকালে আশপাশের গ্রাম থেকে ধেয়ে আসা পানিতে পুরো ফসল ডুবে যাচ্ছে। এতে ধান লাগানো হলেও আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি অনেক জমির চারা একটু বড় হয়েই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কোনো ফসলই মিলছে না এসব জমি থেকে।
কামারপুকুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল জলিল জানান, রানু এগ্রোর উত্তর-পশ্চিম পাশের দেয়ালঘেঁষেই আমার সাড়ে ৩ দোন জমি রয়েছে। এই জমি থেকে গত ২ বছর যাবত কোনো ফসলই পাচ্ছি না। কারণ সেখানে সারা বছরই পানি জমে থাকছে। তার ওপর কারখানার কেমিক্যালযুক্ত পানি ঢুকে সব ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে। এমনকি কারখানার উত্তর-পূর্ব দেয়াল ঘেঁষে থাকা আমার একটি পুকুর কারাখানার বর্জ্য দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। পুকুরটি খনন করাসহ জমির পানি নিষ্কাশনের নালাটি পরিষ্কার করে দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে বারবার বলার পরও তারা কোনো ভ্রুক্ষেপ করছেন না। যে কারণে গত শীত মৌসুমেও আমার জমিতে পানি জমে থাকায় আমি কোনো ফলন পাইনি।
তিনি আরও বলেন, উত্তর ও পশ্চিম দিকের প্রায় ৫টি গ্রামের পানি নিষ্কাষিত হয়ে এই নালা দিয়ে পাশের খালে পড়তো। সেই নালার ওপর ইন্ডাস্ট্রিজ করায় এখন পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে প্রতি বছর বর্ষার সময় পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অথচ নালাটি স্থায়ীভাবে চওড়া করে খুঁড়ে দিলে এবং নিয়মিত কারখানার বর্জ্যে ভরাট হওয়া ময়লা পরিষ্কার করলে পানি যথাযথভাবে নিষ্কাষিত হতে পারতো। এতে আমরা ফসলহানি থেকে রক্ষা পেতাম। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ কেন যে আমাদের সমস্যা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না, তা বুঝে আসে না। হয়তো টাকার গরমে আমাদের তারা মানুষই মনে করছেন না। আমরা এর প্রতিকার চাই।
একই দাবি জানিয়ে আরেক জমির মালিক জামান মাস্টার জানান, আমার প্রায় ৫ দোন জমির ফসল প্রতিবারই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে দোন প্রতি ২০ মণ করে ধান পেতাম, সেখানে এখন ৫ মণ ধানও পাই না। আর বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়ায় একেবারেই কোনো ফসল পাই না। দিনে দিনে কারখানার দূষিত পানি ও ময়লায় জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে আগামীতে আর কোনো ফসলই ফলানো সম্ভব হবে না। তাছাড়া শতবর্ষী এই নালাটিতে আগে দেশীয় নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। এলাকার লোকজন সেই মাছ ধরে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু এখন নালাটি বিলীন হয়ে পড়েছে এবং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য পানি পাশের নদীতে পড়ায় সেই নদীর মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এই ক্ষতি থেকে এখনই উত্তরণ প্রয়োজন। তাই প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ দাবি করছি।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৪ এপ্রিল শনিবার বেলা সাড়ে ১২টায় সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ১২ থেকে ১৫ দোন জমির ধান ক্ষেতের মাঝে মাঝেই বড় বড় অংশজুড়ে ধানগাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া পানিপ্রবাহের নালাটি সিমেন্ট ও পাথরী চুনের বর্জ্য দিয়ে ভরাট হয়ে গেছে। তার ওপর দিয়ে কোনোক্রমে কারখানার পানি অত্যন্ত ধীর গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। ইতোপূর্বে ভরাট নালা থেকে বর্জ্য তুলে নালার পাশের স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেই ময়লাও জমিতে গড়িয়ে পড়ে পানির সাথে মিশে ফসলের ক্ষতি করছে। এই পরিদর্শনের সময় কারখানার সেফটি অফিসার সাজ্জাদ হোসেন ঘটনাস্থলে আসেন।
এ সময় তিনি বলেন, আমরা কারখানার ভিতরে বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। কিন্তু তারপরও কেন বর্জ্য দিয়ে নালা ভরাট হয়েছে এবং পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কোম্পানিটির জিএমের মুঠোফোন নম্বর চাইলে তা দিতে অসম্মতি জানান তিনি।
পরে কারখানার জেনারেল ম্যানেজার জিএম প্রকাশ চন্দ্র দাসের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে কল দিয়ে তাকেও একই প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখন আমাদের সিমেন্ট সিটের কোনো পানিই বাইরের নালায় যায় না। তারপরও যদি নালা ভরাট হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুতই আমরা সেগুলো খনন করে দেবো। তবে ফসলের ক্ষতির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য মন্তব্য করেননি।