মেক্সিকানরা ইসলামে মুক্তির পথ খুঁজছে


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩৬

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
পোরফিরিয়াতো (১৮৭৬-১৯১১) যুগে মেক্সিকান জনগণ অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, যা তাদের জীবনকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। পোরফিরিও দিয়াজের কর্তৃত্ববাদী সরকারের ফলে ক্ষমতা গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যার ফলে দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিনিধিত্ব এবং জনগণের অংশগ্রহণের অভাব দেখা দেয়। তদুপরি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও খারাপ হয়। এ সময়ে দেশটিতে জনসংখ্যার বেশিরভাগই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে এবং একটি সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণি বিলাসিতা এবং সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য জনগণ পথ খুঁজতে থাকে।
মেক্সিকান বিপ্লব : পোরফিরিও দিয়াজের কর্তৃত্ববাদী সরকারের থেকে সাধারণ জনগণের মুক্তির জন্য মেক্সিকান বিপ্লব সংঘটিত হয়। বিপ্লবের পর প্রণীত ১৯১৭ সালের সংবিধানে জনগণের অধিকার রক্ষা এবং জনজীবনে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে একাধিক মৌলিক অধিকার এবং গ্যারান্টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ অধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমিতির অধিকার এবং ভোটাধিকার।
১৯১৭ সালের প্রণীত এই সংবিধানের অন্যতম প্রধান অগ্রগতি ছিল আট ঘণ্টা কর্মদিবস এবং ধর্মঘট করার শ্রমিক অধিকারের নিশ্চয়তার মতো বিষয়। এছাড়া সংবিধানটি লিঙ্গসমতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বাসস্থানের অধিকারও প্রতিষ্ঠা করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অর্জন ছিল কৃষি সংস্কার, যার লক্ষ্য ছিল কৃষকদের মধ্যে জমির আরও সুষ্ঠু পুনর্বণ্টন করা। এটি সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে সাহায্য করে। অধিকন্তু ১৯১৭ সালের মেক্সিকান সংবিধান গির্জা এবং রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ প্রতিষ্ঠা করে, ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে শক্তিশালী করলেও জনগণের কাক্সিক্ষত মুক্তি মেলেনি।
মেক্সিকানদের সামাজিক চ্যালেঞ্জ : মেক্সিকান বিপ্লবের পরও বর্তমানে মেক্সিকান জনগণ একাধিক সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রধান চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে সহিংসতা, দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানসম্পন্ন মৌলিক পরিষেবাগুলোয় অ্যাক্সেসের অভাব।
বিশেষ করে মেক্সিকোয় সহিংসতা একটি গুরুতর সমস্যা, যেখানে অপরাধ এবং সশস্ত্র সহিংসতার হার বেশি। দুর্নীতিও দেশে একটি পুনরাবৃত্ত সমস্যা, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর জনসাধারণের আস্থা হ্রাস করে এবং মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তাকে বাধাগ্রস্ত করে।
সামাজিক বৈষম্যের কারণে মেক্সিকান জনসংখ্যার মধ্যে আয়ের বিশাল বৈষম্য রয়েছে। অনেক নাগরিকের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত আবাসনের সুযোগের অভাব দেখা দেয়। মেক্সিকান জনগণ এ ধরনের বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে ইসলামের দিকে ঝুঁকছে।
মেক্সিকোয় ইসলামের অগ্রযাত্রা : উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর দাপ্তরিক নাম ‘ইউনাইটেড মেক্সিকান স্টেটস’। দেশটির উত্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ ও পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ-পূর্বে গুয়াতেমালা, বেলিজ ও ক্যারিবিয়ান সাগর এবং পূর্ব দিকে মেক্সিকান উপসাগর অবস্থিত। দেশটির মোট আয়তন সাত লাখ ৬১ হাজার ৬১০ বর্গমাইল। আয়তনে মেক্সিকো পৃথিবীর ১৩তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। মেক্সিকো সিটি দেশটির সর্ববৃহৎ শহর ও রাজধানী। দেশটির বেশিরভাগ মানুষ ক্যাথলিক খ্রিস্টান। ২০২২ সালের নভেম্বরে মেক্সিকোর দেশটির মোট জনসংখ্যা ১২ কোটি ৬০ লাখ ১৪ হাজার ২৪ জন, যার মধ্যে ১ লাখ ১১ হাজার জন মুসলিম; যা মোট জনসংখ্যার ০.৪৬% এর প্রতিনিধিত্ব করে। উল্লেখ্য, ইসলাম মেক্সিকোর সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভকারী ধর্ম।
ধারণা করা হয়, মেক্সিকোয় মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটে খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার বছর আগে। প্রাচীন মায়া ও আজটেক সভ্যতার কেন্দ্রভূমি ছিল মেক্সিকো। প্রাচীন সভ্যতার দেশ মেক্সিকোয় ইসলামের আগমন ঘটে বেশ পরে। ধারণা করা হয়, স্পেনে মুসলিম শাসনের পতন হলে স্প্যানিশ শাসকগোষ্ঠী যে বিপুলসংখ্যক মুসলিমকে দাস হিসেবে আমেরিকা মহাদেশে পাঠিয়েছিল, তাদের মাধ্যমেই মেক্সিকোয় ইসলামের আগমন ঘটেছিল। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আফ্রিকান মুসলিম দাসরা। তবে তাদের মাধ্যমে ইসলামের উল্লেখযোগ্য কোনো বিস্তারের বিবরণ পাওয়া যায় না। যেমন পাসকুয়াল আল-মাজানে রচিত ‘আন হেরেজে ই উন মুসলমান’ বইয়ে স্পেন থেকে বহিষ্কৃত ইউসুফ বিন আলবাজ নামে এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যিনি ষোলো শতকে স্পেন থেকে মেক্সিকোয় আসেন এবং তাঁর বাবা ধর্মান্তরিত হন।
তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং মেক্সিকোয় ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। মেক্সিকোয় ইসলামের অগ্রযাত্রা শুরু হয় মূলত দ্বিতীয় শতাব্দীতে। যখন বিপুলসংখ্যক তুর্কি, লেবানিজ ও সিরিয়ান অভিবাসী দেশটিতে পাড়ি দেয়।
মেক্সিকোয় ফুটছে ইসলামের ফুল : ডেনভার পোস্টে প্রকাশিত ঝড়সব গবীরপধহ ঈধঃযড়ষরপং হড়ি ভরহফ এড়ফ রহ ওংষধস অবলম্বনে বিস্তারিত তুলে ধরছেন ফাতিমা ফেরদৌসী; ১৯৯৪ সালে মরক্কো থেকে মেক্সিকো সিটিতে এসেছিলেন সৈয়দ লুয়াহাবি। তখন এই শহরে মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ জন। এদের বেশিরভাগই ছিল কূটনীতিক ও ব্যবসায়িক। স্মৃতি রোমন্থন করে লুয়াহাবি বলেন, ‘মুসলিম সম্প্রদায় ছিল খুবই ছোট। এদের বেশিরভাগই ছিল বিদেশি। মেক্সিকানরা ইসলাম সম্পর্কে তেমন কিছুই জানত না।’ তখন একটি মসজিদ খুঁজে পেতে তাকে হয়রান হতে হয়েছিল। লুয়াহাবি বলেন, ‘অনেক সময় ২-৩ মাসেও একজন মুসলমানের দেখা মিলত না।’ তবে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ এই মেক্সিকোয় মুসলমানদের জন্য তৈরি হয়েছে একটি ভিন্নতর পরিবেশ। মেক্সিকোয় মুসলমানের সংখ্যার বেশিরভাগই মেক্সিকান। এখন প্রতি শুক্রবারই ইসলাম গ্রহণ করছেন মেক্সিকানরা। কোনো কোনো শুক্রবার ৫ জনও ইসলাম গ্রহণ করেন। লুয়াহাবি জানান, ইসলামে নবদীক্ষিতদের বেশিরভাগই নারী, যারা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে শান্তিময় জীবনের সন্ধান পেয়েছেন।
‘হোয়াই ইসলাম’ : ‘হোয়াই ইসলাম’ নামের একটি সংগঠনের ২০১২ সালের জরিপে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে মেক্সিকোয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন ৩০০০ লোক। এদের ১৯ শতাংশ ছিলেন ল্যাটিনো এবং অর্ধেকেরও বেশি নারী। ২০১১ সালের ৫২৪টি মসজিদের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ২০০০ সাল থেকে নারীদের ইসলাম গ্রহণের হার ৮ শতাংশ বেড়েছে। দুই দশক আগে মেক্সিকোয় একটি মসজিদ খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। তখন পাকিস্তানি দূতাবাসের মসজিদে অনেকে নামাজ পড়তেন। তবে এখন অবস্থা বদলে যাচ্ছে। পিউ রিসার্চের গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালে মেক্সিকোয় ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৯৬.৭ শতাংশ। দেশটির সাধারণ মানুষ ইসলামী শান্তিময় লাইফস্টাইলে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করার পর ২০১০ সালে ক্যাথলিকদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৮২.৭ শতাংশে।
মেক্সিকান খ্রিষ্টানরা ইসলাম গ্রহণ করছেন : কেউ কেউ বলছেন, ক্যাথলিকদের ঈশ্বরের তিন রূপ মতবাদ, যাকে বলা হয় ‘দ্য ট্রিনিটি ডকট্রিন’ (পিতা, সন্তান ও পবিত্র সত্তা)-এর বিপরীতে ইসলামে এক আল্লাহতে বিশ্বাস অনেককে আকৃষ্ট করেছে। এছাড়া খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির সীমাহীন অভিযোগেও অনেক খ্রিষ্টান বিরক্ত। তারা ইসলামে এর সমাধান পাচ্ছেন। এদেরই একজন মার্থা আলামিলা, বয়স ২৩। তিনি একটি ক্যাথলিক পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তিনি সবসময় উচ্চতর শক্তিতে বিশ্বাস করতেন। কিন্তু গির্জায় এ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তার সন্তোষজনক জবাব পাননি। শুক্রবার জুমার নামাযের পর মসজিদে বসেই আলামিলা বলেন, ‘আমার মনে কোনো সংশয় ছিল না যে ঈশ্বর আছেন। কিন্তু আমার ধর্মের কাছে অনেক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে আমি অর্থপূর্ণ জবাব পাইনি। আমাকে বলা হতো- ঈশ্বর এভাবে বলেছেন তাই, ঈশ্বর এরকম ইত্যাদি ইত্যাদি।’ এভাবে চলার পর ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রিধারী আলামিলা এক সময় উন্নত জবাব খোঁজার চেষ্টা করেন। আলামিলা বলেন, ইসলাম সম্পর্কে তার প্রাথমিক ধারণা ছিল যে, এটি সন্ত্রাসবাদ ও নিপীড়নের ধর্ম। কিন্তু পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করার পর এবং মুসলমানদের সঙ্গে বৈঠকের পর তার ধারণা পাল্টে যায়। তিনি যেসব প্রশ্নের জবাব খুঁজছিলেন তাও পেয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম যে, এটা একটা সুন্দর ধর্ম। এখানে প্রত্যেকটা জিনিসের অর্থ আছে। কুরআন ও হাদীসে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব আছে।’ প্রায় ছয় মাস ইসলামের ওপর অধ্যয়ন শেষে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)’ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন আলামিলা। তিনি আরো বলেন, ইসলাম সম্পর্কে তার সবচেয়ে সাধারণ যে ভুল ধারণাটি ছিল, তা হলো এই ধর্ম নারীদের অধিকার হরণ করে, তাদের মতপ্রকাশের সুযোগ দেয়া হয় না এবং নারীদের হিজাব পরতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু ইসলামের ওপর অধ্যয়ন শেষে তার এই ভুল ধারণা ভেঙে যায়। আলামিলা বলেন, ‘আমি যেসব মুসলমানদের সঙ্গে মিশেছি, তাদের প্রত্যেকেই অসাধারণ মানুষ। এটা এই কারণে নয় যে, তারা এভাবেই জন্মগ্রহণ করেছে, বরং ধর্ম তাদের এভাবে বদলে দিয়েছে।’ আলামিলা জানান, তিনি এখনো তার পরিবারের কাছে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেননি। তার পরিবারের লোকজন জানেন যে, তিনি ইসলামের ওপর অধ্যয়ন করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে তাদের কাছে প্রমাণ করতে চাই যে, আমি বদলে গেছি। যখন আমি তাদের বলব যে, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তখন তারা যেন দেখতে পায় যে, আমি আগের ব্যক্তিই আছি, কিন্তু আরো ভালো হয়েছি।’ কথা বলার সময় আলামিলার পাশেই ছিলেন লেসলি কামরিলো। তার কাহিনীও প্রায় আলামিলার মতোই। ক্যাথলিক খ্রিষ্টান থেকে তিন বছর আগে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। লেসলি বলেন, ‘শিশুকালে আমি যখন গির্জায় যেতাম, তখনই তাদের ভণ্ডামি আমার চোখে পড়ে। প্রতিবার আগুন আর ধোঁয়া দেখে ঈশ্বর সম্পর্কে আমার মধ্যে ভীতি তৈরি হয়।’ ‘ত্রি-তত্ত্ববাদের (ট্রিনিটি) কথা অনুসারে ঈশ্বর মানবরূপে জন্মগ্রহণ করে এবং মৃত্যুবরণ করে। সেই তিনিই কীভাবে স্বর্গে অমরত্ব লাভ করবেন?’ প্রশ্ন করেন লেসলি। ‘আমার সবসময়ই বিশ্বাস ছিল যে, ঈশ্বর আছেন। আমি সবসময়ই ভাবতাম যে সবকিছু সৃষ্টির পেছনে একজন কারিগর বা ঈশ্বর আছেন।’ কিন্তু তিনি কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছিলেন না। এরপর মুক্ত মন নিয়ে তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ নানা ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়ন শুরু করেন। তিনি নিয়ত করেন যে ধর্মে তিনি সব প্রশ্নের জবাব পাবেন, তাকেই আলিঙ্গন করবেন। অবশেষে ইসলামেই অন্যদের মতো তিনি সব প্রশ্নের জবাব পান এবং শান্তিময় ইসলামী লাইফস্টাইলকে আলিঙ্গন করেন।
‘মুসলিম সেন্টার ডি মেক্সিকো’ : ১৯৯৯ সালে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, এ সময়ের ১০ শতাংশ অভিবাসী মুসলিম ছিল। বর্তমানে অভিবাসীরাই মেক্সিকোর সবচেয়ে ধনীদের অন্যতম এবং তাদের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ। তাদের অন্যতম লাতিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ধনী ইউসুফ সেলিম। বর্তমান সময় মেক্সিকোয় ইসলাম প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ‘মুসলিম সেন্টার ডি মেক্সিকো’র প্রতিষ্ঠাতা ব্রাদার মার্ক ওয়েস্টোন। ১৯৮৮ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণের পর ওমর ওয়েস্টোন নাম ধারণ করেন।
মেক্সিকোয় ৫৫০০ আদিবাসীর ইসলাম গ্রহণ : উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র বৃহত্তম দেশ মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য চিয়াপাস। ১৯৮৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ রাজ্যের ৫ হাজার ৫০০ জন আদিবাসী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রীয় অঞ্চলে হলেও দেশটিতে স্পেনীয় ভাষাভাসী মানুষই বেশি।
মেক্সিকোর মানুষ উদার ও শান্তিপ্রিয়। দেশটির চিয়াপাস রাজ্যে গত দশকে শান্তির সন্ধানে ব্যাপক হারে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে ইসলামের শান্তি ও সহাবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছে। মূলত মেক্সিকোয় ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অবদান রেখেছে লেবানন, সিরিয়া এবং স্পেনের অভিবাসী মুসলমান। যারা মেক্সিকোয় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় ইসলামিক সেন্টার চিয়াপাস রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। এখান থেকেই ইসলামিক দাওয়াহ ও ইসলাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তুলে ধরা হয়। চিয়াপাস রাজ্যের আদিবাসী ‘তাজুতাজিল’ নাম প্রসিদ্ধ। এ গোত্রের লোকেরা সেদেশের সান ক্রিস্টোবাল দে লাস কাসাস শহরে বসবাস করে। ইতোমধ্যে এই গোত্রের অধিকাংশ নাগরিকই ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে শান্তিময় ইসলামী জীবনযাপন করছেন।
তাজুতাজিল গোত্রের আদিবাসীদের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। যারা আমেরিকান প্রাচীন মায়া সাম্রাজ্যের অনুসারী। মধ্য আমেরিকান প্রাচীন মায়া সাম্রাজ্য উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আরব ও স্পেনীয় মুসলিম অভিবাসীদের উৎকৃষ্ট, আকর্ষণীয় আচার-আচরণ ও জীবনযাপনই তাজুতাজিল আদিবাসীদের ইসলাম গ্রহণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে।
ইসলামিক কালচারাল সেন্টার ইন মেক্সিকো সিটি : মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির পাতাল রেল বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম এক এলাকা এবং প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ লোক চলাচলের জন্য পাতাল রেল ব্যবহার করে। এই জনাকীর্ণতার সুযোগ নিয়ে এই এলাকা মেক্সিকোর কিছু মুসলমান কর্তৃক ইসলাম ধর্ম প্রচার করার (দাওয়াহ) স্থানে পরিণত হয়েছে।
ইসলামিক কালচারাল সেন্টার ইন মেক্সিকো সিটি বা মেক্সিকোর ইসলামিক সংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মিত কিছু বিজ্ঞাপন সম্প্রতি পাতাল রেলের কামরায় লাগানো হয়েছে। যে বিজ্ঞাপন লোকদের ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে জানার আহ্বান জানায়। ইসলামিক কালচারাল সেন্টার ইন মেক্সিকো সিটি সপ্তাহের ছুটির দিনে কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করে থাকে। অন্যদিকে একটি ভ্যান গাড়ি এ এলাকায় চলাফেরা করে, প্রতিবেশীদের ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য আহ্বান জানায়। যেটি মেক্সিকো সিটির রাস্তায় ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেবার আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
মেক্সিকোয় মুসলিমরা বিভিন্ন ব্লগ ব্যবহার করছে অন্যদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য এবং ইসলামের বাণী সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্য। কার্লোস আলবার্টো রোজাস একই সাথে ইসা নামেও পরিচিত একজন, যিনি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মদিনা বা মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তিনিও এই ব্লগারদের মধ্যে অন্যতম। যে সমস্ত লোকদের মনে ইসলাম সম্বন্ধে প্রশ্ন রয়েছে এবং যারা এ বিষয়ে সহযোগিতা চায়, এই ব্লগার তাদের সহযোগিতা করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।
পিউ রিসার্চের তথ্য মতে, ১৯৯০ সালে মেক্সিকোয় মুসলিমের সংখ্যা ৬০ হাজার, ২০১০ সালে যা বেড়ে এক লাখ ১০ হাজার হয়। মেক্সিকোয় মুসলিমের সংখ্যা দিন দিন যেভাবে বাড়ছে- এ ধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনঅধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হবে মেক্সিকো, ইনশাআল্লাহ। তবে মুসলিমের সংখ্যা বাড়লেও দেশটিতে মসজিদ ও ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বাড়ছে না।
সূত্র : অ্যাসোসিয়েট প্রেস, আল-জাজিরা, ডয়েচে ভেলে, ডেইলি সাবাহ, রয়টার্স, এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল : alhelaljudu@gmail.com