শহীদ কামারুজ্জামান আমাদের প্রেরণার বাতিঘর
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:২০
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ১২তম শাহাদাতবার্ষিকী দেশব্যাপী দোয়া, আলোচনা সভা ও এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। গত ১১ এপ্রিল ছিল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের শাহাদাত দিবস।
দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সারা দেশে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে। সংগঠনটির মৌলভীবাজার জেলা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী শহর, সিলেট মহানগরী, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ, যশোর শহর ও ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শাখা এসব কর্মসূচি পালন করে। এছাড়া শেরপুরে নিজ এলাকায় শহীদ কামারুজ্জামানের প্রতিষ্ঠিত এতিমখানায় খাবার বিতরণ করা হয়।
ঢাকা কলেজে কামারুজ্জামানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম।
নূরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ কামারুজ্জামান ছিলেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তার কর্মনিষ্ঠা, ত্যাগ ও প্রখর চিন্তাশক্তির মাধ্যমে তিনি সবার হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন। বাতিল শক্তি তার এই প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতাকে সহ্য করতে পারেনি। সম্পূর্ণ কাল্পনিক কাহিনী সাজিয়ে একটি সাজানো ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তাকে বিচারিকভাবে হত্যা করা হয়েছে।
গত ১১ এপ্রিল শনিবার রাজধানীর একটি মিলনায়তনে আয়োজিত এ আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোস্তাকিম আহমেদের সভাপতিত্বে এবং অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেকের সঞ্চালনায় পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়।
ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের অঙ্গীকার নিয়ে যে মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, স্বাধীনতা-পরবর্তী শেখ মুজিবের ক্ষমতা গ্রহণের পর মুক্তিকামী মানুষের সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ভঙ্গ হতে থাকে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং একদলীয় শাসন, দমন-পীড়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ফলে মানুষের আকাক্সক্ষা ব্যাহত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুগে যুগে এদেশে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা জনগণের ম্যান্ডেট ও আশা-আকাক্সক্ষাকে উপেক্ষা করেছে। বর্তমানেও আমরা দেখছি, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর রায়কে অবহেলা করা হচ্ছে। তবে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জনগণ তাদের রায় বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রলীগ ও বামপন্থিদের নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং দেশব্যাপী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে শহীদ কামারুজ্জামান সংগঠনটিকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেন। মেধা, শ্রম ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তিনি দেশের প্রায় প্রতিটি ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরকে সুসংগঠিত করেন এবং শিক্ষার্থীদের মণিকোঠায় এর দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন।
তিনি আরও বলেন, ছাত্রশিবিরের এক স্বপ্নসারথী ও অকুতোভয় দুঃসাহসী ব্যক্তিত্ব শহীদ কামারুজ্জামান শুধু ছাত্রশিবিরের জন্যই নয়, বৃহত্তর পরিসরে দেশের ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাঁর মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। জ্ঞান, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী আন্দোলন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি এ দেশের ইসলামী আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তার প্রখর চিন্তাশক্তি ও নেতৃত্বগুণ বাতিল শক্তি সহ্য করতে পারেনি। তাই বিচারের নামে মিথ্যা ও সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। মব সৃষ্টি করে তৎকালীন সরকার দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দকে নির্মূল করে নেতৃত্বশূন্য করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, নির্মম পরিহাস হলো আজ সেই ট্রাইব্যুনালেই সংশ্লিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর পতনের ইতিহাস রচিত হয়েছে।
শিবির সভাপতি আরও বলেন, ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপনকারী শহীদ কামারুজ্জামান অন্যায় ও জুলুমের কাছে কখনো মাথা নত করেননি; বরং হাসিমুখে শাহাদাতকে বরণ করে নিয়েছেন। তাঁর এই আপসহীন অবস্থান আমাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তিনি এ দেশের ইসলামপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তার শাহাদাত ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে।
সোনার বাংলায় আলোচনা সভা ও দোয়া
সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সাবেক সম্পাদক শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মাগফিরাত কামনায় আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। শহীদ কামারুজ্জামানের ১২তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার এই দোয়ার আয়োজন করা হয়। দোয়া অনুষ্ঠানের আগে শহীদ কামারুজ্জামানের বর্ণাঢ্য কর্মময় ও রাজনৈতিক জীবনীর ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন সোনার বাংলার বার্তা সম্পাদক ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া এবং ফিচার এডিটর হারুন অর রশীদ। দোয়া পরিচালনা করেন জুলফিকার আলী। এ সময় সোনার বাংলার অন্য সাংবাদিক ও বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
শহীদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৮-৭৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা ডাইজেস্টের নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক এবং সাপ্তাহিক সোনার বাংলার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টায় ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার তাকে কথিত যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। পরে শহীদ কামারুজ্জামানকে নিজ জেলা শেরপুরের সদর উপজেলার কুমরী বাজিতখিলা এতিখানার পাশে কবরস্থ করা হয়।