ইরানে মার্কিন-ইসরাইলের আগ্রাসন


৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫৬

জাতিসংঘের নীরবতায় বিশ্বব্যাপী নিন্দা
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
বিশ্বমানবতা, আন্তর্জাতিক আইনকে পাত্তা না দিয়েই ইসরাইলের অব্যাহত আক্রমণের মুখে গাজা খালি করতে বলে এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরান খালি করার নির্দেশ দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পারমাণবিক কর্মসূচি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, মার্কিন স্বার্থবিরোধী ইত্যাদি অজুহাতে মার্কিন ইসরাইল ‘Operation Epic Fury’ এবং ‘Roaring Lion’ যৌথ আগ্রাসন শুরু করে ইরানে। আগ্রাসনে শহীদ হন ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। নেতানিয়াহু খোলামেলাই বলছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যাই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করবে, কিন্তু উল্টো হয়েছে। ইরানের পাল্টা ‘Operation True Promise’ আঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায়ও মুসলিমদেরই রক্ত ঝরছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল : মার্কিন-ইসরাইল ইরানে যে পারমাণবিক প্রযুক্তির অজুহাতে আগ্রাসন চালাচ্ছে, সেটির সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় শীতল যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটনের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে। বিপ্লব পূর্ব ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। তেহরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব আমূল বদলে দেয়। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তেহরান ও তেলআবিবের মধ্যেও কৌশলগত সম্পর্ক ছিল। তুরস্কের পর দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে ইরান ১৯৫০ সালে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ইসলামী বিপ্লবের পর শিয়া উত্থানের আশঙ্কা তুলে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও সুন্নি বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাথে ইরানের দ্বন্দ্ব তীব্র হয়।
‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-‘মুসলিম বিশ্ব’ : ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে বিভাজন তৈরি হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং পরবর্তীতে মরক্কো ইসরাইলের সাথে নিজেদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় ক্রমেই বেশকিছু আরব রাষ্ট্রের সাধারণ শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে ইরান। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সৌদি আরবকেও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে দেখা গেছে, যদিও এই চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফিলিস্তিন ইস্যুটি।
‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তির দূত’! : ‘শান্তির দূত’ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে ফেলার জন্য একটি নাটকীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।
ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় আমেরিকা হামলা চালিয়েছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোষণা করার মাত্র দুই ঘণ্টা পরে, হোয়াইট হাউস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও এবং ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথকে পাশে নিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন যে, এই অভিযানটি ছিল একটি ‘অসাধারণ সাফল্য’।
যদিও ভ্যান্স যুক্তরাষ্ট্রের সংযত পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে। তবে সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন যে ট্রাম্প এখনো একজন অনাক্রমণবাদী এবং তার সমর্থকদের তাকে ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দেয়া উচিত।
ইরানের আগ্রাসনটি ট্রাম্পের দ্বিমুখী নীতির প্রমাণ, কারণ তিনি প্রথম মেয়াদে কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু না করার গর্ব করেছিলেন এবং নির্বাচনী প্রচারে বিদেশি সংঘাতে দেশকে জড়ানো পূর্বসূরিদের বিরুদ্ধে নিয়মিতভাবে সমালোচনা করে নিজেকে শান্তির দূত দাবি করেছিলেন।
ইরান আগ্রাসনে বিশ্বব্যাপী সমালোচনা : বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইসরাইলি হিংস্র থাবার যে তাণ্ডব চলছে, তা কেবল একটি ভৌগোলিক যুদ্ধ নয়; বরং এটি ইসলামী সভ্যতা ও মুসলিম উম্মাহর সার্বভৌমত্বের ওপর এক সুগভীর আঘাত। ইরান, ফিলিস্তিনসহ একের পর এক মুসলিম জনপদ আমেরিকার আগ্রাসী নীতির কারণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। ইরানে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান আগ্রাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র বিভাজন।
এই আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, এটি জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির একটি ‘গভীর লঙ্ঘন’। আরাঘচি আরও বলেন, ‘ইরান তার সার্বভৌমত্ব, স্বার্থ এবং জনগণকে রক্ষার জন্য সব ধরনের উপায় অবলম্বন করবে।’ সৌদি আরব ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ওমান- যেখানে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
ইরান ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির নিন্দা জানিয়েছে আরব-আফ্রিকান মিশরও। যেকোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর দেশটি জোর দিয়ে সতর্ক করেছে। কাতার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, সব দেশ বিবেচনা ও ধৈর্যের প্রদর্শন করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে দেশটি।
ইরাক ও লেবাননের প্রধানমন্ত্রী জোসেফ আউন বলেছেন, ‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার ফলে আঞ্চলিক ও একাধিক দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।’
বিশ্ব পঞ্চ শক্তির রাশিয়া ও চীন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় জোরালো নিন্দা জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার নজরদারিতে থাকা ওই স্থাপনাগুলোয় হামলায় তারা জোর নিন্দা জানাচ্ছে, যা জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন। বিশ্বের বৃহত্তম ভূখণ্ড রাশিয়া বলেছে, “কোনো ন্যায্যতা ছাড়া একটি সার্বভৌম দেশের ওপর এই হামলা একটি ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত,’ যা জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবনার লঙ্ঘন।’’ ‘সকল ধরনের আগ্রাসন’ বন্ধের সাথে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কায়া কাল্লাস বলেন, ‘ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না, কারণ এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে।’ তবে সব পক্ষকে সংযত হওয়া, আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যৎ উত্তেজনা এড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ ইরানকে পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার হুমকি ‘হ্রাস’ করতে সহায়ক হবে। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট লুইস আর্স এবং কিউবার প্রেসিডেন্ট রাফায়েল দিয়াস-কানেল একমত হন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা এই অর্থে ব্যবহার করা উচিত নয় যে তারা ‘মানবজাতি হিসেবে আমরা যেসব নিয়ম তৈরি করেছি, তা লঙ্ঘন করতে পারে।’
ইরানে আগ্রাসন সারা বিশ্বের সাথে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিক ও ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে নয়, ট্রাম্পের নিজস্ব ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের ভেতর থেকেও তীব্র সমালোচনার জন্ম দিলেও বিশ্ব উন্মাদ আর রক্তপিপাসুখ্যাত ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর আগ্রাসন থামছেই না।
আগ্রাসন মোকাবিলায় জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ জরুরি-ইরান : আমেরিকা ও ইসরাইলি আগ্রাসন মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান। এ লক্ষ্যে দেশটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে।
চিঠিতে ইরান বলেছে, আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার দায়িত্ব জাতিসংঘকে বহন করতে হবে। একই সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরাইলি শাসনের আগ্রাসন এবং শান্তিভঙ্গের বিষয়টি মোকাবিলায় বিলম্ব না করে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বহনকারী জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্র যেন এ আগ্রাসনের দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানায় এবং এটি মোকাবিলায় জরুরি ও সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়।
ইরান আগ্রাসনে জাতিসংঘের বিবৃতি : সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমনের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন, যদি আগ্রাসন ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়’, তবে তা মানবজাতির জন্য ‘বিপর্যয়কর’ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তিনি বলেন, আমেরিকা সংঘাত বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার ফলে মধ্যপ্রাচ্য একটি ‘নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খলার চক্রে’ পড়ে যেতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, অঞ্চলটি ইতোমধ্যেই সেই পরিস্থিতির ‘দ্বারপ্রান্তে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি- যেন তারা উত্তেজনা প্রশমিত করে এবং জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যান্য বিধান অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পালন করে।’ সংস্থাটিকে বিবৃতিই প্রকাশ করতে দেখা গেছে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নয়।
পক্ষপাতী জাতিসংঘ : ২০১১ সালে সিরিয়ায় শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষকে মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য জাতিসংঘ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
২০১১ সালের লিবিয়া যুদ্ধে জাতিসংঘ আসলে গুরুত্বই পায়নি। যদিও যুদ্ধ থেকে মানুষকে রক্ষার অঙ্গীকারই ছিলো জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি।
মধ্যপ্রাচ্যে ‘ইসরাইল বনাম ফিলিস্তিন’ ‘ইসরাইল বনাম আরববিশ্ব’ মনোভাব বা দ্বন্দ্ব আরব ভূখণ্ডের গণ্ডি পেরিয়ে সময়ের সাথে ক্রমে ‘ইসরাইল বনাম মুসলিম বিশ্ব’ মনোভাব বা দ্বন্দ্ব হিসেবে রূপ নিয়েছে, যেটির চিরস্থায়ী একটা সমাধান হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জাতিসংঘ এক্ষেত্রে নীরব রয়েছে।
বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা জাতিসংঘের অন্যতম উদ্দেশ্য। অথচ ১৯৮০ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন ও ২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসন কিংবা কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কিংবা ১৯৪৮, ১৯৬৫, ১৯৭১, ২০২৫ ইত্যাদি পাক-ভারত যুদ্ধ প্রতিরোধে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে।
আফ্রিকায় রুয়ান্ডা-বুরুন্ডিতে কিংবা ইউরোপে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও কসোভোয় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও লাখ লাখ মানুষের দেশান্তরিত হওয়া রোধ করার ব্যাপারে জাতিসংঘ আদৌ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগে ইরাকের ওপর বুশ সরকারের অন্যায় আক্রমণের প্রশ্নেও জাতিসংঘ কোনো কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০০২ সালে পূর্ব তিমুরের, ২০১৪ সালে মুসলিম সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছে এই জাতিসংঘই।
জাতিসংঘের নীরবতা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি’- এই বাণী নিয়ে জন্মলাভ করে জাতিসংঘ ‘United Nations Organizations-UNO’। মার্কিন-ইসরাইল ইরানে যে আগ্রাসন চালাচ্ছে, তাদের রোধে ফাঁকা বুলি ছাড়া কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি জাতিসংঘ। মুসলিম বিশ্বে ওপর বারবার অন্যায় আগ্রাসন হলেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। প্রকৃতপক্ষে মুসলিম উম্মাহর কোনো ভেটো ক্ষমতা না থাকায় মুসলিম উম্মাহর পক্ষে কথা বলার কেউ নেই।
গবেষক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বদা মাথায় রাখা আবশ্যক মুসলিম বিশ্বে গণতান্ত্রিক নির্বাচনসহ বিভিন্ন নামে হানাহানি, হত্যা, রাহাজানি, গৃহযুদ্ধ যা কিছু হয় তার সাথে সংযোগ থাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেভিড হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিউরির বিষ ইসলামফোবিয়া যেটির ছোবল ৯/১১-এর পর আরো ভয়াবহ। যার সর্বশেষ ছোবল ইরানের ওপর মার্কিন ইসরাইলের আগ্রাসন। পরবর্তী টার্গেট মুসলিম উম্মাহর একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান, বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা তুরস্ক এবং তালেবান শাসিত আফগানিস্তান। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান পারমাণবিক বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প প্রশাসন।
আগ্রাসন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস : ইরানের মতো একটি স্বাধীন দেশে মার্কিন-ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও যুদ্ধাপরাধের শামিল। ইরানে দুটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের যৌথ হামলা পশ্চিমা বিশ্বের কথিত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মুখোশ উন্মোচিত করেছে, তবে এটির পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
ইসরাইলের সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য পতন : ইসরাইলের যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জয়লাভের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কারণ একটাই- কৌশলগত গভীরতার অভাব (Strategic Depth)। ইসরাইল একটি ছোট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ রাষ্ট্র। একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে তার অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে, শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তারা পরমাণু হামলা চালিয়ে শেষ মুহূর্তে শত্রুকে ধ্বংসের চেষ্টা করতে পারে। তবে তা কেবল চূড়ান্ত ধ্বংস নিশ্চিত করতে পারে, বিজয় নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- ইসরাইলিদের দ্বৈত নাগরিকত্ব। প্রায় সাত লাখ ইসরাইলি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এদের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে ইসরাইল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়লে এই দ্বৈত নাগরিকরা পশ্চিমে ফিরে যাবেন, ফলে জনবলের দিক থেকেও ইসরাইল দুর্বল হয়ে পড়বে।
ইরানের প্রতিরোধ যুদ্ধ : ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, এটি একটি বিপ্লবের ফসল। ইসলামী বিপ্লবের পর এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর ইরান ৪০ বছর ধরে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো প্রচলিত অস্ত্রে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। জিপিএস বা স্যাটেলাইটেও এসবের অবস্থান নিশ্চিতভাবে ধরা যায় না। একমাত্র উপায় স্থল অভিযান, কিন্তু ইরানের ভৌগোলিক গঠন, পর্বতমালা ও ঘনসংখ্যক প্রতিরোধ-শক্তি এ অভিযানের জন্য এক দুর্ধর্ষ ফাঁদ।
ভিয়েতনাম পুনরাবৃত্তি : যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে স্থল অভিযান চালায়, তাহলে সেটি ভিয়েতনামের চেয়েও বড় একটি ফাঁদে পড়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছে- ইরাক ও আফগানিস্তানে তারা শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করেও কিছুই অর্জন করতে পারেনি। ইরান সেই অভিজ্ঞতার চেয়েও কঠিন এক প্রতিপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরকার সম্ভাব্য সংঘাত : যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ যদি বড় ধরনের ব্যর্থতায় শেষ হয়, তবে কেবল বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্য নয়, তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়বে। এই ব্যর্থতা তৈরি করতে পারে, যেখানে সাধারণ আমেরিকানরা মনে করবে, তাদের রাষ্ট্রকে ইসরাইল-সমর্থিত জায়নবাদী লবিগুলো যুদ্ধে ঠেলে দেউলিয়া করে দিয়েছে। এই মনোভাব জায়নবাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতা উসকে দিতে পারে, যা জার্মানিতে ইহুদিবিদ্বেষের পথ প্রশস্ত করেছিল।
সভ্যতা ধ্বংস : আগ্রাসনের ফলে ইরান তার প্রক্সি গোষ্ঠী যেমন হিজবুল্লাহ, হুথি, হামাসকে সক্রিয় করেছে। ইসরাইলও সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নিয়েছে এবং আক্রমণাত্মকভাবে প্রবেশ করেছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- এই যুদ্ধ কি বিজয়ের গল্প হবে, নাকি এক দীর্ঘস্থায়ী ‘ওয়ার অব এট্রিশন’ এর মাধ্যমে কিছু রাষ্ট্র, তাদের ভূখণ্ড, অর্থনীতি ও সভ্যতা ধ্বংস হবে? এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধটিকে সীমিত দ্বন্দ্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং এটিকে একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
একজন হুথি নেতা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা সব ধরনের বিকল্প নিয়ে সামরিকভাবে মার্কিন-ইসরাইল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছি।’ ইতোমধ্যেই তারা ইসরাইলে আক্রমণও চালিয়েছে।
হুথিরা যদি এই সংঘাতের নতুন কোনো ফ্রন্ট উন্মুক্ত করে, তবে তাদের স্পষ্ট লক্ষ্যবস্তু হবে ইয়েমেন উপকূলের বাব আল-মান্দেব প্রণালী।
ইরান ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর সুয়েজ খালের দিকে সামুদ্রিক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী এই সংকীর্ণ পথটি বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সংযোগস্থলে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প বলেন, ইরানকে ‘নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে’, এই বক্তব্য এবং ইরানের পাল্টা বক্তব্য ট্রাম্পকে ফিরে আসা কঠিন করে তুলেছে, যেটি সভ্যতার ধ্বংসের আরেক আভাস।
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের সীমিত সংঘাত নয়, বরং এটি এক ধীরে ধীরে প্রসারমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি জড়িত হওয়া এ সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই মানবতা, অর্থনীতি ও বিশ্বব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব ভয়াবহ হয়ে উঠবে। যুদ্ধ যদি সত্যিই ওয়ার অব এট্রিশনে রূপ নেয়, তাহলে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী, বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দেবে। এটি শুধু সামরিক যুদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, কূটনৈতিক ও মানবিক সংকটের যুগ ডেকে আনতে পারে। তাই জাতিসংঘ, ওআইসি, GCC ও আরব লীগসহ নিরপেক্ষ শক্তিগুলোকে নীরবতা ভেঙে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে এই যুদ্ধ থামানো এবং টেকসই সমাধান এখনই করতে হবে, সেটি করতে ব্যর্থ জাতিসংঘকে জাতিপুঞ্জের ভাগ্যবরণ করতে হতে পারে। আর জাতিসংঘের মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ মুসলিম বিশ্বকে সাধারণ মানবাধিকারের বাইরে গিয়ে ‘মুসলিম মানবাধিকার’ নিয়ে পৃথকভাবে চিন্তা করতে হবে।
সূত্র : ট্রুথ সোশ্যাল, আল-জাজিরা, রয়টার্স, (CENTCOM), এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com