হাজী শরীয়তুল্লাহ
১ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০১
অধ্যাপক আশরাফ জামান : ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত মাদারীপুর মহকুমার শিবচর থানার শামাইল গ্রামে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে শরীয়তুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুল জলিল তালুকদার।
বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন সংযতবাক ও গম্ভীর প্রকৃতির। ইসলামের ওপর গভীর জ্ঞান লাভের জন্য তিনি সাধনা করতেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। মক্কা অবস্থানকালে তিনি জ্ঞান তাপস হযরত মাওলানা তাহের সোম্বল আল মাক্কীর কাছ থেকে কুরআন, হাদীস, ফিকাহ শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য লাভ করে মাওলানা উপাধি লাভ করেন। তিনি মাওলানা সোম্বলের মুরীদ হন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ দেশে ফিরে বিবাহ সমাপন করে পুনরায় মদীনায় যান। রাসূলে পাকের (সা.) রওজার কাছে কোনো এক জায়গায় নিদ্রিত থাকাকালে একদিন নবী করিম (সা.)কে স্বপ্নে দেখেন। রাসূল (সা.) স্বপ্নে তাকে বাংলায় ফিরে গিয়ে ইসলাম প্রচারের জন্য নির্দেশ দান করেন।
আধ্যাত্মিক ঘটনায় সিদ্ধি লাভের জন্য তার উস্তাদ তাহের সোম্বল তাকে কুতুবুল বাঙাল উপাধি দান করেন।
দেশে ফিরে হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরিদপুর, ঢাকা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, খুলনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এবং আসাম, শ্রীহট্ট পর্যন্ত ইসলামের অমর বাণী প্রচার করেন। এ সময় বেশকিছু মুসলমান বিভ্রান্ত হয়ে হিন্দুদের দেব-দেবীর নামে মানত করে শুরু করে এবং কবর পূজা, দরগাহ পূজা, গাজীর শিরনী, ফাতেমার শিরনী পাঁচ পীরের পূজা, খোয়াজ খিজিরের নামে ভেলা ভাসানো প্রভৃতি করতো।
এ সকল প্রচারণায় মুসলমান সমাজে কুসংস্কার, বিদ’আত ও অন্ধবিশ্বাস দূর হয়। অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষকে ইসলামের আলোক দান করার জন্য মাওলানা শরীয়তুল্লাহ যে বিরামহীম পরিশ্রম করেছিলেন, তার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে খুব কমই আছে।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর ইংরেজগণ বুঝতে পারে যে, রাজাহারা মুসলমানগণ সুযোগ পেলেই তাদের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাবে। তাই এ দেশের হিন্দুদের নানা প্রকার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে তাদের আনুগত্য লাভ প্রয়োজন।
এ দেশের মুসলমানগণ ইংরেজ ও হিন্দুদের কাছে ঘৃণিত জাতি হিসেবে পরিচিত হয়। ফারসীর পরিবর্তে ইংরেজগণ ইংরেজিকে রাজভাষা হিসেবে প্রবর্তন করে। সরকারি অর্থানুকূল্যে পরিচালিত মক্তব, মাদরাসা, মসজিদ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান ইংরেজ সরকার বন্ধ করে দেয়। পক্ষান্তরে হিন্দু প্রতিষ্ঠানগুলোয় ইংরেজ সরকার সাহায্য ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে। এভাবে ইংরেজ সহায়তায় হিন্দুগণ রাতারাতি শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত লাভ করে। অন্যদিকে মুসলমানগণ পেছনে পড়ে যায়। মুসলমাদের এই দুর্দিনে মাওলানা হাজী শরীয়তুল্লাহ তার পুত্র মাওলানা মহসিন উদ্দীন আহমদ ওরফে দুদু মিয়া কঠোর ব্রত গ্রহণ করেন। মুসলমানদের পথ প্রদর্শনের জন্য এক বৃহৎ আন্দোলনের সৃষ্টি করেন। এই আন্দোলনই ইতিহাসে ফারায়েজী আন্দোলন নামে খ্যাত। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ফারায়েজী ও বিরোধীদের মধ্যে এক সংঘর্ষ বাধে। দেশের হিন্দু জমিদারগণ এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে।
হাজী শরীয়তুল্লাহ মুসলমন সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার যেমন কবর পূজা, পীর পূজা ইত্যাদির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। এদেশ দারুল হবব, অর্থাৎ বিধর্মী রাজার অধীন এ দেশ। সুতরাং এ দেশে জুমার নামাজ ও ঈদের নামাজ বন্ধ ঘোষণা করেন।
হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন একজন সত্যিকারের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা। ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে তার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত অমায়িক এবং অতি সাধারণ জীবনযাপন তিনি পছন্দ করতেন। বাঙালি মুসলমান সমাজের পথিকৃৎ ছিলেন তিনি। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে এই মহামানব জান্নাতবাসী হন।