বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার অংশীদার হতে চলেছে মুসলিম বিশ্ব


২৬ মার্চ ২০২৬ ২১:২৩

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে প্রায় প্রতিটি বিরোধ-সংঘাতে ইঙ্গ-মার্কিন নেক্সাসের এক নিবিড় যোগসাজশ পরিলক্ষিত হয়। যুদ্ধের খরচ মেটাতে মুসলিম বিশ্ব থেকে লুট করা আর পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকা ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে ইহুদি জায়নবাদীদের নিয়ন্ত্রিত মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সসহ কতিপয় কর্পোরেট জায়ান্টের ব্যাংকিং রিজার্ভ ট্রিলিয়ন ডলারের অঙ্ক স্পর্শ করে। একেকটি বহুজাতিক যুদ্ধ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে সুবিধা বঞ্চিত করে, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে ধ্বংস আর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে। সম্প্রতি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অন্যায় যুদ্ধ এই দশকের জঘন্যতম ভূরাজনৈতিক ঘটনায় পরিণত হয়ে বিশ্বকে ধ্বংসাত্মক করে তুলছে। বর্তমান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইউরোপের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে দুয়ারে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা উঁকি দিচ্ছে।
ইঙ্গ-মার্কিন বিশেষ সম্পর্ক : সাধারণত আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বিষয়টি দ্বারা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার রাজনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, আইনগত, পরিবেশগত, ধর্মীয়, সামরিক এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকেই বুঝিয়ে থাকে। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল ইঙ্গ-মার্কিন সম্পর্কের দৃঢ়তা বোঝাতে এই শব্দটা ব্যবহার করেন। উইড্রো উইলসন-ললয়েড জর্জ থেকে উত্থান হয়ে, চার্চিল-রুজভেল্ট যে ভিত্তিটা রেখে যান রোনাল্ড রিগান-মার্গারেট থ্যাচার এবং ৯/১১ পরবর্তীতে জুনিয়র বুশ-টনি ব্লেয়ার সম্পর্কটিকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যান যে সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় খেসারত দিচ্ছে আজকের বিশ্ব।
আফগানিস্তান : ৯/১১-এর মাত্র কয়েকদিন পর ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র তার নেতৃত্বাধীন ন্যাটোকে সঙ্গে নিয়ে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়ে মোল্লা ওমরের তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের এবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিল ওসামা বিন লাদেন কে হত্যা করে উত্তর আরব সাগরে দাফন করেছে। তবে লাদেনের মৃতদেহ কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করে দেশটিকে পরবর্তীতে হামলার পাইপলাইনে রাখাও হতে পারে। ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে আছে এমন অভিযোগে হামলা করে লাখ লাখ নাগরিক হত্যা করে দেশটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলেও তার কোনো বিচার হয়নি।
পরে ২০২০ সালে তালেবান হামলা সহ্য করতে না পেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতারের দোহায় তালেবানের সাথে আফগানিস্তান থেকে সকল সেনাসদস্য প্রত্যাহার করার এবং তালেবানকে দেশপ্রেমিক সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিতে বাধ্য হন। অবশেষে ৩১ আগস্ট ২০২০ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো তালেবানের কাছে চূড়ান্ত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন জোট আফগানিস্তান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
ইরাককে ঘিরে ইঙ্গ-মার্কিন সম্পর্ক : ব্রিটিশ ও ফরাসি কূটনীতিক সাইক ও পিকোর মধ্যকার স্বাক্ষরিত সাইকস-পিকো চুক্তির ফল বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য। বর্তমান ইরাক পূর্বে অটোমান সাম্রাজ্যের তিনটি বড় প্রদেশের (বাগদাদ, মসুল ও বসরা) সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে এই তিনটি প্রদেশের সমন্বয়েই ইরাক তৈরি হয় এবং বাদশাহ ফয়সালকে ইরাকের শাসনক্ষমতায় বসানো হয়। তিনি ব্রিটিশদের ইরাকের আবিষ্কৃত তেলের খনিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রদান করেন। পরবর্তীতে জঅঋ ইরাকে ফয়সালের বিরুদ্ধে বিপ্লবের মাধ্যমে ইরাক দখল নেন। ইরাককে রাজতন্ত্রের বদলে প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা সত্বেও সরকার তেলের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের পালে যুক্তরাষ্ট্রও যুক্ত হয়, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের; বিশেষত ইরাকে তেলের উত্তোলন ও সরবারহের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যই ছিলো প্রধান। কিন্তু প্রজাতন্ত্র হওয়ায় তারা ব্রিটিশ সরকারের ওপর ফয়সালের মতো অনুগত ছিলো না। ফলে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের কাছে সরকারকে উৎখাত করা খুব জরুরি হয়। অন্যদিকে আরব রাষ্ট্রগুলো ইঙ্গ-মার্কিন জোটের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। ইঙ্গ-মার্কিন জোটকে আরব দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করতে হলেও, আরব দেশগুলোর রাজস্বের অধিকাংশই চলে যেত এই জোটের থেকে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানিতে। ‘অস্ত্র-পেট্রো ডলার চক্র’ আরব দেশ ও ইঙ্গ-মার্কিন জোটের মধ্যে চলতে থাকে। গালফভুক্ত দেশগুলো বিশাল অংকের রাজস্ব পশ্চিমা আর্থিক ও প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতো আর ইরাক রাজস্ব জনগণের জীবন-মান; অবকাঠামো নির্মাণ; শিল্পায়ন ও শিক্ষা উন্নয়নে ব্যবহার করে। ফলে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের জনপ্রিয়তা, উন্নয়ন ও তেলের খনিগুলোর ওপর একনিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়, যা ইঙ্গ-মার্কিন জোটের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তোলে।
শাতিল আরব যুদ্ধ : ইঙ্গ-মার্কিন জোটের ভাবনার ফল ১৯৮০ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনকে ইঙ্গ-মার্কিন জোট সহায়তা প্রদান করে। এই সহায়তার পেছনে অন্যতম স্বার্থ ইরাক-ইরানকে সামরিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলের প্রভাব বৃদ্ধি করা।
গালফ ওয়ার : ইরাক-ইরান যুদ্ধের সমাপ্তির দুই বছরের মাথায় সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করায় জাতিসংঘ ইঙ্গ-মার্কিন ইন্ধনে ইরাকের বিরুদ্ধে রেজ্যুলেশন পাশ করে, এবং কুয়েতকে দখলমুক্ত করতে সমন্বিত সামরিক শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেন। ফলে গালফ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে হেরে সাদ্দাম বাহিনী কুয়েত ত্যাগ করে, কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে ইরাকের ওপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো তা রদ করার বেলায় ইঙ্গ-মার্কিন জোট ভেটো দেয়। এ যুদ্ধেও ইঙ্গ-মার্কিন জোটের লক্ষ্য ছিলো ইরাককে আর্থিকভাবে দুর্বল করা। অবশেষে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৯৫ সালে তেল থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব জাতিসংঘের উন্নয়ন ফান্ডে যাবে এবং জাতিসংঘ ইরাকের আর্থসামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করবে শর্তে ইরাককে সামান্য তেল রপ্তানির সুযোগ দেয়া হয়। পরে জুনিয়র বুশ-টনি ব্লেয়ার ইরাক দখল করে তেলের খনিগুলোর ওপর জোটের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু জাতিসংঘ তেলের রাজস্বে ডলারের বদলে ইউরো ব্যবহারে জোটের স্বার্থে আঘাত ঘটে আর ইউরোপ বিনিময় মুদ্রা হিসেবে ইউরো চালু হওয়ায় লাভবান হয়।
‘ইঙ্গ-মার্কিন হামলা-ইরাক’ : ৮ নভেম্বর ২০০২ সালে ইঙ্গ-মার্কিন জোট- ডগউ প্রযুক্তি ইরাক তৈরি করছে কিনা. তা অনুসন্ধানে ইরাকের সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য করে। ২১ মার্চ ২০০৩ তারিখে ইঙ্গ-মার্কিন জোট ইরাক দখল করে। পরবর্তী দিনেই জাতিসংঘ ইরাকের ওপর থেকে সকল অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়। ফলে ইরাকের তেল অনৈতিক ভাবে দখল করে এই জোট। ইঙ্গ-মার্কিন সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেমনটি ২০০৩ সালের ইরাকে হামলা বিষয়ে বলছিলেন টনি ব্লেয়ার, ‘সাদ্দাম হোসেন নিজ দেশের জনগণ এবং অন্যদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও সেটার মাত্রা তেমন ছিল না।’
ইঙ্গ-মার্কিন ইন্ধনে ইরান অভ্যুত্থান : ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেক ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (বর্তমানে বিপি) জাতীয়করণের উদ্যোগ নেন। এতে ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায়। যুক্তরাজ্যের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ) এক গোপন অভিযানে অংশ নিয়ে অভ্যুত্থানে সহায়তা করে এবং পূর্বে অপসারিত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভিকে পুনরায় ক্ষমতায় বসায়।
ইয়েমেনে ইঙ্গ-মার্কিন জোটের হামলা : ইয়েমেনে ইঙ্গ-মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় আনসারুল্লাহর একজন নেতা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে উত্তেজনার মাধ্যমে বিপদ ডেকে আনছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরাইলের নির্বিচার হামলার প্রতিবাদে ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে হুতিরা জানিয়েছিল- ইসরাইল গাজায় হামলা বন্ধ না করলে লোহিত সাগর হয়ে ইসরাইল অভিমুখী যেকোনো জাহাজে হামলা চালাবে তারা। বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনাও ঘটিয়েছে গোষ্ঠীটি। সেই অছিলায় ইঙ্গ-মার্কিন জোট হামলা চালায় ইয়ামেনে।
ইঙ্গ-মার্কিন জোটে ভাঙন : ইরাক যুদ্ধে জোটটির ভাঙন হয়, যেটি পরবর্তীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়। এই ভাঙনের পিছনে মৌলিক বিষয়- ইরাক যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য- উভয় দেশেরই আলাদা জাতীয় স্বার্থ বিদ্যমান ছিলো; যুদ্ধে অন্তর্ভুক্তির হার বা লেভেলের ক্ষেত্রেও এই দুই শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য লক্ষণীয় এবং দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের পার্সোনালিটি একে অন্যের থেকে স্বতন্ত্র।
‘অ্যাটমস ফর পিস’ ও পারমাণবিক সহায়তা : ইরানে ১৯৫৭ সালে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে শাহকে সমর্থন জানায় যুক্তরাষ্ট্র জোট। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেন আওয়ারের ‘অ্যাটমস ফর পিস’ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। এক দশক পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে একটি পারমাণবিক চুল্লি ইউরেনিয়াম সরবরাহ করে। এই চুক্তিই পরবর্তীতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বর্তমান ইসরাইল-মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ভিত্তি।
ইসরাইল-মার্কিন সম্পর্ক : ১৯৪৮ সালে বেলফোর ডিক্লারেশনের মাধ্যমে ইসরাইলের জন্ম হয়। তার পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নীতি নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলকে অর্থ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রদান করেছে এবং সংঘাতের সময়ে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ২০০২ সালের ১৬ আগস্ট ওয়াশিংটন পোস্টও জানিয়েছিল যে ‘ইসরাইল মার্কিন কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেছেন ইরাকে হামলা চালাতে তারা যেন দেরি না করেন।’ এর ১১ দিন পর বুশের সহকারী ডিক চেনি বিদেশে যুদ্ধ করা সেনাদের সমাবেশে যুদ্ধের প্রচারণা শুরু করেন। ইসরাইলের অনুরোধে ইঙ্গ-মার্কিন জোট ইরাকে হামলা করে অবশেষে সাদ্দাম হোসেন কে উৎখাত করে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এবং ইসরাইলের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে ইরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। সর্বশেষ ইসরাইলের অন্ধ সমর্থনের সেই ধারাবাহিকতায় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ শুরু হয় ইসরাইল-মার্কিন-ইরান যুদ্ধ।
পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্য
বাহরাইনে ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট নাফতালি বেনেটের সফর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ করছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম এক্সারসাইজ ২০২২-এ (আই এম এক্স ২২) ইসরাইলের অংশগ্রহণের পরবর্তী সময়ে এমনটা ঘটেছে। আই এম এক্স ২২-এ প্রায় ৬০টি দেশ সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে সৌদি আরব ও ওমানও ছিল যাদের সঙ্গে ইসরাইলের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সভাপতিত্বে ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনকে একত্র করার ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ অনুসারে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণে এই পদক্ষেপগুলো করা হয়েছিল। অন্যদিকে ইসরাইলের প্যালেস্টাইন দখল করে নেওয়ার খবর প্রায়ই আরব তথা বিশ্বকে উত্তেজিত করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০২১ সালে গাজা উপত্যকায় রক্তপাতের ঘটনা কাতার, কুয়েত, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোয়; বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায়, ইসরাইলি সরকারের প্রতি সমালোচনার আলোড়ন তুলে। এমনকি বাহরাইনে নাগরিক সমাজের সদস্যদের ইসরাইলের সমালোচনায় খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ-‘মুসলিম বিশ্ব’ : ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং পরবর্তীতে মরক্কো-ইসরাইলের সাথে নিজেদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় ক্রমেই বেশ কিছু আরব রাষ্ট্রের সাধারণ শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকে ইরান। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সৌদি আরবকেও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে দেখা যায়, যদিও এই চুক্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ফিলিস্তিন ইস্যুটি।
ইসরাইল-মার্কিন-ইরান যুদ্ধ এবং অখণ্ড ভারত : বিনাযুদ্ধে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে বিশ্বের সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ন্যাটো জোটের অনুকূলে চলে যায়। মূলত মধ্যপ্রাচ্য এবং মুসলমান দেশগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই যেন এ পশ্চিমা সামরিক জোট ও পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য। বিশ্বব্যবস্থার ওপর পশ্চিমা কর্তৃত্ব বজায় রাখার নেপথ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জায়নিস্ট ইসরাইলি লবি জোরালো ভূমিকা পালন করছে। জায়নবাদী ইহুদি নিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট ব্যাংকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, থিঙ্কট্যাঙ্ক, কপোর্রেট মিডিয়া ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরাইলের আধিপত্য ও সম্প্রসারণবাদী নীতিকে পশ্চিমা নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে অধিকার হিসেবে সমুন্নত রাখতে কাজ করে থাকে। ইরান-ইসরাইল-আমেরিকার যুদ্ধ বিগত শতকে গড়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে একটি নতুন বাস্তবতায় পৌঁছাতে চলেছে। পশ্চিমাদের ধর্মযুদ্ধ বা অন্তহীন যুদ্ধের রেশ এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকান স্বার্থের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই। এবারের ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে আরেক কুশীলব হিসেবে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অবস্থান সভ্যতার সংঘাতকে একটি নতুন সম্প্রসারণবাদী উন্মাদনায় পর্যবসিত করছে। তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চালু থাকা অবস্থায় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল-আমেরিকা তেহরানে যৌথ বিমান হামলা শুরু করে। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি ইসরাইল সফরে গিয়ে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটের বক্তব্যে বলেছেন, ইসরাইল হচ্ছে ইসরাইলিদের ফাদারল্যান্ড আর ভারত হচ্ছে তাদের মাদারল্যান্ড। তিনি আরো বলেন, ইরানের পতন না হলে গ্রেটার ইসরাইল এবং অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। তার মতে ইরানের পর পাকিস্তানের পতন হলে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশগুলো বিনাযুদ্ধেই অখণ্ড ভারতের হয়ে যাবে! ভারতের পার্লামেন্ট ভবন উদ্বোধনের সময় সেখানে অখণ্ড ভারতের মানচিত্র স্থাপন বিষয়ে বেশ হইচই হয়েছিল। এবার আমেরিকা-ইসরাইলের যৌথ আক্রমণে ইরানের সব প্রতিরোধ সক্ষমতা চুরমার হয়ে যাবে, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেলক্ষেত্রগুলো আমেরিকা-ইসরাইলের দখলে চলে যাবে এবং ইরানিদের সম্পদ ভাগাভাগির বন্দোবস্ত কায়েমের সাথে সাথে গ্রেটার ইসরাইল গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার দ্বারপ্রান্তে সহজেই পৌঁছে যাবে। এমন পরিকল্পনা ও হিসাব-নিকাশ করেই তারা যুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। এমন পরিকল্পনা ও সমূহ সম্ভাবনা দেখেই নরেন্দ্র মোদি তেলআবিবে গিয়ে ইসরাইলের সাথে নিজেদের ‘অখণ্ড ভারত’র স্বপ্নের ডালি মেলে ধরেছিলেন। পুরো বিশ্ব ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর অন্যায় যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও মোদি ইসরাইলের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরানি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজকে একটি যৌথ মহড়ায় আমন্ত্রণ জানিয়ে সেই জাহাজকে মার্কিন টর্পেডো হামলার জন্য তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে বেঈমানিও করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের দূরত্ব : ইসরাইল সামরিকভাবে ব্যর্থ হওয়ায়, ওয়াশিংটন যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী হলেও ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র- ইরানের সাউথ পার্স- এ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ক্ষুব্ধ করেছে। জ্বালানি স্থাপনায় হামলার এই ঘটনা নিয়ে নিজের ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন ইসরাইল যে এই হামলার পরিকল্পনা করছে, এটি জানতেন না তিনি। প্রেসিডেন্ট পোস্টে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই যুদ্ধ নিয়ে কতটা একমত ও একই অবস্থানে রয়েছে, এই প্রশ্ন সামনে আসছে। যদিও তার এই বক্তব্যটি হামলার পর ইসরাইলের একাধিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সম্পূর্ণ বিপরীত। এ সময় ট্রাম্প যে শব্দগুলো বেছে নিয়েছেন, তাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘ক্রোধের বশবর্তী হয়ে’ গ্যাসক্ষেত্রের ওপর ‘হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ইসরাইল।’ এই ধরণের ভাষা সাধারণত ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার বর্ণনা দিতেই ব্যবহার করেন তিনি- যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রের সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে নয়। প্রেসিডেন্টের পক্ষে নেতানিয়াহুর প্রতি এটি একটি সতর্কবার্তা। যুদ্ধ শুরুর দিকে ইরানের তেলের ডিপোগুলোয় ইসরাইলি হামলার কারণেও ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাদের দূরত্বের এবং যুদ্ধের লক্ষ্য আলাদা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও নতুন শক্তির সমীকরণ : ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ পশ্চিমা মিত্ররাও এতে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। উদাহরণ হিসেবে নরওয়ের অনীহা অবাক করার মতো নয়। নরওয়ে বিশ্বের বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি এবং তাদের অর্থনীতির প্রায় এক-পঞ্চমাংশই তেল ও গ্যাস থেকে আসে। তাই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তাদের জন্য খুব একটা খারাপ খবর নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা, ইরানের প্রত্যাঘাত, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে পক্ষদ্বয় কে আহ্বান করেছেন যুদ্ধ বন্ধের। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ন্যাটোর সম্প্রসারণকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে রাশিয়ার ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিতে পারে। যদিও বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস বলছে, বিশ্ব নেতৃত্ব শুধু সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না। অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এই চার ক্ষেত্রেই শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে দীর্ঘসময় ধরে বিশ্ব রাজনীতির নেতৃত্ব দিয়েছে। চলমান সংকটময় মুহূর্তে, আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনগণকে একটি নতুন পথ নির্ধারণ করতে হবে; যা তাদের নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠা করবে, সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করবে এবং একটি ন্যায়সঙ্গত ও বহুমেরু বিশ্ব ব্যবস্থায় তাদের স্থান পুনর্নির্ধারণ করবে। (সামি আল-আরিয়ান: মিডল ইস্ট আই) ইসরাইল-মার্কিন জোটে ধস আর চীনের ঐতিহাসিক উত্থান একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। তিন দশক ধরে যখন একমেরু প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য ক্রমশ তুঙ্গে, তখন অর্থনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান বিশ্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’, ব্রিকস, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো আর্থিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে, চীন এবং তার অংশীদাররা বহুমেরু বিশ্ব ব্যবস্থা তৈরির অনুঘটক। যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্তিশালী, কিন্তু একই সঙ্গে রাশিয়া, চীন এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। মুসলিম পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুর্কিয়ের সামরিক অ্যালায়েন্স ইরান এককভাবে বীরদর্পে বিশ্বের সুপার পাওয়ার মার্কিন-ইসরাইল জোট, আরব রাষ্ট্রগুলোর মোকাবিলা করছে। তাতে নির্দ্বিধায় বলা যায় এবার যুদ্ধে ইসরাইল-মার্কিন জোটের পরাজয় হলে পরবর্তী বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় শক্তির কাতারে থাকবে মুসলিম বিশ্ব ও ইরান।
সূত্র : ট্রুথ সোশ্যাল, আল-জাজিরা, রয়টার্স, (CENTCOM), এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com