কলকাতার নেতাদের নির্দেশনা মানতে রাজি না তৃণমূল আ’লীগের নেতাকর্মীরা


১৭ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৭

॥ এম গজনবী ॥
ভারতের কলকাতায় অবস্থানরত নেতাদের নির্দেশনা মানতে রাজি না কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর আপনারা পালিয়ে কলকাতায় পাড়ি জমিয়েছেন। আপনাদের কেউ কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন। গোপন আস্তানায় নিরাপদে থেকে আমাদের নির্দেশনা পাঠাচ্ছেন দলীয় বন্ধ অফিস খুলে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে। এটা সম্ভব নয়। আমরা জীবনের ঝুঁকি নিতে রাজি না। জীবনের ঝুঁকি আপনাদেরই নিতে হবে। এমন কাটছাঁট কথা বলেছেন বিভিন্ন জেলার নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা জানান, কলকাতায় বসে আওয়ামী লীগের নেতারা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের খবর পাঠাচ্ছেন দলের বন্ধ অফিস খুলে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে। তাদের নির্দেশনা মোতাবেক অল্প কিছু জায়গায় অফিস খোলা হয়। কিন্তু ফলাফল ভালো আসেনি। হামলার ভয়ে আবার সেটা বন্ধ করতে হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এটা সম্ভব নয়। এ কথা কলকাতায় অবস্থানরত নেতাদের পরিষ্কার করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, তৃণমূলের এসব নেতাকর্মী ভীতসন্ত্রস্ত। ১৬ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে যারা আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়েছেন, তাদের কোনো পাত্তা নেই। তারা গোপনে বিএনপির কাতারে ভিড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকে ভিড়েও গেছেন। আর যারা ক্ষমতার ভাগ পাননি অর্থাৎ ত্যাগী নেতাকর্মীরা এখন এতিমের মতো পড়ে আছেন। ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন রাজ্যে আরাম-আয়েশে কাটানো নেতারা দেশে এতিমের মতো পড়ে থাকা নেতাদের ওপর ধর্ণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বলছেন ফের দল গোছাতে হবে। আরো জানা গেছে, সুবিধাবাদী নেতারা যার যার এলাকায় বিএনপির সঙ্গে সখ্য বজায় রেখে জেলে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস আত্মগোপনে ছিলেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তারা আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে ধানের শীষের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন পিঠ বাঁচাতে। বর্তমানে যার যার মতো করে বিএনপির সঙ্গে মিলেমিশে অনেকে আবার বিএনপিতে জোগাদানও করেছেন। আবার কখনো সুসময় এলে নিজেদের পুরনো দলে ফেরত আসবেন বলে তারা জানান।
কলকাতায় গোপন অফিস : চব্বিশের ৫ আগস্টের কিছু আগে ও পরে আওয়ামী লীগের দাগী নেতারা বিদেশে চলে গেছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ নেতা ভারতের কলকাতায় প্রথম যান। সেখানে বসে দেশে পরিস্থিতি দেখে লন্ডন, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে গেছেন। তবে অধিকাংশ নেতা ভারতের কলকাতায় আছেন। ত্রিপুরা এবং খোদ রাজধানী দিল্লিতেও অনেকে আছেন। জানা গেছে, কলকাতা শহরে অতি গোপনে অজ্ঞাত স্থানে সাইনবোর্ড ছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলা হয়েছে। সেখানে দলীয় নেতারা নিয়মিত বৈঠক করছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেসব নেতারা আছেন তারাও কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। আওয়ামী লীগ ছাড়াও যুবলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগসহ সকল সহযোগী সংগঠন এবং আওয়ামী ঘরানার লেখক, শিল্পী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন কলকাতাতেই আছেন। তারা নিয়মিত অফিসে বসেন। কলকাতা পুলিশ জানলেও তাদের কিছু বলছে না ওপরের নির্দেশে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিও জানে। এমনকি কলকাতা মিডিয়াও বিষয়টি জানে, কিন্তু কেউই মুখ খুলছে না। অফিসে বসে বৈঠক করে বাংলাদেশকে অস্থির করতে ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। অফিস খুলে দেওয়ার নির্দেশনাও তাদের একটি ষড়যন্ত্র।
নাম প্রকাশ করতে চাননি খুলনা শহরের একজন আওয়ামী লীগ নেতা এ প্রতিনিধিকে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কয়েকদিন পর আমরা খুলনাতে দলীয় বন্ধ অফিস খুলি। নিজেদের ইচ্ছায় অফিস খুলিনি। কলকাতা থেকে খবর আসে অফিস খোলার। বলা হলো ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি নেতা উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দিয়েছে। সুতরাং কোনো অসুবিধা হবে না। অফিস খুললে খুলনা বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা আসবে না। আমরা ঝুঁকি নিয়ে অফিস খুললাম, কিন্তু মোবাইলে খবর এলো অফিস বন্ধ করে দ্রুত চলে যেতে হবে। আমরা তড়িঘড়ি করে অফিস বন্ধ করে চলে যাই। পরবর্তীতে অফিস আর খুলতে পারলাম না। তিনি বলেন, এভাবে ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সাফ জানিয়ে দিয়েছি কলকাতায় বসে থেকে আর কোনো অর্ডার আমরা শুনবো না। আপনারা দেশে আসেন। তারপর সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাবো। দল নিষিদ্ধ রয়েছে। তাই কিছু করতে গেলে জেলে যেতে হবে। জুলুম-নির্যাতন ভোগ করতে হবে। আমীর সরদার নামে খুলনা শহরের যুবলীগের একজন নেতা জানান, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর হত্যাসহ আমার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার এড়িয়ে আত্মগোপনে আছি। বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে উকিল ধরে মামলাগুলো হালকা করার চেষ্টা করছি। আওয়ামীপন্থী উকিলদের কাছে গেলে তারা বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে সরাসরি আদালতে যাওয়া কঠিন। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে দেখা যাক কি হয়। ওই যুবলীগ নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কলকাতায় নেতাদের কাছে লোক মারফত খবর পাঠিয়েছিলাম আমাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা দেখার জন্য খুলনার উকিলদের বলতে। উকিলরা একটু ঝুঁকি নিলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়। বিএনপির আইনজীবীদের কাছে গেলে শুধু টাকার শ্রাদ্ধ। তবে মন্দের ভালো যে এখনো জেলে যাইনি। আর যারা জেলে আছেন তারা পস্তাচ্ছেন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, নতুন সরকার আসার পর কিছু জায়গায় আওয়ামী লীগের বন্ধ অফিস খোলার খবর শুনেছি। আমরাও উদ্যোগ নিয়েছিলাম অফিস খোলার। বড় বড় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা ভরসা দেননি। তাই অফিস খুলতে পারিনি। তিনি বলেন, কলকাতায় আওয়ামী লীগের অফিস খোলা হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু কোথায় তা জানি না। বিভিন্নভাবে আরো জানতে পারছি নেতারা নির্দেশ দিচ্ছেন সংগঠনকে গোছাতে। লন্ডন, আমেরিকা থেকেও এমন খবর আসছে। আমাদের অনেক নেতা লন্ডন আমেরিকায় পালিয়ে গেছেন। শুনেছি অনেকে আবার হোটেলে চাকরি নিয়েছেন। তারা বলছেন নতুন সরকারের মনোভাব দেখে দলীয় কার্যক্রম চালাতে হবে। আমার মতে, আগে নিষিদ্ধ আদেশ প্রত্যাহার করাতে হবে, তারপর অফিস খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় অফিস খুলতে গেলে ঝুঁকি নিতে হবে। নেতারা ছাড়া ঝুঁকি নেওয়া সমীচীন হবে না।
গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি গোপালগঞ্জের ওপর। সরকাররের দৃষ্টিও। কারণ গোপালগঞ্জ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। শেখ হাসিনার বাড়ি এখানে। কিন্তু আমরা এখানে অফিস এখনো খুলিনি। অফিস খোলার মতো শক্তি আছে, তারপরও আইন অমান্য করছি না। তারা বলেন, জুলাই আন্দোলনকারীরা এখানে এলে তাদের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে। হতাহতের ঘটনাও ঘটে। অনেক নিরীহ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। আর্থিকভাবে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে ধাক্কা এখনো গোপালগঞ্জের মানুষ ভোগ করছে। যে কারণে অফিস খুলতে গিয়ে ফের কোনো ঘটনা ঘটুক, সেটা আমরা চাই না। কলকাতা থেকে যতই যে নির্দেশনা আসুক না কেন সময়মতো সব কিছু করা হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক অধ্যাপক এ প্রতিনিধিকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। সরকারের নির্বাহী আদেশে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে দলটি নিষিদ্ধ করা হয়। এখন বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। জাতীয় সংসদ বসছে। অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে উঠবে। আলোচনার মাধ্যমে সার্বভৌম সংসদই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। বিষয়টি ফয়সালা না করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো বেআইনি। আর বিদেশে কোনো দেশের মাটিতে বসে দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামতে বলা নিসন্দেহে ষড়যন্ত্র। এ প্রসঙ্গে একজন মানবাধিকার কর্মী বলেন, রাজনীতি করার অধিকার সকল নাগরিকের আছে। এটা একজন নাগরিকের অধিকার। অধিকার আছে বলে যে কেউ বেআইনি কোনো কাজ করতে পারেন না। তাকে দেশের আইন মেনে অধিকার ভোগ করতে হবে। একটি সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। এখন ক্ষমতায় আরেকটি সরকার। বিষয়টির ফয়সালা সরকারের পক্ষ থেকে আসতে হবে। তাই দল নিষিদ্ধের অধ্যাদেশটি আগে সংসদ উঠুক। সে সময়টা দিতে হবে।
১৪ দলকে পরামর্শ : কারারুদ্ধ রাশেদ খান মেননের বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, কারারুদ্ধ হাসানুল হক ইনুর জাসদ, দিলীপ বড়ুয়ার সাম্যবাদী দল, অধ্যাপক মোজাফফরের ন্যাপসহ কয়েকটি বামপন্থী দল মিলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাধা। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ক্ষমতার ভাগ বামপন্থীরা পেয়েছে। যে কারণে হত্যা, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে মেনন ও ইনু বর্তমানে জেলে আছেন। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের মতো ১৪ দলভুক্ত বাম নেতারাও আত্মগোপনে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়ার্কার্স পার্টির এক নেতা এ প্রতিনিধিকে বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে আমাদের বলা হয়েছে অফিস খোলাসহ সীমিত পরিসরে হলেও দলীয় কার্যক্রম চালাতে। আমরা বলেছি নতুন সরকার এসেছে, নতুন সরকার কোন দিকে মোড় নেয় সেটি দেখতে সময়ের প্রয়োজন। তাড়াহুড়ো করে কিছু করতে গেলে হিতেবিপরীত হতে পারে। তাছাড়া আমরা ছোট দল আওয়ামী লীগ বড় দল। বড় দল আগে উদ্যোগ নিক। এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টির এক নেতা বলেন, আজ হোক বা দুদিন পরে হোক রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে গেলে জেলে যেতে হবে। ঝুঁকি নিতেই হবে। এ ঝুঁকিটা বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে আগে নিতে হবে। সাম্যবাদী দলের এক নেতা বলেন, ৫ আগস্ট সরকার বদলের পর বামপন্থী দলগুলোর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। তবে আওয়ামী লীগ থেকে ১৪ দলকে বলা হয়েছে যার যার অবস্থান থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করতে হবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোনো কিছু করা যাবে না। আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হোক, তারপর দলীয় কার্যক্রম চালাতে হবে। জোর করে কিছু করতে গেলে সংঘাত বাড়বে।
এদিকে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একই কথা বলছেন। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সঠিক হলো কি না সেটা পরের বিষয়, আপাতত দলটি নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় অন্য একটি দেশে বসে দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামতে বলার অর্থ উসকে দেওয়া। এটা যেমন বেআইনি তেমনি দণ্ডনীয় অপরাধ। এতে করে দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হবে।