নতুন সংসদের হাতছানি ও সম্ভাব্য ইস্যুসমূহ
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:২৯
॥ ওয়াহিদ মুন্না ॥
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এক অভূতপূর্ব যুগে প্রবেশ করেছে ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার। চিরায়ত বাংলাদেশের মানুষ বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে হয় ট্রেজারি বা বিরোধীদলে থাকতে দেখেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ বিরোধীদলে আর বিএনপি বিরোধীদলে থাকলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। কিন্তু চিরায়ত চিত্রপট বদলে নতুন চিত্রপট প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এই অধিবেশন বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ত্রয়োদশ সংসদ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে সরকারি ও বিরোধিদলের মিথষ্ক্রিয়া, যা আগে কখনো কখনো খিস্তি খেউরের জায়গা হিসেবে বদনাম কুড়িয়েছিল। দেশ এখন একটি পরিবর্তনশীল সময় পার করছে। ঘটতে যাচ্ছে কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা। বাদ পড়বে কিছু বাক্য সাথে যুক্ত হবে কিছু নতুন বাগধারা বা বাগবিধি। এই প্রথম প্রধান বিরোধীদল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী, যা আগে কখনো বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেনি। নতুন করে সংসদ আরও পেয়েছে এনসিপিকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিসও তাদের প্রথম পদচারণা করবে এ সংসদে। অবশ্য এটিই হবে প্রথম আওয়ামী লীগমুক্ত প্রথম সংসদ। কারণ ফ্যাসিজম নীতির কারণে দলটি নিষিদ্ধ এবং প্রধান নেতা শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ নেতৃত্ব জুলাই বিপ্লবের সময় সাধারণ নেতাকর্মীদের ত্যাগ করে লুটের অর্থে বিদেশে উন্নত জীবনযাপনে ব্যস্ত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সম্ভাব্য যেসব ইস্যু আলোচিত হতে পারে, তা হলো রাজনৈতিক সংস্কার, জবাবদিহি এবং নতুন নীতির প্রশ্ন। তাই সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাধারণ ও গতানুগতিক কতিপয় আনুষ্ঠানিকতার কয়েকটি বড় ইস্যু আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছেÑ যেমন ১৩৩টি অধ্যাদেশ, রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও ধন্যবাদ প্রস্তাব, ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, জুলাই চার্টার এবং আওয়ামী লীগের অপশাসন নিয়ে বিতর্ক।
১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা
এই অধিবেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ১৩৩টি অধ্যাদেশ। সংসদ না থাকলে সরকার জরুরি ভিত্তিতে অধ্যাদেশ জারি করতে পারে। তবে পরে সংসদের অনুমোদন নিতে হয়।
রাজনীতিহীন ১৭ বছর পর জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবর্তন হলে ঢাকা পরিণত হয় হাজারো আন্দোলনের শহরে। প্রতিদিন ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়; এমনকি ছোট গলিও স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হতো অধ্যাপক ইউনূসের সীমিত শাসনকালে। এমতস্থায় অনেক বেশিসংখ্যক অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বেশিসংখ্যক জনতুষ্টিমূলক আইন করতে হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। জারিকৃত সেসব অধ্যাদেশ একটি বড় রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান বিএনপির আমলে।
এসব অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন, নির্বাচন সংস্কার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয়ে।
সংসদে এসব অধ্যাদেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। কিছু সংসদ সদস্য বলতে পারেন যে এগুলো দেশের স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি ছিল। অন্যদিকে কেউ কেউ বলতে পারেন যে বেশি অধ্যাদেশ জারি করা সংসদের ক্ষমতাকে দুর্বল করে। তাই এ আলোচনা কেবল আইনি বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি নির্বাহী ক্ষমতা ও সংসদের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে ও প্রশ্ন তুলতে পারে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও ধন্যবাদ প্রস্তাব
অধিবেশন শুরু হয় রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাধ্যমে। এ ভাষণে সাধারণত সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এতে দেশের অর্থনীতি, উন্নয়নে এবং রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয় থাকতে পারে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরে সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয়। এই প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হওয়ার রেওয়াজ। সরকারি ও বিরোধীদলের সদস্যরা তাদের মতামত দেন। বিরোধীদল সরকারের সমালোচনা করতে পারে। তারা সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। অন্যদিকে সরকারপক্ষ তাদের নীতি ও কাজের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে। এই বিতর্ক সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনা হয়ে উঠতে পারে।
ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম
বর্তমান সময়ে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারও সংসদের আলোচনার একটি বড় বিষয় হতে পারে। এ সরকার একটি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিল। সংসদ সদস্যরা সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং দুর্নীতি দমন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
সরকারের সমর্থকরা বলতে পারেন যে, তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। সমালোচকরা বলতে পারেন যে, সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত এখনো স্পষ্ট নয়। এই বিতর্ক দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জুলাই চার্টার নিয়ে বিতর্ক
জুলাই চার্টারও সংসদের আলোচনায় আসতে পারে। এটি মূলত রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের একটি প্রস্তাবিত কাঠামো। এই চার্টারের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সমর্থকরা মনে করেন, এটি ভবিষ্যতে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। তবে কিছু রাজনৈতিক দল প্রশ্ন তুলতে পারে। তারা বলতে পারে যে এত বড় সংস্কার করার আগে আরও ব্যাপক রাজনৈতিক ঐক্য দরকার। তাই সংসদে এই চার্টার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আওয়ামী লীগের শাসন নিয়ে আলোচনা
সংসদের আরেকটি বড় ইস্যু হতে পারে আগের সরকারের শাসন নিয়ে আলোচনা। অনেক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের শাসনকে কর্তৃত্ববাদী বলে সমালোচনা করে। তারা অভিযোগ করেন যে, ওই সময়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত ছিল এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে। সংসদে এসব অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিছু সদস্য তদন্ত বা জবাবদিহির দাবি তুলতে পারেন। তবে অন্যরা বলতে পারেন যে, অতীত নিয়ে বেশি বিতর্কে চেয়ে ভবিষ্যতের নীতি ও উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নতুন সম্ভাব্য বিষয়
এই বড় বিষয়গুলোর পাশাপাশি আরও কিছু ইস্যু সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল শাসন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কও আলোচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
১২ মার্চের সংসদ অধিবেশন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ১৩৩টি অধ্যাদেশ, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের কার্যক্রম, জুলাই চার্টার এবং আগের সরকারের শাসন নিয়ে আলোচনা সংসদের মূল এজেন্ডা হতে পারে।
এই অধিবেশন শুধু আইন প্রণয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে। সংসদে যদি গঠনমূলক আলোচনা হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।