তাকওয়া অর্জনের জন্য সিয়ামের বিধান


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৬

॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
বছর ঘুরে আবারও এসেছে সিয়াম-সাধনার এ মাস রমজান। পবিত্র কুরআনে যে আয়াতটির মাধ্যমে সিয়াম বা রোজা ফরজ হয়, সেটিতেই ইঙ্গিত রয়েছে যে পূর্ববর্তী প্রত্যেক নবী ও রাসূল আ.-এর উম্মতদের জন্য রোজা ফরজ ছিল। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর সিয়াম (রোজা) ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল- যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)। বছরের বিভিন্ন সময়ে রোজা রাখলেও শুধু রমজান মাসের রোজা পালন করা ফরজ। রোজা শুধু উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য ফরজ নয়, বরং তা অতীত নবী-রাসূলদের উম্মতদের জন্যও ফরজ ছিল। কিন্তু রোজার সময়, পদ্ধতি ও ধারা ভিন্ন ছিল। রোজা ফারসি শব্দ, অর্থ উপবাস থাকা। কুরআন-হাদিসে এটিকে সিয়াম বলে। রোজা শব্দটিই প্রচলিত। সাওম বা সিয়াম শব্দের অর্থ বিরত থাকা।
শরীয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া, পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকাকে সাওম বা সিয়াম বা রোজা বলে। হযরত আদম (আ.)-এর সময় আইয়্যামে বিজ বা প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখতে হতো। ‘আইয়্যামে বিজ’ অর্থ শুভ্রতার দিনসমূহ। হযরত আদম ও হাওয়া (আ.) জান্নাতে থাকাকালে নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলায় তাঁদের গায়ের রং কালো হয়ে যায়। তাই ফেরেশতারা তাঁদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং তাঁরাও তওবা করেন। ফলে তাঁদের গায়ের রং সাদা ও সুন্দর হয়। এরপর আল্লাহ হযরত আদম (আ.) ও তাঁর উম্মতকে প্রতি মাসে তিনটি করে রোজা রাখার নির্দেশ দেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মহানবী (সা.) আইয়্যামে বিজের সিয়াম পালন করতেন।’ (নাসাঈ)।
হযরত নূহ (আ.)-এর যুগেও রোজা পালন করা হতো। মহানবী (সা.) বলেন, ‘নূহ (আ.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ছাড়া গোটা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ)। মহানবী (সা.) আরো বলেন, ‘নূহ (আ.)-এর যুগ থেকে প্রতি মাসে তিনটি করে রোজা ছিল।’ (ইবনে কাসির)। হযরত মূসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য আশুরার রোজা ফরজ ছিল। মহানবী (সা.) মদিনায় আসার পর ইহুদিদের আশুরার রোজা পালন করতে দেখে এর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তারা বলল, ‘এটি এক শুভ দিন। এই দিনে আল্লাহ বনি ইসরাইলকে তাদের শত্রু থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। ফলে মূসা (আ.) আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ওইদিনে রোজা রাখেন।’ এ কথা শুনে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তাহলে আমি হযরত মূসা (আ.)-এর অনুসরণে তোমাদের তুলনায় বেশি হকদার।’ (বুখারি)।
এরপর মহানবী (সা.) আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবীদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন। এরপর রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা নফলে পরিণত হয়। দাউদ (আ.) বছরে ৬ মাস রোজা রাখতেন আর ৬ মাস রোজা রাখতেন না। মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হলো দাউদ (আ.)-এর রোজা। তিনি এক দিন রোজা রাখতেন এবং এক দিন বিনা রোজায় অতিবাহিত করতেন।’ হযরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের সময়েও রোজার প্রচলন ছিল। ঈসা (আ.)-এর যখন জন্ম হয়, তখন লোকজন তাঁর মা মরিয়মকে তাঁর জন্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি করুণাময়ের উদ্দেশে রোজা পালনের মানত করেছি। তাই আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না।’ (সূরা মারইয়াম : ২৬)।
ঈসা (আ.) জঙ্গলে ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। একবার ঈসা (আ.)-এর উম্মতরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমরা পাপ আত্মাকে কীভাবে বের করব?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘দোয়া ও রোজা ছাড়া তা অন্য কোনো উপায়ে বের হতে পারে না।’ জাহেলি যুগের লোকজন আশুরার রোজা পালন করত। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘অন্ধকার যুগের লোকজন আশুরার রোজা পালন করত। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মহানবী (সা.) নিজে আশুরার রোজা পালন করেছেন। এরপর যখন রমজানের রোজা ফরজ হয়, তখন মহানবী (সা.) বলেন, ‘আশুরা দিনে যে চায় সে ওইদিন রোজা রাখবে এবং যে চায় সে ওইদিন রোজা পরিহার করবে।’ (বুখারি)।
রমজানের সিয়াম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের পথপ্রদর্শক ও সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন এবং ন্যায় ও অন্যায়ের মীমাংসারূপে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল। অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে, সে যেন এ মাসে অবশ্যই রোজা রাখে। আর যে রোগী বা মুসাফির তাকে অন্য দিনে এ সংখ্যা পূরণ করতে হবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, তোমাদের কষ্ট দিতে চান না, যাতে তোমরা নির্ধারিত দিন পূর্ণ করতে পার ও তোমাদের সৎপথে পরিচালিত করার জন্য আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করতে পার, আর তোমরা কৃতজ্ঞ হলেও হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। আয়াতটি দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে অবতীর্ণ হয়। তারপর ফরজ সিয়ামের বিধান দেয়া হয়।
রমজান মাসে বেশ কিছুদিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) হেরা পর্বতের গুহায় আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন। দিনের বেলায় পানাহার করতেন না, আর রাতে আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন। তাঁর এ ইবাদত-বন্দেগি আল্লাহর কাছে এত পছন্দনীয় হয় যে, ওই ইবাদতে কাটানো দিনগুলো স্মরণীয় করে রাখতে রাসূল (সা.)-এর উম্মতদের ওপর রমজান মাসের রোজা ফরজ করে দেওয়া হয়। রোজা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পছন্দের ইবাদত ছিল। যখন রমজানের রোজা ফরজ হয়নি, তখনো তিনি আশুরার দিন রোজা রাখতেন এবং সাহাবীদের (রা.) রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন। পরে যখন রমজানের রোজা ফরজ করে দেওয়া হয়, তখন তিনি ও তাঁর সাহাবারা আশুরার রোজা রাখা ছেড়ে দেন।
এ প্রসঙ্গে সাহাবী হযরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিন রোজা পালন করেছেন এবং এ সিয়ামের জন্য আদেশও দিয়েছেন। পরে যখন রমজানের সিয়াম ফরজ হলো, তখন তা ছেড়ে দেওয়া হয়। (বুখারি)। আরেক হাদিসে বর্ণনা রয়েছে, হযরত মা আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জাহেলি যুগে কুরাইশগণ আশুরার দিন রোজা রাখত, রাসূলুল্লাহও (সা.) এ রোজা রাখার নির্দেশ দেন। অবশেষে রমজানের রোজা ফরজ করা হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যার ইচ্ছা আশুরার রোজা রাখবে এবং যার ইচ্ছা সে রোজা (আশুরার) রাখবে না। (বুখারি)।
তাই রমজান মাসের একদিন ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ রোজা না রাখলে মানুষ শুধু গুনাহগারই হয় না, ওই রোজার পরিবর্তে আজীবন রোজা রাখলেও রমজানের এক ফরজ রোজার যে মর্যাদা-কল্যাণ, যে অনন্ত রহমত-বরকত, তা কখনো লাভ করতে পারবে না এবং কোনোভাবেই এর যথার্থ ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি অসুস্থতা ও সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের একটি ফরজ রোজাও ভঙ্গ করে, সে আজীবন রোজা রাখলেও ওই রোজার হক আদায় হবে না। (সহীহ বুখারি, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা)। হযরত আলী (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমজান মাসের একটি রোজা ভঙ্গ করবে, সে আজীবন সেই রোজার (ক্ষতিপূরণ) আদায় করতে পারবে না। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা)।
মাহে রমজানের ফরজ রোজার মাস সংযম ও সহনশীলতার মাস। আমরা জানি, সংযম একটি শক্তি। সিয়াম-সাধনায় মুমিন বান্দা যে আত্মতৃপ্তি লাভ করে, চলার পথের পাথেয় অর্জন করে- সে শক্তিই হলো সংযম। সমগ্রজীবনেই সংযম এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। তাই সংযমের সাথে ফরজ রোজা পালন করলে মুত্তাকি হওয়া যায়। আর মুত্তাকিরাই সব ধরনের লোভ-লালসা, হারাম, পরনিন্দা ও মিথ্যা অপবাদ, অহংকার, মিথ্যা, স্বেচ্ছাচারী, শত্রুতা পোষণ, লোকদেখানো আমল করা, কৃপণতা, পরশ্রীকাতরতা থেকে সংযত থাকতে পারে। নিজেকে পাপাচারের জগৎ থেকে পৃথক রাখতে পারে। ফরজ ইবাদত রোজা পালনে এসব বদগুণ বর্জন করতে কী পরিমাণ ধৈর্য, সহনশীলতা আর সংযমের প্রয়োজন হয়, তা বলে শেষ করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ফরজ সিয়াম বা রোজা পালনে তাকওয়ার গুণ অর্জনের তাওফিক দিন। আমীন।
লেখক : সাংবাদিক।