পিলখানায় নৃশংসতার ১৭ বছর

ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও দোষীদের বিচার দাবি


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৯

স্টাফ রিপোর্টার : ১৭ বছর আগে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি) সদর দপ্তর ঢাকার পিলখানায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। সব মিলিয়ে তখন পিলখানায় নিহত হন ৭৪ জন। সেদিন পিলখানায় থাকা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও চরম নৃশংসতার শিকার হন। পিলখানায় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে পৃথক মামলা হয়। এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলায় ৮৫০ জনকে আসামি করা হয়। দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটিই সবচেয়ে বড় মামলা। বিচারিক আদালত ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর এ মামলার রায় দেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে খালাস পান ২৭৮ জন। রায় ঘোষণার আগে চার আসামি মারা যান। ফৌজদারি কোনো মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে কারো মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যেটি ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে পরিচিত। পিলখানা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। রায়ে ১৩৯ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় ২২৮ জনকে। খালাস পান ২৮৩ জন। হাইকোর্টের রায়ের আগে ১৫ জনসহ সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৬১ জন আসামি মারা গেছেন। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হত্যা মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ২২৬ আসামির পক্ষে পৃথক ৭৩টি আপিল ও লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করা হয়েছে। অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে যারা খালাস পেয়েছেন এবং যাদের সাজা কমেছে, এমন ৮৩ জন আসামির বিষয়ে ২০টি লিভ টু আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব আপিল ও লিভ টু আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ শুনানি হবে আপিল বিভাগে। হাইকোর্টের রায় প্রকাশ হওয়ার পর ২০২০ সালে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক লিভ টু আপিল করে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ ২০২১ ও ২০২২ সালে পৃথক আপিল ও লিভ টু আপিল করে। আসামিপক্ষের আপিল ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে ওঠে। সেদিন চেম্বার আদালত বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। এরপর ২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে ওই আপিল। এরই ধারাবাহিকতায় ওই আপিল ২৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ৬৬৯ নম্বর ক্রমিকে ছিল। সিরিয়াল অনুযায়ী শুনানি হবে। এরপর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
জাতীয় শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর বনানীর সামরিক কবরস্থানে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয়ভাবে শ্রদ্ধা জানান। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শ্রদ্ধা জানান। পরে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান শ্রদ্ধা জানান। সেখানে তাঁরা শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের জন্য দোয়া ও মোনাজাত করেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এরপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নতুন করে কোনো তদন্ত কমিশন হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, সেজন্য যথাযথ বিচার করা হবে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ সেনা দিবস’ উপলক্ষে বনানীতে সামরিক কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গণমাধ্যমকে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
এদিকে ২০০৯ সালে পিলখানায় সেনাহত্যার ‘প্রকৃত রহস্য’ উদ্ঘাটন করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার এক বিবৃতি প্রদান করেছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সমঝোতার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় পরিকল্পিতভাবে ৫৭ চৌকস সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করে। আমরা নিহতদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ও তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। সেই সাথে তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, জনগণ ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সেনা হত্যার নির্মম ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে চায়। আমরা বর্তমান সরকারের নিকট দেশপ্রেমিক সকল সেনা হত্যার ‘প্রকৃত রহস্য’ উদ্ঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর) বলেছেন, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে যে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর অন্যতম। একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীতে এতজন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু বিরল ঘটনা। গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন তিনি।