আল্লাহর অনুকম্পা অনুসন্ধান করতে হবে রমাদানে


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৯

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
ইবাদত-বন্দেগীর বসন্তকাল বরকতময় পবিত্র মাহে রমাদান আমাদের মাঝে সমুস্থিত। খোশ আমদেদ মাহে রমাদান। শুধু তাঁর ইবাদতের জন্য মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মানব ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা আয-যারিয়াতের ৫৬নং আয়াতে ঘোষণা করেন, “আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” এ আয়াত থেকে বোঝা যায় মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তার ইবাদতের জন্য অন্য কোনো কাজের জন্য নয়। কিন্তু পবিত্র মহাগ্রন্থ কুরআন মাজীদের সূরা জুমআরের ১০নং আয়াতে ঘোষণা করেন, ‘যখন তোমাদের সালাত শেষ হয়, তখন তোমরা দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর সম্ভবত তোমরাই সফলকাম হবে।’ এ আয়াত দ্বারা বোঝা যাচ্ছে শুধু সালাত আদায় করলেই চলবে না সফল হতে দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড়তে হবে এবং আল্লাহর অনুকম্পার অনুসন্ধান করতে হবে তবে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালাকে ভুলে গিয়ে নয়, বরং তাঁকে অধিক পরিমাণে স্মরণে রেখে অর্থাৎ আল্লাহর প্রদত্ত সংবিধান অনুযায়ী কোনোভাবেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সংবিধানের বাইরে যাওয়া যাবে না।
সফলতা কীভাবে পাওয়া যাবে, তা এই আয়াতে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলে না দিলেও বিজ্ঞানময় কুরআনের সূরা আশ-শামসের ৯নং আয়াতের মধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সেই সফলকাম হয়েছে যে পরিশুদ্ধতা অর্জন করেছে।’ অন্যদিকে আমাদের বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দুনিয়ার কাজে এমনভাবে মশগুল হওÑ যেন তুমি সারা জীবন বেঁচে থাকবে এবং আখিরাতের কাজে এমনভাবে মশগুল হওÑ যেন আগামীকালই তোমার মৃত্যু হবে।’ এ কথাটি বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায় দুনিয়ার কাজ এমনভাবে গুরুত্বসহকারে করতে হবে যেন সারা জীবন বেঁচে থাকলেও অভাব হবে না আর আখিরাতের কাজ এমনভাবে গুরুত্বসহকারে করতে হবে যেন আগামীকাল মৃত্যু হলেও পরকালীন মুক্তি পাওয়া যায়।
উপরিউক্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হলো দুনিয়ার এবং আখিরাতের উভয় কাজই আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং উভয় কাজই মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার সংবিধান অনুযায়ী করতে হবে, তাহলেই সেটি আমাদের ইবাদত হিসেবে কবুল হবে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দরবারে। কেননা মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের শুধু তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন।
এভাবে ইবাদতের মাধ্যমেই আমরা ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তি পেতে পারি। সিয়াম এমনই একটি কর্মসূচি তথা ইবাদত, যেটি যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে আমরা উভয় জীবনের মুক্তি আশা করতে পারি। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সূরা বাকারার ১৮৩নং আয়াত দ্বারা আমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন যেমন তিনি ঘোষণা করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।’
এ আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা জানিয়ে দিলেন ঈমানদারদের সম্বোধন করে যে আমাদের ওপর যেমন রোজা ফরজ করা হয়েছে, তেমনি আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও রোজা ফরজ করা হয়েছিল, যেন আমরা মুত্তাকী হতে পারি। তাহলে আমরা বুঝতে পারি মুত্তাকী হওয়ার অন্যতম একটি পন্থা হলো সিয়াম সাধনা করা। সিয়াম সাধনা যারা করেন এবং মুত্তাকী হন তাদের মর্যাদা মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নিকট যেমন বৃদ্ধি পায়, সমাজেও তেমনি বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং সিয়ামের যেমন রয়েছে পরকালীন গুরুত্ব তেমন রয়েছে ইহকালীন গুরুত্ব। ইহকালীন গুরুত্বের মধ্যে সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। সিয়াম সমাজ থেকে ক্ষুধা, দরিদ্রতা, অভাব ইত্যাদি দূর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেমন মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সূরা বাকারার ১৮৪নং আয়াতে ঘোষণা করেন, “(সিয়াম) নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য তোমাদের মধ্যে যদি কেউ অসুস্থ বা সফরে থাকে, তবে অন্য সময়ও এ সংখ্যা পূরণ করে নিতে পারে। আর যার পক্ষে সিয়াম পালন করা কষ্টকর সে একজন মিসকিনকে খাদ্য দান করবে। তবে যদি কেউ স্বেচ্ছায় ভালো কাজ করে, তবে তা তার জন্য হবে অধিক কল্যাণকর এবং যদি তোমরা সিয়াম পালন করতে পার, সেটি তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর যদি তোমরা তা উপলব্ধি করতে পার।”
আয়াতের হুকুম হলো সিয়াম একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঐ নির্দিষ্ট সময়ে যদি কেউ অসুস্থ বা সফরে থাকে, তাহলে সে অন্য সময় সে সংখ্যাটি পূরণ করবে আর যার পক্ষে সিয়াম পালন করা কষ্টকর সে যেন মিসকিনকে খাদ্য প্রদান করে আবার কেউ যদি সিয়াম পালন করে এবং মিসকিনকে খাদ্য প্রদান করার মতো পুণ্যের কাজ করে, সেটি অধিক কল্যাণকর। তবে সিয়াম সাধনা করতে পারলে সেটি আরো কল্যাণকর যদি আমরা উপলব্ধি করতে পারি।
এই আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সিয়ামের বিকল্প বা অধিক পুণ্যের কাজ হিসেবে মিসকিনকে খাদ্য প্রদানে উৎসাহিত করেছেন। যেটা নিঃসন্দেহে সমাজ থেকে ক্ষুধা, দরিদ্রতা, অভাব দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে গরিব-মিসকিনরা অভাবের কারণে যে ক্ষুধার কষ্ট পায় এ পবিত্র সিয়াম সাধনার মাধ্যমে ধনীরাও ক্ষুধার যে কষ্ট সেটি অনুভব করার সুযোগ পায় ফলে সমাজের ধনীরা গরিব-মিসকিনদের বেশি বেশি দান করতে উৎসাহী হয় এবং সিয়াম সমাজ থেকে অভাব, দরিদ্রতা দূরীভূত করে সমাজের গরিব-মিসকিনদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে সমাজে অর্থনৈতিকভাবে সমতা আনয়ন করে।
অন্যদিকে সমাজ থেকে ক্ষুধা-দরিদ্রতা দূরীকরণ এবং সমাজে অর্থনৈতিক সমতা নিরূপণের জন্য দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর এবং ঈদুল ফিতরের পূর্বে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা ফিতরা প্রদানে উৎসাহ করেছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আ’লার ১৪নং আয়াতের মধ্যে মহান আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সেই সফলকাম হয়েছে যে পরিশুদ্ধতা অর্জন করেছে।’
এখানে সিয়াম সাধনা শেষে গরিব-মিসকিনদের ফিতরা প্রদানকে ইঙ্গিত করেছেন। রমাদানের গুরুত্ব তুলে ধরে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৮৫নং আয়াতে ঘোষণা করেনÑ ‘রমজান হলো এমন একটি মাস যে মাসে নাজিল করা হয়েছে মহাগ্রন্থ আল্-কুরআন যাতে রয়েছে মানুষের জীবন বিধান এবং মানুষের সৎপথে চলার জন্য সুস্পষ্ট নিদর্শন যেটি সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এ মাসটি পাবে সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে এবং যে অসুস্থ বা সফরে থাকে সে যেন অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তোমাদের কাজকে সহজ করতে চান তিনি তোমাদের কষ্ট দিতে চান না। আল্লাহ চান তোমরা যেন রোজা পূরণ করতে পার এবং তোমাদের সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য আল্লাহর মাহাত্ম্য ঘোষণা করতে পার। সম্ভবত তোমরা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।’
অন্যদিকে হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, ‘সিয়াম ঢালস্বরূপ। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মতো কাজ করবে না। যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায় তবে সে যেন দুবার বলে যে আমি সিয়াম পালন করছি। ঐ সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ, নিশ্চয় সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধির থেকেও উৎকৃষ্ট সে আমার জন্য আহার, পান ও কামাচার পরিত্যাগ করে সিয়াম আমারই জন্য তাই এর প্রতিদান আমি নিজেই প্রদান করব। আর প্রত্যেক নেক কাজের বিনিময় দশগুণ।’ (হাদিস নং-১৮৯৪)।
এ হাদিস দ্বারা রাসূল সা. সিয়াম পালনকারীকে অশ্লীলতা, মূর্খতা, গালিগালাজ, ঝগড়া বিবাদ ইত্যাদি করতে নিষেধ করেছেন, যেটি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আবার অন্য কেউ যদি সিয়াম পালনকারীর সাথে বিবাদ করতে চায় ঐ সিয়াম পালনকারী যেন নিজেকে দুবার সিয়াম পালনকারী হিসেবে পরিচয় দেয়। সুতরাং সিয়াম সমাজ থেকে বিশৃঙ্খলা দূরীকরণেও অনন্য ভূমিকা পালন করে।
হজরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত ১৮৯৮নং হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন ‘যখন রমাদান আসে তখন জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়’ আর উক্ত সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত ১৮৯৯নং হাদিসে রাসূল সা. বলেন ‘রমাদান আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শয়তানগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’
এ হাদিস দুটি দ্বারাও রমাদানের যে সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম তা ফুটে ওঠে। এদিকে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা পবিত্র কুরআনের সূরা কদরে ঘোষণা করেছেন
১. নিশ্চয় আমি কুরআনকে নাজিল করেছি মহিমান্বিত রজনীতে।
২. আপনি কি জানেন মহিমান্বিত রজনী কি?
৩. মহিমান্বিত রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
৪. সেই রাতে ফেরেস্তাকুল এবং জিবরাইল আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি কাজের জন্য অবতীর্ণ হন।
৫. ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত সেই রজনি শান্তিময় থাকে। রমাদান মাসে হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ লাইলাতুল কদর এবং মানবজাতীর জীবনবিধান আল্-কুরআন নাজীল করে রমাদান মাসের আধ্যাত্মিক মর্যাদার সাথে সামাজিক মর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি করেছেন মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা।
অন্যদিকে মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা দাম্পত্য থেকে পারিবারিক তথা সামাজিক সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা হিসেবে সিয়াম পালনের কথা বলেছেন। যেমন যিহার একটি দাম্পত্য বিষয়ক সমস্যা হলেও সেটি পারিবারিক থেকে সামাজিক সমস্যা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তাই এ বিষয়ে মহান আল্লাহ সূরা মুুজাদালাহ্ এর ৩ এবং ৪নং আয়াতে বলেন,
(৩) যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে যিহার মোয়ের সাথে তুলনা করে অতঃপর তারা তাদের কথা ফিরিয়ে নেয় তারা যেন একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্তি দেয় এ আদেশ তোমাদের জন্য তোমরা যা কর আল্লাহ তার খবর রাখেন।
(৪) কিন্তু যার এ সমর্থ নেই সে যেন একাধারে দুই মাস রোযা রাখে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে প্রায়শ্চিত্তরূপে যে সেটিও পারবে না, সে যেন ৬০ জন মিসকিন খাওয়ায় এটি এজন্য তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা.-এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন কর। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত শাস্তি এবং কাফিরদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি’।
এদিকে রমাদান মাসে শ্রমিকদের কাজ সহজ করার বিষয়ে রাসূল সা. ঘোষণা করেছেন, “যে ব্যক্তি রমাদান মাসে তার শ্রমিকদের কাজ সহজ করে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার হিসাবকে সহজ করে দেবেন”। (বুখারী শরীফ)।
শতকরা ৯৫ ভাগ মুসলিমদের দেশে রমজান সামনে রেখে এ দেশের অসাধু লোকজন যে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় সেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়, যদিও এটি ইসলামি রাষ্ট্র নয়।
রমাদান সামাজিক শিক্ষাসহ অন্যান্য যে শিক্ষা আছে তা আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়সহ সকল ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তায়ালা বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
alhelaljudu@gmail.com