১৭ বছরে শিক্ষায় ধস : মান বাড়েনি
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৩
নেই কোনো ভিশন
প্রাথমিকেই ঝরে পড়ছে শিশুরা
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নেই গবেষণা
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বিগত ১৭ বছরে দফায় দফায় বাজেট বাড়ানো হলেও বাড়েনি শিক্ষার মান। বিপুল বাজেট বরাদ্দে দুর্নীতি অনিয়ম আর দলীয়করণের ফলে জবাবদিহিহীন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। দিন দিন বিশ্ব র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক মান তো দূরের কথা, দেশের চাকরির বাজারের উপযোগী করেও শিক্ষার্থীরা গড়ে উঠতে পারছে না।
শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ, মেরামত ও আসবাবপত্র ক্রয়েই ব্যয় হয়। তারপরও বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নেই কার্যকর শিক্ষাকার্যক্রম। দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর মাঝে অন্যতম হলো শিক্ষা সেক্টর। ব্যাপক দলীয়করণ আর দুর্নীতির কারণে শিক্ষা সেক্টরটি দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। আর শিক্ষক কর্মচারীরা ব্যস্ত নিজেদের আখের গোছাতে। ফলে যা হবার তাই- শিক্ষার মান বাড়ছে না, বেড়েছে নানা বাহারি খরচের বাহানা।
শিক্ষায় দশ বছরে তিনগুণ বরাদ্দ বৃদ্ধি
গত ১০ বছরে শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রায় ৩.৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই বরাদ্দের সিংহভাগই যায় অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও বেতন-ভাতায়। শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন, গবেষণা ও কারিকুলাম সংস্কারে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম। বাজেটের হিসেবে দেখা যায় ২০১৩-১৪ সালে বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ১০.৬ শতাংশ। যার পরিমাণ ছিল তেইশ হাজার ছয়শ’ কোটি টাকা। এভাবে প্রতি বছর বাড়তে বাড়তে বাড়তে ২০২২-২৩ সালে শিক্ষায় বরাদ্দ দেয়া হয় ৮১ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বাজেট বরাদ্দের ১২ শতাংশ। এতকিছুর পরও বাড়েনি শিক্ষার মান। তবে এসকল বরাদ্দের বেশিরভাগই অবকাঠামো খাতে। গবেষণা কিংবা মান উন্নয়নে এগোয়নি তেমন।
সৃজনশীল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে
দেশে আওয়ামী লীগের বিগত ১৭ বছর ধরে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়। এ বিষয়ে শিক্ষা বাজেটের বিরাট অংশ ব্যয় করা হয়। করা হয় নানা গবেষণা এবং আলোচনা। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় সৃজনশীল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানিতে। ফলে দেশে যত বেকার, এর ১৩ শতাংশই স্নাতক।
দেশে ২০০৯ সালে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়েছিল। যদিও ২০২৩ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়, তবে এক বছরের ব্যবধানে তা বাতিল হয়ে যায়। সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল এই ধারণা নিয়ে যে, আমাদের শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে অনেক বেশি সৃজনশীল হবে। কিন্তু ২০২২ সালের বৈশ্বিক সৃজনশীল ইনডেক্সে ১৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২৯তম অবস্থানে রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূচকেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। ২০২২ সালে ইউএনডিপি এবং মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০তম। জাতিসংঘের সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের প্রকাশিত ২০২১ সালের বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৬ নম্বরে। উদ্ভাবন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে আছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ২০২২ সালে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, শিক্ষার গুণগতমান কমে যাওয়া দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন না করা, শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতাসহ নানা কারণে শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। তাঁরা সতর্ক করেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘শিক্ষার মানের দিক দিয়ে আমরা খুব একটা এগোতে পারছি না। আমাদের ছেলেমেয়েরা বুদ্ধিমান। এতদিন আমাদের শিক্ষক নিয়োগের মান ভালো ছিল না। ফান্ডের সংকটে গবেষণা পিছিয়ে আছে। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের যে বেতন দেওয়া হয়, তা খুবই কম। ফলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছে না। তাই শিক্ষার মান বাড়াতে এই খাতের বাজেটও অনেক বাড়ানো উচিত।’
ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মোট বিশ্ববিদ্যালয় ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি আর বেসরকারি ১১৬টি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রকাশিত ২০২৫ সালের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং অনুযায়ী, বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই স্থান পায়নি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৫’-এ সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলেও শিক্ষার মানের একটা চিত্র বেরিয়ে আসে। ওই শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান ইউনিটে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৯৪ শতাংশ অকৃতকার্য। কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটেও ৯০ শতাংশের বেশি ভর্তিচ্ছু ফেল করে। এই দুই ইউনিটের পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া এক লাখ ২১ হাজার শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একজন স্নাতকের সনদকে সিঙ্গাপুরে ফাউন্ডেশন কোর্সের সমমান ধরা হয়েছে। অথচ গুণে-মানে দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাবির ওই স্নাতক দেশটির একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। পেশাজীবীদের এমপ্লয়মেন্ট পাসের জন্য সিঙ্গাপুরে ৪০ নম্বর নির্ধারিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ নম্বর রয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতায়। ওই স্নাতকের এমপ্লয়মেন্ট পাস নবায়নের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাজ্যের মান অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি স্নাতক সমমানের। আর বিশ্ববিদ্যালয়টির স্নাতক ডিগ্রি ফাউন্ডেশন কোর্সের সমমানের। এ কারণে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তিনি কোনো নম্বর পাননি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত স্নাতক সনদকে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষ ‘ডিপ্লোমা’ হিসেবে গণ্য করছে। অনেক দেশেই এখন বাংলাদেশের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিকে স্নাতক মানের ধরা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার মান নিম্নমুখী কি না, সেটা জানার জন্যও গবেষণার দরকার। তবে গ্লোবালি শিক্ষাব্যবস্থা খুব বেশি ট্রান্সফর্ম হচ্ছে। এতে অন্য দেশের নীতিনির্ধারকরা যে পদক্ষেপগুলো নিতে পারছেন, আমাদের দেশে তা পারছেন না। এডুকেশন নিয়ে আমাদের কোনো ভিশন নেই, পলিসিরও ঠিক নেই। কারিকুলামও না বুঝে-শুনে পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে আমরা একবার সামনে যাই, আবার পেছনে যাই।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজের জন্য বাজেট বরাদ্দ খুবই কম। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে গবেষণা খাতে বিনিয়োগ নগণ্য, ফলে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষকদের অর্থ বরাদ্দ দেয়া হলেও তাতে ভালো কোনো গবেষণাপত্র উঠে আসেনি। এর বড় কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মধ্যে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির প্রবণতা একেবারেই কমে গেছে।
প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা ভয়াবহ
দেশের বিগত সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে শিক্ষার গুণগতমানের উন্নতি হচ্ছে না। বরং দেখা গেছে শেখার ন্যূনতম দক্ষতায় ভয়াবহ ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ শিশু মৌলিক শিক্ষা ও গণিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে প্রাথমিক স্তরেই পিছিয়ে পড়ছে পড়াশোনায়, নড়বড়ে হচ্ছে ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। যে কারণে পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে দারিদ্র্যপীড়িত ও গ্রামীণ এলাকার শিশুরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়ছে, যা বাড়াচ্ছে সামাজিক বৈষম্য।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এক জরিপ প্রকাশ করে। এ জরিপের তথ্য বলছে, শিক্ষার বিস্তৃতি বাড়লেও মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, ফলে প্রাথমিক স্তরেই শিশুদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
জরিপ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে আটজনই প্রাথমিক বিদ্যালয় ভর্তি হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ৮০ শতাংশ এবং প্রাথমিকে তা ৮৪ শতাংশ হলেও প্রাথমিক স্তর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিত্র বদলে যায়। প্রাথমিকের ৮৪ শতাংশ থেকে নিম্নমাধ্যমিক স্তরে উপস্থিতির হার নেমে আসে ৬০ শতাংশে এবং উচ্চমাধ্যমিকে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৫১ শতাংশে। নীতিগতভাবে প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকার থাকলেও শেখার মান নিশ্চিত না হওয়ায় পরবর্তী ধাপে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তথ্যানুযায়ী, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিশুদের মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশের প্রাথমিক পাঠ দক্ষতা রয়েছে, বাকি ৭৬ শতাংশ পড়তে পারে না। একটি ছোটগল্পের ৯০ শতাংশ শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে মাত্র ৩৯ শতাংশ শিশু, অর্থাৎ ৬১ শতাংশ শিশু সেটা পারে না। মৌলিক বোঝাপড়ার তিনটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারে মাত্র ৩২ শতাংশ, আর অনুমানভিত্তিক প্রশ্নে সফল মাত্র ৩০ শতাংশ। সেই হিসেবে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশু শ্রেণি অনুযায়ী প্রত্যাশিত পড়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।
পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের গণিতে দক্ষতার মান তলানিতে নেমেছে। মৌলিক গণিতে শিশুদের দক্ষতা আরও কম। তারা সংখ্যার সঙ্গে পরিচিত হতে এবং সহজ যোগ-বিয়োগও করতে পারছে না। জরিপের তথ্য বলছে, পাঠের তুলনায় সংখ্যাজ্ঞানের চিত্র আরও উদ্বেগজনক।
এ প্রসঙ্গে এনসিটিবি সদস্য (কারিকুলাম) মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বলেন, ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) প্রস্তাব অনুযায়ী প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার মান বাড়াতে নতুন করে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুই স্তরে মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিসও মূল্যায়নের আওতায় আনা হবে।
কোয়ালিটি শিক্ষক বাড়ছে না
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ইরফান আজিজ বলেন, ‘আমরা কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করতে পারছি না, এ ব্যাপারে আমি একমত। আমাদের শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসছে, কিন্তু তাদের পাঠমুখী করতে পারছি না। তারা লাইব্রেরিতে যাচ্ছে না। শিক্ষকরা কতটা প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে আসছেন, কতটা আন্তরিকতা নিয়ে পড়াচ্ছেন, সেটাও ভাবনার বিষয়। আসলে যারা এখন শিক্ষক, তাদের বেশিরভাগই শিক্ষক হতে চাননি। ফলে তারা দায়সারা অবস্থায় পাঠদান করাচ্ছেন। উৎকৃষ্ট কারিগর না হলে তো উৎকৃষ্ট শিক্ষা হবে না। এজন্য শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে মেধাবীদের এ পেশায় আনতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তাদের জাতির কারিগর হিসেবে মোটিভেট করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকদের সম্মানি খুবই হতাশাজনক।
মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব ও পেশাগত দুর্বলতার চিত্র দেশজুড়ে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব প্রকট। অনেক শিক্ষক প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই চাকরিতে নিয়োগ পান। এছাড়া শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও পদোন্নতির ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়, যা তাদের মোটিভেশন কমিয়ে দেয়। শিক্ষকদের শিক্ষকতার পাশাপাশি জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা খণ্ডকালীন বিভিন্ন কাজে যুক্ত হতেও দেখা যায়। অবসর সময়ে একজন শিক্ষকের তার পাঠ্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন ছোট-খাটো গবেষণা মনোযোগী না হয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য ছুটতে দেখা যায়।
একসময় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মেডিকেল শিক্ষায় বাংলাদেশের সুনাম থাকলেও তা আর ধরে রাখতে পারছে না বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন (ডব্লিউএফএমই) বিশ্বের মেডিকেল শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সংস্থাটির অনুমোদন পায়নি। এতে বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের এমবিবিএস ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে এর প্রভাব পড়েছে বিদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলাদেশে এমবিবিএস ভর্তির ক্ষেত্রে। আগে আমাদের পার্শ্ববর্তী নেপাল, ভুটান ও ভারতের কাশ্মীর থেকে অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে এমবিবিএস পড়তে এলেও এখন তেমন আসছেন বিগত বছরগুলোয় মান পড়ে যাওয়ায়।
বেকার ৫ জনের একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের করুণ চিত্র উঠে আসে, যা বাংলাদেশের শিক্ষার মানেরই বহিঃপ্রকাশ। জরিপ অনুসারে, দেশে যত বেকার আছেন, তাদের মধ্যে সাড়ে ১৩ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী। ৭.১৩ শতাংশ বেকার উচ্চমাধ্যমিক পাস। অর্থাৎ প্রতি পাচজন বেকারের একজন ব্যক্তি স্নাতক ডিগ্রিধারী বা উচ্চমাধ্যমিক সনদধারী।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ বেশ কয়েকটি দেশের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশগুলো তাদের বর্তমান শিক্ষাক্রমে জোর দিচ্ছে বাণিজ্য (অর্থনীতি), বিজ্ঞান (জীববিজ্ঞান), কারিগরি শিক্ষা উন্নয়ন (টিইডি), কৃষি ও বাস্তব দক্ষতা উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোয়। আর প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে দেশগুলো নজর দিয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানোর ওপর। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ধরা হয় ফিনল্যান্ডের বর্তমান ব্যবস্থাকে। বছরে দেশটির একজন অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে অন্তত ৭৪ বার পরীক্ষা বা মূল্যায়ন করা হয়। যদিও সেই মূল্যায়ন আমাদের দেশের গতানুগতিক পরীক্ষা নয়। কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুতেই নজর নেই আমাদের নীতিনির্ধারকদের।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত এবং আরো যুগোপযোগী করা প্রয়োজন, তবে ভবিষ্যতে জাতীয় শিক্ষার উদ্দেশ্য কী হবে, সেটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে এটি হতে হবে।