ইসলামের দৃষ্টিতে নবজাতক শিশুর গঠন পদ্ধতি


১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২৪

জহুরুল ইসলাম মুজাহিদ
মানুষ পৃথিবীতে আসে সবচেয়ে অসহায় অবস্থায়। বাবা-মায়ের সেবা-যত্ন ছাড়া তাদের শারীরিক ও মানসিক গঠন অসম্ভব। আধুনিক বিজ্ঞান এবং ইসলামের দৃষ্টিতে এ গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয় মায়ের গর্ভ থেকেই। তাই একটি সুন্দর সুস্থ ও দীনদার সন্তান গঠন করতে বিয়ের আগে থেকেই প্রস্ততি নিতে হয়।
প্রাক-জন্ম প্রস্তুতি : সঠিক ভিত্তি রচনা
১. নেক পাত্রী নির্বাচন (বিয়ের পূর্বস্তর)
কুরআন ও হাদিসে শিক্ষা রয়েছে, দীনদার পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে একটা নেক পরিবার গড়ে ওঠে।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, “নারীকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয় তার সম্পদ, বংশ, সৌন্দর্য এবং দীন। দীনদার নারীকে বেছে নাও, নচেত তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সহীহ বুখারী)।
সন্তানের চরিত্র গঠনে মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নেককার মা না হলে সন্তান সঠিক দীনি শিক্ষা পাবে না।
২. দোয়া ও নিয়ত : অনাগত সন্তানকে শয়তানের প্রভাব থেকে রক্ষা করতে তাই সন্তান জন্মের প্রথম প্রক্রিয়া শুরু করতে হয় এ দোয়ার মাধ্যমে, ‘বিসমিল্লাহি, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইত্বান, ওয়া জান্নিবিশ শাইত্বানা মা রাযাকতানা।’ (সহীহ বুখারী)।
এটি শুধুমাত্র একটি দোয়া নয়, বরং সন্তান জন্মদানের পূর্বেই তার আত্মিক সুরক্ষার সূচনা।
২. জন্মের পর প্রাথমিক পরিচর্যা ও সুরক্ষা
১. আজান ও ইকামত দেওয়া
নবজাতকের ডানে আজান ও বামে ইকামত :
‘যার সন্তান জন্ম নেয়, তার কানে ডান পাশে আজান ও বাম পাশে ইকামত দেওয়া সুন্নত।’ (আবু দাউদ)।
এতে করে প্রথম যে শব্দ শিশুর কানে পৌঁছে, তা আল্লাহর নাম, তাওহীদ ও সালাতের আহ্বান।
২. তাহনিক করা
নবজাতকের মুখে খেজুর চিবিয়ে দেওয়া।
রাসূল সা. নিজ হাতে সাহাবীদের নবজাতকদের তাহনিক করতেন। (সহীহ বুখারী)।
এতে নবজাতক পুষ্টি ও বারাকাহ লাভ করে এবং রাসূলুল্লাহ সা.-কে অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত আশা করা হয়।
৩. নাম রাখা
ভালো অর্থবিশিষ্ট, ইসলামসম্মত নাম রাখা, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের ভালো নাম দাও। কেননা কিয়ামতের দিনে তাদের নাম ও পিতার নামে ডাকা হবে।’ (আবু দাউদ)।
নাম শিশুর আত্মপরিচয়ের অংশ, যা তার ওপর নৈতিক ও মানসিক প্রভাব ফেলে।
৪. আকিকা দেওয়া
কন্যার জন্য ১টি, পুত্রের জন্য ২টি পশু কুরবানি, ‘প্রত্যেক সন্তানই আকিকার বিনিময়ে বন্ধক হয়ে থাকে।’ (তিরমিযী)।
আকিকা শুধু কুরবানি নয়, বরং সন্তানের জন্য একটি আত্মিক সুরক্ষা ও পরিবারিক দায়িত্ববোধের প্রতীক।
৫. চুল কাটা ও সদকা
শিশুর মাথার চুল ফেলে ওজন করে তা সমমূল্যের রুপা সদকা দেওয়া।
রাসূল সা. ফাতিমা রা.-এর সন্তানদের জন্য এ কাজ করতেন। (তিরমিযী)
৩. শিশুর ধর্মীয়, নৈতিক ও মানসিক গঠন
১. দীনি পরিবেশে লালন-পালন
পরিবারে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, কুরআন শিক্ষাÑ এগুলো শিশুর অন্তরে দীনের ভিত্তি স্থাপন করে।
শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মায়ের আমল শিশুর জন্য বাস্তব পাঠ্যবই।
২. হালাল খাদ্য ও হালাল উপার্জন
রাসূল সা. বলেন, ‘যে গোশত হারাম দিয়ে বেড়ে ওঠে, জান্নাত তার জন্য হারাম।’ (সহীহ মুসলিম)।
হালাল উপার্জনে খাদ্য গ্রহণ করলে শিশুর অন্তর নরম, আল্লাহভীরু হয়।
৩. মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ
ধাপে ধাপে দীনের শিক্ষা দিতে হবে, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের ৭ বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।’ (আবু দাউদ)।
শিশু ৭ বছর থেকে আমল শুরু করে এবং ১০ বছর বয়সে শক্তভাবে গঠিত হয়।
৪. আখলাক (চরিত্র) গঠন
রাসূল সা. এর অন্যতম মিশন ছিল, ‘আমি উত্তম চরিত্র পরিপূর্ণ করতে প্রেরিত হয়েছি।’ (মুসনাদে আহমদ)।
মূল গুণাবলি যা শিশুদের শেখাতে হবে :
ক. সত্যবাদিতা
খ. ধৈর্য
গ. শ্রদ্ধাবোধ
ঘ. দয়া
ঙ. দায়িত্বশীলতা
৪. সন্তান গঠনে পিতা-মাতার ভূমিকা
১. পিতা-মাতা আদর্শ হোক
শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে।
নামাজ, কুরআন, দোয়া এগুলো আগে বাবা-মাকে করতে দেখুক।
২. দোয়া করা
সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করা।
কুরআনের দোয়া
‘রব্বি হাবলি মিন আস-সালিহীন’ (হে আমার প্রতিপালক! আমাকে নেক সন্তান দান করো)। (সূরা আস-সাফফাত)।
৫. সারসংক্ষেপ : তিনস্তম্ভে গঠন
স্তম্ভ ব্যাখ্যা
আকিদা
আল্লাহ, রাসূল, আখিরাতের প্রতি ঈমান
ইবাদত নামাজ, রোজা, কুরআন শিক্ষা, দোয়া
আখলাক উত্তম চরিত্র, সমাজে সদাচরণ এবং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছন্দে ছন্দে শিশুর মন মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া।
ইসলামে নবজাতক শিশু গঠন একটি পরিকল্পিত ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার সূচনা হয় বিয়ের মাধ্যমে এবং তা চলে সন্তানের পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব গঠনের মাধ্যমে। ইসলাম একটি এমন সমাজ চায়, যেখানে প্রতিটি সন্তান হয় আল্লাহভীরু, সদাচরণকারী, সমাজে কল্যাণকর এবং আখিরাতের মুক্তির পথে পরিচালিত।
সন্তান গঠন একটি আমানতের প্রতিদান শুধু দুনিয়ায় নয়, আখিরাতেও।
একজন ভালো সন্তান, পিতা-মাতার জন্য সদকায়ে জারিয়া। প্রতিটি বাবা-মাকে অবশ্যই ইসলামের যথার্থ জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
লেখক : সহ-সভাপতি, দোকান কর্মচারী ইউনিয়ন, ঢাকা মহানগরী উত্তর।