নির্বাচনী মাঠে নারী : প্রচার, ভোটদান ও নিরাপত্তা
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২২
॥ কাজী তাবাসসুম ॥
জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক মাঠ ততই সরগরম হয়ে উঠছে। পোস্টার, মিছিল, সভা আর স্লোগানে মুখর দেশ। কিন্তু এ নির্বাচনী উত্তাপের ভেতর এক ভিন্ন বাস্তবতা নীরবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে- নির্বাচনী প্রচার ও ভোট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে গিয়ে নারীরা ক্রমেই সহিংসতা এবং ভয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিভিন্ন আসনে নির্বাচনী প্রচারে নারীদের সক্রিয় উপস্থিতি এখন আর নতুন কিছু নয়। প্রার্থী হিসেবে, দলীয় কর্মী হিসেবে কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থক হিসেবে নারীরা মাঠে নামছেন। দুঃখজনকভাবে এ অংশগ্রহণই অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোথাও পোস্টার লাগাতে গিয়ে বাধা, কোথাও মিছিলে হামলা, কোথাও কটূক্তি, হুমকি বা শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনা- এসব এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়।
নির্বাচনী প্রচারে নারীদের ওপর সহিংসতা কেবল শারীরিক আক্রমণেই সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক হয়রানি, সামাজিক অপমান এবং অনলাইন হুমকিও এর অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী প্রার্থী বা নারী কর্মীদের লক্ষ করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, চরিত্রহননের চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন রূপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ঢাকা-৪ আসন, ঢাকা-১৫ আসনসহ সারা দেশে বিভিন্ন আসনে নারীদের ওপর হামলা, হিজাব খুলে নেয়া ইত্যাদি ঘটনার খবর পাওয়া যায় গত কয়েকদিনে।
বাংলাদেশে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। স্বাধীনতার পর থেকে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নারীর ক্ষমতায়নের ফলে নির্বাচনে নারী ভোটারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে নারীরা আগ্রহের সঙ্গে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার কথা ভাবছেন। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ, কটূক্তি বা ইচ্ছাকৃত বাধা নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগে নিরুৎসাহিত করে। আবার অনেক পরিবারে এখনো নারীদের একা ভোটকেন্দ্রে যাওয়াকে ভালো চোখে দেখা হয় না; বিশেষ করে যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকে।
এ সহিংসতার প্রভাব সরাসরি নারী ভোটারদের ওপরও পড়ছে। যখন নারীরা দেখছেন- প্রচারে অংশ নেওয়া নারীরাই নিরাপদ নন, তখন সাধারণ নারী ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সাহস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে পরিবার ও সমাজের চাপ আরও বেড়ে যায়। ‘পরিস্থিতি ভালো না’, ‘ঝামেলা হতে পারে’- এ যুক্তিতে অনেক নারী ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে থাকেন।
নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, কিন্তু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দুর্বল থেকে যায়। নারীদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা এখনো যথেষ্ট দৃশ্যমান নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সহিংসতার পেছনেই দলীয় কর্মীদের নাম উঠে আসে। অথচ নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতার কথা রাজনৈতিক ইশতেহারে বড় করে লেখা হয়। মাঠের বাস্তবতা ও বক্তব্যের এ দ্বৈততা নারীদের প্রতি রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের কর্মীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নারীবিদ্বেষী আচরণের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বও কম নয়। নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত বা আহতের সংখ্যা নিয়ে খবর হলেও নারীদের ওপর সংঘটিত সহিংসতা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। অথচ এ ঘটনাগুলো তুলে ধরা জরুরি, কারণ নীরবতা সহিংসতাকেই উৎসাহিত করে। নারীভিত্তিক সহিংসতার আলাদা পরিসংখ্যান ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এ বাস্তবতাকে সামনে আনতে পারে।
সব শেষে প্রশ্ন থেকেই যায়- আমরা কি এমন একটি নির্বাচন চাই, যেখানে নারীরা ভয়ে ঘরে বসে থাকবেন? নাকি এমন একটি গণতন্ত্র, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে মতপ্রকাশ করতে পারবেন? নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে কেবল নারীদের অধিকার রক্ষা নয়; এটি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত। নির্বাচনী মাঠে নারীর উপস্থিতি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তাদের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার যদি ভয়ের দেয়ালে আটকে যায়, তবে প্রশ্ন উঠবে আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েই।
নারী ভোটারদের নিরাপদ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া একটি গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রাহী জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে নারী ভোটারদের আস্থা অর্জনই হবে নির্বাচনের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি। রাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সমাজ- সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই নিশ্চিত করা সম্ভব নারী ভোটারদের নিরাপদ ভোটদান এবং একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ।