গল্প দাদুর আসর-১

প্রসঙ্গ : দেশের ভোট


৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫০

মাহবুবুল হক
অনেকদিন আসর হয় না। গল্প দাদু, দাদিকে নিয়ে বিলাতে গিয়েছিলেন। এটা বললেই তো হবে না। তোমরা নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে- বিলাত আবার কোথায়? সেখানেই বা তারা কেন গিয়েছিলেন? সহজ জবাব হলো, বিলাত মানে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ড হলো যুক্তরাজ্যের বড় দেশ। এটা ইউরোপের পশ্চিম-উত্তর কোণে অবস্থিত। জাতিতে ওরা ব্রিটিশ। আমরা যেমন জাতিতে বাংলাদেশি। ব্রিটিশ বা ব্রিটেন শব্দ থেকেই বিলাত শব্দের উৎপত্তি বলে বাংলাদেশিরা মনে করে। এ সম্বন্ধে তোমাদের কৌতূহল থাকলে পরে একদিন জানাবো। যে বাংলাদেশিরা বিলাত শব্দটি বলেছে, তারা শিক্ষিত ছিল না। তারা ইংরেজি ভাষা দূরের কথা, কোনো ভাষাই ভালো করে জানতো না। কিন্তু নিজেদের মধ্যে চলাফেরার জন্য তারা নিজেরা এক ধরনের শব্দ ব্যবহার করতো। আর এদের মধ্যে তখনকার দিনে অধিকাংশ বাংলাদেশি ছিলো সিলেটের অধিবাসী। একটা উদাহরণ দিলে তোমরা সহজে বুঝতে পারবে।
সৌদি আরবের রাজধানীর নাম রিয়াদ। রিয়াদের একটি জায়গার নাম ‘হাইয়াল-উজারা’। বাংলাদেশিদের কাছে নামটা বেশ বড়। তারা এত বড় নাম সহজে সবাই মনে রাখতে পারতো না। কেউ জিজ্ঞেস করলে উল্টা-পাল্টা বলতো। তো এভাবেই স্মার্ট বাংলাদেশিরা ঐ জায়গার নাম হাইয়াল উজারার বদলে ‘হারা’ বলতো। এই বলতে বলতেই গত ১০০ বছরে ঐ জায়গার নাম হয়ে গেছে ‘হারা’। এখন অফিসিয়াল নাম হাইয়াল-উজারা বললে কেউ আর চেনে না, জানে না। কিন্তু হারা বললে সবাই চেনে এবং জানে। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশিরা দুনিয়ার যেখানেই গিয়েছে, সেখানেই নাম পরিবর্তনের স্মার্টনেস দেখিয়েছে। তারা পরিকল্পনা করে এ কাজটি করেনি। বলতে বলতেই দীর্ঘ নামগুলো সহজেই স্বল্প নামে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশিরা বলে ব্রিটিশ, ব্রিটেন এসব নাম উচ্চারণ করতে বা লিখতে স্বল্প শিক্ষিত বাংলাদেশিরা পেরে উঠতো না। পাশাপাশি নানা শব্দ হয়তো তারা ব্যবহার করতো। ধীরে ধীরে বিলাত শব্দটি সবার মুখে মুখে স্থান পেয়ে যায়। তবে আনন্দ বা বিষাদের কথা জানি না, বাংলাদেশের বুড়োরা ব্রিটেনকে বিলাত বললেও বর্তমান স্মার্ট বাঙালি তরুণরা এখন আর বিলাত বলে না।
আমি বললাম কেন জান? আমাদের সময়কার একটা শব্দ তোমাদের জানালাম।
তোমাদের সাথে কথা বলতে অনেকটা সময় চলে গেল। সময় চলে গেলে তো সময় আর পাওয়া যায় না। আসলে তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাকে ফোন করে ভোটের কথা জানতে চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, তোমরাই তো আমাদের চেয়ে বেশি জান। কারণ ইদানীং সবাই বলে বাচ্চারাই বড়দের চেয়ে বেশি জানে। কথাটা আমরা বুড়োরা আগে বুঝতাম না। উদ্ভট কথা মনে করতাম। লোকেরা তোমাদের খুশি করার জন্য এসব কথা বলছে। মনে মনে হাসতাম। মর্নিং ওয়ার্কের পর পুলের ওপর বসে আমরা বুড়োরা তোমাদের নিয়ে কত ঠাট্টা-মশকারী করতাম। কিন্তু ’২৪-এর বিপ্লবের পর আমরা তোমাদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করি না। তোমাদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে যে অন্যায় আমরা করেছি, সেই কারণে মহান আল্লাহর দরবারে আমরা বারবার ক্ষমা চেয়েছি। এখনো চাই।
আমরা যা করতে পারিনি, তা তোমরা করতে পেরেছ। আমরা যা বুঝিনি, তা তোমরা আমাদের আগেই বুঝে ফেলেছ। আমরা সবাই মিলে ধ্বংস হচ্ছিলাম। এর মধ্যে অনেকেই আবার বেঈমানী করছিল। বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। আয়-ইনকাম বাড়াচ্ছিল। রাস্তাঘাট, পুল, সড়ক তৈরি হচ্ছিল। ভাবছিলাম দেশের উন্নতি হচ্ছে। মানুষের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু তোমরা ঠিকই বুঝেছ, কোনো উন্নতি হচ্ছে না। সরকার শুধু আমাদের এবং তোমাদের ঘাড়ে ঋণ বাড়াচ্ছিল। যাই হোক, যেভাবে হোক, মনে হয় মহান আল্লাহই তোমাদের জানিয়েছেন। তোমরা সত্যটা বুঝে ফেলেছিলে। তোমরা আন্দোলন করে, বিপ্লব করে একটা খারাপ সরকারকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করেছিলে। তোমাদের ভয়ে তারা পালাতে বাধ্য হয়েছিল। সেদিন থেকে আমরা বুড়োরা বুঝেছি, এ যুগে তোমরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জান, অনেক বেশি বোঝ। ছোট বলে তোমাদের আর উপেক্ষা করা যাবে না।
তবু ফোন আসে, ভোটের কথা বলার জন্য। তা বলতে গিয়ে এর মধ্যে নানা কথা বলে ফেললাম।
ভোট তো তোমরাই আনলে। সরকার চলে গেলে বা ভেঙে গেলে নতুন সরকার গঠন করতে হবে। সরকার ছাড়া দেশ কে চালাবে? নিশ্চয়ই একটা সরকার লাগবে। এটা তোমরা বোঝনি বা বোঝ না- এটা তো নয়। কিন্তু তোমরা হয়তো ভেবেছিলে তোমরাই একটা সরকার গঠন করে দেবে। তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের বড় ভাইরা একটা সরকার গঠন করেছিল। সে সরকার এখনো আছে। সে সরকারে তোমাদের বড় ভাইয়েরা ছিল। এখন আর নেই। বুড়োদের সঙ্গে ছোটরা থাকে কি করে? এটা তো হলো একটা দিক মাত্র।
সরকার গঠনের জন্য বহুদিক আছে। সেসবের কিছু তোমরা অবশ্য জেনে ফেলেছ। আরও কিছু খুঁটিনাটি অল্পদিনেই তোমরা জানতে পারবে।
ক্লাসে ক্যাপ্টেন নির্বাচনের জন্য কী কী করতে হয়, তা তো তোমরা জান। এই যে নির্বাচন কথাটি এসে গেল, ইংরেজি ভাষায় এটার নামই ইলেকশন। আবার ইংরেজি একটি শব্দ আমি এখানে উচ্চারণ করেছি। সেটার বাংলা হলো সম্মতি প্রদান, মতামত প্রদান, পরামর্শ প্রদান, উপদেশ প্রদান ইত্যাদি। যেমন ক্যাপ্টেন নির্বাচনের দিন ক্লাস টিচার এসে বললেন, আজ আমরা তোমাদের ক্লাসের জন্য একটা ৩ জনের সরকার গঠন করবো। তোমরা ৫ মিনিটের মধ্যে ৩ জনের নাম ১, ২, ৩ করে এক্ষুণি আমার কাছে দিয়ে দাও। এই ৩ জন থেকে আমরা ১ জন ক্যাপ্টেন এবং ২ জন মনিটর ঠিক করে নেব। তোমরা সবাই নামগুলো দিলে, এটাই ভোট দেয়া হলো। ভোট দেয়া শেষ হলেই তোমাদের থেকে ৩ জন চৌকস ছাত্রকে নিয়ে ভোটগণনা শুরু করা হলো। কে কত বেশি ভোট পেয়েছে। যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে, সে ক্যাপ্টেন এবং যে দুজন ২য় ও ৩য় সংখ্যক ভোট পেয়েছে, তারা হলো মনিটর। ক্লাস টিচার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ক্লাস পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করে ফেললেন। এভাবেই পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে ভোটগ্রহণ করা হয়। যারা পরিবারের সরকার হয়, সমাজের সরকার হয়, দেশের সরকার হয় এবং রাষ্ট্রের সরকার হয়।
কোনোটি ছোট, কোনোটি বড়। কিন্তু বিষয়টি মোটামুটি একই। ক্লাসে সরকার গঠন করতে গিয়ে তুমি যে ৩ জনের নামে ভোট দিয়েছ, দেখা গেল তাদের ১ জনও ভোটের পরীক্ষায় পাস করেনি। সেক্ষেত্র তোমাকে কী করতে হবে। তোমাদের বুঝতে হবে, মানতে হবে অন্য সহপাঠীরা যাদের ভোট দিয়েছে তারা নিশ্চয়ই ঠিক কাজটি করেছে। তুমি হয়তো বিষয়টি সেভাবে বুঝতে পারনি। তোমার মতো অন্যদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের ঘটনা কমবেশি ঘটতে পারে। যাদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে, তাদের শোকর ও সবর ধরতে হবে। নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিতে হবে। যারা জয়লাভ করেছে এবং যাদের ভোটে যারা জয়লাভ করেছে, তাদের উল্লাসে ভেসে যাওয়া ঠিক হবে না। আনন্দে উচ্ছল হওয়া টিক হবে না। এমন আনন্দ করা যাবে না- যাতে অন্যরা দুঃখ পায় বা কষ্ট পায়। তোমরা সবাই সবার বন্ধু। তোমরা প্রায় একই এলাকায় বসবাস কর। অনেকের সঙ্গে অনেকের গভীর বন্ধুত্ব আছে। হয়তো আত্মীয়তাও আছে। এটা তো মাত্র কিছুদিনের জন্য। মাত্র ১ বছরের জন্য। পরের ক্লাসে উঠলে আবারও এ ধরনের ভোট হবে। সেই ভোটে তুমি বা তোমরা যারা গত ক্লাসে ভোটযুদ্ধে জয়লাভ করতে পারনি, আল্লাহর ইচ্ছায় এই ক্লাসে উঠে অনেকের ভোট পেয়ে যাবে। মাঝখানে ১ বছরের একটা সময় ছিল। যখন তোমরা ভেবেছ, চিন্তা করেছ, গবেষণা করে দেখেছ কী কী কারণে তোমাদের একদল বন্ধু বিজয় লাভ করেছিল। আর একদল বন্ধু কী কী কারণে পরাজয় বরণ করেছিল। আসলে এটা জয়-পরাজয় নয়, কিন্তু বোঝানোর জন্য বলা।
আমাদের দেশে (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে) যে ভোট বা যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা ঠিক তোমাদের ক্লাসের ক্যাপ্টেন নির্বাচনের মতো না হলেও বুঝে নিতে হবে বড় পরিসরে এ ধরনেরই একটি প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আসো সবাই মিলে আমরা মহান আল্লার কাছে দোয়া করি- দেশের এই ভোটটা যেন সঠিক ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।