সিন্ডিকেটের খপ্পরে এলপি গ্যাস, বাড়তি টাকা দিলে মিলছে সিলিন্ডার
২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৯
স্টাফ রিপোর্টার : প্রতি মাসের শুরুর দিকে দেশের জ¦ালানি মূল্য সমন্বয় করে থাকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নিয়ম অনুযায়ী গত ৪ জানুয়ারি সর্বশেষ জ¦ালানি মূল্য সমন্বয় করা হয় এবং ওইদিনই তা কার্যকর করা হয়। নতুন মূল্য অনুয়ায়ী, জানুয়ারি মাসের জন্য ভোক্তাপর্যায়ে ১২ কেজি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৩০৬ টাকা। অর্থাৎ ১২ কেজিতে আগের চেয়ে মূল্য বাড়ে ৫৩ টাকা। কিন্তু ঢাকাসহ সারা দেশের এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য অবিশ্বাস্য হারে বেড়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্য ভোক্তার কাছ থেকে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা পর্যন্তও নেওয়া হয়েছে। ঢাকার কোনো কোনো বাজারে এখনো ১২ কেজি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ভোক্তাদের এই পকেট কাটার পরিস্থিতি কবে শেষ হবে তারও কোনো নিশ্চিয়তা নেই।
কেন হঠাৎ করে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের দোকানগুলোয় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। এটা সবার আন্দাজ রয়েছে। গত সরকারের সময় এলপি গ্যাসের ব্যবস্থা চার/পাঁচটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখনো তাদেরই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে তারা যখন ইচ্ছা সংকট তৈরি করে, আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এখন দেশজুড়েই গ্যাস সিলিন্ডার সংকট তৈরি করা আছে। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা দিলে ঠিক মিলছে গ্যাস। ফলে এটা ভোক্তাদের কাঠে স্পষ্ট যে সংকট মানবসৃষ্টি। সংকট আসলে কতটা? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার যে এলাকাগুলো সিলিন্ডার গ্যাস নির্ভর এসব এলাকার দোকানগুলোয় গ্যাস সিলিন্ডার নেই বললেই চলে। কিন্তু বেশি দামে কিনতে গেলে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
২০০৯ সালের পর ঢাকায় যেসব নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে এ ভবনগুলোয় পাইপ লাইনে গ্যাস সংযোগ নেই বললেই চলে। গ্যাস সংকটের কারণে ২০০৯ সালের ২১ এপ্রিল থেকে সারা দেশে নতুন আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ। তবে ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্দেশনা অমান্য করে বেশ কিছু সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটার বিহীননির্বাচনের পর জ্বালানি বিভাগ থেকে মৌখিকভাবে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ না দিতে বলা হয়। এরপরও বিভিন্ন সময় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি গ্যাস সংযোগ দিয়েছে। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে তিতাসের বোর্ড সভা এমন সাত লাখ গ্রাহককে বৈধ করেছিল। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ২১ মে আনুষ্ঠানিকভাবে তিতাসসহ সবক’টি গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানকে আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং সিএনজির নতুন সংযোগ না দিতে নির্দেশ দেয় জ্বালানি বিভাগ। কিন্তু এই নির্দেশ অমান্য করে ক্ষমতাসীন দলের লোকজনকে এবং অবৈধ অর্থের বিনিময়েও কিছু সংযোগ দেয় গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। যদিও ২০০৯ সালের পর ঢাকায় যেসব নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে এর ৯৯ শতাংশই গ্যাস সংযোগ পায়নি। এসব বাসাবাড়িতে বসবাসকারীরা সিলিন্ডার গ্যাস নির্ভর। যখন সংকট দেখা দেয় তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
ভোক্তাদের অভিযোগ, প্রকৃত সংকটের চাইতে কয়েকগুণ বেশি সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কিছু অসৎ ব্যক্তির যোগসাজশে। গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করা দোকানিদের ভাষ্য হচ্ছে, এজেন্টদের কাছেই গ্যাস নেই। তবে বাড়তি দামে কোনো কোনো এজেন্ট গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছে। পাড়া-মহল্লার দোকানিদের মধ্যে যাদের কাছে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে এরা দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছে। এসবই কারসাজির খেলা। এলপিজির সংকট ও দাম বৃদ্ধিতে কারসাজির কথা স্বীকার করেছেন খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, বিইআরসি দাম কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেও একদল অসাধু ব্যবসায়ী সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই সিন্ডিকেট তৈরি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, এলপিজি সংকট সমাধানে সরকার শতভাগ ব্যর্থ। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন, কারসাজি হচ্ছে, তাহলে তারা কেন সেই কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের ধরছেন না। সরকার কি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের ধরছেন না, নাকি ধরার ইচ্ছা নেই, নাকি ধরতে পারছেন না। সরকারের কাছে এতগুলো বাহিনী থাকতে সরকার কেন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না? বর্তমান সরকারের তো রাজনৈতিক কোনো দায় নেই। ভোটের রাজনীতি নেই, তাহলে তারা কেন সিন্ডিকেট ভাঙছেন না। এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই এলপিজি খাত নিজেদের দখলে রাখতে চায়। নিয়ন্ত্রণে মাত্র কয়েকটি কোম্পানি এই খাত দখলে নিতে চায়। পুরো বাজার তারা দখল করে নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বর্গিদের মতো এলপিজি দখলে রাখতে সংকট তৈরি করে। আর জনগণ অসহায় হয়ে পড়েন। রাষ্ট্র এই জনগণকে রক্ষা করতে পারেন না। এই ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কী সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী? প্রশ্ন রাখেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, হঠাৎ করেই সংকট কাটবে না, সময় লাগবে। বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে এলপিজি বহনকারী জাহাজ। প্রথম দফায় ১০টি এবং পরে আরও ১৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। এতে সংকট বৃদ্ধি পায়। ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধে ছোট ছোট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সিএনজি স্টেশনগুলোয় গ্যাস সিলিন্ডার রিফিল করার সুযোগ সৃষ্টির কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, এমন পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তিনি বলেন, এলপি গ্যাসের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সবাই যথাযথভাবে ব্যবসা করতে পারছেন না। এর কারণ হচ্ছে, লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) জটিলতা ও মূলধন সংকট। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে।
জানা গেছে, সংকট কাটাতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুমতিও দিয়েছে। ১০ জানুয়ারি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান। বিপিসির আমদানিকৃত গ্যাস আসার পরই সংকট কাটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।