ব্যবসা-বাণিজ্যে ভয়াবহ স্থবিরতা সুদিনের অপেক্ষায় মানুষ
২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৯
রফতানিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি
আওয়ামী লুটপাটে দুর্বল ব্যাংকগুলোয় নেই ফান্ড
বিনিয়োগে মারাত্মক মন্দা
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভয়াবহ স্থবিরতা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ আমলের ব্যাপক লুটপাটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতিতে। রফতানিতে মারাত্মক ধস, উচ্চ সুদের হার এবং শিল্পে নেই কোনো বিনিয়োগ। ফলে ভোক্তার চাহিদায় ধস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, কাঁচামাল আমদানি কম, জ্বালানি সংকট সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম অবস্থা। সবকিছুর জাঁতাকলে সাধারণ মানুষের নাজুক অবস্থা।
নাগরিক সমাজ এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদায়ী বছরটি ছিল কেবল টিকে থাকার লড়াই। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে অর্থনীতির এ গুমোট ভাব হয়তো কেটে যাবে- এমন প্রত্যাশায় বুক বাঁধছেন তারা।
রফতানিতে মারাত্মক ধস
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) ২৬টি দেশে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমে গেছে। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারগুলোয় নেতিবাচক প্রবণতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমেছে ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এ সময়ে রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের। এর সঙ্গে শাকসবজি, মাছ, হিমায়িত খাদ্য, অপ্রচলিত পণ্য রফতানিও কমেছে। দেশের ভেতরেও ব্যবসার গতি কমেছে। দেশের মূল রফতানি পণ্য গার্মেন্টস খাতে রফতানির মারাত্মক ধস পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে।
সদ্যবিদায়ী ডিসেম্বর মাসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারে। আর ২০২৪ সালের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩৭৭ কোটি ৫ লাখ ডলার।
তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয়ের মধ্যে ১৬৩ কোটি ১৭ লাখ ডলার এসেছে নিটওয়্যার রফতানি থেকে, যা বছর ব্যবধানে ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ১৬০ কোটি ২৩ লাখ ডলার এসেছে ওভেন পোশাক রফতানি থেকে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১৪ দশমিক ৭১ শতাংশ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং চামড়াসহ ২৭ ধরনের পণ্য বিশ্ববাজারে রফতানি হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৩৯৯ কোটি ৬৮ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কম।
বিনিয়োগে মারাত্মক স্থবিরতা
দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে গভীর সংকট বিনিয়োগে স্থবিরতা। বেসরকারি বিনিয়োগ, বিদেশি বিনিয়োগ দুটিই নেমে গেছে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিনিয়োগের এ স্থবিরতা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। ব্যাংকের উচ্চ সুদহার ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের গতি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ধীর। যার প্রভাবে দেখা যায় চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এক লেজেগোবরে অবস্থা।
ব্যবসায়ীদের মতে, গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
আওয়ামী লুটপাটে সক্ষমতা হারিয়েছে বেশিরভাগ ব্যাংক
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাপক লুটপাটে বিনিয়োগ সক্ষমতা হারিয়েছে বেশিরভাগ ব্যাংক। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ী ও গ্রাহকদের। বহু ব্যাংকে জমা রাখা গচ্ছিত অর্থ তুলতে পারছেন না সাধারণ গ্রাহকরা। ব্যবসায়ীরা ঋণের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেও কোথাও পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় ফান্ড। এক রিপোর্টে দেখা যায়, বর্তমানে পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক কার্যত নামমাত্র টিকে আছে। দেউলিয়ার পর্যায়ে আছে ১২টি ব্যাংক। অতিমাত্রায় দুর্বল ১৫টি ব্যাংক। দখল ও লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বর্তমানে পাঁচ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানার আশীর্বাদপুষ্ট এস আলম গ্রুপ একাই পুরো ব্যাংক খাত ধ্বংস করে দিয়েছে। সাথে রয়েছে তার সহযোগীরা।
সরকারি খাতে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক ছিল বেসিক ব্যাংক। লুটপাটের মাধ্যমে এটিকে পরিকল্পিতভাবে অত্যন্ত দুর্বল করা হয়। আগে পদাধিকারবলে এর পর্ষদের চেয়ারম্যান থাকতেন শিল্প সচিব। সদস্য হিসেবে থাকতেন আরও কিছু সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ফলে ব্যাংকটি বেশ ভালোভাবে চলছিল। এর খেলাপি ঋণ ছিল ৩ শতাংশের কম। প্রতি বছর সরকারকে মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ দিত। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এর চেয়ারম্যান করা হয় দলীয় ঘনিষ্ঠ আবদুল হাই বাচ্চুকে। তিনি চেয়ারম্যান হয়ে ব্যাংকের প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙে ফেলেন। যাকে খুশি তাকে ঋণ দিতে থাকেন। পর্ষদকে বানিয়ে ফেলেন অন্ধ ঘোড়া। যাদের ক্ষমতা আছে অনেক, কিন্তু কিছুই করতে পারেন না। এ সুযোগে ব্যাংকের একক কর্তৃত্ব নিয়ে তিনি যাকে খুশি তাকে ঋণ দিতে শুরু করেন। কোনো নিয়মকানুনের বালাই ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন ড. আতিউর রহমান। তাকে বেসিক ব্যাংকের বিষয়গুলো জানানো হলে তিনিও লুটপাটের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো অবস্থান নেননি। ২০১০ থেকে ২০১৩ এ তিন বছরে ব্যাংকটি প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা চলে যায় লুটপাটকারীদের হাতে। এ টাকা আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে।
সরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবার ওপরে ছিল জনতা ব্যাংক। সময় নিয়ে লুটপাট করে দুর্বল করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিসমিল্লাহ গ্রুপের মাধ্যমে এ ব্যাংকে লুটপাট শুরু হয়। এর নেপথ্যে ছিলেন সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য। তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্রথমে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। পরে আরও ৬টি ব্যাংক থেকে মোট ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পুরোটাই বিদেশে পাচার করে দেন। এরপর সরকারি প্রভাবে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি, এ্যানন টেক্স গ্রুপের ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ঘটনা ঘটে। বেক্সিমকো গ্রুপ প্রভাব খাটিয়ে শুধু স্থানীয় কার্যালয় থেকেই ঋণ নেন ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অথচ একটি শাখা বা কোনো ব্যাংক একজন গ্রাহককে এত বেশি ঋণ নিতে পারে না। এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংকের কাছে দফায় দফায় বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণের তথ্য চেয়েও পায়নি। ওই ঋণের মধ্যে এখন ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা খেলাপি। এছাড়া ব্যাংকটি রাজনৈতিক চাপে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নগদ টাকায় খেলাপি ঋণ কিনে সেগুলোকে নতুন ঋণ দিয়েছে। সেসব ঋণ এখন আবার খেলাপি হয়েছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ শতাংশে। ২০০৯ সালের শুরুতে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ৫ শতাংশের নিচে। ব্যাংক এখন প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। প্রতি বছর লোকসান দিচ্ছে।
একইভাবে সরকারি খাতের অগ্রণী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ২০০৯ সালের শুরুতে ছিল ২০ শতাংশের কম। এখন তা বেড়ে ৪১ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারি খাতের সোনালী ব্যাংকে ২০১০ সালেই শুরু হয় হলমার্ক গ্রুপের কেলেঙ্কারি। গ্রুপটি সোনালী ব্যাংকসহ ২৭টি ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেন। এর নেপথ্যে থেকে গ্রুপকে সমর্থন দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা। ওই সময়ে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ঋণ কেলেঙ্কারি। এ কারণে সোনালী ব্যাংক দুর্বল হয়েছে। এ ধকল এখনো ব্যাংকটি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
বেসরকারি খাতের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক দখল করে লুটপাট করা হয়েছে। এ ব্যাংক থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। এগুলো এখনো সব খেলাপি হয়নি। ধীরে ধীরে খেলাপি হচ্ছে। যে কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে এখন ২৮ শতাংশে উঠেছে। আগে খেলাপি ঋণ ছিল ৯ শতাংশের কম।
দুই দফা দখল করে লুটপাট চালানো হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংকে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে এটি দখলে নেয় সিকদার গ্রুপ। তারা ব্যাপক লুটপাট করে। পরে এটিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একীভূত করার সিদ্ধান্ত হলে সিকদার গ্রুপ আপত্তি করে। তখন সাবেক গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের হাতে তুলে দেন। তারাও ব্যাংকটিতে লুটপাট চালায়। ফলে এখন খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ শতাংশ। মূলধন ঘাটতিও প্রকট।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক এস আলম গ্রুপের দখলেই ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইন প্রয়োগের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে এটিতেও তারা লুটপাট চালায়। লুটের ঋণ সব খেলাপি হচ্ছে। যে কারণে এখন খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে।
আইএফআইসি ব্যাংকে সালমান এফ রহমান একাই লুটপাট করেছেন। যে কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখন ৫৮ শতাংশের বেশি।
লুটপাটের কারণে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত। এর মধ্যে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৫৫ শতাংশ। পদ্মা ব্যাংকে দুই দফায় লুটপাট হয়েছে। প্রথমে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের হাত ধরে ব্যাংকটি চালুর পরই তিনি লুটপাট করেন। তিনি ছিলেন ব্যাংকটির উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান। পরে ব্যাংকটি অচল হয়ে পড়লে একে নতুন করে পুঁজির জোগান দেওয়া হয় সরকারি খাতের ব্যাংক থেকে। তখন এর নেতৃত্বে আসেন নাফিজ সারাফত। তিনি ব্যাংকে লুটপাট করেন। যে কারণে এখন খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ শতাংশে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে লুটপাটের কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশে। ইউনিয়ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশ। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে যে লুটপাট হয়েছে, তার পুরোটাই করেছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ ও তার ঘনিষ্ঠরা। প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। ব্যাংকে এখন খেলাপি ঋণ ১৫ শতাংশ।
ভালো নেই ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ মানুষ
বিগত আওয়ামী লীগ আমলের ব্যাপক লুটপাটে অস্থির দেশের অর্থনীতি। চরম মন্দাভাব সাধারণ ব্যবসায়ী সমাজে। যার প্রভাবে ভালো নেই সাধারণ মানুষও।
কথা হয় মুগদা এলাকার মুদি ব্যবসায়ী শফিক রহমানের সাথে। তিনি বলেন, এত বড় দোকান নিয়ে বসে আছি। বেচাকেনা তেমন নেই বললেই চলে। ক্রেতারা যেন কোথায় চলে গেছে।
মিরপুর এলাকার একটি বহুজাতিক কনজ্যুমার কোম্পানির ডিলার আরজু মিয়া সোনার বাংলাকে জানান, মাসিক বিক্রি একদম কমে গেছে। প্রতি মাসেই যেন কমে যাচ্ছে। কারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা একদম তলানিতে। সাধারণ মানুষের হাতে টাকা নেই। টাকা সব লুটপাটকারীরা পাচার করে দিয়েছে।
মোহাম্মদ তোফায়েল, একজন নিয়ন সাইন এসএমই ব্যবসায়ী। তিনি জানান, সামান্য কিছু ব্যাংক লোনের জন্য দিনের পর দিন কয়েকটি ব্যাংকে ধরনা দিয়েছি। আশ্বাস দিলেও কোনো ব্যাংকই শেষ পর্যন্ত লোন দিতে পারছে না। কারণ কোনো ব্যাংকের কাছেই পর্যাপ্ত ফান্ড নেই। আর যে সমস্ত ব্যাংকে টাকা আছে, তারা বড় বড় ব্যবসায়ীদের নিয়ে ব্যস্ত। অর্ডার থাকলেও পর্যাপ্ত ফান্ডের অভাবে আমার কারখানা-অফিস বন্ধ হবার উপক্রম।
সুদিনের অপেক্ষায় মানুষ
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, টানা চার মাস ধরে পণ্য রফতানি কমায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস রফতানি খাতেও স্বস্তি নেই। নভেম্বর মাসে রফতানি হয়েছে ৩৮৯ কোটি ডলারের পণ্য। এ রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৫৪ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি এস এম নুরুল হক বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য তথা দেশের বেসরকারি খাতের অবস্থা ভালো না। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে রফতানি আদেশ অনেক কমে গেছে। বেশকিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এফবিসিসিআইয়ের এ সাবেক পরিচালক বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে গতিশীল হবে। ক্ষমতাসীন সরকার বেসরকারি খাতের পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই ও ডিসিসিআই নেতাদের মতে, ২০২৬ সাল হবে ‘ঘুরে দাঁড়ানোর বছর’। তাদের এ আশাবাদের পেছনে তিনটি জোরালো যুক্তি রয়েছে। তারা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সফল হলে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী বর্তমানে ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ মোডে আছেন। নির্বাচিত সরকার এলে বিলিয়ন ডলারের ঝুঁলে থাকা প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখবে। রাজনৈতিক সরকার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কোনো অর্থনৈতিক রোডম্যাপ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এফবিসিসিআইয়ের এক সাবেক সভাপতি বলেন, ‘আমরা ২০২৫ সালকে একটি ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’ হিসেবে দেখছি। আমাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। তবে ২০২৬-এ নির্বাচনোত্তর স্থিতিশীলতা ফিরলে আমরা আবার নতুন করে বিনিয়োগের সাহস পাব।’
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসার প্রধান তিন প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট। নতুন বছরে আমার প্রথম প্রত্যাশা অবশ্যই একটি নির্বাচিত সরকার। এ বিষয়গুলোর উত্তরণ ঘটানো আমাদের দ্বিতীয় প্রত্যাশা। এর বাইরে নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের সমস্যা যাতে তারা প্রাধান্য দেয়। লজিস্টিক, এনবিআরের দুর্নীতি, ট্যাক্স ও ভ্যাটের সমস্যা ও অবকাঠামো- এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। এগুলো নিয়ে নতুন সরকারকে কাজ করতে হবে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক টালমাটাল অবস্থাও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় হামলা ও সহিংসতার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের দুর্বলতা সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনাগুলো বিনিয়োগ পরিবেশে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিনিয়োগ পরিবেশে এটি এখন একটি বড় ‘বিষফোড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর এ আস্থার জায়গাটাই এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি ও কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে কার্যত সাফল্য নেই বললেই চলে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। এফডিআই কমিটমেন্ট আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বেড়েছে। আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট ও ‘নিট’ (শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নয়) জনসংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় ২০০ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়েছে। ইউরোপীয় বাজারে চাহিদা কমেছে। আবাসন, টেক্সটাইলসহ শ্রমঘন খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানিসংকট ও কম এডিপি বাস্তবায়নের কারণে ভারীশিল্প চরম চাপের মধ্যে রয়েছে।’