আওয়ামী আমলে গুম : বিচারের প্রতীক্ষায় ভুক্তভোগী পরিবার


১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫০

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে ভয়াল ঘটনা ছিল গুম। গুম হওয়া ব্যক্তিদের ‘ক্রসফায়ারে নিহত’, ‘মাদক কারবারি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সরকারি নথিতে দেখানো হতো। বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, লেখক-সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের নানা পেশার মানুষকে নিপীড়নের এক ভয়াবহ কৌশলের মাধ্যমে টিকে ছিল আওয়ামী লীগ। ভুক্তভোগী এসব পরিবার ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আশায় দিন গুনছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশে ‘গুম’ ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। গুম ছিল একটি নির্যাতনের সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার, যা মূলত র‌্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। ভয়ার্ত এসব গুমে শেখ হাসিনা ও তার চারপাশের উচ্চপর্যায়ের জ্ঞাতসার ও নির্দেশনার বাইরে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারত না, যা রাজনৈতিক দমন এবং ভয় প্রতিষ্ঠার একটি সুসংহত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়।
গুমের শিকার ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবির
গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন, তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী। গুম কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ও ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। সব মিলিয়ে ছয় সহস্রাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনের বলা হয়।
সরাসরি শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা
হাইপ্রোফাইল গুমের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার তৎকালীন প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ মামলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর) যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে করে এটি স্পষ্ট হয় যে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছে।
বিচারের আশায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো
একদিন-দুদিন নয়, বাবাকে ছাড়া ইনশা আর ইনামের কেটে গেছে প্রায় অর্ধযুগ। বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, তাও জানেন না পরিবারের সদস্যরা। বাবা কবে ফিরবে? নিষ্পলক চাহনিতে শুধুই বাবাকে খুঁজে ফেরা। অশ্রুসজল অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে মলিন মুখগুলোয় মুছে গেছে হাসির রেখা। ইনশা বলেন, ‘তদন্ত কমিশন গঠন হওয়ার পর আমি আবার নতুন করে আশা দেখছি যে, আমি আমার বাবাকে ফিরে পাবো। আমি আশা রাখি যে, আমার বাবা বেঁচে আছেন।’
২০১৯ সালের ১৯ জুন গুম হন ইসমাঈল হোসেন। ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের রোষানলে পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে যায় তাকে। আজও হদিস মেলেনি তার। এমনকি লাশটিও পায়নি তার পরিবার। নিখোঁজ প্রিয় মানুষটির আশায় দিন কাটছে স্ত্রী নাসরিন জাহানের। এখনো অপেক্ষা, ফিরে এসে ফের হাল ধরবেন সংসারের। নাসরিন জাহান বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়ে প্রতিদিন ঘুমানোর আগে আমাকে প্রশ্ন করে যে মা, বাবা কি বেঁচে আছে? আমার কাছে তো প্রশ্নের উত্তরটা নেই। ছয় বছর হলো আমি এভাবে বহন করছি, আমি এখনো জানলামই না যে আমার স্বামী বেঁচে আছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
গুম হওয়া মানুষের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে এমন কর্মকাণ্ড চালিয়েছে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী সরকার। ভিন্ন মতকে দমনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে তোলা হয় আয়নাঘরের গোপন বন্দিশালা।
‘বাবাকে আমি আট বছর ধরে দেখিনি। চলতে-ফিরতে একাকিত্বের সময়ে আমার বাবা এসে বলেন, ‘আমাকে এখনো বের করলি না? আমাকে বের কর।’ আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। স্বপ্নে বার বার এসে বাবা ডাকে, ‘আমাকে খুঁজে নিয়ে আসবি না?’ আমি এ ধরনের স্বপ্নই দেখি।’ এ হৃদয়বিদারক কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম সাগর। আট বছর আগে গুম হয়েছেন সাইফুল ইসলাম সাগরের বাবা। আজও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) জামায়াত সংসদ সদস্য প্রার্থী। ঢাকা-১৪ আসনে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমানকে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ৮ বছরের বিভীষিকাময় ‘আয়নাঘর’ থেকে শেষে জুলাই বিপ্লবে মুক্তি পান। ব্যারিস্টার আরমান এ ব্যাপারে বলেন, আমার স্বপ্ন বাংলাদেশকে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত করা, যেখানে বিচারব্যবস্থা জনগণের অধিকার নিশ্চিত করবে। কোনো দল, কোনো পরাশক্তি বা ক্ষমতাধর ব্যক্তির ইশারায় জনগণের অধিকার খর্ব হবে না।
গুমের শিকারদের সম্পর্কে তিনি বলেন, গুমফেরত অধিকাংশই ছাত্র, যারা ফিরে এসে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি, তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গুম-শিকার পরিবারগুলোও বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিজয়ী হলে আমার প্রথম কাজ হবে গুম-শিকার পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা।
ব্যক্তিগতভাবে নিজের ওপর করা অপরাধগুলো ক্ষমা করলেও ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিচার না হলে গুম আবার ফিরে আসবে। তাই এ সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে বিচার প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, এ রাজনীতির কারণেই আমি বাবাকে ও জীবনের সোনালি সময় হারিয়েছি। তবু রাজনীতিতে এসেছি প্রমাণ করতে যে জুলুম আদর্শকে পরাজিত করতে পারে না। আমাদের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়াই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রথম বিজয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত বিজয় হবেই, ইনশাআল্লাহ।
গুমের শিকার সাতক্ষীরার মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, গুমে জড়িত ফ্যাসিস্ট হাসিনার যে সকল বাহিনী সদস্যরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা দরকার। তিনি বলেন, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায় বিচার, এমনটাই আশা করছেন, স্বজন হারানো পরিবারগুলো।
গুম : পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম
গুম কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, এখনো অনেকে অভিযোগ নিয়ে আসছেন। ‘গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরো ভিকটিমের খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, আমাদের সম্পর্কে জানেন না কিংবা অন্য দেশে চলে গেছেন। এমন অনেকেই আছেন, যাদের সঙ্গে আমরা নিজ থেকে যোগাযোগ করলেও তারা অনরেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।’ তিনি বলেন, বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। আমরা যে তথ্য পেয়েছি, তা দিয়ে প্রমাণিত যে, এগুলো পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম।
এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘বাংলাদেশে এ ধরনে পরিস্থিতি যেন আর কখনো না ঘটে এবং একইসঙ্গে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা গুম হয়েছে এবং যারা ফেরত এসেছে, যারা এখনো আসেনি, আমরা মনে করছি যে তারা ফেরত আসতে পারে, সে সম্ভাবনাও আছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব মানুষ যেন ন্যায়বিচার পায়। গুমের শিকার প্রতিটি পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে।’
গুম কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দেশে বিভিন্ন সময় জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়ে আমরা দীর্ঘ এক বছর তিন মাস ধরে কাজ করেছি। প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনে আমাদের টিম নিরলসভাবে কাজ করেছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হস্তান্তর করেছি। আমরা আশা করি, সরকার আমাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে, যেন গুমের শিকার পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক (অব.) ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আবদুল লতিফ মাসুম এ প্রসঙ্গে বলেন, আসন্ন নির্বাচন যদি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়, তবে এটি দেশের জন্য হবে এক প্রতীকী মুক্তির সূচনা। গুমের অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা। তবে বাস্তবতা এখনো জটিল। সমাজে ভয় আর অবিশ্বাসের ছায়া পুরোপুরি কাটেনি। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, নতুন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পুরোনো বিভাজন হয়তো আবার মাথা তুলতে পারে। তবু আশা হারাচ্ছে না সাধারণ জনগণ। তারা বিশ্বাস রাখে, বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশ আর পথ হারাবে না।
তিনি আরো বলেন, গুমের ক্ষত গভীর, কিন্তু এ ক্ষত নিয়েই জাতি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। যারা ফিরেছেন, তারা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির হিসাব মেলাতে আসেননি, তারা ন্যায়ের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছেন। তার মতে, এ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ন্যায়বিচার, স্মৃতি ও মানবতার পুনর্জাগরণের লড়াই।
গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সদস্য নুর খান লিটন বলেন, আশা করি গুম সংস্কৃতি চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
গুমে জড়িত সামরিক অফিসারদের বিচার শুরু
আওয়ামী শাসনামলে র‌্যাবের টিএফআই সেলে ১৪ জনকে গুম ও নির্যাতনের মামলায় শেখ হাসিনা, তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। এসব মামলায় গ্রেপ্তার ১২ সেনা কর্মকর্তাকে হাজির করা হয় ট্রাইব্যুনালে। এছাড়া শতাধিক গুম ও হত্যা মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী বলেন, গুমের সাথে জড়িত এসব সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের কাছে রয়েছে। সময়মতো গুমে বাকি কুশীলবদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।