মার্কিন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে, নিহত ৩ হাজারের বেশি

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ইরান


১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪১

॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র আযমী এবং সামরিক পরাশক্তি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্র উৎখাত করে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে গঠন হয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। ইসলামী প্রজাতন্ত্র গঠনের পর থেকেই দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলসহ পশ্চিমাদের চোখরাঙানি এবং নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে চলতে চলতে অর্থনৈতিক শিরদাঁড়া চারদশকেও শক্ত করতে পারেনি। এছাড়া শিয়া-সুন্নি সংকট, মধ্যপ্রাচ্য প্রণোদনানীতি এবং সর্বোপরি শিয়াপন্থি একঘেয়েমি সরকারগুলোর অযোগ্যতার কারণে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দেশটি পরিণত হয়েছে এক জরাজীর্ণ রাষ্ট্রে। এরই ধারাবাহিকতায় ইরানে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে শুরু হওয়া ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্ষোভ থেকে সরকার পতনের ডাক দেওয়া হয়।
ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে শুরু হওয়া ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ থেকে সরকার পতনের আন্দোলন দমনে মাঠে নামানো হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী । নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজারে পৌঁছেছে। ইসরাইলি গণমাধ্যম জেরুসালেম পোস্ট জানিয়েছে, নিহতের এ সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণকে উসকে দিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভ চালিয়ে যান। সহায়তা আসছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানে মার্কিন হামলার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইরানের বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবন, মেট্রো স্টেশন, ব্যাংক ছাড়াও বাস, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল এবং জাতীয় পতাকায় আগুন দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে সরকার। ইন্টারনেট না থাকায় পরিস্থিতির পুরো চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসছে না বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বার্তা সংস্থা।
ইরানে এবারের বিক্ষোভকে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বলা হচ্ছে। এর আগে ২০২২ সালে পুলিশ হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাহাসা আমিনি নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল দেশটি। তখন সাড়ে ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০ হাজার জনের বেশি ইরানিকে। ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০০৯ সালে।
গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) লেবানন সফরকালে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সায়্যেদ আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন যে, দেশটির সাধারণ জনগণের চলমান অভ্যন্তরীণ ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলন’ মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাঈলের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে সহিংস হয়েছে। তবে ট্রাম্পের সামরিক হুমকির প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন যে, এমন অভিযানের সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট : দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় রয়েছে ইরান। এতে দেশটির অর্থনীতি আগে থেকেই নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। এরই মধ্যে গত বছরের জুন মাসে ১২ দিন ধরে চলে ইসরাইল-ইরান সংঘাত। ইসরাইলের সঙ্গে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্রও। সংঘাত চলাকালে ইরানের বিভিন্ন শহর ও পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এর জেরে ইরানে বর্তমানে অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির কারণে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। এক বছর ধরে মার্কিন ডলারের তুলনায় দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মানেও পতন চলমান। ইরানিরা মনে করছেন, ক্ষমতাসীনদের অযোগ্যতা ইরানের সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অন্যদিকে চলমান বিক্ষোভ আরও জোরদার করার ডাক দিয়েছেন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত রেজা পাহলভি।
এক পোস্টে ইরানের মানুষকে সহায়তা করতে দেশটিতে ‘হস্তক্ষেপের জন্য’ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি। তবে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, রেজা পাহলভির সঙ্গে তিনি দেখা করবেন না। এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে দেশটিতে চলমান বিক্ষোভের জন্য পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন নামের একটি সংগঠনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সংগঠনটি এমকেও নামে পরিচিত। ইসলামী বিপ্লবের পর বিরোধী এ সংগঠন বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন তারা আবার সংগঠিত হয়েছে বলে দাবি তেহরানের।
‘ট্রাম্পের হাতে ইরানিদের রক্ত’
ইরানে বিক্ষোভ যখন চরম পর্যায়ের দিকে, তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। ইরানে বিক্ষোভের প্রথম দিক থেকে বার বার উসকানি দিয়ে ট্রাম্প বলছেন, দেশটিতে হামলা চালাতে ‘প্রস্তুত’ যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের হুমকির পর টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ মুখে ‘ট্রাম্পের হাত ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত’ উল্লেখ করে দেশবাসীর প্রতি ‘ঐক্যের’ ডাক দেন। তিনি বলেন, ইরানিরা যদি ‘বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধাদের’ মতো আচরণ করে, সেটি তেহরান বরদাশত করবে না। অন্যদিকে তেহরান থেকে আল-জাজিরার তোহিদ আসাহি জানিয়েছেন, ‘তেহরানের অনেক নাগরিক’ পুলিশের কাছ থেকে ‘যেখানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে’, সেখানে যাওয়া এড়ানোর বার্তা পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশের কাছ থেকে আমরা এ সর্বশেষ খবর পেয়েছি এবং কর্মকর্তারা বলছেন, ‘সরকার দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে খুব কঠোর, খুব সিদ্ধান্তমূলক হবে।’
ইরানে অর্থনৈতিক সংকট : ইরানজুড়ে দোকানের তাকে থাকা পণ্যের দাম এখন আর এক সপ্তাহ; এমনকি একদিনও স্থির থাকছে না। অনেক ইরানির জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের হঠাৎ লাফিয়ে বৃদ্ধি এক দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং রেকর্ড নিম্নস্তরে নেমে যাওয়া মুদ্রার বিনিময় হারের বিরুদ্ধে ধর্মঘট হিসেবে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল; তা-ই এখন ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষের এক বিস্তৃত বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছে। তেহরানের ৫৫ বছর বয়সী মরিয়ম জানিয়েছেন, তিনি সম্প্রতি সূর্যমুখী তেল কেনা স্থগিত করেছিলেন এর দামের কারণে। মরিয়ম বলেন, ‘তিন দিন পর দাম দ্বিগুণের বেশি হয়ে গিয়েছিল। আমার আয় কি তিন দিনে দ্বিগুণ হয়েছে যে রান্নার তেলের জন্য আমাকে এত টাকা দিতে হবে?’ ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মহসেনি এজেহি দেশটিকে অস্থিতিশীল করতে অর্থনৈতিক দুর্দশা কাজে লাগানোর জন্য বিদেশি শক্তিকে অভিযুক্ত করে হুঁশিয়ারি দেন, যে বিক্ষোভকারীরা ‘শত্রুকে সাহায্য করছেন’ তাঁদের প্রতি কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না।
‘ইরানকে আবার মহান করুন’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ছবি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ছবিতে তাকে ‘মেক ইরান গ্রেট এগেইন’ (ইরানকে আবার মহান করুন) লেখা এবং তাতে তারই সই করা একটি টুপি হাতে দেখা যাচ্ছে। তার এ টুপি ইরানের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে। ট্রাম্পের বিখ্যাত স্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (আমেরিকাকে আবার মহান করুন) স্লোগানকে পরিবর্তন করে এ টুপি বানানো হয়েছে। টুপিতে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগের ইরানের পতাকার ছবি রয়েছে, যা সরাসরি ইরানে সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সম্প্রতি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত উড়োজাহাজ ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ ছবিটি তোলা হয়।
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছিল। জবাবে ইরান দোহার একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পরে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও গত সপ্তাহে ট্রাম্প আবারও হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় চালু করে, তবে তিনি তাদের ‘ধুলায় মিশিয়ে দেবেন’। ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের বর্তমান সরকারকে হটাতে তাদের ভেতরের একটি অংশের সঙ্গে সমঝোতা করে থাকতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমান সরকারকে হটাতে পারলে তাদেরই একটি অংশকে তিনি ক্ষমতায় রাখবেন। ইরানে শুরু হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে ট্রাম্পের এ অবস্থানকে অনেকে ভেনেজুয়েলায় তাঁর গৃহীত কৌশলের সঙ্গে তুলনা করছেন।
স্টিমসন সেন্টারের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক রান্ডা স্লিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প তেহরানের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোয় একটি বার্তা পাঠাচ্ছেন। বার্তাটি হলো ভেনেজুয়েলার দিকে তাকান। খামেনিকে সরিয়ে দিন, আমি চুক্তির জন্য প্রস্তুত।’
ছয় মাস আগেই ইরান দেখিয়ে দিয়েছে যে, তারা সহজে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যবস্তু নয়। গত বছর জুন মাসে ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে তেহরানের কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেলেও একই সঙ্গে তাদের টিকে থাকার সক্ষমতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিষেধাজ্ঞা নাকি শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা
বিক্ষোভ বাড়তে থাকায় একটি পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। ইরানের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য কতটা দায় নিষেধাজ্ঞার, আর কতটা দায় সরকারের শাসনব্যবস্থার। ইরানের অর্থনীতি বহুদিন ধরেই কিছু কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে, যেগুলো ১৯৮০ সালের পর থেকে আর সমাধান করা হয়নি। বিপ্লবী আদর্শ এবং তার সঙ্গে যুক্ত ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় একটি শক্ত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে।
অর্থনৈতিক ও আর্থিক আইনকানুনও বাকি দুনিয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি শিয়াপন্থি প্রজাতন্ত্র ইরান। এর ফলে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশটি।
এতে ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বের সামনে একটি প্রশ্ন স্থায়ীভাবে দাঁড়িয়ে গেছেÑ কেন এতগুলো সরকার এমন কোনো অর্থনৈতিক নীতি ও কর্মসূচি নিতে পারেনি, যা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারত। এ প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব; বিশেষ করে ২৫ বছরের কৌশলগত সহযোগিতা ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি তেমন কোনো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি।
২০২৫ সালের শুরুতে রাশিয়ার সঙ্গে যে কৌশলগত অংশীদারি চুক্তি সই হয়, সেটিও ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেনি। এ দুই অংশীদার মিলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের মানুষ অনেক দিন ধরেই বিক্ষোভের স্লোগানে বলে আসছে, দেশের পররাষ্ট্রনীতি; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডই রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রধান অপচয়ের কারণ। তবে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ ব্যাখ্যা কার্যকর না। লেবানন, সিরিয়া, গাজা ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। প্রথমবারের মতো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য শুধু নিষেধাজ্ঞাকেই দায়ী করা যায় না। এ স্বীকারোক্তি দেখিয়ে দেয় যে, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা এখনো সংকটের মূল কেন্দ্রে রয়েছে। সরকারের অতিমাত্রায় অযোগ্যতার কারণে জাতীয় মুদ্রার এই দুরবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি চলছে ইরানে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন ইরানের সাধারণ জনগণ। বর্তমানে ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের মান ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫। অর্থাৎ ইরানে এখন এক ডলারের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫৫ ইরানি রিয়েল।
‘আল্লাহর শত্রু’
ইরানের বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকার। একইসঙ্গে বিক্ষোভে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন, তারা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
শনিবার ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহম্মদ মোভাহেদি আজাদের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সংবিধানের ১৮৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিক্ষোভকারীদের ‘মোহারেব’ (আল্লাহর শত্রু) বলে ঘোষণা করছে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র। ‘মোহারেব’-দের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।’
‘রেড লাইন’ ঘোষণা : ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় এ লাইন কোনোভাবেই অতিক্রম করা যাবে না।
একইসঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা জনসম্পদ ও কৌশলগত স্থাপনা রক্ষায় সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করে, গত দুই রাতে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনাগুলো লক্ষ করে হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকজন সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন।
আইআরজিসি জানায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের অর্জন রক্ষা ও দেশের নিরাপত্তা বজায় রাখা একটি লাল রেখা। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজপথে প্রতিরোধ-মিছিলে প্রেসিডেন্ট
ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রের সমর্থনে ‘জাতীয় প্রতিরোধ মিছিল’ খ্যাত বিশাল সমাবেশ হয় গত সোমবার (১২ জানুয়ারি)। তেহরানের জাতীয় প্রতিরোধ মিছিলে যোগ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে মিছিলরত মানুষের সঙ্গে হাঁটতে, জাতীয় পতাকা হাতে থাকা নাগরিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়। এর আগে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এ জাতীয় প্রতিরোধ মিছিলে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। দুই সপ্তাহ ধরে চলা প্রাণঘাতী সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান জানাতেই এ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। অন্যদিকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান।
উত্তাল ইরানের শাসন : ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের ক্ষমতায় ছিলেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি। তিনি তেলের আয়ের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে তেলবহির্ভূত খাত গড়ে তোলার একটি বিকল্প অর্থনৈতিক কৌশল প্রস্তাব করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানো।
কারণ এসব নিষেধাজ্ঞা সাধারণত ইরানের তেল খাতকে লক্ষ করে দেওয়া হয়; কিন্তু ওই উদ্যোগ সফল হয়নি। ২০০২ সালের আগস্টে নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনার প্রথম ছবি প্রকাশের পর পারমাণবিক-সংকট তীব্র হয়ে ওঠে এবং বিদেশি চাপ আরও বেড়ে যায়, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
পরে ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ একটি জনতাবাদী নীতি অনুসরণ করেন। যার লক্ষ্য ছিল তেল থেকে নগদ কর্মসূচির মাধ্যমে তেলের আয় জনগণের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা। কিন্তু এ কৌশল ব্যর্থ হয়। দেশের ভেতরের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর বাধা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে এ উদ্যোগ টেকেনি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৬৯৬, ১৭৩৭, ১৭৪৭, ১৮০৩ ও ১৯২৯ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে এসব নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর ফলে তেলবাণিজ্য সীমিত হয়, আর্থিক সম্পদ জব্দ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ঢোকার পথ সংকুচিত হয়ে যায়। আর ১৯৮০ সাল থেকে চলতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রশ্ন উঠেছে খামেনী শাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
অন্যদিকে ইরানজুড়ে চলমান অস্থিরতা ও বিক্ষোভের পরিস্থিতি এখন ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। গত সোমবার তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি এ দাবি করেন।
বৈঠকে আরাঘচি বলেন, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশব্যাপী চলমান বিক্ষোভকে পরিকল্পিতভাবে ‘রক্তাক্ত ও সহিংস’ করা হয়েছে- যাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের একটি ‘অজুহাত’ খুঁজে পান।
আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, তবে সংলাপের পথও খোলা রেখেছি।’ তিনি জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সারা দেশে দ্রুত ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করার কাজ চলছে। বিশেষ করে দূতাবাস ও সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোয় দ্রুত সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী নাম উল্লেখ না করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইতিহাসের ‘অহংকারী স্বৈরশাসকদের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘যিনি দম্ভের সঙ্গে বসে সারা বিশ্বকে বিচার করছেন, তিনি জেনে রাখুন- ফেরাউন, নমরূদ ও রেজা শাহর মতো অহংকারী শাসকরা যখন ক্ষমতার চূড়ায় ছিলেন, তখনই তাঁদের পতন হয়েছিল। তাঁর (ট্রাম্প) পতনও অনিবার্য।’ ক্ষমতার চূড়ায় থেকে যারই পতন হোক খামেনী শাসন ভেনেজুয়েলা বা মাদুরো মডেলে পতন না হলেও এখনই শিয়া-সুন্নি, আঞ্চলিক সংকট নিরসন করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব করতে না পারলে শিয়াপন্থি একঘেয়েমি অযোগ্য সরকারের ইরানের অর্থনৈতিক জরাজীর্ণতার কারণে পতন হতে পারে।
সূত্র : এপি, আল-জাজিরা, ডয়েচে ভেলে, ডেইলি সাবাহ, মিডল ইস্ট আই, বিবিসি, রয়টার্স।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।