গণভোটে সচেতনতায় সরকারের কর্মসূচি
১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৪
তিন দিনের শুনানিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরেছেন ১৫০ প্রার্থী
পেশাজীবীসহ সব সংগঠনের নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারির পর
স্টাফ রিপোর্টার : নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সব রাজনৈতিক দল ব্যস্ত থাকলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট নিয়ে জামায়াত ও এনসিপি ছাড়া অন্য দলগুলোর তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদিকে নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানি চলছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে যেসব প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাদের মধ্যে যারা রিটার্নিং অফিসারের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন, তাদের আপিল শুনানি শুরু হয়েছে গত ১০ জানুয়ারি আর তা শেষ হবে আগামী ১৮ জানুয়ারি। এরপর আগামী ২১ জানুয়ারি কমিশন চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে এবং প্রতীক বরাদ্দ করবে। আগামী ২২ জানুয়ারি শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা।
তফসিল অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিল গত ২৯ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জাতীয় পার্টি-জাপাসহ ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ২ হাজার ৯১টি মনোনয়নপত্র জমা দেয়। এছাড়া স্বতন্ত্র থেকে জমা পড়ে ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়নপত্র বাছাই করে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। বৈধ হয় ১৮৪২ জনের। বাতিল ৭২৩টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ৩৫০ জনের মতো। বাকিগুলো ৫১টি নিবন্ধিত দলের। আবার দলগুলোর মধ্যে বিএনপির ২৭, জামায়াতে ইসলামীর ৯, জাতীয় পার্টির ৫৭ ও ইসলামী আন্দোলনের ৪১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বিএনপির বাতিল হওয়া ২৭ জনের মধ্যে বেশিরভাগই দলীয় পরিচয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দলীয় প্রার্থী হওয়ার প্রত্যয়ন ছিল না। অবশ্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বিএনপির পরিচয়ে ৩৩১ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর ৯ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। দলটি থেকে ২৭৬ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ প্রার্থীর মধ্যে ৪১ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। বৈধতা পান ২২৭ জন। দলগতভাবে সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বাতিল হয় জাতীয় পার্টির। দলটির ২২৪ জনের মধ্যে ৫৭ জন বাদ পড়েন। বৈধতা পান ১৬৭ জন।
যেসব কারণে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হলো
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা বাছাইয়ের সময় আইনে নির্ধারিত নিয়মকানুন মানার বিষয়ে কোনো ঘাটতি আছে কিনা, মূলত সেটা দেখেন। এক্ষেত্রে এক ডজনের মতো কারণ উঠে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা, ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর না করা, ঋণখেলাপি, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ না করা, আয়কর বিবরণী না দেওয়া, মনোনয়নপত্র পূরণে অসম্পূর্ণতা রাখা, দ্বৈত নাগরিকত্ব, মামলা সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ না করা, তথ্য গোপন করা, জামানতকারী হিসেবে ঋণখেলাপি, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের তিন বছর অতিবাহিত না হওয়া, দলের প্রত্যয়ন না দেওয়া ও ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর না থাকায় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে (স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য প্রযোজ্য বিধান)।
তিন দিনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরেছেন ১৫০ জন
আপিল শুনানির তৃতীয় দিনে ৪১ জনের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। সোমবার (১২ জানুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল শুনানির তৃতীয় দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবন অডিটরিয়ামে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি চলবে। এর আগে ১০ ও ১১ জানুয়ারি দুই দিনে ১৩২টি আপিল শুনানি শেষে মোট ১০৯ জন প্রার্থী আবার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফিরেছেন। অর্থাৎ তিন দিনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ১৫০ প্রার্থী। রিটার্নিং অফিসারদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধরা ইসিতে মোট ৬৪৫টি আপিল করেন। সেগুলো ১৮ জানুয়ারির মধ্যে শুনানি ও নিষ্পত্তি করবে কমিশন।
গণভোট নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে দেশজুড়ে কর্মসূচি
গণভোট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মসূচির বাস্তবায়ন চলছে। মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে তৃণমূলে গণভোটের বিষয়ে অস্পষ্টতা দূর করার জন্য। গত ১২ জানুয়ারি দুপুরে প্রেস উইংয়ের এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। এরই অংশ হিসেবে গত ১২ জানুয়ারি বরিশালে পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয় বিভাগীয় কর্মকর্তা সম্মেলন ও ইমাম সম্মেলন। এতে গণভোট বিষয়ে প্রশিক্ষণমূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ এবং অপর বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। আগামী কয়েকদিনে অন্যসব বিভাগেও একই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে এসব কর্মসূচিতে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় এবং ইমাম ও ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিভাগীয় পর্যায়ে ইমাম সম্মেলন ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে। ১২ জানুয়ারি রাজশাহীতে, ১৪ জানুয়ারি রংপুরে, ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামে, ১৭ জানুয়ারি ঢাকায়, ১৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহে, ২২ জানুয়ারি সিলেটে এবং ২৪ জানুয়ারি খুলনা বিভাগে কর্মসূচি রয়েছে। এসব মতবিনিময় সভায় বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ সিনিয়র শিক্ষক, বিশিষ্ট সাংবাদিক, প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদক, দোকান মালিক সমিতির প্রতিনিধি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ও এনজিও প্রধান, ধর্মীয় নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
পেশাজীবীসহ সব সংগঠনের নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারির পর
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সময়কালে বাংলাদেশে অবস্থিত যেকোনো পেশাজীবী সংগঠন বা অন্য কোনো সংগঠনের নির্বাচন আয়োজন না করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব (নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়-০১ শাখা) মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে গত ১২ জানুয়ারি এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের কার্যক্রমকে যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখার লক্ষ্যে দেশের সকল পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল প্রকারের নির্বাচন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতি, সাংবাদিক সমিতি, বণিক সমিতি (চেম্বার অব কমার্স), সমবায় সমিতি ও ট্রেড ইউনিয়নসহ অন্যসব সংগঠনের নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির পর করতে নির্বাচন কমিশন নির্দেশনা প্রদান করছে।
প্রসঙ্গত, ৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে আটটি দল প্রার্থী দেয়নি। দলগুলো হলো- বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম। এছাড়া নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ ভোটের বাইরে রয়েছে।