দুই শতকের শিক্ষার বাতিঘর কুমিল্লা জিলা স্কুল
১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৮
রেজাউল করিম রাসেল, কুমিল্লা : কুমিল্লা জিলা স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়, এটি কুমিল্লা জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক গৌরবময় অধ্যায়। যেখানে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে। ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত এ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তখনকার ত্রিপুরা জেলার শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় কুমিল্লা জেলা স্কুলে রূপ নিয়ে আজও তার ঐতিহ্য অটুট রেখেছে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে এ স্কুল যেন নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছে সাক্ষীর ভূমিকায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এখানকার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ স্কুলটিকে দিয়েছে অনন্য মর্যাদা। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া সাবেক শিক্ষার্থীদের নাম এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় স্কুল প্রাঙ্গণে, যা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। শিক্ষার মান ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে কুমিল্লা জিলা স্কুল বরাবরই আপসহীন বলে জানান বর্তমান ও সাবেক শিক্ষকরা।
মো. আবদুল হালিম নামে স্কুলের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বলেন, এ স্কুলে শিক্ষকতা করা মানে শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়, এখানে আমরা শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব অনুভব করি। সততা, শৃঙ্খলা আর দেশপ্রেম এ তিনটি বিষয় সবসময় আমাদের পাঠদানের মূল জায়গায় থাকে।
শ্যামল চন্দ্র দাস নামে স্কুলের আরেক শিক্ষক আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ক্লাসরুমে ঢুকলে আজও মনে হয় শত বছরের ইতিহাস আমাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। এ অনুভূতিই আমাদের আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। আমরা সবসময়ই দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই শিক্ষার্থীদের পাঠদান দিয়ে থাকি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে।
এদিকে শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিক সাফল্যের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও স্কুলটির সুনাম রয়েছে। বিতর্ক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞান মেলা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় এখানকার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে। স্কুলের বিশাল খেলার মাঠ, পুরনো লাল ইটের ভবন ও আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যেন অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। সাবেক শিক্ষার্থীরা কুমিল্লা জিলা স্কুলকে নিজেদের জীবনের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
মিয়া মোহাম্মদ তৌফিক নামে এ স্কুলের এক সাবেক ছাত্র ও বর্তমানে জনপ্রিয় লেখক ও সাংবাদিক বলেন, আজ আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, তার শিকড় এ স্কুলেই। এখানকার শিক্ষকরা শুধু পড়াশোনা নয়, আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। জিলা স্কুল শুধু পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয়, মানুষ তৈরির কারিগরও। কর্মজীবনে এখানকার সাবেক শিক্ষার্থীরা দূরদূরান্তে থাকলেও মাঝেমধ্যে নানান আয়োজনে তাদের মিলনমেলা ঘটে। এ স্কুলের স্মৃতি আমরা এখনো আঁকড়ে ধরে আছি।
আরেক সাবেক শিক্ষার্থী আহসান হাবিব বলেন, স্কুলের করিডোরে হাঁটলে এখনো মনে হয় কৈশোরের সেই দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। এখান থেকেই জীবনের লড়াই শুরু করার সাহস পেয়েছি।
অভিভাবকরাও এ স্কুলের প্রতি আস্থাশীল। কারণ তাদের বিশ্বাস কুমিল্লা জিলা স্কুল সন্তানদের নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ দেয়। মিজানুর রহমান নামে এক অভিভাবক বলেন, সরকারি স্কুল হলেও এখানে শৃঙ্খলা ও পড়াশোনার মান অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালো, তাই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা নিশ্চিন্ত থাকি। জেলা স্কুলে ভর্তি হওয়া মানেই এক একটি শিক্ষার্থীর জীবন পাল্টে যাওয়া।
মীর আলী নামে আরেক অভিভাবক জানান, শিক্ষকদের আন্তরিকতা আর প্রশাসনের নজরদারি আমাদের আস্থা আরও বাড়িয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম, আধুনিক বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাব যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুত করছে।
সাবেক ছাত্র সংগঠনগুলোও স্কুলটির উন্নয়ন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। নিয়মিত পুনর্মিলনী, শিক্ষাবৃত্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা করছে তারা। মাসুক আলতাফ চৌধুরী নামে এক সাবেক শিক্ষার্থী বলেন, এ স্কুল আমাদের শুধু দিয়েছে পরিচয় নয়, দিয়েছে দায়িত্ববোধ, তাই আজও আমরা চেষ্টা করি প্রতিষ্ঠানটির পাশে দাঁড়াতে। কুমিল্লা জেলা স্কুলের প্রতিটি ইট, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ যেন শত শত গল্প বহন করে, যেখানে আনন্দ, সংগ্রাম, সাফল্য আর স্বপ্ন একাকার হয়ে আছে।
জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল হাফিজ বলেন, কুমিল্লা জিলা স্কুল শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবার। এখানে আমাদের লক্ষ্য কেবল ভালো ফলাফল নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের চেতনায় গড়ে তোলা। সে লক্ষ্যে পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি নিয়মিত সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও সামাজিক সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ ও সৃজনশীলতা বিকাশে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বিজ্ঞানাগার ও কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছেÑ যাতে শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী জ্ঞান অর্জন করতে পারে। একইসঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। আমাদের বিশ্বাস, এ সমন্বিত কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই কুমিল্লা জিলা স্কুল ভবিষ্যতেও দেশের অন্যতম আদর্শ সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তার গৌরব ধরে রাখবে।