গোলাপিরা আসে


১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১০

॥ আশরাফ জামান ॥
গোলাপিরা আসে। গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে যেন আসছে শহরে। গ্রামে ভাত নেই, কাপড় নেই। ভিক্ষা চাইতে গেলে কেউ দিতে পারে না। দুর্ভিক্ষ চারদিকে। জমিতে ফসল নেই, ঘরে ধান নেই কৃষকের। ঘর-দোর-মাঠ উজাড় হয়ে গেছে। সর্বত্র হাহাকার।
মফস্বল শহর। গ্রামের লোক এসে ভরে গেছে। সারা শহরে, ফুটপাতে ভিড় এসব উদ্বাস্তুর। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির মূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। চাল চার-পাঁচ টাকা সের যা কদিন আগে দুই টাকা সের ছিল। সাবান, সোডা আর লবণ অগ্নিমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। কাপড় কাচার জন্য সোডার বিকল্প হিসেবে গরিব মানুষ ছেঁড়া কলাগাছের পাতা খোল পুড়িয়ে তার ছাই ব্যবহার করছে।
১৯৭৪ সাল। দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে দেশের অধিকাংশ মানুষ নিষ্পেষিত। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না দেশের কালোবাজারি, ঘুষখোর, টাউট, বাটপার প্রভৃতি সুবিধাবাদী কিছু মানুষ। ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ খাচ্ছে অখাদ্য-কুখাদ্য। বাজারে খাদ্যদ্রব্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে চালের কুঁড়া, আটার ভূসি, কলাই ভূসি। হোটেল-রেস্তোরাঁয় বিকেলে উদ্বাস্তুদের ভিড় পড়ে, ভাতের একটু ফ্যানের জন্য।
দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চাটারা আমার দেশের সব সম্পদ খেয়ে ফেলেছে। আমি কার বিচার করব? যেদিকে তাকাই, সেদিকেই দেখি তারা আমার লোক।
হয়তো এ চাটাদের জন্য আজ দেশে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ঘরে অভাব নেই। বরং তারা পয়সা কামাইয়ের একটা সুযোগ পেয়েছে। যাকে বলে, কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ।
লবণ, সাবান-সোডা, আটা, চালের পারমিট পেয়ে এসব নেতাকর্মী হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে যাচ্ছে। সারা পাকিস্তানে আগে যেখানে বাইশ পরিবার গোনা হতো, বর্তমান বাংলাদেশে সেখানে ধনীর সংখ্যা হয়েছে কয়েক হাজার পরিবার।
ছোট্ট শহরে গ্রাম থেকে চলে এসেছে যেসব উদ্বাস্তু, তাদের সংখ্যা অগণিত। স্কুল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বারান্দা, ঘ্যাগের দালানের বারান্দা এগুলোয় রাতে রা থাকে। দিনে নেমে আসে রাস্তয়। দুপুরে আওয়ামী ও ছাত্রলীগ কর্মীরা সরকারি লঙ্গরখানার খিচুড়ি বিতরণ করে, তখন রাস্তার দু’পাশে বসে পড়ে ওরা। প্রায় অর্ধমাইলের বিরাট লাইন হয়। কারো সামনে থালা, কেউবা কলাপাতা নিয়ে বসে। ছেলে-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী।
সারা দিনে একবার চাল-ডাল মেশানো খিচুড়ি যে পরিমাণ পাওয়া যায়, ক্ষুধা নিবৃত হয় না। সারাটা দিন আসতে থাকে গ্রাম থেকে লোকজন। মনে হয় গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে। শহরে উপচে পড়ছে মানুষ।
মানুষের একই প্রশ্ন, ‘দ্যাশ স্বাধীন করলাম কি এ খিচুড়ি খাইবার জন্য? পশ্চিমারা কি সব ভাত নিয়্যা গেছে?’
লঙ্গরখানার খিচুড়ি খাবার পর ক্ষুধার্থ মানুষগুলোর অধিকাংশ রাস্তার পাশেই পড়ে থাকে। ছিন্ন বস্ত্র পরা এসব মানুষের বুকে প্রাণ আছে, কিন্তু বোঝা যায় না। এরা মানুষ নয় যেন মানুষের কঙ্কাল।
গ্রামে অনেকদিন অভুক্ত থাকার পর শহরে এসে খিচুড়ি খেয়ে কেউবা আবার হজম করতে পারেনি বমি করা শুরু করেছে। কারোবা পেটের অসুখ হয়। কোনো কোনো এলাকায় আবার কলেরা, ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। সারা দেশের একই অবস্থা। হাজার হাজার আদম সন্তান খাদ্যের অভাবে মৃত্যুবরণ করছে।
পড়ন্ত বিকেলে যখন উদ্বাস্তু শিবিরগুলো একটু ঝিমিয়ে পড়েছে, তখন একদল যুবতী কোথা থেকে বেরিয়ে এলো। ওরা হাত ধরে খালি পায়ে শিস মেরে রাস্তা দিয়ে চলে। মুখে হাসি, বুকের কাপড় পড়ে পড়ে যায়। শহরে লোকজন ওদের নাম দিয়েছে গোলাপি।
এ গোলাপিরা ক্ষুধার তাড়নায় গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছে। এদের একেকজনের একেক ধরনের ইতিহাস থাকলেও মুখ্য উদ্দেশ্য একটাই।
দেহ ভঙ্গিমা, উৎকট হাসি, মুখে উগ্র প্রসাধনী মেখে দিব্যি হাত ধরে বেড়ায়। রাত ৭টা-৮টা পর্যন্ত তাদের দেখা যায়, তারপর আর দেখা যায় না। দেখা যায় পরদিন সকালে আবার ঘুমন্ত অবস্থায়। তবে দিনের অর্ধেক এরা ঘুমিয়ে কাটায়। রাতে ঘুমানোর সময় এদের কম। এত দুর্ভিক্ষের ভিড়েও ওদের খাদ্যের প্রতি অরুচি। লঙ্গরখানার লাইনে ওরা বসে না। ছিন্ন কাপড়ও ওদের পরতে হয় না।
ছবুরা, আছিয়া, মালতি ওরা এসেছে পশ্চিমের এলাকা থেকে। অবশ্য একসঙ্গে আসেনি। শহরে আসার পর ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে।
ছবুরা কাতুলী গ্রামের কৃষক আবুল মিয়ার মেয়ে। বয়স ষোলো বছর। গরিব বাবা, ভাত-কাপড়ের নিশ্চিত আশায় বিয়ে দিয়েছিল এক বৃদ্ধের কাছে। বৃদ্ধ বিপত্নীক। ঘরে বিবাহযোগ্য ছেলেমেয়ে রয়েছে। তাদের ব্যবস্থা না করে নিজেই বিয়ে করে।
স্বামীর সংসারে এসে ছবুরার অন্তত ভাতের অভাব মিটেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য- সত্তর বছরের বৃদ্ধ স্বামী দু’বছরের মধ্যেই মারা যায়। যার ফলে সেখানে আর টিকতে পারেনি। সতীন পুত্র ও কন্যারা তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। পিটিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে দেয় উঠতে-বসতে। সৎমাকে তারা সহ্য করতে পারে না।
স্বামীর সংসারের মায়া ত্যাগ করে ফিরে আসে বাপের সংসারে। কিন্তু বাবা তাকে আশ্রয় দিলেও খাবার দিতে পারে না। অগত্যা বাবার সংসার ত্যাগ করে শহরে চলে আসে ছবুরা।
এসে ভালোই থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি ভালো থাকতে। একদিকে পেটের জ¦ালা, অন্যদিকে যৌবনের। দুটিকে এক করে মিলিয়ে যোগ দিয়েছে গোলাপিদের দলে।
আছিয়া সতেরো বছর বয়সের এক তরুণী। বাবা নেই। মা ও ছোট দুটি ভাই নিয়ে তাদের সংসার। মিয়াবাড়ি, তালকদার বাড়িতে কাজ করত। ধান মাড়াই, উড়ানো থেকে শুরু করে, ধানভানা পর্যন্ত কাজগুলো করতে হতো। এখন মাঠে ধান নেই, কৃষিকাজ নেই। শেষ পর্যন্ত মা ও ছোট ভাইদের নিয়ে শহরে চলে এসেছে। শিবনাথ স্কুল বারান্দায় থাকতে গিয়ে পরিচয় হয় ছবুরা ও মালতির সাথে।
একদিন ভূঞাপুর থেকে একটা বাসে এক মুরগির পাইকার কয়েক ঝুড়ি মুরগি নিয়ে ঢাকার দিকে রওনা হয়েছিল। টাঙ্গাইল পৌঁছার পর বাসস্ট্যান্ড এসে দেখতে পেল দুই ঝুড়ি মুরগি মরে গেছে। হয়তো মুরগির মড়ক লেগেছিল। দুই ঝুড়ির থেকে অন্তত শতখানেক মরা মুরগি রাস্তায় ফেলে দিচ্ছিল।
আর যায় কোথায়? এমন একটা সূবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা যায়? খবর পেয়ে শিবনাথ স্কুলের উদ্বাস্তুদের মধ্য থেকে একদল মেয়েলোক দৌড়ে এসে উপস্থিত। এসে একেকটি মুরগি নিয়ে দু-তিনজন টানাটানি শুরু করল। একটু শক্তিশালী যারা, তারা কেউবা একাধিক নিয়ে গেল। বহুদিন পর গোশত খাওয়ার এমন একটা সুযোগ কেউ ছাড়বে?
তাদের এ কাজে বাধা দিতে এলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম সাহেব। তিনি বার বার বলছিলেন, তোমরা এগুলো খেয়ো না। মরা মুরগি খাওয়া হারাম।
উত্তরে কয়েকজন মেয়েলোক বলল, ‘হুজুর! আপনেগো জন্যি হারাম হইলেও আমাগো জন্যি হালাল। আমরা মানুষ না পশু। আমাগো মতন খিদা থাকলে আর ওসব কইতেন না।’
অগত্যা ইমাম সাহেব চলে গেলেন। আছিয়াও ছিল ওদের দলে। ওর মা কতদিন হয় গোশত খায়নি। মাকে গোশত খাওয়ানোর শখ ছিল তার। মাত্র দু’দিন আগে একদিন ওর মা স্বপ্ন দেখে মেয়েকে বলেছিল, ‘মারে! খোয়াবে দেখলাম তোর বাবা মুগনিরহাট থুনে একটা বড় মুরগি আনছে। আইন্যা কইলো আছুরণ। মুরগি আনলাম, জবাই কর। হগলে মিল্যা প্যাট ভইর‌্যা ভাত খাই।’
অশ্রুভরা চোখে তার মা বলল, আছুরে কতদিন অয় কালু আর মালুরে এক টুকরো গোশত খাওয়াইবার পারি নাই।
দুঃখের দিনেও হাসল আছিয়া। বলল, মাগো! ভাত পাই না তয় আবার গোশতের কতা কও?
হঠাৎ তাই গোশত খাবার এমনি একটা সুযোগ হাতছাড়া করতে পারে না আছিয়া।
মুহূর্তে একটা মুরগি হাতে নিয়ে গিয়ে উঠলো মায়ের কাছে। মনে হলো সে যেন এক রাজ্য জয় করে এসেছে। মা ও ছোট দুটি ভাই নিয়ে সেদিন তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েছিল মৃত মুরগির গোশত। এসব কথা ভাবলে আজ কান্না পায় আছিয়ার।
আজ তার ভাত মাংশের অভাব নেই। যতদিন রূপ আছে, যৌবন আছে, ততদিন কোনো অভাব তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। দুঃখ হয়, তার ছোট দুটি ভাইয়ের জন্য। ছোট ভাই দুটি ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে মারা গেছে। তারপর ওর মা কোথায় চলে গেছে কেউ বলতে পারে না।
এরপর এ পথ বেছে নিয়েছে আছিয়া। রাতে খদ্দেরের ধান্দায় বের হয়। প্রতি রাতে বিশ-ত্রিশ টাকা আয় হয়।
ওদের আরেক বান্ধবী মালতি। হিন্দু বিধবা মেয়ে। বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি। মালতি বলে, সতী-সাবিত্রিই সে ছিল। স্বামী কালিপদর সংসারে। কিশোরী মালতির রূপ-লাবণ্য ভরা দেহের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হতো অনেকেই। গ্রামের ছেলে সতীশ প্রেম নিবেদন করে ব্যর্থ হয়েছে। বাবা-মা পছন্দ করেই স্বগোত্রের পাত্র কালিপদর সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য, বছর না ঘুরতেই ক্ষয়রোগে মারা গেল জোয়ান স্বামী।
তারপর থেকে চলছে মালতির বৈধব্য যন্ত্রণা। বাপের বাড়ি থাকতে কত প্রলোভন, কত ইশারা নরপশুদের। মালতির চরিত্রে কেউ সামান্য কলঙ্কের ছাপ দিতে পারেনি। তার সংকল্প থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হয়নি সে।
আজ প্রায় পনেরো বছর আগের কথা। সতী-সাধ্বী নারী মালতির চরিত্র নিজে রক্ষা করতে পারল না। একদিকে পুরুষ হায়েনার চোখ; অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের কালোগ্রাসে সংকল্প পথে দৃঢ়ভাবে থাকতে দিল না তাকে।
আজ সে নিজেই হাত দিয়ে ইশারা করে ডাকে খরিদদারদের। বয়স একটু বেশি হলেও দেখতে সুন্দরী। তাই চাহিদা আছে লম্পট গ্রাহকদের কাছে।
বৃদ্ধ রহিমুদ্দীন শেখ কাকুয়া গ্রামের বাসিন্দা। সপরিবারে এসে উঠেছে ঘ্যাগের দালানের বারান্দায়। সপ্তাহখানিক আগে কলেরা রোগে তার বিবি মারা গেছে। কাফনের কাপড়ের অভাবে তার বিবিকে নিজহাতে কলার পাতা দিয়ে দাফন করেছে। অথচ একদিন সে ছিল কাপড়ের কারিগর। একদিন রহিমুদ্দীন তার আশপাশের দু-চারজনকে নিয়ে সন্তোষ গেল মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। ফিরে এসে জানাল, তোমরা ডর পাইয়ো না, ভাসানী হুজুর কইছে দেশে অভাব দূর হইয়া যাইবো। তাছাড়া শেখ সাবকে তোমাগো টাঙ্গাইলে আগে বেশি রিলিফ দেওনের ব্যবস্থা করবেন।
বৃদ্ধের কথায় উপস্থিত সকলে কে কী বুঝল, বোঝা গেল না। তবে কোনো মন্তব্য না করে চলে গেল।
কিন্তু দেশের অবস্থার অবনতি দিন দিন বাড়ছে। টাঙ্গাইলেও মারা যাচ্ছে অনেক আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা।
গ্রাম থেকে গোলাপিদের আবাসন কমছে না, বরং বাড়ছেই।

বাংলা সাহিত্যে রোজা
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৬

আল মাহমুদের গল্পে প্রেম ও প্রকৃতি
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫

প্রেরণার বাতিঘর : আল মাহমুদ
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৪

বাবারা এমনই হয়
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:০৩