অবিভক্ত বাংলার মনীষা : ড. আজিজুল হক


১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৯

॥ শাহানারা স্বপ্না ॥
মোহাম্মদ আজিজুল হক (১৮৯২-১৯৪৭) অবিভক্ত বাংলার কীর্তিমান এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের চাপে পিষ্ট বাঙালি মুসলমানদের অস্তিত্ব পুনরুজ্জীবনে রেখেছেন অসামান্য অবদান। মুসলমান সমাজের অবক্ষয় ও দুর্দিনের সহায়তায় দরদি মনে নিজের শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে আসার প্রেরণা অনুভব করেন। বাংলার কৃষকদের অবস্থা ছিল শোচনীয়। তিনি মুসলিম শিক্ষার্থীদের দুর্দশা লাঘবে এবং মেহনতি কৃষকদের কল্যাণে সময়, মেধা ও শ্রম ব্যয়ে উন্নয়নের চেষ্টা করেন। তিনি ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক ও সমাজসেবক। শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষা প্রবর্তন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ প্রতিষ্ঠা তাঁর অন্যতম কীর্তি।
ড. আজিজুল হক ১৮৯২ সালের ২৭ নভেম্বর নদিয়া জেলার শান্তিপুর গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মুন্সি মনিরুদ্দীন আহমদ। তিনি অবিভক্ত বাংলার বিখ্যাত কবি মোজাম্মেল হকের দৌহিত্র। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। অল্প বয়সে মাকে হারান। মায়ের মৃত্যুর পর পিতৃব্য কবি মোজাম্মেল হকের তত্ত্বাবধানে ও অভিভাবকত্বে এবং একজন নিঃসন্তান চাচির কাছে বেড়ে ওঠেন।
শান্তিপুরে পিতামহের প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক বিদ্যালয়ে আরবি ও বাংলা শেখার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯০৭ সালে তিনি শান্তিপুর হাই মুসলিম ইংরেজি স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে এফ.এ. ও বি.এ অধ্যয়ন করেন। ১৯০৯ সালে এফ.এ ও ১৯১১ সালে ডিস্টিংশনসহ বি.এ. পাস করেন। কলকাতা ইউনিভার্সিটি ল’ কলেজ থেকে ১৯১৪ সালে বি.এল. ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু এবং ইংরেজি ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি মুসলিম ইনস্টিটিউটের কর্মকাণ্ডে এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যাদি বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
ড. আজিজুল হক বাংলার কৃষক ও কৃষি উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। ১৯১২ সালে যখন তিনি একজন আইনের ছাত্র এবং মুসলিম ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক সম্পাদক ছিলেন, তখন মুসলমান ছাত্রদের দুর্দশার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগবশত ‘গড়যধসসবফধহ ঊফঁপধঃরড়হ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটি তিনি বাংলার পাবলিক ইনস্ট্রাকশন-এর পরিচালক ডব্লিউ হর্নেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মুসলিম ইনস্টিটিউটের এক সভায় পাঠ করেন। পরে পরিচালকের উৎসাহ ও সমর্থনে এটি ’হিস্টরি অ্যান্ড প্রব্লেমস অব মুসলিম এডুকেশন ইন বেঙ্গল’ নামে বই আকারে ১৯১৭ সালে প্রকাশিত হয়।
ড. আজিজুল হক ১৯১৫ সালে কৃষ্ণনগর জেলা আদালতে ওকালতির মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেটনা ইউনিয়ন বোর্ড প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯২৬ সালে নদিয়া জেলার সরকারি উকিল (জিপি) ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) পদ লাভ করেন। এ বছরই তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৬-১৯৩৪ পর্যন্ত নদিয়া জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২৯ সালে ব্যবস্থাপক সভায় পুনর্নির্বাচিত। এ নির্বাচনে শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক তাকে সমর্থন করেন। ১৯৩৩ এ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কৃষ্ণনগর মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৩৪-এর ১৫ জুন তিনি বঙ্গীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। একই বছর ব্যবস্থাপক সভার স্পিকার নির্বাচিত হন, ১৯৪২ পর্যন্ত এ পদে বহাল থাকেন। ১৯৩৮ সালের আগস্ট মাসে দুই বছরের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিযুক্ত হন এবং ১৯৪২-এর মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৪২ সালের এপ্রিলে লন্ডনে ভারতের হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। ১৯৪৩ সালে ভারতের বড় লাটের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য নিযুক্ত হন এবং বাণিজ্য, শিল্প, বেসামরিক সরবরাহ ও খাদ্য বিভাগের ক্যাবিনেট মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি ভাইসরয় লর্ড লিনলিখগো ও লর্ড ওয়াাভেলের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।
ড. আজিজুল হক ১৯৪৫ সালে কেন্দ্রের মন্ত্রিত্ব থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। যোগদান করেন কলকাতা হাইকোর্টে। ১৯৪৬-এ মুসলিম লীগের টিকিটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ও গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত বঙ্গের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন।
রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও লেখক হিসেবে প্রভুত খ্যাতি লাভ করেন। তিনিই প্রথম সরকারি স্কুলে শিক্ষার মাধ্যমে ইংরেজির সাথে বাংলা চালু করেন। ১৯৪০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা পরিকল্পনাকে অ্যাক্টে পরিণত এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা সপ্তাহ পালন কর্মসূচি প্রবর্তন, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার মহাজনী বিল ও প্রজাস্বত্ব আইন উপস্থাপন তার যুগান্তকারী কীর্তি।
১৯২৬ সালে আজিজুল হক খানবাহাদুর, ১৯৩৭ সালে সি.আ.ই, ১৯৩৯ সালে নাইট উপাধি পান। তিনি ইউথ, টি.সি. অনারারি লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিলেন। ১৯৩৯ সালে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সমাবর্তন ভাষণ প্রদান করেন। ১৯৪০-এ রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে শ্রী নিকেতনের বার্ষিক উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন। বগুড়ায় তার নামে ১৯৩৯ সালের ৯ জুলাই ‘আজিজুল হক কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজ অব্দি সুনামের সাথে সমাজে আলো বিলিয়ে যাচ্ছে। ১৯৪৬ সালে তিনি কে.সি.এস.আই উপাধি পান। তাঁকে ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধিতে সম্মানিত করেন।
১৯৪৬ সালে ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের আহ্বানে তিনি ব্রিটিশ সরকারের দেয়া সমস্ত খেতাব বর্জন করেন।
তিনি অনেকগুলো মূল্যবান গ্রন্থ লিখেছেন। তার মধ্যে ‘হিস্ট্রি অ্যান্ড প্রবলেমস অব মুসলিম এডুকেশন ইন বেঙ্গল’, ‘দ্য ম্যান বিহাইন্ড দ্য প্লাউ’, ‘দ্য সোর্ড অব দ্য ক্রিসেন্ট মুন’ বিখ্যাত। এছাড়াও ‘হযরত মোহাম্মদ (সা.) জীবন চরিত্র’ তাঁর প্রকাশিত একটি গ্রন্থ। তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ম্যান বিহাইন্ড দ্য প্লাউ’ (১৯৩৯) বইটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ. ক্লাসের পাঠ্য ছিল।
অসাধারণ বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মহান যশস্বী মানুষটি ১৯৪৭ সালের ১৯ মার্চ তারিখে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে কলকাতায় ইন্তেকাল করেন।
২৭ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার এ মহান মনীষার আবির্ভাবের দিন। জাতির খেদমতে তিনি করেছেন অসংখ্য কল্যাণকর কাজ। অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, সমাজসেবক, আইনজীবী, কীর্তিমান লেখক ও গুণগ্রাহী স্যার ড. আজিজুল হক ইতিহাসে অমর গৌরবের আসন অলংকৃত করে রেখেছেন।