ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা

প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে নেয়ায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড়


৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:১০

গত ৫ জানুয়ারি সোমবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জাতীয় পরিষদের বাইরে নিকোলাস মাদুরোর মুক্তির দাবিতে তার সমর্থকদের বিক্ষোভ। এ সময় তাদের হাতে নিকোলাস মাদুরোর ছবি দেখা যায় ছবি: রয়টার্স

॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল॥
যুক্তরাষ্ট্র গত ৩ জানুয়ারি শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ভয়াবহ সামরিক হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিউইয়র্কের ব্রুকলিন জেলে নিয়ে যায়। ভেনেজুয়েলা সরকার অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র কারাকাসে ‘আগ্রাসন’ চালিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘সামরিক আগ্রাসন’ প্রত্যাখ্যান করছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা
কারাকাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় বিকট বিস্ফোরণের পর ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায় গত ৩ জানুয়ারি ভোরে। স্থাপনা দুটির একটি হলো শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত লা কারলোটা সামরিক বিমানঘাঁটি। অন্য সামরিক ঘাঁটি হলো ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটি। গত ৫ জানুয়ারি সোমবারও ট্রাম্প বলেছেন, মাদুরোর ক্ষমতা ত্যাগ করাই হবে ‘বুদ্ধিমানের কাজ’। পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য ৫ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলা আক্রান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘ঠিক এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র কারাকাসে বোমা হামলা চালাচ্ছে…।’ পাশাপাশি কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনায়’ যুক্তরাষ্ট্র
মাদুরোকে গ্রেফতারের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন নিরাপদে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা ‘পরিচালনা’ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
মাদুরোকে আটকের এ অভিযানের প্রশংসা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটি আমেরিকার ইতিহাসে আমেরিকার সামরিক শক্তি ও সক্ষমতার সবচেয়ে বিস্ময়কর, কার্যকর ও শক্তিশালী প্রদর্শনী।’
ট্রাম্প বলেন, মাদুরোকে ‘বিচারের আওতায় আনতে’ কারাকাসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ‘একটি শক্তিশালী সামরিক দুর্গে’ অভিযান চালায় মার্কিন বাহিনী। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোনো দেশই তা অর্জন করতে পারত না, যা আমেরিকা (মাদুরোকে আটক করে) অর্জন করেছে।’ ট্রাম্প আরও দাবি করেন, এ অভিযানের সময় ভেনেজুয়েলার সব সামরিক সক্ষমতাকে ‘অকার্যকর’ করে দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করার মানে দেশটিতে মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েন কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা স্থলসেনা মোতায়েনে ভয় পাই না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি, দেশটি (ভেনেজুয়েলা) যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয়।’
ভেনেজুয়েলা পরিচালনার জন্য ঠিক কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হবে, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এ মুহূর্তে লোক মনোনীত করছি এবং আমরা আপনাদের জানিয়ে দেব তারা কারা।’ ভেনেজুয়েলা কে শাসন করবেÑ এমন প্রশ্নে নিজের ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দিকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মূলত আমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোই মোটা দাগে দেশটি পরিচালনা করতে যাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় ‘শাসন’ বৈধ
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ট্যাবলয়েড দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যখন প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করা হয়, ভেনেজুয়েলা চালাতে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরা যা চাই তা করেন, তবে আমাদের সেটা করতে হবে না।’
এখন প্রশ্ন হলোÑ দেলসি রদ্রিগেজ যদি ট্রাম্পের কথা মানতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি কীভাবে দেশটি চালাবেন? ট্রাম্প এর কোনো আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করেননি, যা আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে।
‘কারডোজো স্কুল অব ল’-এর অধ্যাপক রেবেকা ইংবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ কোনো আইনি পথ তিনি দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইনে একটি অবৈধ দখলদারত্বের মতো শোনাচ্ছে এবং ঘরোয়া আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই।
তবে ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযান এখানে খুব একটা বড় উদাহরণ হতে পারে না। সে সময় নরিয়েগা নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করলে বিরোধদলীয় প্রার্থী গুইলারমো এনদারাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে শপথ পাঠ করানো হয়েছিল। তখন এনদারাই পানামা চালিয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব নেননি।
ভেনেজুয়েলাজুড়ে উদ্বেগ-অনিশ্চয়তা
চলমান অনিশ্চয়তার কারণে ভেনেজুয়েলার কিছু মানুষ দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সীমান্ত পেরিয়ে তারা কলম্বিয়ার কুকুটা শহরে যেতে চান। তাদের একজন কারিনা রে। তিনি মাত্রই সীমান্ত পেরিয়েছেন। তিনি সীমান্তের ওপারে ভেনেজুয়েলার সান ক্রিস্টোবল নগরে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে জানান।
অন্যদিকে কারাকাসের ব্যবসায়ী হুয়ান কার্লোস রিঙ্কন সতর্ক অবস্থায় আছেন। তিনি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘সত্যিটা হলো, এর পেছনে অনেক কারসাজি আছে। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই, এগিয়ে যেতে চাই এবং চাই ভেনেজুয়েলা অন্যান্য দেশের মতো নিজের ভাগ্য এবং নিজের নেতা নির্বাচনের অধিকার রাখুক।’
আর সশস্ত্র সংঘাত-সংক্রান্ত লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তিজিয়ানো ব্রেদা বলেন, পরবর্তী পরিস্থিতি নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়ার ওপর।
কারাকাসে মিছিল ও বিশ্বজুড়ে নিন্দা
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে এবং একে ‘কাপুরুষোচিত অপহরণ’ বলেছেন ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভøাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ।
লোপেজ বলেন, প্রেসিডেন্টের কয়েকজন দেহরক্ষীকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার বেশ কয়েকজন সেনা ও বেসামরিক নাগরিকও নিহত হয়েছেন।
মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ৯০ দিনের জন্য ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। রদ্রিগেজ একই সঙ্গে দেশটির তেলমন্ত্রী। রোববার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ওই বক্তব্যে পাদ্রিনো লোপেজ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি শপথ নিয়েছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে যদিও নিউইয়র্কের আদালতে মাদুরো নিজেকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট বলে দাবি করেছেন।
টেলিফোনে দ্য আটলান্টিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘দেলসি রদ্রিগেজ যদি সঠিক কাজ না করেন, তবে তাঁকেও খুব বড় মূল্য চুকাতে হবে- সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড়।’
মাদুরোকে তুলে আনা কি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে আনা জাতিসংঘের সনদের লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে, যে সনদ যুক্তরাষ্ট্রও স্বাক্ষর করেছে। জাতিসংঘের সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য কোনো দেশের সার্বভৌম অঞ্চলে অনুমতি ছাড়া, আত্মরক্ষা ছাড়া বা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমতি ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না।
যদিও ১৯৮৯ সালে পানামা অভিযানের সময় বিচার বিভাগের আইনি পরামর্শক অফিস (ওএলসি) দাবি করেছিল, মার্কিন ফৌজদারি মামলার কোনো পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিদেশে এফবিআই পাঠানোর ‘সহজাত সাংবিধানিক ক্ষমতা’ বুশের আছে, এমনকি যদি সেই অভিযানে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়ে থাকে তবুও।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র যখন বিদেশের মাটিতে ড্রোন হামলা চালায়, তখন তারা দাবি করে, সেই দেশের সরকারের অনুমতি আছে অথবা এটি আত্মরক্ষার জন্য করা হয়েছে। কিন্তু কাউকে বিচারের জন্য গ্রেপ্তার করা ‘আইন প্রয়োগকারী’ কাজ, এটি কোনো ‘আত্মরক্ষা’ নয়।
১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য পানামায় অভিযানের নিন্দা জানানোর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৭৫-২০ ভোটে এটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মাদুরো কি ‘দায়মুক্তি’ পাবেন
১৮১২ সালের এক রায় থেকেই সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেন, ‘সার্বভৌম ব্যক্তি’ বিদেশি ভূখণ্ডে গ্রেপ্তার বা আটক থেকে মুক্ত থাকবেন। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বার বার বলেছেন, মাদুরো ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট নন। বরং তিনি একটি মাদক পাচারকারী সংস্থার প্রধান, যিনি সরকারের ছদ্মবেশে আছেন।
পানামার তৎকালীন নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের পর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ছাড় দেওয়ার দাবি করেছিলেন তার আইনজীবী। কিন্তু তৎকালীন বুশ প্রশাসন যুক্তি দেখিয়েছিল, তিনি এর যোগ্য নন। ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ও আপিল আদালত নরিয়েগার বিপক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার জাতীয় নির্বাচনী কাউন্সিল ২০১৮ ও ২০২৪ সালে নিকোলা মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেই ফলাফলে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ২০১৯ সাল থেকে এবং জো বাইডেনের মেয়াদে ২০২৪ সাল থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেয়নি।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন তেল কোম্পানি
ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন দ্বার উন্মোচন করবে, যারা শিগগিরই দেশটির বিশাল জ্বালানি প্রকল্পগুলোয় অংশ নেবে। তিনি দাবি করেন, ‘সবাই জানে, ভেনেজুয়েলার তেলের ব্যবসা দীর্ঘসময় ধরে পুরোপুরি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল। তারা যতটা পারত, তার তুলনায় তারা প্রায় কিছুই উত্তোলন করতে পারছিল না।’
মাদুরো আটক : ভেনেজুয়েলা সরকারের সম্পৃক্ততা
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, এ কাজে যুক্ত ছিল ছোট্ট একটা দল, যার মধ্যে ভেনেজুয়েলার সরকারে থাকা একটি সূত্রও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল।
ডিসেম্বরের শুরুতে ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিসোলভ’ নামে এক মিশনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এটি ছিল বহু মাস ধরে করা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিকল্পনা আর অনুশীলনের (রিহার্সাল) ফল, যাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট শাখা ডেলটা ফোর্সকে। অভিজাত এ বাহিনীর সদস্যরা মাদুরোর প্রাসাদের সমান আকারের একটি মডেল বানিয়ে অনুশীলন করেছেন।
এটি এমন পরিকল্পনা, যাকে বলা হচ্ছে স্নায়ুযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযান, তা ছিল চূড়ান্ত গোপনীয়।
মাদুরোকে তুলে নেওয়া ‘ডেল্টা ফোর্স’ কী?
বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর একাধিক বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। এসবের মধ্যে ডেল্টা ফোর্স অন্যতম। এ ইউনিট মূলত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, জিম্মি উদ্ধার, সরাসরি সামরিক হামলা ও বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি-সংক্রান্ত কাজের জন্য প্রশিক্ষিত। চড়া মূল্যের লক্ষ্য পূরণে ডেল্টা ফোর্সকে ব্যবহার করা হয়।
ডেল্টা ফোর্স প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৭ সালে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্পেশাল অপারেশন্স কমান্ডের (জেএসওসি) সরাসরি অধীনে কাজ করে। নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ব্র্যাগভিত্তিক ডেল্টা ফোর্সের মোট ৮টি অপারেশনাল ‘সেবরে স্কোয়াড্রন’ বা হামলা চালানোর উপযোগী স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট রয়েছে।
ডেল্টা ফোর্স-সম্পর্কিত প্রায় সব তথ্যই সর্বোচ্চ মাত্রায় গোপন রাখা হয়। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে এ ইউনিটকে সবচেয়ে জটিল, গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে পাঠানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কুখ্যাত ‘এসইএএল টিম সিক্স’-এর মতো ডেল্টা ফোর্স সাম্প্রতিক ইতিহাসে বেশ কয়েকটি আলোচিত সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে ১৯৯৩ সালে সোমালিয়ার উদ্ধার অভিযান অন্যতম।
ওই বছর সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উড়োজাহাজ গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। কয়েকজন মার্কিন সেনা আটকা পড়েন। তাঁদের উদ্ধারে পরিচালিত অভিযানে ডেল্টা ফোর্স অংশ নিয়েছিল। এ অভিযান নিয়ে ২০০১ সালে ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ নামের একটি ছবি মুক্তি পায়।
লাতিন আমেরিকার দেশ পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ধরতে ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ পরিচালনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এতেও অংশ নিয়েছিল ডেল্টা ফোর্স। গত ৩ জানুয়ারি শনিবার শেষরাতে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কর্মকর্তা অপারেশন জাস্ট কজের প্রসঙ্গ টেনেছেন।
গত দশকগুলোয় এ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশই প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো না কোনোভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। মেক্সিকোর ভূখণ্ড টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোয় আগ্রাসন চালায়। ১৮৪৭ সালে মার্কিন সেনারা রাজধানী মেক্সিকো সিটি দখল করে নেয়। ১৮৪৮ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে।
১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে কিউবার স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র। এই বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র পুয়ের্তো রিকোর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে এবং ১৯০২ সাল পর্যন্ত কিউবা দখল করে রাখে। সে বছর একটি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন নৌবাহিনীকে গুয়ানতানামো বের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন সেনারা ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত এবং আবার ১৯১৭ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত দ্বীপটি দখলে রাখে। ফিদেল কাস্ত্রোর ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ১৯৬১ সালে ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আগ্রাসনে সমর্থন দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৫ সালে হাইতিতে আগ্রাসন চালায়। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তারা দেশটির শুল্ক ও অর্থ দপ্তর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে।
আবার ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গোলার্টকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রায় ২৭ হাজার সেনা নিয়ে পানামায় আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেন। এর লক্ষ্য ছিল স্বৈরশাসক নরিয়েগাকে আটক করা। সিআইএর এ সাবেক মিত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এ আগ্রাসনে পানামার প্রায় ৩০০ সেনার পাশাপাশি আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এ হামলার কয়েক ঘণ্টা পর নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষিত গিয়েরমো এন্দারাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসায় যুক্তরাষ্ট্র।
দেশ ছাড়া বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানকে গ্রেফতারের ও নজীর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ১৯৮৯ সালে গভীর রাতে পানামায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে অপসারণের জন্য হামলা চালানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সুরক্ষা, অগণতান্ত্রিক আচরণ, দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসার কারণ দেখিয়ে এ হামলা করা হয়।
পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান শুরুর পরপরই নিজের বিপদ আঁচ করতে পারেন নরিয়েগা। তিনি পানামা সিটির ভ্যাটিকান কূটনৈতিক মিশনে আশ্রয় নেন। বিষয়টি মার্কিন সেনাদের নজর এড়ায়নি।
নরিয়েগাকে দূতাবাস থেকে বের করে আনতে মার্কিন বাহিনী অভিনব কৌশল গ্রহণ করে। ভ্যাটিকানের কূটনৈতিক মিশনে মার্কিন বাহিনী জোর করে ঢুকতে পারবে না। তাই তারা নরিয়েগার বিরুদ্ধে কৌশলী লড়াই শুরু করে। মিশনের বাইরে উচ্চ শব্দে রক মিউজিক বাজাতে শুরুর করে।
দিনরাত ২৪ ঘণ্টা উচ্চশব্দে সেই সময়ের জনপ্রিয় সব হার্ড রক ব্যান্ডের গান বাজতে থাকে। মানসিক অত্যাচারের কাছে অবশেষে হার মানেন নরিয়েগা। ভ্যাটিকান মিশন থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। ১৯৯০ সালের ৩ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। নরিয়েগা ১১ দিন ভ্যাটিকান মিশনে লুকিয়ে ছিলেন।
২০০৩ সালের ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ইরাকে হামলা চালায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের কাছে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ আছেÑ এমন অভিযোগে এ হামলা চালানো হয়েছিল।
২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন সেনাবাহিনী। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাঁসি দেওয়া হয় তাঁকে।
এছাড়া মধ্য আমেরিকার দেশ হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো এরনান্দেজকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুসিগালপায় নিজ বাড়ি থেকে অরল্যান্ডো এরনান্দেজকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভেনেজুয়েলার পর কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকোর দিকে দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের
ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামে সামরিক অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতারের পর দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রের চোখ এখন কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোর দিকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সতর্ক করে বলেন, তাকে ‘নিজের খবর রাখতে হবে।’ সাংবাদিকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি কোকেন তৈরি করছেন এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন।
মাদুরোর নাম উল্লেখ না করেই পেত্রো ওয়াশিংটনের অভিযানকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, এর ফলে মানবিক সংকট তৈরি হবে। মাদকবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দেন যে, কলম্বিয়ার মাদক উৎপাদন ল্যাবেও হামলা চালানো হতে পারে। একে পেত্রো ‘আক্রমণের হুমকি’ বলে নিন্দা করেন।
মেক্সিকো ও কিউবার উদ্দেশে বার্তা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। তিনি বলেন, আমি যদি হাভানায় সরকারে থাকতাম, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও চিন্তিত হতাম।
লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে ১৯৬১ সালের কিউবান নির্বাসিতদের নেতৃত্বাধীন ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ অভিযান, যা ফিদেল কাস্ত্রোকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল। মেক্সিকো প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটির সঙ্গে কিছু একটা করতেই হবে। তিনি দাবি করেন, আমরা তার (প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমের) সঙ্গে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। তিনি একজন ভালো নারী। কিন্তু মেক্সিকো চালাচ্ছে মাদক কার্টেলগুলো।
ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছেন ‘আপনি কি চান আমরা ওই কার্টেলগুলোকে গুঁড়িয়ে দিই?’ কিন্তু তিনি নাকি সবসময়ই ‘না’ বলেছেন।
বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক গত ৩ জানুয়ারি শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ভয়াবহ সামরিক হামলা চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কের ব্রুকলিন আদালতের মুখোমুখি করার ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন বলতে আর বিশ্ব রাজনীতিতে আসলে তেমন কোন কিছু নেই। সুতরাং অচিরেই বিশ্ববাসীকে নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে।
তথ্যসূত্র: গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা, বিবিসি, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন।
লেখক: এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।