গুম-খুনের নির্দেশদাতা শেখ হাসিনাসহ পিশাচদের অবিলম্বে বিচার শুরু করা হোক


৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫৮

॥ জামশেদ মেহদী ॥
শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশ হওয়ার পর প্রথম গুম-খুন করেন। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ‘১৯৭১ সালের শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে বাংলাদেশে গুমের প্রথম ঘটনাগুলো ঘটে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অনেক সদস্য, সেনা অফিসার এবং অন্যান্য বিরোধীদলীয় সদস্যদের শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বারা গঠিত একটি অভিজাত আধাসামরিক বাহিনী জাতীয় রক্ষীবাহিনী তুলে নিয়ে যায়।’
এগুলো তো ছিলো রক্ষীবাহিনীর গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু শেখ মুজিব স্বয়ং যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ার ঘটান, সেটি হলো কমরেড সিরাজ শিকদারের ক্ষেত্রে। ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি শেখ মুজিবের সরাসরি নির্দেশে সর্বহারা পার্টির নেতা কমরেড সিরাজ শিকদারকে হত্যা করা হয়। হত্যা করার পরদিন জাতীয় সংসদে শেখ মুজিব পাশবিক উল্লাসে হুঙ্কার দেন, ‘কোথায় আজ সিরাজ শিকদার?’
কী ছিল সিরাজ শিকদারের অপরাধ? সিরাজ শিকদারও ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের জন্য তিনি আওয়ামী লীগারদের মতো ভারতে যাননি। বরং বরিশালের পেয়ারা বাগানে বাংলাদেশের একদল দামাল ছেলেকে তিনি প্যারামিলিটারি ট্রেনিং প্রদান করেন এবং পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিন্তু যুদ্ধ যতই এগোতে থাকে, ততই সিরাজ শিকদার বুঝতে পারেন যে, স্বাধীনতার নামে বাংলাদেশ রাওয়ালপিন্ডির খবরদারি থেকে মুক্ত হয়ে দিল্লির প্রভুত্বের অধীনে চলে গেছে। তাই স্বাধীনতার পর তিনি বজ্র নির্ঘোষে আওয়াজ তোলেন, ‘পিন্ডি ছেড়েছি, দিল্লি যাবো না’।
তিনি ১৬ ডিসেম্বরকে ‘ভারতীয় গোলামির দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন পরই বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয়নি। স্বাধীনতার নামে দেশটি দিল্লির শৃঙ্খলে চলে গেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে শেখ মুজিব রাওয়ালপিন্ডির বিরুদ্ধে ছিলেন উচ্চকিত, সেই শেখ মুজিব দিল্লির আধিপত্যের কাছে হয়ে যান খামোশ। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব তার শাসনতন্ত্রে সমস্ত ইসলামী রাজনীতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন, কিন্তু কমিউনিস্ট রাজনীতিকে বৈধতা দেন। এর ফলে দিল্লির তাঁবেদারির বিরুদ্ধে অনেক মানুষের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হলেও তার বিস্ফোরণ ঘটানোর কেউ সাহস পাননি। একমাত্র সিরাজ শিকদারই সিংহশার্দুলের মতো ভারতীয় প্রভুত্বের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। আর তার পরিণতি বাংলাদেশে তিনি প্রথম ক্রসফায়ারের শিকার হন।
শেখ মুজিবের পতনের পর তার ঘাতক বাহিনী রক্ষীবাহিনীর বিলোপ সাধন করা হয়। এরপর আর রাজনৈতিক কারণে গুম, খুন, ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দেখা যায়নি। কিন্তু শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আবার শুরু হয় সেই গুম, খুন ও ক্রসফায়ার। ১৫ বছরব্যাপী শেখ হাসিনা তার বিরোধীদের কণ্ঠ দমন করার জন্য অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মীকে উঠিয়ে নেন। ১৫ বছর ধরে গুম-খুনের যে ভয়াল রাজত্ব তিনি প্রতিষ্ঠা করেন, সেটি অনেকে জানলেও প্রাণের ভয়ে কেউ প্রকাশ করতে সাহস পাননি। কিন্তু অবশেষে সত্যের জয় হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, তারা জনতার কণ্ঠস্বরকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে একটি হলো জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার নির্বিচার গুলি ও খুন। আরেকটি হলো ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণের পর একই বছরের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সামরিক বাহিনীর ৫৭ চৌকস অফিসারসহ যে ৭৪ ব্যক্তিকে ঠাণ্ডামাথায় খুন করা হয়, সেই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য আরেকটি তদন্ত কমিশন গঠন। শেখ হাসিনার ১৫ বছরে যে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার বিস্তারিত উদ্ঘাটনের জন্য আরেকটি তদন্ত কমিশন গঠন। সুখের বিষয়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এ ৩টি কমিশনই তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট সরকার তথা প্রধান উপদেষ্টার নিকট দাখিল করেছে। তবে এটি আফসোসের বিষয় যে, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে রাতে আঁধারে আলেম-ওলামার যে ম্যাসাকার হয়, সেই ম্যাসাকারের তদন্তের জন্য আলেমা-ওলামা এবং সর্বশ্রেণির মানুষের দাবি থাকলেও শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো তদন্ত কমিশন গঠিত হয়নি।
সুখের বিষয়, অবশেষে গুম-খুনের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। গুম-খুন সম্পর্কে বিক্ষিপ্তভাবে অনেক দিন থেকেই এসব রিপোর্ট বের হচ্ছিলো। কিন্তু শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার হয় সেগুলোকে উপেক্ষা করেছে, না হয় সেগুলো অস্বীকার করেছে। কিন্তু গুম-খুন সম্পর্কে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ করে সুইডেন থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘নেত্র নিউজ’। এ নিউজ পোর্টালে সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় আয়নাঘরের ছবি। এ নিউজ পোর্টালটি সম্পর্কে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ খুব একটা ওয়াকিবহাল ছিলেন না। কিন্তু নেত্র নিউজ উপগ্রহের মাধ্যমে ২টি আয়নাঘরের ছবি প্রকাশ করে।
পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার রক্তপিপাসা জানা যায় আয়নাঘরের মাধ্যমে। জামায়াতের মরহুম সাবেক আমীর গোলাম আযমের পুত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আমান আযমী, ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা প্রভৃতি জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের শিকার মরহুম মীর কাসেম আলীর পুত্র ব্যারিস্টার আরমান, লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান প্রমুখকে বছরের পর বছর আয়নাঘর নামক বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। আয়নঘর সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার আমান আযমী একটি পুস্তক লিখেছেন। নাম ‘বিভীষিকাময় আয়নাঘর ফ্যাসিবাদের গোপন কারাগারে ২৯০৮ দিন’। ব্যারিস্টার আরমানও আয়নাঘর সম্পর্কে একটি পুস্তক লিখেছেন। পুস্তকটির নাম ‘আয়নাঘরের সাক্ষী গুম জীবনের আট বছর’। এ দুটি বই পড়লে শুধু আয়নাঘর নয়, হিটলার যেভাবে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের শায়েস্তা করেছেন, সেই একইভাবে যে শেখ হাসিনাও তার বিরোধীদের শায়েস্তা করেছেন সেটি বিশদভাবে জানা যায়।
এগুলো তো হলো আয়নাঘর তথা গুম-খুন সম্পর্কে পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট। কিন্তু গত ৪ জানুয়ারি রোববার সরকারিভাবে গঠিত গুম কমিশনের রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাখিল করা হয়েছে। ঐ রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা যেসব খবর পেয়েছেন, সেসব খবর থেকে বিশ্বাস করা যায় যে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের আমলে ৫ থেকে ৬ হাজার ব্যক্তি গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। এই যে গুম ও খুন তার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিলো রাজনৈতিক। কমিশনের কাছে ১৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৫৬৯টি অভিযোগ আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম বলে বিবেচিত হয়।
কমিশনের রিপোর্ট মোতাবেক যারা গুম হয়ে জীবিত ফিরেছেন, তাদের ৭৫ শতাংশ জামায়াত ও শিবিরের কর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনসমূহের নেতাকর্মী। গুমের যারা নির্দেশদাতা, তাদের মধ্যে যারা হাইপ্রোফাইল নেতা, তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক আহমেদ সিদ্দিকী প্রমুখ। যেসব হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিকে গুম করা হয়েছিলো, তারা হলেন- বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, ব্রিগেডিয়ার আমান আযমী, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান, সাবেক সামরিক অফিসার লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান, ব্যারিস্টার আরমান প্রমুখ।
কমিশন সদস্যরা জানান যে, বেশ কয়েকটি গুম ও খুনের ব্যাপারে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া যাদের ভারতে পাঠানো হয়েছিলো, তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছিলো। এ রিপোর্টটি পড়ার পর গুম ও খুন সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন যে, ‘পৈশাচিকতা’ বলে যে শব্দ রয়েছে, এই গুম ও খুনের বেলায় সেই শব্দটিই সঠিকভাবে প্রযোজ্য।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর কী পৈশাচিক আচরণ করা যেতে পারে, সেটার ডকুমেন্টেশন এ রিপোর্ট। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, কত পৈশাচিক হতে পারে, কত বীভৎস হতে পারে- এটা তার ডকুমেন্টেশন। যারা এ ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা আমাদের মতোই মানুষ। নৃশংসতম ঘটনা ঘটিয়ে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে।’
কমিশন জানায়, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশের গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এ নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সীগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।
গুম, খুন, ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এতদিন ধরে যেসব লোমহর্ষক তথ্য পাওয়া যাচ্ছিলো, তার অফিসিয়াল প্রমাণ পাওয়া গেল এ কমিশনের রিপোর্টের মাধ্যমে। প্রধান উপদেষ্টা তো নিজেই বলেছেন, এরা পিশাচেরও অধম। বাংলাদেশের সভ্য সমাজে মুক্ত মানবের মতো ঘোরাফেরা করার অধিকার তাদের নেই। আমরা কমিশন রিপোর্টকে ধন্যবাদ জানাই এবং সেইসাথে এ কমিশন গঠন করে সত্য উদ্ঘাটন করার নির্দেশদানের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও ধন্যবাদ জানাই।
তবে এ রিপোর্ট শুধুমাত্র কয়েক দিস্তা কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? এখন যখন এসব রক্তহিম করা রিপোর্ট প্রকাশ্যে এসেছে, তখন এই অপরাধীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে সময় বেশি নেই। আর ১ মাস ৮ দিন তার হাতে আছে। তাই চটজলদি করে গুমখুনের বিচার শুরু করতে হবে। আমরা জানি যে, এক মাস ৮ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করা অসম্ভব। বিচার সম্পন্ন করা অসম্ভব হতে পারে। কিন্তু বিচার শুরু করাটা তো অসম্ভব নয়। ইতোমধ্যেই দেশে সাধারণ নির্বাচনের ঢাকঢোল বেজে উঠেছে। এ ডামাডোলে এমন ভয়ঙ্কর অপরাধের বিচারের দাবি যেন তলিয়ে না যায়, সেজন্য বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই এ বিচার শুরু করতে হবে।
যদি এ সময়ের মধ্যে বিচার শুরু করা যায়, তাহলে আগামী নির্বাচনে যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের পক্ষে সেই বিচারকে থামিয়ে দেওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল এ বিচারকে এড়িয়ে যেতে চাইলেও জুলাই বিপ্লবকে বুকে ধারণ করা রাজনৈতিক দল ও তরুণ সমাজ ঐ মহলকে ছাড় দেবেন না। তারা বিচার সম্পন্ন করতে বাধ্য হবেন।
Email:[email protected]