একজন ওসমান হাদির গোটা মুসলিম উম্মাহর আইকন হয়ে ওঠার গল্প


৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৫

॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
শির চির উন্নত, যে মাথা সিজদা করে শুধু স্রষ্টার। যিনি জীবন দিয়েছেন, কিন্তু মস্তক বিক্রি করে দেননি। যার জীবন ও কাব্য মিলেমিশে একাকার হয়েছে আজ। শহীদ ওসমান হাদি, ঘাতকের বুলেটে তোমার মৃত্যু হয়নি, মরণকে কীভাবে জয় করে নিতে হয়, তা শিখিয়ে দিয়ে গেছ তুমি জীবন দিয়ে। তুমি মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে দেদীপ্যমান এক আইকন হয়ে থাকবে চিরকাল।
“হে সীমান্তের শকুন
এক্ষুণি ছিঁড়ে খাও আমাকে
হে আটলান্টিকের ঈগল
শিগগির খুবলে খাও আমাকে
হে বৈকাল হ্রদের বাজ
আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করো আমাকে ……
হে ঈগল, চিল ও ভয়ংকর বাজেরা! হে সাম্রাজ্যবাদী সাহসী শকুনিরা! তোমরা এফ-থার্টি ফাইভের মতো মিগ টুয়েন্টি নাইনের মতো দল বেঁধে হামলে পড়ো আমার বুকে আমার রান, থান, চক্ষু, কলিজা আজ সব তোমাদের গণিমতের মাল, দেশি শুয়োর খুবলে খাওয়ার আগেই, আমায় ইচ্ছেমতো ছিঁড়ে খাও তোমরা! দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার তা হলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও।
[শহীদ ওসমান হাদির লেখা সেই বিখ্যাত কবিতার অংশবিশেষ ‘আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন’]।
হায় আফসোস! দেশীয় দাসেরাই তার মস্তিষ্কটাই খুবলে খেলো! দেশীয় শকুনের হাতেই তার জীবন প্রদীপ নিভে গেল। যিনি জীবন দিয়েছেন কিন্তু আধিপত্যবাদের পক্ষে মস্তক বিক্রি করেননি।
▪ বিদ্রোহী কবিতার যোগ্য নায়ক হলেন শরীফ ওসমান হাদি
“বল বীর, বল উন্নত মম শির।
শির নেহারি আমারি,
নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির,
বল বীর, বল উন্নত মম শির।”
শরীফ ওসমান হাদি বাংলাদেশের আযাদীর সংগ্রামের ইউনিক একটি নাম, একটি প্রতিষ্ঠান।
সময়টা ছিল ঠিক এক জুমা থেকে আরেক জুমা। এক জুমার নামাজ পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আরেক জুমার চাঁদের শুরুতে শাহাদাতবরণ করেন জুলাই বিপ্লবের অকুতোভয় আপসহীন, সম্মুখসারির যোদ্ধা ও ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। ক্ষমতা বা মসনদের লোভ নয়, বরং মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে হাদি ছিলেন আপসহীন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক বজ্রকণ্ঠ লড়াকু সৈনিক। তার এ ত্যাগী দর্শনই তাকে এক অন্যন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
▪ জাতীয় বীরের রাজকীয় প্রস্থান :
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা রিকশায় থাকা ওসমান হাদিকে লক্ষ করে গুলি করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ওই রাতেই সেখান থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদি মৃত্যুবরণ করেন।
আহত হাদির সুস্থতা কামনায় জুমার নামাজ শেষে মোনাজাতে মানুষের কান্না-দোয়ার স্রোতÑ সবটাই ছিল হাদিকে ঘিরে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষ কেঁদেছে, হাত তুলে দোয়া করেছে। একজন মানুষের জন্য প্রতিটা মসজিদে, প্রতিটা হৃদয়ে এত ভালোবাসা, এত অশ্রু! অথচ মাত্র ৩২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন তার। অন্যায়ের বিপক্ষে, ইনসাফের সমাজ গড়ার লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন ছোট-খাটো আকারের এ মানুষটি। তার চারিত্রিক বলিষ্ঠতার এ সাক্ষ্য মানুষ দিয়েছে কান্নার ভাষায়। তার জানাযায় বিশাল জনসমুদ্র প্রমাণ করে তিনি গণমানুষের কতটা জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। মহান আল্লাহ তাকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
হাদির ওপর কাপুরোষিত হামলা বা আঘাত যেন
জুলাই চেতনার ওপর আঘাত॥
হাদির ওপর এ আক্রমণ
গোটা বাংলাদেশের মানচিত্রের ওপর আক্রমণ।
▪ হাদির জন্ম ও শিক্ষাজীবন
শরীফ ওসমান হাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। শরীফ ওসমান হাদি ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা একজন মাদরাসা শিক্ষক, মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন, যার আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষা হাদির জীবন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে হাদি সর্বকনিষ্ঠ।
ওসমান হাদির শিক্ষা জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঝালকাঠির বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসায়’। সেখান থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান ঢাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এ প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টাস করেন। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি শৈশবকাল থেকেই পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। আবার এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিজেও তিনি সেরা ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগেই তিনি অন্তত ৫ বার বিভিন্ন বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেয়েছিলেন। ক্লাস ফাইভে ও এইটে বৃত্তি পেয়েছিলেন। দাখিল, আলিমেও স্ট্যান্ড করেছিলেন। শুনেছি ওসমান হাদি একজন কুরআনের হাফেজ ছিলেন। তার পুরো পরিবারও আলেম পরিবার। ছাত্রজীবন শেষ করার পর হাদি জ্ঞান বিতরণের মহান পেশা শিক্ষকতাকে বেছে নেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি একটি স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করেন, যেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শাহাদাতের পূর্ব পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন।
ঝালকাঠি জেলার নলছিটির দিগন্তছোঁয়া সবুজের আলো-বাতাস আর সুগন্ধা নদীর কোলঘেঁষে বেড়ে উঠে শহীদ ওসমান হাদির দুরন্ত শৈশব। নিজ গ্রামে আর ফিরে আসবে না লড়াকু ওসমান হাদি। এ নদী, নলছিটি লঞ্চঘাট, এ কোলাহলপূর্ণ বাজারের প্রতিটি ধূলিকণায় ওসমান হাদির পদচিহ্ন আঁকা, জড়িয়ে রয়েছে শৈশব কৈশোরের হাজারো স্মৃতি। জুলাইযোদ্ধা শহীদ ওসমান হাদি দেশের সার্বভৌমত্ব আর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে হুংকার তুলেছিল। পুরো পরিবারটাই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, সকলে যেন ওসমান হাদিরই প্রতিচ্ছবি। ওসমান হাদি আজ নির্দিষ্ট জনপদ, দেশ ছাপিয়ে সারা বিশ্বে আধিপত্যবাদ বিরোধী শক্তির এক উজ্জ্বল আইকন হয়ে গেছে।
▪ ওসমান হাদির নামের সার্থকতা
ওসমান নামের অর্থ- জ্ঞানী বা সবচেয়ে শক্তিশালী। আর হাদি নামের অর্থ পথপ্রদর্শক। এটি মহান আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম। সুন্দর একটি নামের অধিকারী শরীফ ওসমান হাদি- সবচেয়ে শক্তিশালী-জ্ঞানী সম্মানিত পথ নির্দেশক।
যে বীরের রক্তে বাংলার এ সবুজ জমিন রঞ্জিত হলো, মহান আল্লাহ আজাদীর সংগ্রামের এ মহানায়কের শাহাদাতকে কবুল করে নিন, তার শোকসন্তপ্ত পরিবার বিশেষ করে তার শোকার্ত মা, স্ত্রী এবং নিষ্পাপ অবুঝ সন্তানকে রহমতের চাদরে ঢেকে রাখুন। আমরা আর কোন দেশপ্রেমিক অকুতোভয় সন্তানকে এভাবে হারাতে চাই না। হাদির রক্তের বিনিময়ে মহান আল্লাহ বাংলাদেশেক আধিপত্যবাদ মুক্ত দেশ হিসেবে কবুল করুন। হাদি বলেছে, ‘যুগ হতে যুগান্তরে আজাদীর সন্তানেরা স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রাখবেই। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই! আমরা তো শাহাদাতের জন্যই মায়ের উদর হতে পৃথিবীতে পা রেখেছি।’
▪ শহীদ হাদির সহজ-সরল পারিবারিক জীবন
একজন শহীদ ওসমান হাদি হয়ে ওঠার পেছনে তার মা, বোন ও স্ত্রীর ভূমিকা ছিল অনেক। মা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ছেলেকে মায়ার ডোরে আগলে রেখেছিলেন, তিনি আজ পুত্র শোকে শয্যাশায়ী। ছাত্র জীবনে বড় বোনের আদর আর শাসনে বড় হয়েছেন হাদি।
শরীফ ওসমান হাদির স্ত্রীর নাম রাবেয়া ইসলাম সম্পা। ২০২০ সালে তাদের বিয়ে হয়, স্ত্রীও মেধাবী ও দেশপ্রেমিক নাগরিক। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। তিনি যখন অন্তঃসত্ত্বা, তখনই গণঅভ্যুত্থানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শরীফ ওসমান হাদি। তার স্ত্রীও এ অসুস্থ অবস্থায় হাদির সঙ্গী হয়ে সহযোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছেন। হাদির এত বড় বিপ্লবী হয়ে ওঠার পেছনে তার স্ত্রীর অবদান কম নয়। মৃত্যুর সাথে লড়াই করা ওসমান হাদির স্ত্রীকে কেউ কোথাও না দেখে অনেকেই তখন প্রশ্ন করেছিলেনÑ কেন তার স্ত্রী ক্যামেরার সামনে আসছেন না?
অথচ তিনি পর্দার আড়ালে থাকতেই ভালেবাসেন, নিজেকে জাহির করার মধ্যে নয়। বোনের বাসায় থেকেই হাদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত বয়সে এসে প্রিয়তমা স্ত্রীর ভালোবাসায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। অত্যন্ত সাদামাটা অথচ শান্তিময় সংসার ছিল তার। স্ত্রী সাংসারিক কোনো অপ্রাপ্তি বা চাওয়া-পাওয়া নিয়ে কোন অশান্তি দেননি কখনো তাকে। কোনো ধরনের মান-অভিমান, ঝগড়াঝাঁটি তাদের সুখী দাম্পত্য জীবনে কোনো আঁচড় কাটতে পারেনি। তার বাধা-বন্ধনহীন সংগ্রামী জীবনে স্ত্রী কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াননি কখনো। তাই তো হাদি আকস্মিক দুর্ঘটার কথা শুনে তার স্ত্রী ভেঙে পড়েননি। পিতৃহারা ৭ মাসের অবুঝ শিশুটিকে বুকে চেপে ধরে শোককে শক্তিতে পরিণত করেছেন। কাউকে সান্ত্বনা দিতে হয়নি, বরং তিনিই সবাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। বলেছেন, ‘হসপিটালে আপনাদের ভাইকে বলে এসেছি, কোটি মানুষ তোমার জন্য দোয়া করছে। এবার বিছানা থেকে উঠে এসো।’
প্রখ্যাত সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমার কোনো ক্ষমতা না থাকলেও কত মানুষ নানা প্রয়োজনে আমার কাছে আসে। অথচ এত ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও হাদি কখনো তার কোনো চাহিদার কথা আমার কাছে ব্যক্ত করে নাই। সংসারের অভাব-অনটনের প্রসঙ্গ কোনোদিন তোলে নাই। আমি ওকে বলতাম, একবার অন্তত স্ত্রী-সন্তানকে কিছুদিন সময় দাও। কীসের কী সংসারের দিকে তাকানোর সময় ওর কোথায়।’
▪ শহীদ শরীফ ওসমান হাদির পুত্রের বিপ্লবী নাম
শহীদ ওসমান হাদির পুত্র সন্তান হলে তার নাম একটি মিনিংফুল বিপ্লবী নাম রাখতে বলেছিলেন তার বড় ভাইকে। তার ভাই একজন বড় আলেম। তিনি শিশুটির নাম রাখেন ‘ফিরনাস’। ফিরনাস (ঋরৎহধং) একটি আরবি নাম, যার অর্থ ‘শক্তিশালী’, ‘সাহসী’, এবং ‘মোটা ঘাড়ের সিংহ’ বা ‘বলিষ্ঠ’, যা শক্তি, সাহস ও বীরত্ব বোঝায়। এটি ছেলেদের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব আব্বাস ইবনে ফিরনাসের সাথে সম্পর্কিত, যিনি একজন বিখ্যাত উদ্ভাবক ও উড্ডয়ন বিশারদ ছিলেন।
অর্থ: শক্তিশালী, সাহসী, বলিষ্ঠ, মোটা ঘাড়ের সিংহ।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় যে, আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৮১০-৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) একজন বিখ্যাত আন্দালুসীয় বহুশাস্ত্রবিশারদ ও উদ্ভাবক, যিনি উড্ডয়নের প্রচেষ্টার জন্য পরিচিত ছিলেন। ৮ মাসের বাচ্চাটিকে রেখে হাদি চলে গেছে জান্নাতি পাখি হয়ে। মহান আল্লাহ তার প্রিয় উত্তরাধিকার এ সন্তানটিকে রহমতের চাদরে ঢেকে রাখুন, উত্তম অভিভাবক হয়ে যান, আর আগামীর রাহবার হিসেবে কবুল করুন।
শহীদ হাদি নিজেই শুধু বিপ্লবী ছিলেন না, তিনি একটি সৎ ও যোগ্য বিপ্লবী জেনারেশন গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে কাজ শুরু করে ছিলেন।
▪ হাদির শহীদী আত্মা আল-কুরআনের ভাষায় কথা বলছে, (লোকেরা তাকে হত্যা করে ফেললে আল্লাহর পক্ষ থেকে) তাকে বলা হলো, জান্নাতে প্রবেশ কর। (তখন) সে বলল, হায়! আমার জাতির লোকেরা যদি জানত, কী কারণে আমার প্রতিপালক আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং আমাকে সম্মানিত লোকদের দলভুক্ত করেছেন। [সূরা ইয়াসিন : ২৬-২৭]।
শাহাদাতের মর্যাদা লাভের পর তাকে যখন সসম্মানে বলা হলো, তুমি জান্নাতে প্রবেশ করো। সে যখন জান্নাতে প্রবেশ করলো এবং সেখানে সে বিদ্যমান নিয়ামতসমূহ প্রদর্শন করলো এবং আকাক্সক্ষাভরে বলে উঠল, হায়! আমার সম্প্রদায় যারা আমাকে অবিশ্বাস করে হত্যা করেছে, তারা যদি আমার প্রতিপালক কর্তৃক আমার পাপ মার্জনা করে আমাকে পুরস্কৃত করার কথা জানত, তাহলে তারা আমার মতো ঈমান এনে আমার মতো প্রতিদান লাভ করতে পারত। রবের পক্ষ থেকো কতটা নিয়ামত ভোগ করতে পারতো।
যারা তাকে হত্যা করেছে হাদির আত্মা যেন তাদের ধিক্কার জানিয়ে বলছে- হায়! তাদের যদি জানাতে পারতাম যে, আমার রব আমাকে কতটা সম্মানিত করেছেন, নিয়ামাত দানে ভূষিত করেছেন।
▪ শহীদের মৃত্যুর কষ্ট কেবল পিঁপড়ার কামড়ের মতো
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একজন শহীদ নিহত হওয়ার সময় ঠিক ততটুকুই কষ্ট পায়, যতটুকু তোমাদের কেউ পিঁপড়ার কামড়ে কষ্ট পায়।’
আমরা ভাবি তলোয়ার বা গুলির আঘাতে মৃত্যু কত যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের জন্য মৃত্যুকে সহজ করে দেন। শহীদের কাছে সেই ভয়ানক মৃত্যুটি কেবল একটি ছোট্ট চিমটি বা পিঁপড়ার কামড়ের মতো মনে হয়। (রেফারেন্স: ঔধসর ধঃ-ঞরৎসরফযর ১৬৬৮; ঝঁহধহ অহ-ঘধংধ’র ৩১৬১)।
সহজ মৃত্যুÑ আল্লাহ শহীদের কষ্ট নিজের দায়িত্বে কমিয়ে দেন। অনুভূতি-দৃশ্যত রক্তাক্ত মনে হলেও শহীদের অনুভূতি ভিন্ন থাকে। আল্লাহর বিশেষ রহমত যে, তিনি তার পথের পথিকদের কষ্ট দেন না। ভয় দূরÑ মৃত্যুর কষ্টের ভয়ে জিহাদ বা হক কথা বলা থেকে পিছিয়ে না আসা। (তাফহীমুল কুরআন)।
যেভাবেই বা যত কষ্টি দিয়ে মারা হোকনা কেন, শহীদরা কোনো মৃত্যু কষ্ট অনুভব করেন না। আশা করি হাদিও তা পাননি।
▪ শহীদের রক্ত কখনো বৃথা যায় না
হাদি তার শাহাদাতের মাধ্য দিয়ে প্রতিটি প্রাণে বিপ্লবের যে মশাল জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, ইনশাআল্লাহ তা একদিন দেশকাল ছাপিয়ে সারা বিশ্বকে জাগিয়ে তুলবে, প্রতিবাদী করবে। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে তা আজ। শহীদ হাদি যে আইডোলজি লালন করতো সে আইডোলজির কখনো কোনো মৃত্যু নেই। আজ এক হাদি থেকে লাখকোটি হাদির যে জোয়ারে বাংলার জমিন ফুঁসে উঠেছে, তা রুধিবে সাধ্য কার? শহীদের রক্ত ভেজা ঊর্বর ভূমিতে আজাদীর আজন্ম লালিত স্বপ্নের যে বীজ রোপিত হয়েছে তা সকল অপশক্তির আগাছাকে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে বিষাক্ত সাপের বিষদাঁত উপড়ে ফেলবে শিগগিরই ইনশাআল্লাহ।
মহান রবের কথায় সান্ত্বনা খুঁজে নিতে হবে আমাদের সকল শোকাহত হৃদয়ে, ‘আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না।’ [সূরা বাকারা : ১৫৪]।
▪ সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এক বিপ্লবী লড়াকু সৈনিক ছিলেন ওসমান হাদি
ভারতীয় আধিপত্যবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবিলা করে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা, জুলাই চেতনায় বাংলাদেশি সংস্কৃতির ধারা তৈরি করা; চলমান কালচারাল ফ্যাসিজমের যত ন্যারেটিভ, সব ভেঙে দিয়ে জুলাইয়ের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সমুন্নত রাখাÑ এসব স্বপ্ন নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করেছিলেন। হাদিই হচ্ছে আধিপত্যবাদবিরোধী আগামী লড়াইয়ের আইকনিক হিরো।
পৃথিবীর ইতিহাস বলছে বীরেরা কখনো মরে না। হাদি বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে না, আসমানে হয়। আমি চলে গেলে আমার সন্তান লড়বে, তার সন্তান লড়বে।’
যারা পরিবর্তনের জন্য নেতৃত্ব দেন তারা দীর্ঘকাল মানুষের অন্তরে বেঁচে থাকেন। বাংলাদেশে জুলাই ২০২৪ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরিবর্তনের যে যাত্রা শুরু হয়েছে তা আর থামতে দেয়া যাবে না। এ পরিবর্তনের অন্যতম নায়ক শহীদ হাদির রক্ত আবারো সকল বিভেদের ফাটল রোধে তারুণ্য শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে নতুনভাবে উদ্দীপ্ত করবে।
আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে শহীদ হাদির রক্তের বদলা নিতে হবে, ইনশাআল্লাহ। শহীদ ওসমান হাদি ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে দেখা করার পর শহীদ হাদির সম্মানিত স্ত্রীর একমাত্র কথা ছিল-তোমাদের ভাইয়ের কাজ বোন হিসেবে তোমাদের করে যেতে হবে।
এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে।
ফ্যাসিস্ট ও মাফিয়াদের জন্য হাদি ছিল বড় আতঙ্ক
হাদি প্রচলিত সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করছিল। তাই তাদের প্রধান টার্গেট হয়েছিল, কারণ সে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল। তার সম্পর্কে প্রখ্যাত সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমার নিজের মধ্যে বিপ্লবী হওয়ার একটা সুপ্ত ইচ্ছা লালন করেছি, হাদির মধ্যে আমার সে হতে না পারা বিপ্লবীকে যেন দেখতে পেতাম। হঠাৎ একদিন আমার দেশ অফিসে এসে বললো দেশ পরিবর্তন করতে হলে সংসদে যেতে হবে। নির্বাচনে নেমে পড়লো একটি প্রধান দলের বেশুমার বিত্তের অধিকারী, একজন প্রবীণ রাজনৈতিকের বিরুদ্ধে। আমি ভাবলাম, করুক না পাগলামি সে হয়তো পরাভূত হবে, কিন্তু জাতিকে ওদের প্রজন্ম যে বার্তাটুকু দিয়ে যেতে পারবে। সেটি রাষ্ট্রের পরিবর্তনকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলবে। আমি মনে করি, হাদি সফল হয়েছিল মাত্র অল্প কয়দিনে নতুন ধারার ক্যাম্পেইনে, রাজনৈতিক ঊংঃধনষরংযবফ কেঁপে উঠেছিল। ও জীবনে ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে চেয়েছিল, আল্লাহ হাদির মনের আশা পূরণ করেছেন। হাদি আজ আইকন হয়েছে কিন্তু আমরা তো এমন ইমপ্যাক্ট চাই না।’
হাদি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের গর্বিত বিশ্বাস এ উন্নত শির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। হাদি আল্লাহর কাছে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করছিল। হাদি বিপ্লবের সহযোদ্ধাদের প্রতি মমতাময় ছিল, হাদি নির্লোভ ছিল, হাদি অকুতোভয় ছিল, সর্বোপরি হাদিকে কেনা যাচ্ছিল না, তাই হাদিকে টার্গেট করা হয়। হাদির এ অসাধারণ চরিত্রবান ও লড়াকু বিশেষত্ব ফ্যাসিস্ট, ভারতের দালাল এবং ইসলামোফোবিক অপশক্তির কাছে তাকে এক ভীতিকর চরিত্রে পরিনত করেছে। তাই তার ওপর এমন আক্রমন।
▪ আমাকে শহীদ করে সেই মিছিলে শামিল করে নিও
হাদির শহীদি মিছিল দেখে সকলেরই যেন এমন গৌরবময় মৃত্যুর জন্য লোভ হয়। এমন আকাক্সিক্ষত মৃত্যু ক’জনেরই সৌভাগ্য হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম (রহ.) পর এত বিশাল জনসমুদ্রের জানাজা সম্ভবত আর দেখা যায়নি। শহীদ ওসমান হাদি মাত্র ৩২ বছর বয়সে যে বিরল সম্মানের অধিকারী হয়েছেন তা অবিস্মরণীয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম জানাযা আর হয়েছে কিনা, জানি না। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার এ মর্যাদা, তার সততা, প্রতিবাদী, সাহসী ভূমিকার জন্য, নির্ভেজাল দেশপ্রেমের জন্য, সকল চাটুকারিতার ঊর্ধ্বে উঠে নির্লোভ ডেডিকেশানের জন্য। এমন কাপুরোষিত গুপ্তহত্যা তাকে এতটুকু ম্লান হতে দেয়নি, বরং করেছে অম্লান, চীর দীপ্তিময়, বিশ্বময়। জীবিত হাদির চেয়ে শহীদ হাদি অনেক বেশী শক্তিশালী হয়েছে। আশা করি, জমিনের মতো আসমানেও তিনি রাজকীয় সম্মানে অভিষিক্ত হয়েছেন।
আল কুরআনের ভাষ্য মতেÑ শহীদ হাদি ছিলেন, হাদি আছেন, হাদি থাকবেন আমাদের মাঝে চির অম্লান হয়ে, ন্যায় ইনসাফের প্রতীক হয়ে, প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে। আমরা আশা করি, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পক্ষে ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে হাদিদের এ লড়াই চলছে চলবেই।
বাংলার দ্বিতীয় বাঘ শহীদ ওসমান হাদি।
আল্লামা সাঈদী ও শের-ই-বাংলার যোগ্য উত্তরসূরি।
তুমি জাগিয়ে দিয়েছো ঘুমন্ত আত্মবিস্মৃত তরুণ সমাজকে।
হে বিপ্লবী বীর-
প্রিয় রাসূল বলেছেন, যাকে যে ভালোবাসে তার সাথে তার হাশর হবে।
বিদ্রোহী চিরবিপ্লবী কবি নজরুলের সাথী হয়ে, তার দর্শনকে ধারণ করে,
শহীদ আবু সাঈদ মুগ্ধের মতো এক বুক সাহস নিয়ে
শহীদ আবরারের মতো আধিপত্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক হয়ে,
জাগিয়ে তুলেছ তারুণ্যকে বারুদসম রক্ত শপথে
সময় এখন ঝাঁপিয়ে পড়ার কর্তব্য কর্মে।
হাদি হত্যার বিচার চেয়ে গোটা দেশ আজ ঐক্যবদ্ধ। আততায়ীকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দ্রুত দেশে এনে অথবা দেশে থাকলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হোক। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা মোটেই অসম্ভব নয়।