ভোট নিয়ে আ’লীগ ও তার দোসরদের নানা অপকৌশল
১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১৪
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
ভোট বানচালে একের পর এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটির মধ্যে কোনো আত্মসমালোচনা লক্ষ করা যায়নি। কোনো নেতা অতীত খুন-গুম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মতো বড় বড় অপরাধের দায় স্বীকার না করে উল্টো দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। এদিকে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগের দোসররা বসে নেই। তারা না অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। নির্বাচনে আসার জন্য আওয়ামী লীগ নানা কূটনৈতিক অপতৎপরতা চালিয়েছে, কিন্তু এতে সফল হয়নি। গত ২৯ ডিসেম্বর সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত দলটির তৃতীয় সারির বেশকিছু নেতা ও সমর্থক স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরের জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। আর কেউ কেউ জাতীয় পার্টি আরেক অংশ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। জাতীয় পার্টির এ দুই অংশই গত সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া সিঁড়ি হিসেবে রাজনীতিতে অবস্থান করেছে। এখনো আওয়ামী লীগের হয়েই ভোটে রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকরা কেউ আলাদা ভোট করছেন না। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি দল ব্যারিস্টার আনিসুল- জেপি’র মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ এর অংশ হিসেবে মাঠে রয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিতে আইনি কোনো বাধা না থাকলেও জনবিচ্ছিন বাম ও আওয়ামী লীগের অন্য দোসররা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসেনি।
ভোট বানচালে বিশৃঙ্খলা পাকাতে চায় আ’লীগ
বেশ কয়েকদিন ধরে নতুন করে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা না করলেও বসে নেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ এ দলটি। রাজধানীতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে ফ্লাইওভার থেকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছে একজন নিরীহ যুবককে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ এসব। ক্ষমতা ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে থাকা এবং অন্য নেতারা বিদেশে পালিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের মানুষকে নানারকম ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছে। শেখ হাসিনা ভারতে বসে আত্মগোপনে থাকা তার দলের নেতাকর্মীদের ভয়েস কলে নানা নাশকতামূলক অপতৎপরতার নির্দেশনা দেন। তা মোকাবিলায় সরকারের তরফ থেকে নানারকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী সব পক্ষ সোচ্চার হয়। এরপরই রাজধানীতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় ওসমান হাদিকে। এসব দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল থেকে জুলাই গণহত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশ ও ঢাকার বিশেষ আদালত থেকে রাজউকের প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় প্রথমে ২১ বছরের সাজা হয়, পরে আরও এক মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর আওয়ামী লীগ নতুন করে চক্রান্ত শুরু করে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরিসহ নির্বাচন বানচালের সর্বাত্মক অপচেষ্টা চালাতে পারে। বিভিন্ন আসনে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে তারা। সীমান্তবর্তী আসনগুলোয় আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারত থেকে অবৈধভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করে নির্বাচনে সহিংসতা চালাতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে তারা সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের উচ্চপর্যায়ে এমন প্রতিবেদন দিয়েছে। নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ বিভিন্ন মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের উসকানি ও মদদ দিয়ে তাদের বসতবাড়ি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে ভোটের পরিবেশ নষ্ট করাসহ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাতে পারেÑ এমন তথ্যও দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম বলেন, ‘নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। ফ্যাসিস্ট এ রাজনৈতিক দলটি দেশে জ্বালাও-পোড়াও চালিয়ে প্রমাণ করছে তাদের নেশাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।’ তিনি বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের চেষ্টা করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী দল। তাদের সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকতে পারে, মতপার্থক্য থাকলেও একটি উৎসবমুখর ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সবাই চাচ্ছে। খুব সুন্দর একটা ইলেকশন দেখতে পাবেন। যেটা ফ্রি, ফেয়ার ও এক্সক্লুসিভ হবে; যেখানে সমস্ত জনগণ অংশগ্রহণ করবে। খুবই উৎসবমুখর পরিবেশে ইলেকশন হবে।’ তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের জ্বালাও-পোড়াও বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমেই তারা প্রমাণ করেছে, কেন তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’
জাপার টার্গেট আওয়ামী লীগের ভোট
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারলেও তাদের দোসর জাতীয় পার্টি অংশ নিচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল দাবি করে আছে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার হালুয়া-রুটির সুবিধাভোগী জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে, সরকার সে সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি। ফলে তারা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ইতোমধ্যে তারা দলীয় মনোনয়পত্রও জমা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ভোট করতে না পারায় জাতীয় পার্টি চাচ্ছে আওয়ামী লীগের ভোটগুলো নিজেদের বাক্সে নিয়ে আসতে। দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা আপাতত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করেছেন। জানা গেছে, ইতোমধ্যে বেশকিছু আসনে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন এবং অনেকে জমাও দিয়েছেন। এরা আপাতত ‘স্বতন্ত্র’ কৌশল অবলম্বন করেছেন। প্রার্থিতা টিকে থাকলে শেষ পর্যন্ত জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি অথবা আসিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন নতুন জোটের সাথে কৌশলগত ভোট বিনিময় করবে। আর জাতীয় পার্টি চাচ্ছে, দলীয়ভাবে যেহেতু আওয়ামী লীগ ভোট করতে পারছে না, সেহেতু আওয়ামী লীগের ভোটাররা যেন জাতীয় পার্টিকে ভোট নিয়ে সংসদে পাঠায়, তারা সংসদে গিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নেবে এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি সচলে ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় পার্টি এবার নয়া কৌশল নিয়েছে। এটা হচ্ছে জাতীয় পার্টি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে নামছে। জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি থেকে বের হয়ে সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং ১৪ দলীয় জোটের শরিক জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন নির্বাচনী জোট ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’। এ জোটে রয়েছে বিএনএম, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, গণফ্রন্ট, মুসলিম লীগ ও তৃণমূল বিএনপি যাদের অধিকাংশই গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। নতুন জোট ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ ১২২ আসনে প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অপরদিকে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে আবারো যোগ দিয়েছেন বহিষ্কৃত নেতা মশিউর রহমান রাঙা। দলটি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিয়ে ইতোমধ্যে ২৪৩টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এদের প্রায় সবাই দলীয় মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। জাতীয় পার্টি আর ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ যেভাবেই প্রার্থীতা করুক না কেন, এরা সবাই আওয়ামী লীগের ভোট ঘরে তোলার টার্গেটে রয়েছেন।
আনিসুল-মঞ্জুর ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ ১৪ দলের নয়া সংস্করণ
গত ৯ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টি (একাংশ) ও জাতীয় পার্টির (জেপি) নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) জোট হয়। জাতীয় পার্টির (একাংশ) আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন অংশ দুটিসহ মোট ১৮টি দল রয়েছে এই জোটে। এনডিএফের শরিক দলগুলো হলো জাতীয় পার্টির (জাপা) আনিসুল ইসলাম নেতৃত্বাধীন অংশ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (জেপি), জনতা পার্টি বাংলাদেশ, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (মহসিন রশিদ), জাতীয় ইসলামিক মহাজোট, বাংলাদেশ স্বাধীন পার্টি, বাংলাদেশ স্বাধীনতা পার্টি, অ্যালায়েন্স ডেমোক্রেটিক পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ডেমোক্রেটিক পার্টি, জাতীয় সাংস্কৃতিক জোট, জাসদ (শাহজাহান সিরাজ), ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক পার্টি ও গণ আন্দোলন। এ জোটের বেশ কয়েকটি দল আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোটে ছিল। ফলে এই জোট মূলত ১৪ দলের নয়া সংস্করণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্রদের অনুকূলে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত কৌশলগত ভোট আদান-প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় পার্টি ও মিত্রদের প্রার্থীদের জেতানোর চেষ্টা করা হবে। অন্যদিকে হিসাব-নিকাশে না মিললে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতে ভোট বর্জনেরও ঘোষণা আসতে পারে এই জোটের পক্ষ থেকে। শেষ পর্যন্ত তারা কী করবে, তা নির্ভর করছে বিদেশে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনা ও তার দলের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আসা নির্দেশনার ওপর।