হাদি হত্যাকাণ্ড দায় কার?

প্রিন্ট ভার্সন
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:১৭

॥ জামশেদ মেহদী ॥
ছোটকাল থেকে একটি কথা শুনে আসছি- সেটি হলো, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদির ক্ষেত্রেও দেখছি, বিষয় অনেকটা ঐ রকম পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হবে এবং আগামী ৩ মাসের মধ্যেই সেই বিচার সম্পন্ন হবে। ঐ দিকে গত ২২ ডিসেম্বর সোমবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন যে, হাদির কিলার এবং তার সহযোগীরা দেশে আছেন, নাকি বিদেশে আছেন- সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য সরকারের কাছে নাই। তার আগের দিন পুলিশ বিভাগের অতিরিক্ত আইজিপি এবং আরেকজন সিনিয়র অফিসার একই কথা বলেছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং তার অধস্তন অফিসাররা বলেছেন যে, ওসমান হাদির ঘাতকদের ধরার জন্য সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইতোমধ্যেই ১০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন সন্দেহভাজন হত্যাকারী ফয়সাল করিম মাসুদের পিতা হুমায়ূন কবির ও মাতা হাসি বেগম। আরো রয়েছেন তার শ্যালক। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরো জানিয়েছেন যে, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে কিছু বলতে তিনি বা তার মন্ত্রণালয় অথবা পুলিশ অস্বীকার করেন।
আইন উপদেষ্টার সিদ্ধান্তকে ধন্যবাদ জানাই। ৩ মাসের মধ্যেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হবে, সেটি অবশ্যই একটি আশার বাণী। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ কার বা কাদের বিচার করবেন? ফয়সাল করিম মাসুদ সন্দেহভাজন হত্যাকারী। তার সম্পর্কে অনেক কথাই পত্রপত্রিকায় বেরিয়ে আসছে। কিন্তু বিচারের কাঠগড়া একটি ভিন্ন জিনিস। এখানে প্রয়োজন অকাট্য প্রমাণ। হয়তো সরকার ইতোমধ্যেই অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে অথবা আরো তদন্তের স্বার্থে সেটা প্রকাশ করছে না। যদি তাই হয়, তাহলে ভালো কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে পুলিশের আন্তরিকতাকে কটাক্ষ না করেও বলা যায় যে, তাদের যোগ্যতার অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
ফয়সাল করিম মাসুদই যে কিলা, সেটি তো পুলিশ প্রথমে বলতে পারেনি। এ তথ্যটি প্রথম ফাঁস করেছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। তিনিই ফয়সাল করিমের অ্যান্টিসিডেন্ট, অর্থাৎ অতীত বের করেছেন। সে যে আদাবরের বাসিন্দা, আদাবর ছাত্রলীগের নেতা এবং আইটি ব্যবসার সাথে জড়িত, সেগুলোও তিনিই উদ্ঘাটন করেছেন। হত্যাকারী মাসুদ করিম যে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়েছেন, সেটিও উদ্ঘাটন করেছেন জুলকারনাইন সায়ের। বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে জুলকারনাইনের বিভিন্ন স্ট্যাটাস এবং ইউটিউব ভিডিও থেকেই জানা যায় যে, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তে ফিলিপ নামে এক ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে ভারতে মানব পারাপারের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। সম্ভবত এই ফিলিপের মাধ্যমেই ওসমান হাদির হত্যাকারী ভারতে পালিয়ে গেছে।
জুলকারনাইন সায়েরের এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের পরই পুলিশকে দেখা যাচ্ছে ঐ লাইনে এগিয়ে যেতে। সায়ের এসব বলার পরই ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট প্রভৃতি সীমান্তে বিজিবি তাদের টহল জোরদার করেছে। আমি শুরু করেছি চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে- এ প্রবাদ বাক্য দিয়ে। পাখি তো উড়ে গেছে। তাকে আর খাঁচার ভেতর আনবেন কীভাবে?
আমার প্রশ্ন- জুলকারনাইন সায়ের যদি এতসব খবর জানতে পারেন, তাহলে পুলিশ এবং আমাদের অন্যসব গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে না কেন? মানব পাচার বা মানব পারাপারকারী ফিলিপের সিন্ডিকেটের খবর আমাদের বর্ডার গার্ড বা পুলিশ কি আগে জানতে পারেনি? সরকারের এত বড় বাহিনী, তারা পরের মুখে ঝাল খাবে কেন? জুলকারনাইনের সব তথ্যই যে সঠিক, সেটিই বা হলফ করে বলা যায় কীভাবে? বিষয়টি তো অন্যভাবেও দেখা যায়। আসুন, আমরা সেই লেন্স দিয়েই দেখি।
গত বছরের জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই অকস্মাৎ বাংলা-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটে। যতই দিন যায়, ততই পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, বরং দিনের পর দিন অবনতিই ঘটতে থাকে। কেন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এ অবনতি, সেটি আর কাউকে বুঝিয়ে দিতে হবে না। শেখ হাসিনা তার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ নামক এ স্বাধীন ভূখণ্ডকে ভারতের করদ
রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। বিনিময়ে ভারত তাকে ক্ষমতায় রেখেছে। ভারতের শক্তিতে ক্ষমতায় থেকে হাসিনা তার সরকারকে দুর্ভেদ্য বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু জনগণ সাথে না থাকলে যে মহাশক্তিধররাও আখেরে কাউকে ক্ষমতায় রাখতে পারে না, তার প্রমাণ মিলেছে গত বছরের ৫ অগাস্ট।
গত ১৬ মাসে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নানারকম সমালোচনা হয়েছে। আমরা সেগুলো নিয়ে তার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো কথা বলতে চাচ্ছি না। কিন্তু এই ১৬ মাসে একটি বিষয় সবরকম সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ড. ইউনূস বাংলাদেশকে ভারতের গোলামির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জুলাই বিপ্লবের লাখকোটি জনগণ।
আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখার শর্তে যেখানে সমস্ত ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে এবং ১৮ কোটি বাংলাদেশির বিরুদ্ধে গিয়ে ভারত এক ব্যক্তি বা একটি দলকে সমর্থন দিলো, সেই দলটি যখন অকস্মাৎ জুলাই বিপ্লবের মতো ২ মাসের আন্দোলনে তাসের ঘরের মতো উড়ে যাবে, সেটা তো নরেন্দ্র মোদি ভাবতে পারেননি। কিন্তু যখন তাসের ঘর হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো, তখন ভারতের কোনো সমর্থন এবং কোনো শক্তিই কাজে লাগলো না। রূপকথায় সোনার ডিমপাড়া রাজহাঁসকে তার মালিক জবাই করলেও নরেন্দ্র মোদি সোনার ডিমপাড়া শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের মসনদে পুনঃপ্রতিষ্ঠার খোয়াব দেখা শুরু করেন।
সেজন্য তিনি শেখ হাসিনাসহ প্রায় ১ লাখ আওয়ামী নেতাকর্মীকে ভারতে আশ্রয় দেন। ভারতের মাটিতে বসে হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চালাবেন, সেটিরও প্রশ্রয় দেয় ভারত সরকার। কিন্তু শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ছিলো ভারতের মুখে প্রথম চপেটাঘাত। তারপর যখন ড. ইউনূস ইলেকশন দেওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করলেন এবং ইলেকশন কমিশন যখন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশন করার সমস্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করলো, তখন ভারত দেখলো, হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার সব আশা-ভরসা শেষ। সুতরাং তারা আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বানচাল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগের একটি বিরল সুবিধা রয়েছে। সেটি হলো, শত অপরাধ করার পরও যখন সরকার বা জনতার রুদ্ররোষ তাদের ওপর পড়ে, তখন তাদের সামনে খুলে যায় বিশাল নিরাপদ শেল্টার। সেটি হলো, ৪ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত বিশাল বাংলা-ভারত অভিন্ন স্থলসীমান্ত। আওয়ামী লীগের জন্য প্রতিটি ক্রাইসিস পিরিয়ডে ভারত তার দুয়ার খুলে দিয়েছে। মুজিব সরকারের পতনের পর কাদেরিয়া বাহিনী এবং আরো কিছু ডাই হার্ড আওয়ামী লীগার সীমান্ত পার হয়। কাদের সিদ্দিকীসহ অনেক মুজিবভক্ত ভারতে আশ্রয় পান। তাদের সাহায্যপুষ্ট হয়ে, তাদের অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, জেনারেল জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশ সীমান্তে ঐ আওয়ামীপ্রেমীরা একাধিকবার সশস্ত্র হামলা করে। কিন্তু জনসমর্থন না থাকায় একসময় তারা দেশে ফিরতে বাধ্য হয়।
এবার তো শেখ হাসিনা সদলবলে ভারতে পালিয়েছেন। তার সাগরেদরা ভারতীয় মদদপুষ্ট হয়ে গত ১৬ মাসে কত কর্মসূচিই তো দিলো। কিন্তু প্রত্যেকবারই তাদের কর্মসূচি সুপার ফ্লপ। আর হবে নাই বা কেন? পানি ছাড়া যেমন মাছ বাঁচতে পারে না, তেমনি আর্মড ক্যাডার জনসমর্থন ছাড়া টিকতে পারে না। তাই বিভিন্ন উপলক্ষে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কয়েকটি বাসে আগুন লাগানোর মধ্যেই তাদের অপতৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হয়।
ভারত এবং আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, নির্বাচন বানচাল করা। নির্বাচন বানচাল হলে ড. ইউনূস ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। দেশে আসবে আরকেটি সরকার যারা ইউনূসের মতো বিপুল জনসমর্থনে পুষ্ট হবে না। এ মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে বড় শত্রু হলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাকে সরাতে পারলে আরেকটি অনির্বাচিত সরকার এলে হয়তো তার সাথে ভারত বার্গেইনিং কাউন্টার খুলতে পারে। ভারতের এখন যত প্রচেষ্টা সেটি এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্যোগে কেন্দ্রীভূত।
ড. ইউনূসের সরকার গত ১৬ মাসে কিছুই করতে পারুক আর না পারুক, অন্তত ভারতের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে। ভারতীয়রা বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া অনেক সীমিত করেছে। এবার বাংলাদেশও করেছে ‘টিট ফর ট্যাট’। ইটের বদলে পাটকেল। ভারতীয়দের জন্য সবরকম ভিসা সার্ভিস বন্ধ করেছে বাংলাদেশ।
জনসমর্থন যখন মিলছে না, তখন এদেশের চিহ্নিত ভারতবিরোধী এবং ইসলামী জাতীয়তাবাদী শক্তিকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে তারা চায় স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে। আর তখন ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে ।
শহীদ ওসমান হাদি ভারত ও আওয়ামী লীগের এই সর্বশেষ বদমতলবের প্রথম কুরবানি। প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞজনরা বলছেন, চলমান নীলনকশার শিকার হয়ে শহীদ হাদিই প্রথম শহীদ নন। সামনে হয়তো ওরা আরো রক্ত ঝরাবে।
এ কথা আজ সকলের মুখে মুখে। সরকার, তার বিভিন্ন বাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের এ বদমতলব পূর্বাহ্নে আঁচ করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এ কথা আরো ভালোভাবে বোঝাতে হলে গত ১৬ মাসের কাসুন্দি ঘাটতে হয়। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। এনজিও এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত সরকার ভারতের মতো চাণক্য বুদ্ধির সরকারের মারপ্যাঁচ বুঝতে পারেনি।
এখনো সময় আছে। যেসব ব্যক্তি এবং মহল ভালনারেবল পয়েন্টে আছেন, তাদের সরকার গানম্যান প্রটেকশন দিচ্ছেন। এটি ভালো উদ্যোগ। তবে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হবে জুলাই বিপ্লবের স্পিরিট পুনরুজ্জীবিত করা। শহীদ হাদি প্রচলিত ধারা হাই প্রোফাইল কেউ ছিলেন না। তারপরও ৩২ বছরের এই যুবকের জানাযায় লাখ লাখ মানুষ শামিল হওয়ায় নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে যে, জুলাই বিপ্লব এখনো বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের বুকে ধিকি ধিকি আগুনের মতো জ¦লছে। সরকার এবং ছোট-বড় নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক দলের এই মুহূর্তে যেটি করণীয় সেটি হলো, জুলাই বিপ্লবের এই নতুন করে প্রজ্জ্বলিত আগুন যেন নিভে না যায়, যেন সেটি সরকার ও জনসাধারণ নির্বিশেষে সকলের বুকে প্রজ্জ্বলিত থাকে, সেই কাজটি করা। আর সেই কাজটিই হবে ভারতের মতো বিশাল শক্তির পাশে থেকেও শির উন্নত করে এগিয়ে যাওয়া।

হাদি হত্যাকাণ্ড দায় কার?

সম্পর্কিত খবর