আলহামদুলিল্লাহ! ৩৬ জুলাই আবার ফিরে এলো
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:৫৭
॥ মাহবুবুল হক ॥
ধর্ম, বর্ণ, মতবাদ, আদর্শ ও রাজনীতি নির্বিশেষে দেশের সিনিয়র সিটিজেনরা পুনরায় পেরেশানির মধ্যে পড়ে গেছেন। প্রায় সবার উৎকণ্ঠা এ দেশের ভবিষ্যৎ কী? কোথায় যাচ্ছে দেশ? দেশের গন্তব্য কী? গন্তব্যের মাধ্যম কী? কোনো কিছুই তো দেশবাসীর জানা নেই। যারা বিদেশে অবস্থান করছেন তাদের উৎকণ্ঠা তো আরো অনেকগুণ বেশি।
দেশের যে আইডেন্টিটি বা পরিচয় বর্তমানে সারা দুনিয়ায় উদ্ভাসিত হচ্ছে, তা হলোÑ এটা একটা অস্থির দেশ। এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ সম্ভবত কাজকর্ম করে না, রুজি-রোজগারে ব্যস্ত থাকে না। অধিকাংশ মানুষই যেন রাজনীতির হা-ডু-ডু খেলায় ব্যস্ত। অথবা রাজনীতির কুস্তি খেলায় নিয়োজিত। এদের আয়-ইনকাম বোধ হয় রাজনীতি থেকেই আসে।
কোনো কোনো দেশের মানুষ বিষয়টিকে আরো গভীরে নিয়ে চিন্তা করে। বলে যে, রাজনীতি যে একটা বড় পেশা, বাংলাদেশের প্রাত্যহিক জীবন বিশ্লেষণ করলে তাই অনুমান করা যায়। প্রায় সব দেশের মানুষ চিন্তা করতে শুরু করেছে যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ খুব খারাপ। কারণ সেখানে কখনোই শান্ত পরিবেশ বজায় থাকে না। গত ৫৪ বছরের খতিয়ান নিয়ে সিনিয়র সিটিজেনরা একদিকে যেমন আমাদের দেশ নিয়ে মজা করেন- যেমন বলেন, ওই দেশটির মানুষ দরিদ্র হলেও প্রাণবন্ত, উচ্ছল, উজ্জ্বল। কোনো কিছুই তাদের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এ যেন এক বাধা-বন্ধনহীন অনন্য এক জগৎ। নিজেদের মধ্যে তারা যখন আলাপ করে, তখন তারা অনেক মজা করে উল্লেখ করে, আমাদের তো কত নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। আমাদের চারদিকে কত পোস্টার, কত ব্যানার। সেসব পোস্টারে-ব্যানারে সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন দল, মত ও প্রতিষ্ঠানের কত রকম সতর্কবাণী, কত রকম সাবধানতা, রুলস-রেজুলেশন, আইনকানুন, বিধি শেষ নেই। সেসব আমাদের পদে পদে, পলে পলে মেনে চলতে হয়। আমাদের গাড়ি আছে। পেট্রল-অকটেন সবকিছু আছে। কিন্তু গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই। আমাদের ড্রাইভার নেই। এসব কারণে গাড়ি থাকা সত্ত্বেও গাড়ির সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারি না। গাড়ি পার্কিং করার জন্য মাইলের পর মাইল আমাদের ঘুরতে হয়। অথচ প্রায় শোনা যায়, বাংলাদেশিরা শত শত গাড়ি পোড়াচ্ছে। কার গাড়ি কে পোড়ায়। কেন পোড়ায়! এর কোনো জবাবদিহি নেই। ওরা নিজেদের শিশু-কিশোর সন্তানদের যা খুশি তাই করতে পারে। প্রয়োজন হলে পেটাতে পারে, মারতে পারে। এতিমখানায় দিতে পারে। শিক্ষকরা শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রীদের যেকোনো ধরনের শাস্তি দিতে পারে। অথচ আমরা আমাদের শিশু-কিশোর সন্তানদের দিকে চোখ বড় করেও তাকাতে পারি না। মারধর তো দূরের কথা, বকা-ঝকাও দিতে পারি না। আমরা জীবনসঙ্গীদের ওপর কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি না। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এক্ষেত্রেও যা খুশি তাই করতে পারে। পুরুষরা সেখানে রাজা-বাদশাহ। আমরা ঘুষ দিয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে পারি না। ব্যাংক ছাড়া বিনিয়োগ করে সুদ খেতে পারি না। বাংলাদেশের মানুষ সব পারে। প্রয়োজনে ব্যাংকের পরিচালক ও ম্যানেজাররা ব্যাংকের সব টাকা লোপাট করতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ জীবনের প্রতি পদে পদে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দুর্নীতি করতে পারে। সুনীতির পরিবেশ ধ্বংস করে দিতে পারে। কিন্তু আমরা তো এসব কিছুই চিন্তা করতে পারি না। ওদের সরকারগুলো কত স্মার্ট। নাগরিকদের জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থানের ব্যবস্থা না করেও হতদরিদ্র থেকে নিম্নবৃত্ত হতে পারে, আবার প্রয়োজনে অনুন্নত দেশ থেকে উন্নতশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। তাহলে আমরা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করি নাকি তারা। নিয়মকানুনের বেড়াজালে আমরা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি। নাকি নিয়মকানুন উপেক্ষা করে তারা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে।
এসব বিদেশের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন। আপরাইডদের প্রশ্ন আরো উচ্চস্তরে। বাংলাদেশের মানুষ এই নির্বাচন করছে, এই সেক্যুলার হচ্ছে, এই ধর্মান্ধ হচ্ছে, এই জঙ্গি হচ্ছে, এই সাম্প্রদায়িক গোলযোগ সৃষ্টি করছে, এই শোনা গেল বিপ্লব করে সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। শোনা গেল, যে সরকার ছিল সেটা ছিল ফ্যাসিবাদী সরকার। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সেই সরকারের পতন ঘটেছে। তারা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবেশী বড় দেশে। যারা ছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের বন্ধু। কিছুদিন পরই শোনা গেল, বিপ্লব ভেস্তে গেছে। পুরোনো আইনকানুন দিয়েই আবার দেশকে সাজানো হচ্ছে। কিছুদিন মনে হলো সব ঠিকঠাক চলছে। পরক্ষণেই মনে হলো সব ভুয়া। সবকিছু আইওয়াশ। বন্ধু, রাষ্ট্র ও পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের ইচ্ছেতেই সবকিছু চলছে। যারা বিপ্লব করেছিল, তাদের একটা বড় অংশ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্বতন আমলা ও কর্মচারীরা দিব্যি বসে থেকে আরামসে দেশের বারোটা বাজাচ্ছেন। এ বিষয়ে কারো কোনো বলার কিছু নেই। দেশের সকল শূন্য জায়গায় ফ্যাসিবাদের সময় যারা প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকায় ছিল তারাই বসে গেছে। নির্বাচন করে কোনো কিছু করার প্রয়োজন হয়নি। প্রচলিত আইনের মাধ্যমে যারা সরকার গঠন করলেন, তাদের যেন কোনো অস্তিত্বই থাকল না। এই শোনা গেল, বিপ্লবোত্তর অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ভালো করছেন। পরক্ষণে শোনা গেল সব ভুয়া। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে কিছু কাজ করতে চেয়েছিল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কারণে সেসব বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচন করতে চেয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানুষ নির্বাচন অনুষ্ঠানকে স্বাগত জানাল, সাধুবাদ জানাল। যারা পতিত সরকারের সহযোগিতায় কেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্ষমতার শূন্যস্থানে পূর্ব থেকেই বসেছিল, তারা হাজারো বাধা সৃষ্টি করে বসে রইল। ফ্যাসিবাদী সরকার ও দলের মতো যে দলটি একসময় প্রধান বিরোধীদল ছিল, তারাও সমাজের সকল স্তর থেকে চাঁদাবাজি, লুটপাট, খুন-গুম, অনাচার, অত্যাচার, অবিচার নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে অব্যাহত রাখল। পূর্বের ১৭ বছরের জায়গায় একইতালে যোগ হলো আরো প্রায় দেড় বছর। বিপ্লব উত্থান, পলায়ন এবং অন্তর্বর্তী সরকার, যা কিছু হলো, সামান্য ব্যবধান ছাড়া একই মাত্রায়, একই অবস্থা ও ব্যবস্থায় দেশও বহমান থাকল। বড় কোনো কিছু চেঞ্জ হলো না। পরিবর্তন হলো না। কিছু শব্দের পরিবর্তন ছাড়া কার্যত তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।
তবে কয়েকটা বিষয় না বললে সত্যের অপলাপ হবে। যেমন গত ১৬-১৭ বছরে যেসব দল, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও তাদের লোকজন, নেতাকর্মীরা চরম জুলুম-অত্যাচারে নিপতিত ছিল। খুন-গুম, মামলা-মোকদ্দমা, অত্যাচার, অবিচার ও ধ্বংসের সম্মুখীন হয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল, তারা সবাই কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বিপ্লব-পরবর্তী সরকার গঠনের সাথে সাথে ওভারগ্রাউন্ডে চলে আসতে পেরেছিল। এতে কোনো বাধা-বন্ধন ছিল না। কারণ আন্ডারগ্রাউন্ডের ব্যক্তি ও মানুষই বিপ্লবের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সৈনিক ছিল। এখানে বলে রাখা ভালো আন্ডারগ্রাউন্ডে হাজার হাজার লোক ছিল না, ছিল লাখ লাখ মানুষ এবং আয়নাঘর। শত শত গুপ্তস্থান ও কারাগারসমূহেও ছিল লাখ লাখ মজলুম ব্যক্তি ও মানুষ। নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে অমানবিক পরিবেশে জীবন-যন্ত্রণায় হাবুডুবু খাচ্ছিল। এদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তি ও মানুষ তাৎক্ষণিক ওভারগ্রাউন্ডে এসে স্বাধীনতা উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছে।
পতিত সরকারের মাথাওয়ালা ব্যক্তিরা বিপ্লবের পূর্বে বার বার যে বয়ান সঞ্চারিত করেছিলেন, তা হলো বিপ্লব হলে আমাদের লাখ লাখ লোককে হত্যা করা হবে। আল্লাহর রহমতে সেই হিটলারি কাজটি বাংলাদেশে সে সময় হয়নি। এর কারণ সম্পূর্ণভাবে যে মানবিক, তাও নয়। আবার মানবিক বিষয়টিকে একেবারে উপেক্ষা করাও যায় না। অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিপ্লবীদের বড় একটা অংশ মানবিকতার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর সাথে সাথে বিপ্লবের পরপরই যারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষমতায় বসে যায়, তাদের অন্যায় লেনদেনের মধ্যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে নিষ্পন্ন হয়। নীরবে ও নিভৃতে লোকচক্ষুর অন্তরালে খুন-গুম, জুলুম-নির্যাতন ইত্যাদি সংঘটিত হয়নি। এ বড় একটা বিষয়কে কেউ সামনে আনেনি। যেভাবে হোক, বিষয়টি ছিল স্বস্তি ও শান্তির। আর তাছাড়া গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাও নির্বাপিত হওয়ায় দেশবাসী ও আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টিকে অভিনন্দিত করা হয়।
আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করাও ছিল একটা বড় ধরনের বিষয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন ও বিচার কাজ চলমান করাও ছিল একটা অনন্য বিষয়।
বিপ্লবের উত্থান ঘটেছিল প্রাথমিকভাবে সরকারের দুর্নীতি নিয়ে। বিপ্লবের যারা ক্যাটালিস্ট, তারা যখন পৃথকভাবে রাজনৈতিক দল গঠন করে কেউ কেউ দুর্নীতির পথে এগিয়ে গেল, তখন থেকেই বিপ্লবের সুষমা ধ্বংস হয়ে গেল। বিপ্লবের ক্যাটালিস্টরা ক্ষমতায় গেল, আবার বেরিয়ে এলো। এত কিছু বোধ হয় দেশবাসী ভাবেনি।
জনগণ মনে হয় এত রেডিক্যাল হতে চায়নি। জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল ভালোর দিকে, মন্দের দিকে নয়। যখন তারা দেখল ভালোর দিকে তেমন কিছু এগোচ্ছে না, তখন তারা খুঁজতে লাগল রাজনীতির ময়দানে কারা ভালোর দিকে আছে। খুঁজতে খুঁজতে তারা বড়-ছোট ৮-১০টি দল খুঁজেও পেল। আনন্দের কথা সেই ৮-১০টি দলের মধ্যে কিছু নেতাকর্মী সেক্যুলার থাকলেও মূলত তারা ইসলামপন্থি বলে ধারণা করা হয়। এদের মধ্যে এখনো একতার সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্য গঠিত হয়নি- এ কথা সত্য, কিন্তু এ ঐক্য গঠনের সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর।
এ দলগুলো রেডিক্যাল নয়, কিন্তু এরা ধীরে ধীরে সংস্কার চায়। এদের নেতাকর্মীরা ততটা অভিজ্ঞ নয়। অর্থাৎ নির্বাচনে বা ক্ষমতায় অভিজ্ঞ নয়। কিন্তু এদের মধ্যে প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ, গুণিজন তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি আছেন। যারা উচ্চতর পেশায় নিয়োজিত আছেন। যেমন শিক্ষাবিদ, লেখক, রাজনীতিবিদ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, সাবেক আমলা, উচ্চতর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সাবেক ছাত্রনেতা, সংস্কৃতিজন, আইনজীবী, সাবেক বিচারপতি, সাবেক এমপি ইত্যাদি। এরা রেডিক্যাল না হলেও মাঝে মাঝে রেডিক্যালিজম প্রদর্শন করে বসেন। রেডিক্যাল কথাবার্তাও বলেন। যেটা তারা নন। তারা এ কথা জানেন যে, বাংলাদেশের মানুষ হুটহাট করে পরিবর্তন চায় না। গৃহের একটা চৌকি বা খাটও হঠাৎ করে সরায় না। বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যিক। বাপ-দাদার বিষয়-আশয় রাতারাতি পরিবর্তন করে বসে না। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-আচরণের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ স্ট্যাটিক। তাবলিগের পরিবার হুট করে অন্য মাজহাব গ্রহণ করে না। যারা আলিয়াপন্থী তারা হুটহাট করে কওমি হয়ে যায় না। পীর সাহেবরা বাপ-দাদার সিলসিলা পরিবর্তন করে অন্য কোনো সিলসিলায় যায় না। বিষয়টি খুব সূক্ষ্ম। অনেকটা বিশ্বজনীন। বিলেতের কনজারভেটিব ফ্যামিলির ব্যক্তি খুব সহজে লেবার পার্টির সদস্য হয় না। আবার লেবার পার্টির সন্তান সহজেই কনজারভেটিব হয় না। এ বিষয়ে বেশি উদাহরণের প্রয়োজন নেই। কমিউনিজমের মধ্যে যারা রেডিক্যাল ছিল, তারা রাতারাতি বলসেভিক হয়ে উঠেছিল তারা রাজনীতির কারণে লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে। ম্যানসেভিকরা ছিল ধীরগতির। তারা এখনো বিশ্বব্যাপী কাজ করছে। বলসেভিকরা হারিয়ে গেছে। ইসলামী ধারার এ ৮-১০টি দল যদি একটু চিন্তাভাবনা করে শুধু নির্বাচনের জন্য অন্য আরো কিছু দলকে সঙ্গী করার প্রয়াস পায়, তাহলে নির্বাচনে ভালো কিছু করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে মনে হয়। তবে এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো- রেডিক্যাল বক্তব্য শূন্যের কোটায় আনতে হবে। ভাবতে হবে মাঝের অবস্থান তাদের যেমন ছিল, এখন হয়তো তা সে অবস্থানে নেই। কেন নেই, সে বিষয়টি তাদের খতিয়ে দেখতে হবে। দোষটা কার। দেশাবসীর? জনগণের? ষড়যন্ত্রকারীদের? বিপক্ষদের? আর যদি… ত্রুটিটা সবার হয়, তাহলে কার কত পারসেন্ট?
বিপ্লবীরা সবাই মিলে একসাথে থাকলে খুব ভালো হতো, অন্তত নির্বাচন পর্যন্ত। কিন্তু সেটা হয়নি। বাস্তব অসুবিধাও ছিল। একদলের বা এক আদর্শের ছাত্র বা জনগণ বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেনি, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া; বিশেষ করে স্বৈরাচারী দল ছাড়া সব দল, মত ও মতবাদের ছাত্র-জনতা অংশগ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিপ্লবোত্তর সময় এক থাকা বা একসাথে রাজনীতি করা বাস্তব অর্থে সম্ভবও ছিল না।
তবে বিপ্লবের ক্যাটালিস্টরা ছিল ছাত্র। তারা ইচ্ছা করলে ছাত্রত্ব শেষ করে তাদের নিজের নিজের আদর্শ বা মতবাদ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলে প্রবেশ করতে পারত। অথবা তারা নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু কোনোটাই বাস্তবভাবে সম্পন্ন হয়নি।
বিপ্লবের ছাত্র ক্যাটালিস্টরা নানাভাবে বিভক্ত হয়ে গেল। শেষমেশ যারা রইল, তারা ‘ফ্যাসিবাদ ও এন্টি ইন্ডিয়ান’ বয়ানে মোটামুটিভাবে স্থির রইল। কিন্তু দেখা গেল এখানেও চরম ও নরম বয়ান। একেকজন একেক সুরে কথা বলছে। প্রতিবেশী, আঞ্চলিক রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা কতটা এন্টি ইন্ডিয়ান হব? কারণ পাকিস্তানের একটা শিশু ছোট থেকে বড় হয় ‘ক্রাস ইন্ডিয়া শুনে শুনে’, ‘ক্রাস ইন্ডিয়া পড়ে পড়ে’, তারা যখন খেলনা বন্দুক চালানো শেখে, তখনো নির্দিষ্ট স্পটে ইন্ডিয়ার মানচিত্র টানানো থাকে- সেটাই কানমারি, সেটাকেই লক্ষ করে খেলনা গুলি চালাতে হয়।
আমাদের শিশুরা গত ৫৪ বছরে শুনে এসেছে ‘ভারত আমাদের বন্ধু’, ‘ভারত আমাদের বন্ধু দেশ’, ‘ভারত আমাদের সৎ প্রতিবেশী’, ‘ভারত মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সাহায্য করেছে’, ‘ভারত না হলে মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়লাভ করতাম না’। এ ধরনের একটা পটভূমি ও প্রেক্ষাপটে আমরা কতদূর এন্টি ইন্ডিয়ান হবো, অবশ্যই তা ভাবতে হবে।
বিপ্লবের ক্যাটালিস্টদের একজন ছিলেন শিক্ষক- শরীফ ওসমান হাদি। তিনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শপথ নিয়ে গড়ে তুললেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ এবং যেহেতু তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত কবি, সাহিত্যিক ও বিপ্লবী সংস্কৃতিজন, স্বাভাবিকভাবে গড়ে তুললেন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। তুমুল কাজ শুরু করলেন। সহ্য হলো না ফ্যাসিবাদীদের, সহ্য হলো না সেক্যুলারদের। এ মহান ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করা হলো গত ১২-১২-২০২৫ তারিখে। তিনি সিঙ্গাপুরে শহীদ হয়েছেন ১৮-১২-২০২৫ তারিখে। ঢাকায় মহাজানাযা হয়েছে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এবং সমাহিত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাধিস্থলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে। বিপ্লবীরা একত্রিত থাকলে এমন ঘটনা হয়তো নাও ঘটতে পারত। তবে স্মরণকালে ঢাকায় এত বড় জানাযা আর হয়নি। এমন একটা নবতর পরিস্থিতিতে এখন আমরা কী করব?