মুসলিমদের অনগ্রসর শ্রমিক জীবনযাপন
১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ০০:০৯
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
জার্মানি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে হিটলারের দেশ নামে পরিচিত। আয়তনের বিচারে জার্মানি ইউরোপের মধ্যে সপ্তম এবং বিশ্বের মধ্যে ৬৩তম। এখানে অন্য ধর্মাবলম্বীদের মতো মুসলিমদের উপস্থিতি রয়েছে। জার্মানিতে স্বপ্নময় জীবনের হাতছানিতে অভিবাসন গ্রহণ করলেও দেশটিতে; বিশেষ করে মুসলিমরা বিবাহবন্ধন ব্যতীত সন্তান গ্রহণ, নিয়মনীতিহীন অবাধ পরিবেশের কারণে ইসলাম থেকে দূরে সরে অনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে শিক্ষায় অনগ্রসর হয়ে শ্রমিক জীবনযাপন করছে। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শিল্পোন্নত দেশ হলেও কর্মসংস্থানের দিকে মুসলিমরা এখানে সবচেয়ে পিছিয়ে। অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলো মেধাহীন হয়ে মানবসম্পদের সংকটে আক্রান্ত। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও দেশটিতে ইসলামবিদ্বেষী পরিবেশ বিরাজমান।
জার্মানি ভৌগোলিক অবস্থান ও ভাষা
জার্মানি সরকারিভাবে ফেডারেল প্রজাতন্ত্র। বার্লিন জার্মানির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। জার্মানির মোট আয়তন ৩,৫৭,০২২ বর্গকিলোমিটার যার মধ্যে ৩,৪৯,২২৩ বর্গকিমি ভূমি এবং বাকি অংশ জলভাগ। জার্মানির পূর্ব সীমান্তে পোল্যান্ড ও চেক প্রজাতন্ত্র, পশ্চিম সীমান্তে ফ্রান্স, লুক্সেমবুর্গ, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডস, উত্তর সীমান্তে ডেনমার্ক এবং দক্ষিণ সীমান্তে অস্ট্রিয়া ও সুইজারল্যান্ড অবস্থিত। উত্তর সীমান্তে উত্তর সাগর ও বাল্টিক সাগর এবং দক্ষিণে আল্পস পর্বতমালার মাঝখানে অবস্থিত জার্মানি। দেশটির মধ্য দিয়ে ইউরোপের অনেক প্রধান প্রধান নদী যেমন রাইন, দানিউব, এলবে প্রবাহিত হয়েছে। জার্মানির সরকারি ভাষা জার্মান। অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরবি, গ্রিক, ইতালীয়, কুর্দি এবং তুর্কি ভাষা উল্লেখযোগ্য। জার্মানির পূর্ব সীমান্তে পোলিশ এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ওলন্দাজ ভাষা প্রচলিত।
জনসংখ্যা
জার্মানিতে মোট জনসংখ্যা ৮ কোটি প্লাস। ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট মিলিয়ে জার্মানির অর্ধেকেরও বেশি মানুষ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। এক-তৃতীয়াংশ কোনো ধর্মের অনুসারী নয়। ম্যুন্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানী ডেটলেফ পোলাক জানান, গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে ৯০ শতাংশ মানুষ ছিলেন খ্রিষ্টান। জার্মানিতে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। জার্মান টেলিভিশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে দেশটিতে প্রতি বছর চার হাজার জার্মান নাগরিক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। তাই অনেকেই বর্তমান জার্মানিকে ইউরোপে ইসলামের সবচেয়ে উর্বর ভূমি বলেন। বিএএমএফের প্রেসিডেন্ট হ্যান্স-এথার্ড সোমার বলেন, সাম্প্রতিক কালে মধ্যপ্রাচ্য; বিশেষ করে সিরিয়া থেকে শরণার্থী আসায় জার্মানিতে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির অধিকাংশই ইসলামকে বিদেশি বলে প্রত্যাখ্যান করে। সমাজবিজ্ঞানী পোলাকের ভাষায়, ‘মুসলিমদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় জার্মানিতে বেশ কম।’ ভবিষ্যতে একজন মুসলমান জার্মানির খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল, সিডিইউর প্রধান এবং চ্যান্সেলর হতে পারেন বলে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েন দলটির সংসদীয় দলের নেতা রালফ ব্রিংকহাউস। যদিও ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পর ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এখন জার্মানিতে তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে।
জার্মানির ইতিহাস
জার্মানির ইতিহাস জটিল এবং এর সংস্কৃতি সমৃদ্ধ, তবে ১৮৭১ সালের আগে এটি কোনো একক রাষ্ট্র ছিল না। ১৮১৫ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত জার্মানি একটি কনফেডারেশন এবং ১৮০৬ সালের আগে এটি অনেক স্বতন্ত্র ও আলাদা রাজ্যের সমষ্টি ছিল। ১৮৭১ সালে অটোফন বিসমার্কের অধীনে একত্রিত হবার পর জার্মানিতে দ্রুত শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মানি ইউরোপে আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা চালালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত। ১৯১৮ সালে যুদ্ধে জার্মানির পরাজয় ঘটলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। জার্মানিতে উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়ার ফলে নাৎসি পার্টির আবির্ভাব ঘটে। নাৎসি পার্টি ১৯৩০-এর দশকে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে। ১৯৩৯ সালে জার্মানির আগ্রাসনের ফলে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বযুদ্ধ হয়। ১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তি যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন জার্মানিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত করে। ১৯৬১ সালে পূর্ব জার্মানি সরকার বার্লিনে একটি প্রাচীর তুলে দেয় এবং দেশের সীমান্ত জোরদার করে। ১৯৮৯ সালে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের বাসিন্দারা বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলে। এ ঘটনাটিকে পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদের পতন ও জার্মানির পুনঃএকত্রীকরণের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের ৩ অক্টোবর দুই জার্মানি একত্রিত হয়ে জার্মান ফেডারেল প্রজাতন্ত্র গঠন করে।
ইসলামের আলো
মুসলিম স্পেন শিক্ষা-দীক্ষা, শিল্প-সাহিত্য, দর্শন-চিন্তা ইত্যাদি তৎকালীন ইউরোপ তথা জার্মানিতে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। জার্মানরা ক্রুসেড যুদ্ধের কারণেও ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। এ যুদ্ধে স্পেন ও জার্মানির রাজাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এছাড়া মুবাল্লিগ ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তুরস্কের উসমানীয় খিলাফতের সোনালি যুগে জার্মানিতে ইসলামের আলো পৌঁছে। জার্মানির একজন খ্যাতিমান মুসলিম মুরাদ বেলফার্ড হফম্যান। তিনি মরক্কোয় জার্মানির রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। মুসলমান হবার পর তিনিও জার্মানির সমাজে ইসলামকে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতে অনেক যুদ্ধবন্দির মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ হাজার। এদের মাধ্যমেও জার্মান নাগরিকরা মুসলমানদের জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। মুক্তির পর তাদের অনেকে জার্মানিতে জীবনযাপন শুরু করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কিছুসংখ্যক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী জার্মানিতে গমন করে।
ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদ
জার্মানিতে মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয় ১৯৩২ সালে। হামবুর্গ ইসলামিক সেন্টারের মতো বর্তমানে প্রায় প্রতিটি রাজ্যে কয়েকটি করে ইসলামিক সেন্টার রয়েছে। জার্মানিতে এসব ইসলামিক সেন্টারের কার্যক্রমগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তুর্কি মুসলমানরাই চালিয়ে থাকে। খ্রিস্টান অধ্যুষিত জার্মানিতে মসজিদ, পাঠাগার ও ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় মুসলমান সমাজহিতৈষীদের অসামান্য অবদান রয়েছে। জার্মানিতে রয়েছে ঐতিহাসিক লাল মসজিদ (১৭৮৯-১৭৯১ খ্রি.)। এছাড়া বার্লিন থেকে ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে উইনসফোর্ড অঞ্চলে জার্মানিতে সাম্প্রতিককালে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৯১৫ সালে যুদ্ধে মুসলমানদের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। দেশটিতে দুই হাজার ৬০০টির মতো ছোট-খাটো মসজিদ রয়েছে। কোলন মসজিদ ইউরোপের অন্যতম বড় এবং জার্মানির সবচেয়ে বড় মসজিদ। আয়তন ৪৫০০ বর্গমিটার। তুরস্কভিত্তিক সংগঠন তার্কিশ ইসলামিক ইউনিয়ন ফর রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স (ডিআইটিআইবি) মসজিদটি পরিচালনা করে। ২০১৮ সালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানের উদ্বোধন করেন।
ইসলাম তথা মুসলিমবিদ্বেষ
বৈষম্যবিরোধী বিভিন্ন সংস্থা, কাউন্সেলিং সেন্টার ও বেসরকারি সংস্থার বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পুলিশের নথিভুক্ত অপরাধের পরিসংখ্যান ও মুসলিমবিরোধী ঘটনার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দ্য ইনডিপেনডেন্ট গ্রুপ অব এক্সপার্টস অন মুসলিম হস্টিলিটি (ইউইএম) বলছে, জার্মানিতে মুসলমানদের সাথে বৈষম্য প্রতিনিয়ত ঘটছে। এনজিও ক্লেইম এর হানানো বলেন, ‘এখানে এখন যারা মুসলিম কিংবা যাদের দেখতে মুসলিমদের মতো মনে হয়, তাদের জন্য জার্মানি নিরাপদ নয়।’ ক্লেইম তাদের প্রতিবেদনে আরো বলছে, মুসলিমবিদ্বেষের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করতেও মুসলিমরা ভয় পাচ্ছে। এমনকি জার্মানির রাজধানী বার্লিনেও এক মুসলিম নারীকে রেলের ট্র্যাকে ধাক্কা দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সে হামাসের সদস্য কিনা? এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি দুই জার্মান নাগরিকের মধ্যে একজন ইসলামবিদ্বেষী। ইসলামোফোবিয়ার মাধ্যমে মুসলিমদের দোষারোপ করা নিষিদ্ধ নয়। যদিও দার্শনিক মোশে জুকারম্যান বলেছেন, ‘ইসলামোফোবিয়া হলো একটি অকথিত ইহুদিবিরোধিতার প্রকাশ’ এবং ‘ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন’ কার্যক্রম। ‘আইজেএইচ’ ও ‘মুসলিম ইন্টারঅ্যাকটিভ’ এর মতো মুসলিম সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং ‘জেনারেশন ইসলাম’ এবং ‘রিয়েলিটি ইসলাম’ এর মতো মুসলিম সংগঠনগুলোকে নাজেহাল করেছে জার্মান সরকার। এরকম বিভিন্নভাবে জার্মানিতে ইসলামবিদ্বেষ চলমান।
পেগিডা
২০১৫ সালে প্রায় ১০ লাখ উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দেয়ার পর, জার্মানিজুড়ে আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তুতে পরিণত হয় ইসলাম। ইউরোপে অব্যাহত অভিবাসন প্রত্যাশীদের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করার লক্ষ্যে জার্মানিতে ইসলামবিদ্বেষী ‘পেগিডা’ আন্দোলন যাত্রা শুরু করে। পেগিডা আন্দোলনের জন্মভূমি নামে খ্যাত জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় ড্রেসডেন শহরে সবচেয়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেন, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, চেক রিপাবলিক এবং স্লোভাকিয়ায়ও অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ইউরোপে অভিবাসীদের স্বাগত জানাতে মহাদেশটির বিভিন্ন শহরে একই দিনে ‘পেগিডা’বিরোধী বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। আলোচিত হয় যে ‘জার্মানি ইসলামের জন্য অনুকূল দেশ নয়’ কিংবা ‘ইসলাম জার্মানির অংশ হতে পারে না’।
‘অল্টারনেটিভ ফর ডয়েসল্যান্ড’
মুসলমানদের আজান, বোরকা ও মসজিদের মিনার নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে দলীয় ম্যানিফেস্টো তৈরি করেছে ‘অল্টারনেটিভ ফর ডয়েসল্যান্ড’ সংক্ষেপে এএফডি ভয়ানক উগ্র রাজনৈতিক দলটি। এরা ইউরোবিরোধী এবং অভিবাসনবিরোধী হলেও মূলত ‘ইসলামবিরোধী’। ম্যানিফেস্টোতে তারা ঘোষণা করেছে, জার্মানিতে ইসলাম ধর্মের কোনো স্থান নেই। এখানে খ্রিষ্টানদের মতো সমান অধিকার মুসলিমদের থাকা উচিত নয়। তাদের মুসলিমনীতি অনেকটা ইহুদিদের ব্যাপারে নাৎসিদের ভূমিকা যেমন ছিল। অনেকের মতে, এএফডির ইসলাম সম্পর্কে অবস্থান বিপজ্জনক এবং বিভক্তি সৃষ্টিকারী এবং জার্মানির মুসলমানদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
সন্তানদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা
‘সন্তান স্কুলে বলেছে, তার বাবা-মা বলেছেন, সমকামিতা ইসলামে হারাম।’ এ কারণে জার্মানিতে ছোট একটি শিশুকে পুলিশ কর্তৃক ছিনিয়ে নিয়ে বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে জার্মান প্রশাসন যেটির ভিডিও সম্প্রতি সোসশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় একজন ব্রেমারহ্যাভেন পুলিশ অফিসারকে বলতে শোনা যায়, ‘এটি আদালত এবং ইয়ুথ ওয়েলফেয়ার অফিসের সিদ্ধান্ত।’
যদিও ২০১২ সালে সেক্রেটারি জেনারেল অব দ্য কাউন্সিল অব ইউরোপের কাছে লেখা এক চিঠিতে সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ডের মতো বিভিন্ন নর্ডিক দেশে অভিবাসী, তরুণ, একক অভিভাবক, মুসলিম এবং অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলো থেকে সোশ্যাল সার্ভিসের নামে নির্মমভাবে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করার নিন্দা জানায় নর্ডিক কমিটি ফর হিউম্যান রাইটস (এনএইচসিআর)।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি
জার্মানিতে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ সত্ত্বেও জার্মান সরকার বা সরকারের পদস্থ ব্যক্তিবর্গের কিছু ইতিবাচক কাজ ও পদক্ষেপের মধ্যে ২০১০ সালের অক্টোবরে জার্মানির চ্যান্সেলর মার্কেলের, ‘জার্মানি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হতে খুব বেশি দেরি নেই। পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগা জার্মানিতে অধিক পরিমাণ মসজিদের উপস্থিতি মেনে নেওয়ার জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে’, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেসারের, ‘মুসলিম জীবন অবশ্যই জার্মানির অংশ।’ এবং কোলন শহরের মেয়র হেনরিয়েট রেকারের আজানকে কেন্দ্র করে, ‘আজান দেওয়ার অনুমোদনের মাধ্যমে এ শহরের বৈচিত্র্যময়তা প্রকাশিত হয়েছে এবং স্থানীয় মুসলিমদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে। এ উদ্যোগ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আইনের ন্যায্যতা দিয়েছে।’ মন্তব্য অন্যতম। এছাড়া জার্মানির মুসলিমবিদ্বেষী লেখক থিলো সারাজিনের ইসলাম নিয়ে বিতর্কিত একটি বই প্রকাশ নিয়ে আদালতে জেল হয়।
সম্প্রতি তার নতুন আরেকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটির শিরোনাম ‘হসটাইল টেকওভার-হাউ ইসলাম ইমপেয়ারস প্রগরেস এন্ড থেরেটেন্ড সোসাইটি’ (প্রতিকূল অর্জন। কিভাবে ইসলাম উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে ও সমাজে হুমকি তৈরি করছে)।
এন্টিটি আন্ডার পাবলিক ল
২০১৫ সালে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে যখন জার্মানিতে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছিল, তখনো এঞ্জেলা মার্কেল বলেছিলেন, ‘ইসলাম জার্মানির অংশ।’ কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হোর্স সিহোফার দেশটির বহুল প্রচারিত বিল্ড সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, জার্মানিতে ইসলাম ধর্ম পালন করা সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ দেশে এ ধর্ম খাপ খায় না।’ তবে তাঁর এহেন বক্তব্য খণ্ডন করে চ্যান্সেলর মার্কেল আবারও মন্তব্য করেছেন, ইসলাম অবশ্যই জার্মানির অংশ। ইউরোপিয়ান মনিটরিং সেন্টার অন রেসিজম অ্যান্ড জেনোফোবিয়ার প্রধান বিট উইন্কলারের মতে, ইউরোপ এখন ইসলামফোবিয়ায় আক্রান্ত। তাদের পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনকভাবে ফুটে উঠেছে। ইসলাম জার্মানিতে ‘এন্টিটি আন্ডার পাবলিক ল’, অর্থাৎ সার্বজনিন আইন দ্বারা স্বীকৃত ধর্মীয় গোষ্ঠী নয়। ‘ইসলাম জার্মানির অংশ’Ñ এ মন্তব্য করে সাবেক জার্মান প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ান ভুলফ তুমুল বিতর্কের সূত্রপাত করেছিলেন। জার্মানিতে বসবাসকারী মুসলিম জনসাধারণের সহানুভূতি পেলেও বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর এ কথায়। ভুলফের উত্তরসূরি ইওয়াখিম গাওক, যিনি একজন প্রটেস্ট্যান্ট যাজকও, সরাসরি এ বাক্যটিকে গ্রহণ করতে চাননি। তাঁর মতে ইসলাম নয়, শুধু মুসলমানরা জার্মানির অংশ। প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মতত্ত্ববিদ পেট্রা বার এক অনুষ্ঠানে কোন ধর্ম জার্মানির অংশ? এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘‘এটা খুব সহজেই বলা যায় সব জার্মানের ধর্মই জার্মানির অংশ। মুসলিমরা এ সমাজের অংশ, তাই ইসলামও। এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করাটা আমার বোধগম্য হয় না। ইসলাম ছাড়া তো মুসলমান হওয়া যায় না।’’ এভাবে বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে মুসলিমরা ইসলাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে যেটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অনগ্রসর মুসলিম শ্রমিক
মুসলিমরা উন্নত জীবনের আশায় এখানে অভিবাসী হলেও অনগ্রসর শ্রমিকে পরিণত হচ্ছে। ৪৭ শতাংশ মুসলিম মাধ্যমিক পর্যায়ের লেখাপড়া শেষ করতে পারে। মাত্র ৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পায়। অর্থনেতিক দৈন্যদশার কারণেই তারা শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে পারছে না। বেকারের সংখ্যা মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে মুসলিম দেশগুলো মেধাশুন্যতায় ভুগছে এবং সেই শূন্যতা পূর্ণ করতে অমুসলিম দেশ থেকে অধিক মূল্যের বিনিময়ে মানবসম্পদ হায়ার করছে ফলে মুসলিম দেশগুলো মেধাশূন্যতার সাথে মুসলিম জনসংখ্যা হারানোর এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
বিবাহবহির্ভূত সন্তান জন্মদান
বিবাহবহির্ভূত সন্তান জন্মদানে ইউরোপের দেশগুলোয় শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স। ইউরোস্টেটের এক জরিপ মতে, দেশটিতে ৬০% বাবা-মা বিয়ে ছাড়াই তাদের সন্তান জন্ম দেন। সুইডেন, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, নেদারল্যান্ডসে এ হার ৫০ শতাংশের ওপরে। বেলজিয়াম, স্পেন, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়ায় ৪০ শতাংশের বেশি। তালিকায় ১৯ নম্বর ইতালিতে ৩৪ শতাংশ শিশুদের বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী নয়। পরিবার গঠন, সন্তান জন্মদান এবং লালন-পালনের জন্য বিবাহ একটি ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি। পশ্চিমা সভ্যতায় সেই ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তবে মন্দের ভালো জার্মানিতে এ হার ৩৩ শতাংশ। জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপে দেশটির অবস্থান ২০ নম্বরে। ইউরোপে তুলনামূলক জার্মানিতে বিয়ে ছাড়া সন্তান জন্মদানের হার কিছুটার কম। ইসলাম, খ্রিষ্টান, ইহুদি ধর্মসহ অন্য মতবাদের ন্যায় বিয়ে ছাড়া সন্তান জন্মদানকে আদি জার্মানরাও অনৈতিক মনে করে। স্বামী-স্ত্রী দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে সন্তান লালনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন জার্মানিরা। এছাড়া বিয়ের পর সন্তান নিলে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয় জার্মান সরকার। বিবাহিতদের চাকরি পেতে অন্যদের তুলনায় গুরুত্ব বেশি দেয়া হয়।
ইউরোপসহ পুরো বিশ্বেই মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও ইসলাম অনুশীলনের চিত্র ভিন্ন। যদিও অবসাদগ্রস্ত যুবক এবং নারীদের মধ্যে ইসলাম জেনেই মুসলিম হওয়ার হার বেশি। ইসলামকেই তারা শেষ আশ্রয় হিসেবে গণ্য করছে। প্রতিকূলতা সামলে পশ্চিমা সভ্যতার নামে অনৈতিক প্রবাহে গা না ভাসিয়ে মুসলমানরা ইসলাম ধরে রাখতে পারলে জার্মানি, ইউরোপ তথা সমগ্র বিশ্বে ইসলাম বিজয়ী অবশ্যম্ভাবী।
সূত্র : অ্যাসোসিয়েট প্রেস, আল-জাজিরা, ডয়েচে ভেলে, ডেইলি সাবাহ, রয়টার্স।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]