কাশ্মীর সংকট নিরসনে প্রয়োজন জাতিসংঘ প্রস্তাবিত গণভোট
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:২০
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল॥
হিমশীতল পর্বতমালা, স্বচ্ছ হ্রদ, সবুজ উপত্যকা এবং মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ‘ভূস্বর্গ’খ্যাত কাশ্মীর এক অনন্য উপত্যকা। এ অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ‘কাশ্মীর’ শব্দটি কেবল একটি ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, একাধিক দেশের রাজনৈতিক দাবি এবং অসংখ্য মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিচ্ছবি। ভারত, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধের কারণে কাশ্মীর বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গবেষকদের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একসময়ের স্বাধীন কাশ্মীর সংকটের একমাত্র সমাধান হচ্ছে জাতিসংঘ গৃহীত প্রস্তাবের আওতায় গণভোট অনুষ্ঠান।
কাশ্মীর উপত্যকার ভৌগোলিক অবস্থান : ভৌগোলিকভাবে ‘কাশ্মীর’ একটি বিশাল ও জটিল অঞ্চল, যা উপত্যকাটির চেয়েও অনেক বিস্তৃত। ঐতিহাসিকভাবে কাশ্মীর বলতে মূলত তৎকালীন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে বোঝানো হতো, যা ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের পর এবং পরবর্তী সংঘাতের জেরে ভারত, পাকিস্তান ও চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন অংশ নিয়ে গঠিত হিমালয় ও কারাকোরাম পর্বতমালার সংযোগস্থলে পীর পাঞ্জাল পর্বতমালাবেষ্টিত ডিম্বাকৃতির উপত্যকা যেটি বিশ্বের অন্যতম জটিল ভূ-রাজনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। এটির গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬০০ মিটার। কাশ্মীরের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ১৫০০-এর দশকে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এ কাশ্মীরকে ‘ভূস্বর্গ’ (Paradise of Earth) আখ্যা দিয়েছিলেন।
জম্মু-কাশ্মীর : প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের পর (১৮৪৫-৪৬) ব্রিটিশরা কাশ্মীরকে শিখদের কাছ থেকে দখল করে এবং ১৮৪৬ সালে ‘অমৃতসর চুক্তির’ মাধ্যমে এটিকে জম্মুর ডোগরা শাসক মহারাজা গুলাব সিংয়ের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীতে জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ এবং গিলগিট-বালতিস্তান নিয়ে বৃহত্তর জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়, যা ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত একটি দেশীয় রাজ্য হিসেবে টিকে ছিল। জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হলো শ্রীনগর, আর শীতকালীন রাজধানী হলো জম্মু। কাশ্মীর উপত্যকা প্রধানত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তবে জম্মু অঞ্চলে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। একসময় এ রাজ্যের আলাদা পতাকা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং পৃথক সংবিধান ছিল। কালক্রমে সব হারিয়ে ‘রাষ্ট্রপতি’ হন ‘রাজ্যপাল’। ‘প্রধানমন্ত্রী’ হন ‘মুখ্যমন্ত্রী’।
লাদাখ : এটি বৃহত্তর কাশ্মীর অঞ্চলের পূর্ব অংশজুড়ে বিস্তৃত, যা মূলত একটি উচ্চ মালভূমি এবং শীতল মরুভূমি অঞ্চল। এর রুক্ষ অথচ অত্যাশ্চর্য ল্যান্ডস্কেপ, হিমবাহ এবং সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি এটিকে একটি অনন্য ভৌগোলিক পরিচয় দিয়েছে। লেহ ও কারগিল এর দুটি যৌথ জেলা সদর।
আজাদ কাশ্মীর : কাশ্মীর উপত্যকার পশ্চিম অংশ এবং পীর পাঞ্জাল পর্বতমালার পশ্চিম ঢাল নিয়ে গঠিত আজাদ কাশ্মীর, যা ‘পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর’ (POK) বলে অভিহিত। আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ। আজাদ কাশ্মীর পাকিস্তানের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে পরিচালিত হয়, যার নিজস্ব রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং আইনসভা রয়েছে। তবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব এখানে বিদ্যমান।
গিলগিট-বালতিস্তান (Gilgit-Baltistan – এই) : বৃহত্তর কাশ্মীর অঞ্চলের উত্তরতম অংশে অবস্থিত, যা কারাকোরাম, হিমালয় এবং হিন্দুকুশ পর্বতমালার সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে এটি জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ হলেও পাকিস্তান এটিকে তার একটি প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি, বরং একটি ‘স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ হিসেবে পরিচালনা করে। এর মর্যাদা নিয়েও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্ক রয়েছে। এটি চীনের সাথে পাকিস্তানের কৌশলগত ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর’ (CPEC) প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আকসাই চীন (Aksai Chin) : এটি কারাকোরাম পর্বতমালার পূর্বে অবস্থিত একটি উচ্চ মালভূমি অঞ্চল, যা মূলত একটি শুষ্ক, বরফাবৃত মরুভূমি। আকসাই চিন অঞ্চলটি ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। ভারত এটিকে তাদের লাদাখ অঞ্চলের অংশ দাবি করে, অন্যদিকে চীন এটিকে তাদের জিনজিয়াং প্রদেশের অংশ মনে করে। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর থেকে এটি চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং উভয় দেশের মধ্যে ‘লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল’ (LAC) দ্বারা এটি বিভক্ত। আকসাই চীনের কিছু অংশ শান্দুর পাস এবং কারাঘান উপত্যকা নিয়েও বিরোধ রয়েছে।
কাশ্মীর উপত্যকার সীমানা ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র/অঞ্চল : বৃহত্তর কাশ্মীর অঞ্চল একটি অত্যন্ত কৌশলগত অবস্থানে অবস্থিত, যার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের সাথে সীমান্ত রয়েছে। কাশ্মীর অঞ্চলের পূর্বে ভারতের পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশ, পশ্চিমে পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ এবং উত্তর-পূর্বে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশ ও স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত অঞ্চল অবস্থিত। উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তানের ওয়াকান করিডোরের মাধ্যমে একটি সরু সীমান্ত রয়েছে, যা গিলগিট বালতিস্তান অঞ্চলের সাথে সংযুক্ত।
কাশ্মীরের বেশিরভাগ অংশই হিমালয় পর্বতমালার অংশ। এটি কাশ্মীর উপত্যকাকে ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে পৃথক করেছে। লাদাখ, গিলগিট-বালতিস্তান এবং আকসাই চীন অঞ্চলে বিস্তৃত কারাকোরাম পর্বতমালা যেখানে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ক২ অবস্থিত। সিন্ধু নদ কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী, যা এ অঞ্চলের জন্য জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ঝিলাম, চেনাব এবং রাভি নদীর মতো অন্য প্রধান নদীগুলোও এ অঞ্চলে প্রবাহিত হয়। এ নদীগুলো কেবল কাশ্মীরের ভূগোলেই নয়, ভারত-পাকিস্তান পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়নেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগুলো কাশ্মীরকে একটি অনন্য ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রদান করেছে।
মুসলিম শাসনের আগমন : একাদশ শতাব্দীর পর থেকে কাশ্মীরে মুসলিম শাসনের আগমন ঘটে এবং তা অঞ্চলটির সংস্কৃতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে।
সুলতানি ও মুঘল আমল : চতুর্দশ শতাব্দীতে শাহ মীর কাশ্মীরি সালতানাতের প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মুঘল সম্রাট আকবরের সময় (১৫৮৬ খ্রি.) কাশ্মীর মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুঘল শাসকরা; বিশেষত জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান, কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে অনেক সুন্দর বাগান (যেমন শালিমার বাগ, নিশাত বাগ) তৈরি করেন। এ সময়েই কাশ্মীরে ইসলাম ধর্ম ব্যাপক প্রসার লাভ করে এবং বহু সুফি সাধক ও আলেম এ অঞ্চলে এসেছিলেন, যারা স্থানীয় সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করেন।
কাশ্মীরি সংস্কৃতির ওপর ইসলামী প্রভাব : মুসলিম শাসনের অধীনে কাশ্মীরি ভাষা, পোশাক, রন্ধনশৈলী এবং শিল্পকলায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। পশমিনা শাল এবং কাঠের কারুশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী কাশ্মীরি শিল্পকর্ম এ সময়েই বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করে।
ব্রিটিশ ভারত বিভাজন এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর ভবিষ্যৎ : ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারতীয় উপমহাদেশে ৫০০-এর বেশি দেশীয় রাজ্যকে ভারত বা পাকিস্তানের যেকোনো একটিতে যোগদানের অথবা স্বাধীন থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। জম্মু ও কাশ্মীর ছিল বৃহত্তম দেশীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি। দুঃখজনক তবে সত্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এটির শাসক ছিলেন হিন্দু মহারাজা সিং। প্রাথমিকভাবে মহারাজা সিং স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নিলেও ১৯৪৮ সালের অক্টোবর মাসে তিনি ভারতভুক্ত হতে চান। ভারত মহারাজার কাছে ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’ নামক চুক্তিতে স্বাক্ষর করার দাবি জানায়, মহারাজা এতে স্বাক্ষর করেন যার মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত ভুক্ত হয়।
প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ও সিজফায়ার লাইন (LoC) : জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৪৮ সালের শেষ পর্যন্ত চলে। ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘ-প্রণীত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা একটি ‘যুদ্ধবিরতি রেখা’ (Ceasefire Line) তৈরি করে। এ রেখাটি পরবর্তীতে ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ (Line of Control – LoC) নামে পরিচিতি লাভ করে। এ রেখা কাশ্মীরকে ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে বিভক্ত করে দেয়।
এটি ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তৈরি হলেও ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি দ্বারা একে একটি ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। খড়ঈ একটি অঘোষিত সীমান্ত হিসেবে কাজ করে এবং উভয় পক্ষই এখানে কড়া সামরিক প্রহরা বজায় রাখে। কাশ্মীর উপত্যকা নিয়ে দেশদুটির মধ্যে আরো কয়েকবার সংঘাত হয়।
লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল- ভারত-চীন সীমান্ত : এটি সেই বিতর্কিত সীমান্ত রেখা যা ভারত-নিয়ন্ত্রিত লাদাখ এবং চীন-নিয়ন্ত্রিত আকসাই চিনকে পৃথক করে। খঅঈ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত নয়, বরং এটি উভয় দেশের কার্যকর সামরিক নিয়ন্ত্রণের রেখা। এ রেখা বরাবর প্রায়ই দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত দেখা যায়।
সিয়াচেন হিমবাহ : সিয়াচেন হিমবাহ পূর্ব কারাকোরাম পর্বতমালার একটি অংশ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০,০০০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। এটি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বিতর্কিত এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ। এটি বিশ্বের উচ্চতম এবং সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত, যেখানে চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ভূখণ্ডে উভয় দেশের সৈন্যরা মোতায়েন রয়েছে। এর অবস্থান সিন্ধু নদের গতিপথের ওপরও প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়।
সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল ও প্রভাব : ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির দীর্ঘ ৭২ বছর পর ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরকে প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেয়। একই সাথে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। অঞ্চলটির প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আসে এবং এটি ভারতীয় সংবিধানের অন্যান্য রাজ্যের মতোই সম্পূর্ণভাবে ভারতের আইনের আওতায় চলে আসে। এ সিদ্ধান্ত ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও পাকিস্তান এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। অনুচ্ছেদটি বাতিলের ফলে জম্মু-কাশ্মীরের বাইরের রাজ্যের লোকেরা সেখানে স্বাধীনভাবে জমি কিনে বসবাস করার অধিকারী হয় এবং অন্যান্য রাজ্য থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর লোক এনে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের লেবাসধারীদের কাশ্মীরে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করার পথ সুগম হয়।
৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান নেতা সৈয়দ আলী শাহ গীলানী (৯০) এক টুইটার বার্তায় বিশ্ববাসীর নিকটে তাদের রক্ষার আর্তি জানিয়ে লিখেছেন যে, আপনারা এ বার্তাকে ‘এস ও এস’ হিসাবে গণ্য করুন! তবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়া ব্যতীত কেউ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি।
বিলটির প্রতিবাদে কংগ্রেস নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম বলেন, সরকার যা করেছে, তা দেশ ও গণতন্ত্রের পক্ষে চরম বিপজ্জনক। এ সিদ্ধান্ত দেশকে টুকরো টুকরো করে ফেলার প্রথম পদক্ষেপ’। রাজ্যসভায় কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা গোলাম নবী আযাদ বলেন, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিকভাবে কাশ্মীরের যে অনন্য চরিত্র, কলমের এক খোঁচায় বিজেপি সেটাই বরবাদ করে দিতে চাইছে’। কাশ্মীরের শেষ অধিপতি মহারাজা সিং-এর পুত্র ও লোকসভার কংগ্রেস সদস্য ড. করণ সিং এ বিলের বিরোধিতা করে মত দেন, বিজেপি কাশ্মীর নিয়ে যে পন্থাই গ্রহণ করুক তাতে বৈপ্লবিক কিছু ঘটবে না। তিনি বলেন, যেদিন আমার বাবা সেই চুক্তিতে সই করেন সেদিন ২৭ অক্টোবর আমি নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। মনে রাখতে হবে, মহারাজা সেদিন কেবল প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক সম্পর্কটুকুতেই ভারতভুক্তি স্বীকার করেছিলেন, রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে মিশিয়ে দেননি। যে শর্তে বাবা সেদিন রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, দিল্লি তার মর্যাদা রাখেনি’।
বিলের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী রাজা ফারুক হায়দার খান মনে করেন, ‘ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কাশ্মীরকে হারালো। আমরা কখনোই ভারতের অংশ ছিলাম না। কিন্তু ভারত আজ জম্মুসহ লাদাখ উপত্যকাও হারালো’। ভারতীয় কংগ্রেসের এমপি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘নিয়ম ভেঙ্গে জম্মু-কাশ্মীর ভাগ করা হচ্ছে। সিমলা চুক্তি ও লাহোর চুক্তি সত্ত্বেও কিভাবে এটা অভ্যন্তরীণ বিষয় হলো? কাশ্মীরকে আপনারা কয়েদখানা বানিয়ে দিলেন’। কংগ্রেস নেতা মনিস তেওয়ারী বলেন, ‘ভারতীয় সংবিধানে কেবল ৩৭০ ধারা নেই। বরং সেখানে ৩৭১-এ থেকে আই পর্যন্ত রয়েছে। যেগুলো নাগাল্যান্ড, আসাম, মণিপুর, অন্ধ্র প্রদেশ, সিকিম প্রভৃতি রাজ্যে ‘বিশেষ অধিকার’ প্রদান করে। আজ যখন সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করছে, তখন এর মাধ্যমে ঐসব রাজ্যের জন্য কি বার্তা পাঠানো হচ্ছে?’ মিজোরামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা লালথান হাওলা ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রেক্ষিতে বলেন, ‘এ ঘটনা মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশের মতো রাজ্যের জন্য আতঙ্কের’। তারা বলেন, ৩৭১-এ ধারায় হাত পড়লে রুখে দাঁড়াবে মিজোরাম। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অন্যান্য রাজ্যগুলোর নেতারা। হ্যাঁ, ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে উক্ত ৫টি রাজ্যে পৃথক পতাকা উড়িয়ে মিছিল করা হয়েছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা আন্দোলনের ইঙ্গিত বহন করে। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রদেশ কংগ্রেস। দার্জিলিং ও কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের অংশ থাকবে কি না, সেটা নিয়ে তাদের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। কাশ্মীর নিয়ে সরকারের এ হঠকারী সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৭ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বাম রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। ইতোমধ্যে পাকিস্তান ও চীনের অনুরোধে কয়েক দশক পরে এ প্রথম কাশ্মীর নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসে। কিন্তু ভেটো ক্ষমতার অধিকারী রাশিয়া ভারতের পক্ষে এবং চীন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তাতে কোনো ফলাফল আসেনি। তবে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি বলেছেন, এ বৈঠকই পাকিস্তানের শেষ পদক্ষেপ নয়। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের এ বৈঠক কাশ্মীর সমস্যাকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে’।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি : ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই কাশ্মীরকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে। চীনও আকসাই চিনকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা এ বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে সকল পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর জন্য উৎসাহিত করেছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কাশ্মীর সমস্যাকে একটি আন্তর্জাতিক বিরোধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৪৮ সালে গৃহীত নিরাপত্তা পরিষদের ৪৭নং প্রস্তাবে কাশ্মীরের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার স্বীকার করে বলা হয়েছিল যে, ‘গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরিরা তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে’ যা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
মানবাধিকার পরিস্থিতি : কাশ্মীরের সংবেদনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং পর্যবেক্ষকরা কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে; বিশেষ করে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর উপত্যকায়, ইন্টারনেট শাটডাউন, যোগাযোগ বিধিনিষেধ এবং নাগরিকদের চলাচলের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করেছেন। ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর উপত্যকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৯ সালে ভারত সরকার কর্তৃক জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানকারী সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল এবং এটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ) বিভক্ত করার পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। এ পদক্ষেপের ফলে কাশ্মীরে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আরও বেড়েছে এবং ইন্টারনেট ও যোগাযোগে দীর্ঘ সময় ধরে বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছিল। পাকিস্তান এ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
কাশ্মীর কেবল একটি স্থান নয়, এটি একটি জটিল সত্তা, যা বহু স্তরবিশিষ্ট ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্বারা গঠিত। ‘ভূস্বর্গ’ উপাধি যেমন কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরে, তেমনই এর বিতর্কিত অবস্থান একটি চলমান মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটকে নির্দেশ করে। কাশ্মীরের জনগণের জীবনযাত্রায় এ রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব অনস্বীকার্য। বার বার সংঘাত, সামরিক উপস্থিতি এবং যোগাযোগ বিধিনিষেধ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। তবে এ প্রতিকূলতার মধ্যেও কাশ্মীরি জনগণ তাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম এবং অনন্য জীবনবোধ ধরে রেখেছে। পর্যটন, কৃষি এবং হস্তশিল্প এখনো এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতা এর পূর্ণ বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। কাশ্মীর অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা কেবল স্থানীয় জনগণের জন্যই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে একটার পর একটা অন্যায় সিদ্ধান্ত ভারতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ছিন্নভিন্ন করে ফেলতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সকল পক্ষের মধ্যে ফলপ্রসূ সংলাপ এবং ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক প্রস্তাবিত ৪৭ ধারা মোতাবেক কাশ্মীরের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষাকে বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র : অ্যাসোসিয়েট প্রেস, আল-জাজিরা, ডয়েচে ভেলে, বিবিসি, রয়টার্স।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]