এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুরা সবার অবহেলার পাত্র হয়ে ওঠে
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৬:০৯
॥ হামিম উল কবির॥
স্নায়ুবিক বিকাশজনিত ব্যাধিতে এডিএইচডি আক্রান্তের কারণে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারায় শিশুরা ক্লাসে অথবা পরিবারে অবহেলার শিকার হয়ে থাকে। সবার হাসির পাত্র হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত অস্থিরতার কারণে শিশু সমবয়সীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারে না। অনেক সময় পারস্পরিক কথা-বার্তার মাঝখানে আবেগ ধরে রাখতে না পারায় শিশু হঠাৎ করে কথার মাঝখানে কথা বলে ফেললে বা অন্যের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেললে বন্ধুদের বিরক্তির কারণ হয়ে থাকে। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে শিশু ধীরে ধীরে বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। খেলাধুলা বা দলগত কাজে নিয়ম মানতে না পারায় অথবা ধৈর্য ধরতে না পারায় সহপাঠীরা এ ধরনের সঙ্গীকে এড়িয়ে চলে। ধীরে ধীরে শিশুটি একাকী হয়ে পড়লে শিশুর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়। এতে করে শিশু একসময় অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হয়। আবার অতিরিক্ত চঞ্চলতার কারণে পরিবারের বাইরে অনেকে পছন্দ করে না এমন শিশুদের।
আপনার পাশেই থাকতে পারে এমন শিশু : কথা ও আচরণে একটু বেশি চঞ্চল, কিন্তু কোনো কিছুর ওপর সঠিক উপলব্ধি করার ক্ষমতা কম এমন শিশু আপনার চারপাশেই রয়েছে। প্রতিটি পরিবারে না হলেও পাশের পরিবারেই আছে। এ ধরনের শিশুর সংখ্যা খুব কম নয়। বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ১০ শতাংশ শিশু এ রোগটিতে ভোগে। কোনো সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা না থাকলেও বাংলাদেশেও মোট শিশুর ৫ থেকে ১০ শতাংশ এমনই থাকতে পারে বলে সাইকিয়াট্রিস্টরা বলছেন। শিশুর মধ্যে এ সমস্যাটি থাকলে শিশু স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না, নির্দেশ মানতে অসুবিধা হয়। এমন ধরনের শিশুরা পড়ে বিপাকে। এমন অবস্থাকে শিশুর বদগুণ হিসেবে ধরে নেয়া হয় এবং অবহেলার শিকার হয়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত এ ধরনের শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ে। শিশুর এ ধরনের আচরণকে ‘এটেনশান ডেফিসিট হাইপার এক্টিভিটি ডিজঅর্ডার’ (এডিএইচডি) নামক একটি রোগ। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এ সমস্যাটি বেশি থাকে। তবে ১২ বছরের পর থেকে সমস্যাটি কমে গেলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় হলেও থেকে যায়। উন্নত বিশ্বে শিশুর এ সমস্যা সহজে শনাক্ত হলেও বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয় অভিভাবকরা। ফলে শিশুর শারীরিক এ সমস্যাটি দূর হয় না এবং একসময় সমাজে পিছিয়ে পড়ে, অর্থনৈতিকভাবে কোনো অবদান রাখতে পারে না বলে সকলের অপ্রিয় হয়ে থাকে।
এ ধরনের শিশুদের ভিন্ন গঠনের মস্তিষ্ক থাকে
এডিএইচডিতে আক্রান্ত শিশুদের মস্তিষ্ক একটু ভিন্ন গঠনের হয়ে থাকে। এদের মস্তিষ্ক সাধারণের চেয়ে একটু বেশি আলাদা হয়ে থাকে। এ ধরনের শিশুদের মস্তিষ্কের সামনের অংশ (প্রিফ্রন্টাল কর্টেস্ক) তুলনামূলক কম সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্কের সামনের অংশেই মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এ রোগটিতে আক্রান্ত কর্টেস্ক তুলনামূলক কম সক্রিয় থাকে বলে শিশু মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; এমনকি আবেগও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আবার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থ ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিনের অভাব। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিনের অভাব এডিএইচডিতে আক্রান্ত শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না থাকা এবং আগে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকার কারণ। এর বাইরে মস্তিষ্কের বিকাশের বিলম্ব এবং হরমোন ভারসাম্যের অভাব উল্লেখযোগ্য।
এডিএইচডি শিশু হওয়ার পারিপার্শ্বিক কারণ
পারিপার্শ্বিক কিছু কারণে এইডএইচডি শিশু হতে পারে। এ ধরনের রোগের শিশু হওয়ার জন্য মায়ের গর্ভাবস্থায় কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। আবার শৈশবকালীন জীবনযাত্রাও শিশুর মধ্যে এ রোগটি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। শৈশবকালীন শিশু মানসিক চাপযুক্ত পরিবেশ, সহিংসতা ও অস্থিরতার মধ্যে বড় হলেও পরে শিশুর মধ্যে পরে এই রোগটি হতে পারে অথবা ঝুঁকি বাড়ায়। গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান না হলেও ভূমিষ্ঠ শিশুর এমন হতে পারে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা অথবা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকারী মায়ের শিশুরও এমন হতে পারে। যেমন কোনো মা গর্ভাবস্থায় ধূমপান ও মাদক সেবন করলে গর্ভে শিশুর মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ধূমপানকারী মায়ের শিশুর এডিএইচডি ছাড়াও নানা ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় মা চিকিৎসকের পরামর্শে না থাকলে কম ওজন নিয়ে শিশু জন্মাতে পারে এবং কম ওজন বিশিষ্ট শিশুর এডিএইচডি হতে পারে। এছাড়া প্রসবকালীন প্রসবের রাস্তায় অনেক সময় ধরে শিশু আটকে থাকলে শিশুর অক্সিজেন প্রাপ্তি কম হতে পারে। শিশুর মস্তিষ্কে অক্সিজেন কম পৌঁছালে এ ধরনের শিশু হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এডিএইচডি শিশু হওয়ার এটাও একটি কারণ হতে পারে বলে বলেছেন। সেজন্য বাড়িতে প্রসবের ব্যবস্থা না করে হাসপাতালে নিয়ে কাজটি করলে মা ও শিশুর ঝুঁকি কমে যায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, ছোটবেলায় টক্সিনের (বিষাক্ত পদার্থ বা রাসায়নিক) সংস্পর্শে আসলে শিশুর এমন রোগ হতে পারে। টক্সিনের মধ্যে শিসা (লেড), পারদ ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসলে এমন শিশু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পুরনো ব্যাটারি ভাঙার কারখানার কাছাকাছি থাকলে, আবার গর্ভাবস্থায় মা এসব কারখানায় কাজ করলে অথবা শিশুকে পাশে রেখে কাজ করলে শিশু এ রোগটিতে আক্রান্ত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না খেলে অথবা নির্দিষ্ট কিছু খনিজ পদার্থের ঘাটতি থাকলেও ভূমিষ্ঠ শিশু এ রোগে ভুগতে পারে। যেমন আয়রন বা লৌহ গর্ভাবস্থায় খাওয়ালে সুস্থ শিশু জন্মাতে সহায়তা করে। আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে শিশুর স্নায়বিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে দারুণ কার্যকরী। মাছে বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছে ওমেগা-৩ বেশি থাকে। প্রচুর মাছ না খেলে ওমেগা-৩ জাতীয় ওষুধ খেতে হয়। ভিটামিন ডি গর্ভাবস্থায় সুস্থ শিশু বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ভিটামিনটি শিশুর বুদ্ধিমত্তা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। গর্ভাবস্থায় মায়ের মধ্যে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে ভূমিষ্ঠ শিশুর এডিএইচডিসহ নানা রোগ হতে পারে।
কাউন্সেলিং করে চিকিৎসা
প্রাথমিক অবস্থায় উপযুক্ত চিকিৎসা নিতে পারলে শিশুর মানসিক বিকাশ অনেকাংশে উন্নত হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই রোগের উপসর্গ দেখা দিলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। এটা একটি স্নায়বিক সমস্যা। মস্তিষ্কের সমস্যা হলেও ঠিক কী কারণে এ সমস্যাটি হয়ে থাকে, এখন পর্যন্ত তা সুনির্দিষ্ট করে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত না হওয়ায় মস্তিষ্কের এ সমস্যাটি সমাধানের জন্য খুব বেশি ওষুধ নেই। সাইকোথেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের ওপর চিকিৎসকরা বেশি জোর দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়রাল থেরাপি (সিবিটি) খুবই কার্যকর। এডিএইচডিতে আক্রান্ত শিশুদের অথবা বয়স্কদের মনোভাব ও আচরণ পরিবর্তনে বেশ সহায়ক হয়ে থাকে সিবিটি। এ থেরাপির মাধ্যমে রোগীর অতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে উন্নত করা যায়। এছাড়া পরিবার ও রোগীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পারিবারিক আচরণে পরিবর্তন আনতে হয়। আক্রান্ত শিশুটিকে সব ব্যাপারে সহানুভূতির সাথে দেখতে হয়। জীবনধারা উন্নয়ন করেও এডিএইচডিতে আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তিকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসা যায়।
জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে সুস্থ করা
জীবনধারা পরিবর্তন করে ফেলতে পারলে এডিএইচডিতে আক্রান্তদের জীবন অনেকটা সহজ হয়ে যায়। একই সাথে রুটিনের মধ্যে জীবন পরিচালিত করলেও সুফল মেলে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক রোগ (সাইকিয়াট্রি) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. শামসুল আলম বলেন, জীবনধারা বদলে নিলেও এ রোগটির উপশম হয়ে থাকে। ছোট শিশুরা তো পারবে না. তবে বয়স বাড়লে জীবনধারা নিজেই বদলাতে পারবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায় এবং এতে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে। এর সাথে যোগ করতে হবে চিকিৎসকের অথবা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার। পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্ককে স্টিমুলেন্ট করতে সহায়তা করে। চিকিৎসকরা একই সাথে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমাতে পারলে মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে। সম্পুরক খাদ্য হিসেবে ফ্যাটি এসিড রয়েছে এমন খাবার এবং ভিটামিন বি৬ রয়েছে এমন খাবার খাওয়াতে হবে। এছাড়া ফ্যাটি এসিড ও ভিটামিন বি৬ সাপ্লিমেন্ট খাওয়ানো যেতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে। এতেও অনেক ফল বয়ে আনে।
সুস্থ থাকার বিকল্প পদ্ধতি
শারীরিক ব্যায়ামের সাথে ধ্যান বা যোগব্যায়াম মস্তিষ্কের একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে মাইন্ডফুলনেস থেরাপি বেশ কাজ করে। এ ধরনের রোগে আক্রান্ত শিশুদের পিতা-মাতাও শিশুকে সুস্থ করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। শিশুর জন্য বাড়িতে একটি নিয়মিত রুটিন তৈরি করতে হবে। পিতা-মাতাকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং শিশুর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে হবে। শিশুর আচরণ উন্নত করার জন্য প্রতিটি ভালো কাজের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। এডিএইচডি শিশুদের সামাজিক জীবনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে এডিএইচডি শিশু যেমন পিছিয়ে পড়ে, তেমনি সামাজিক ক্ষেত্রে দক্ষতার এভাবে সমস্যায় পড়ে শিশু। বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, সুসম্পর্ক বজায় রাখা কিংবা সহযোগিতামূলক আচরণ এদের জীবনকে কঠিন করে তোলে। ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়। বন্ধুরা এডিএইচডি আক্রান্তকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধরে নিয়ে তাদের এড়িয়ে চললে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। ফলে এমন শিশুর সঠিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে। আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে না।