শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মহান বিজয় দিবস

জাতির সামনে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে হবে

প্রিন্ট ভার্সন
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৭

বিজয়

সোনার বাংলা রিপোর্ট :

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে আমাদের প্রিয় জন্মভূমির জন্মের মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। সাড়ে ৯ মাস যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধের একটি সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যিকারের মুক্তি আসে না। আসে না প্রকৃত স্বাধীনতা। বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডের জন্মসনদ অর্থাৎ পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান এবং বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। সেদিনই বেশি দামে কেনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা কম দামে ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে বলে মনে করেন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা। এমনকি ভারতেরও দাবি এ অর্জন তাদের। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও ভারতের সেনাপ্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের যুদ্ধে যৌথবাহিনীর সাফল্যের প্রধান রূপকার ছিলেন ভারতের তৎকালীন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ।’ (সূত্র: ঢাকা পোস্ট, ১৫ জানুয়ারি ২০২৫)।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বাবা সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী আবুল মনসুর আহমদ তার লেখা, ‘বেশি দামে কেনা কম দামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ বইয়ে ১৫টি প্রবন্ধে ‘কেন আমরা স্বাধীন’ হয়নি এবং কেন মুক্তিযুদ্ধে কেন মুক্তি আসেনি, তা ব্যাখ্যা করেছেন। ৯ম সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) আবদুল জলিল তার লেখা ‘অরিক্ষত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইয়ে অনেকগুলো উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করলেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং পিন্ডি থেকে মুক্ত হয়ে দিল্লির জিঞ্জিরে বন্দি হয়েছিলো বাংলাদেশ। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরাও বিষয়টির সাথে একমত এবং তারা মনে করেন, ৩৬ জুলাই ভারতের তাঁবেদার হাসিনার পতনের পর দেশের স্বাধীনতার নতুন সূর্যোদয় হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। এ আপ্তবাক্য মনে রেখে ১৪ ও ১৬ ডিসেম্বরের সত্য ইতিহাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে ৩৬ জুলাইয়ের ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী, ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও বৈষম্যমুক্ত দেশগড়ার শপথ নিতে হবে।
১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত অসত্য ও ভিত্তি মুখোশে ঢাকা ইতিহাসের মোড়কে। একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি বুঝতে আর গবেষণার দরকার নেই বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
একাধিক সূত্রে প্রকাশ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার প্রত্যক্ষ দালিলিক প্রমাণসমৃদ্ধ কাজ ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি ও মুক্তি দেয়ার সময় কলকাতায় আওয়ামী লীগ নেতারা বার বার জহির রায়হানকে বাধাগ্রস্ত করেছিলেন। শাহরিয়ার কবির (আওয়ামী বুদ্ধিজীবী) বলেন, “তিনি (জহির রায়হান) যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য ঢাকা ছেড়ে আগরতলা এবং পরে কলকাতা চলে যান। কলকাতায় তিনি প্রচার কাজ সংঘটিত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পতিত হন এবং তাঁকে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হতে হয়। ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটি নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে শুটিং করতে দেয়নি, এমনকি কোনো কোনো সেক্টরে তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। (ছবি তৈরি হওয়ার পর) আওয়ামী লীগের নেতারা ছবি দেখে ছাড়পত্র না দেয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।” [সূত্র: একুশে ফেব্রুয়ারি, জহির রায়হান (ভূমিকা: শাহরিয়ার কবির), পল্লব পাবলিশার্স আগস্ট, ১৯৯২, পৃ: ১৩-১৬]।
প্রখ্যাত প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিককালে জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে নতুন তথ্য শোনা গেছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবীসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থী শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানতো তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মুহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে। তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আলবদর, আলশামস্, না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায় মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি মুজিব বাহিনী।’ (সূত্র: নির্মল সেন, আমার জবানবন্দি, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি, ২০১২, পৃ: ৪০৫-৪০৬)।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় ভারতের ষড়যন্ত্র ছিল। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সেজন্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়েছিল। বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পর জহির রায়হানকে যারা গুম করেছিল, তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে।’ তিনি যথাযথ মর্যাদায় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মহান বিজয় দিবস পালন এবং সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রকৃত ইতিহাস জাতির সামনে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মহান বিজয় দিবস

সম্পর্কিত খবর