আশ্রয় চাও রবের কাছে
২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৫
॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া মানে হলো সবরকম বিপদ, অকল্যাণ এবং মন্দ থেকে পরিত্রাণ পেতে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা এবং তাঁর কাছেই প্রার্থনা করা। এটি একটি ইবাদত, যা শুধু আল্লাহর জন্য করা উচিত। কারণ তিনিই একমাত্র চূড়ান্ত শক্তি ও সুরক্ষা প্রদানকারী। আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা মানে হলো- তাঁর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা স্বীকার করা।
মানুষ আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা স্বীকার করে এ কারণে যে, একমাত্র আল্লাহই মানুষকে রক্ষা করতে পারেন এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা তাঁর হাতে। আশ্রয় প্রার্থনা করা একটি ইবাদত, যা শুধু আল্লাহর জন্য নিবেদিত হওয়া উচিত। কুরআন এবং হাদিসে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলা হয়েছে; যেমন শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে, জাহান্নামের শাস্তি থেকে বা অন্য যেকোনো বিপদ থেকে। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার মাধ্যমে মানুষ মানসিক শান্তি ও স্থিরতা লাভ করে। কারণ সে জানে, তার ভরসার স্থান একমাত্র আল্লাহ।
মানুষকে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। তাই জীবনের সবক্ষেত্রে মানুষ স্রষ্টার মুখাপেক্ষী। আল্লাহপাক বলেন, ‘হে মানুষ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে মুখাপেক্ষী। আর আল্লাহ, তিনি অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সূরা ফাতির : ১৫)। আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং অকল্যাণ থেকে মুক্তি চাওয়া মানুষের কর্তব্য। কেননা তিনি বান্দাকে তার কাছে প্রার্থনা করতে আদেশ করেছেন এবং তা কবুল করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘বল তো, কে বিপদগ্রস্তের ডাকে সাড়া দেন এবং তার কষ্ট দূরীভূত করেন?’ (সূরা নামল : ৬২)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ যদি তোমাকে বিপদাপদে পতিত করেন, তবে তিনি ব্যতীত তা অপসারণকারী কেউ নেই।’ (সূরা আনআম : ১৫)।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘বান্দা যখন আমার কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করে, আমি অবশ্যই তাকে তা দিই। আর যখন আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি তাকে আশ্রয়দান করি।’ আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা শ্রেষ্ঠতম ইবাদত। যে ব্যক্তি যত বেশি আল্লাহর ইবাদতকারী, সে তত বেশি তার আশ্রয় গ্রহণকারী। তাই তো দেখা যায়, আল্লাহর পয়গম্বররা তাঁর কাছেই বেশি বেশি আশ্রয় চাইতেন। হযরত নূহ (আ.) বলেন, ‘হে আমার রব, আমার জানা নেই এমন কোনো বিষয় প্রার্থনা করা থেকে আমি তোমার কাছেই আশ্রয় চাচ্ছি।’ (সূরা হুদ : ৪৭)।
মিশরের সম্রাজ্ঞী জুলাইখার ফেতনা থেকে বাঁচার আকুতি নিয়ে হযরত ইউসূফ (আ.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি। তিনি আমার মালিক। তিনি আমাকে সযত্নে থাকতে দিয়েছেন।’ (সূরা ইউসুফ : ২৩)। হযরত মূসা (আ.)-এর দাওয়াতে দাম্ভিক ফেরাউন ঔদ্ধত্য দেখালে তিনি বলেন, ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় চাই প্রত্যেক অহঙ্কারী থেকে, যে কেয়ামতের হিসাব-নিকাশে বিশ্বাস করে না।’ (সূরা মুমিন : ২৭)। হযরত মরিয়ম (আ.) ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার মমতাময়ী মা বলেছিলেন, ‘হে প্রভু! আমি তাকে এবং তার ভবিষ্যৎ সন্তানকে বিতাড়িত শয়তান থেকে তোমার আশ্রয়ে সমর্পণ করলাম।’
প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) এরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক সন্তান ভূমিষ্ঠের পর অভিশপ্ত শয়তান তাকে আক্রমণ করে। এতে সন্তান চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু মরিয়ম এবং তার সন্তানকে আল্লাহ রক্ষা করেছেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)। হযরত মরিয়ম (আ.)-এর কাছে মানুষের আকৃতিতে জিবরাঈল ফেরেশতা আগমন করলে তিনি তাকে অপরিচিত পুরুষ ভেবে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করেন। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন, ‘আমি তোমার অনিষ্টতা থেকে দয়াময়ের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যদি তুমি আল্লাহভীরু হও (তবে সরে যাও)।’ (সূরা মরিয়ম : ১৮)।
প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) সর্বদা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এ মর্মে কুরআন ও সুন্নায় অসংখ্য দোয়া ও ইস্তিয়াজা বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ। আমি তোমার কাছে দারিদ্র্য, কুফরি, শিরকি, নিফাকি, যশ-খ্যাতি ও লোক দেখানো ইবাদত থেকে পানাহ চাই।’ (বুখারি)। দরিদ্রতা ও ধনাট্যতা উভয়ই কল্যাণ বা অকল্যাণের বাহন। তাই নবীজি (সা.) এসবের খারাবি ও অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। দুনিয়া ও জীবন-মরণের ফেতনা এবং দুশ্চিন্তা, পেরেশানি থেকে আল্লাহর কাছে নামাজ শেষে পানাহ চাইতেন। উপকারবিহীন ইলম, ভয়ভীতিহীন অন্তর, অতৃপ্ত হৃদয় এবং প্রত্যাখ্যাত দোয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করতেন। তিনি সাহাবাদেরও আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণের জন্য উৎসাহ দিতেন এবং এতদসংক্রান্ত বিভিন্ন দোয়া শেখাতেন।
হযরত ওসমান ইবনে আবুল আস (রা.) নবীজির কাছে এসে শরীর ব্যথার অভিযোগ করলে তিনি তাকে বললেন, ‘তোমার ব্যথার স্থানে হাত রেখে তিনবার বিসমিল্লাহ পড়। এরপর ৭ বার পড়- আউজুবিল্লাহি ওয়া কুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাজিরু।’ অর্থ- আমি যে ব্যথা অনুভব করছি, তার অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাচ্ছি। (মুসলিম)। হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে রাসূল (সা.) ঝাড়-ফুঁক করতেন এ দোয়া পড়ে ‘আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ মিন কুল্লি শায়তানিউ ওয়া হাম্মাহ ওয়া মিন কুল্লি আইনিল লাম্মাহ।’ (বুখারি)।
শয়তান মানুষের চির দুশমন। মানুষের ক্ষতি ও অনিষ্টতা সাধনে সে সদা তৎপর। তার অনিষ্টতা থেকে বাঁচতে হলে মহান আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ অতি প্রয়োজন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘শয়তান মানুষের কাছে এসে বলতে থাকে অমুক অমুক বস্তু কে সৃষ্টি করেছে? এক পর্যায়ে বলে, তোমার রবকে কে সৃষ্টি করেছেন?’ নবীজি বলেন, এ পর্যায়ে পৌঁছালে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং এরূপ কল্পনা বর্জন করবে।’ (বুখারি)।
টয়লেট এবং নোংরা স্থানে শয়তানের উপস্থিতি বেশি। তাই টয়লেটে গমনকালে পাঠ করবে- ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবায়িস।’ অর্থ- হে আল্লাহ। আমি তোমার কাছে পুরুষ ও মহিলা শয়তান থেকে আশ্রয় চাই। (বুখারি ও মুসলিম)। ঘুমের আঁধারেও শয়তান মানুষের ক্ষতিসাধনে সচেষ্ট থাকে। তাই কেউ খারাপ স্বপ্ন দেখলে তিনবার বাম দিকে থুথু নিক্ষেপ করে শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইবে। অতঃপর পার্শ্ব পরিবর্তন করে ঘুমাবে।’ (মুসলিম)। স্ত্রী সহবাসের সময় শয়তানের অনিষ্টতা থেকে মুক্তি লাভের জন্য রাসূল (সা.) দোয়া শিখিয়েছেন। তা হলো, ‘বিসমিল্লাহে আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়তানা ওয়া জান্নিবিশ শায়তানা মা-রাজাকতানা।’ এ দোয়ার ফলে যে সন্তান জন্ম নেবে, শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (বুখারি ও মুসলিম)।
মহান আল্লাহর অপার হেকমত যে, তিনি প্রত্যেক মানুষের জন্য মানব ও জিন শয়তান নিয়োজিত রেখেছেন। আবার তাদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘বলুন, হে প্রভু! আমি তোমার কাছে শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।’ (সূরা মুমিনুন : ৯৭)। এ মর্মে কুরআনের সর্বশেষ দুটি সূরা অবতীর্ণ করেছেন। যেখানে জিন ও মানব শয়তানের অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়।
রাগ শয়তানের বড় অস্ত্র। এর মাধ্যমে শয়তান মানুষকে বিভিন্ন অপরাধে লিপ্ত করাতে সমর্থ হয়। তাই রাগের সময় শয়তান থেকে পানাহ চাওয়া উচিত। সুলাইমান ইবনে সুরাদ (রা.) বলেন, একদা আমরা রাসূল (সা.)-এর দরবারে বসা ছিলাম। এ অবস্থায় দুই ব্যক্তি ঝগড়ায় লিপ্ত হলো। তাদের একজন রেগে অগ্নিশর্মা হয়েছে। তার চেহারা রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। তা দেখে রাসূল (সা.) বললেন, আমি এমন একটি কথা জানি যা ওই ব্যক্তি বললে তার রাগ চলে যাবে। অতঃপর বললেন, তা হলো- ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়তনির রাজিম’।
আল্লাহর বিশেষ কিছু পরিচয় দিয়ে তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। কী কী থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। আল্লাহর তিনটি পরিচয় এখানে উল্লেখ করা হয়েছে- রব, মালিক, ইলাহ। রব শব্দটি দিয়ে একই সঙ্গে মালিক ও পরিপূর্ণ কর্তৃত্বশীল সত্তাকে বোঝানো হচ্ছে। রব হলেন সেই মালিক, যিনি পরিপূর্ণ কর্তৃত্বশীল থেকে অস্তিত্ব রক্ষা করে লালন-পালন ও বিকাশ নিশ্চিত করে পূর্ণতায় পৌঁছান এবং পুরস্কার দেন। অভ্যন্তরীণ আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ অভ্যন্তরীণ আক্রমণের ওপর মানুষের কিছু নিয়ন্ত্রণ আছে। এর জবাবদিহির বিষয় রয়েছে।
অভ্যন্তরীণ আক্রমণকারী হিসেবে মূলত এসেছে শয়তানের কথা। এরপর মানুষের কথাও এসেছে। শয়তান কুমন্ত্রণা দিয়ে মানুষকে আল্লাহর এ তিনটি বড় পরিচয় এবং তাওহিদের তিনটি মৌলিক উপাদান থেকে ভুলিয়ে রাখে। আল্লাহর তিনটি বৈশিষ্ট্যকেই নিজের বলে দাবি করে বসে। সূরা নাজিয়াতের ২৪ নম্বর আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী, শয়তান নিজেকে রব বলে দাবি করে। সূরা জুখরুফের ৫১ নম্বর আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী, সে নিজেকে মালিক বলে দাবি করে। সূরা কাসাসের ৩৮ নম্বর আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী, সে নিজেকে ইলাহ বলে দাবি করে।
শয়তানের আক্রমণ হলো বার বার কুমন্ত্রণা দেওয়া। সে সুযোগমতো আসে ও সরে পড়ে, সে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে। কিন্তু আল্লাহ মানুষের ওপর রহমত করেন। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে সবসময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। শয়তানের কাছ থেকে পানাহ চাওয়ার মাধ্যমে মানুষকে তার শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করার শিক্ষা দিয়েছেন আল্লাহ।
মানুষের জীবন অনিষ্টতার ঘূর্ণিপাকে আবর্তিত। তা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় মহিয়ান-গরিয়ান আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা। রাসূল (সা.) বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, আমার চোখের অনিষ্টতা থেকে, কানের অনিষ্টতা থেকে, আমার জিহ্বার অনিষ্টতা থেকে, আমার অন্তরের অনিষ্টতা থেকে এবং আমার লজ্জাস্থানের অনিষ্টতা থেকে।’ (তিরমিযী)। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন! আমীন।
লেখক : সাংবাদিক।