সংস্কার : সর্বাঙ্গে ব্যথা মলম দেব কোথা!
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:০৭
॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
চব্বিশের আগস্ট বিপ্লবের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বাধিক আলোচিত শব্দ ছিল ‘সংস্কার’। সেই আগস্টের পরপরই রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো কোনোটি প্রথম যে দাবি উচ্চারণ করে, সেটি হলো- অবিলম্বে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কেননা এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলে একটি স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রধান দাবি হয়ে উঠলো ‘ভোটের আগে সংস্কার চাই’। অতঃপর একে একে গঠিত হতে শুরু করলো বিভিন্ন সেক্টরের শিরোনামে সংস্কার প্রস্তাব ও সুপারিশ প্রণয়নের কাজ। সেগুলো যথারীতি পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে এসব সংস্কারের মূল প্রস্তাবসমূহ জাতির অনুমোদনের জন্য গণভোট গ্রহণের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সংস্কার
বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো হলো সংবিধান সংস্কার, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য এবং দুদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে কার্যকর গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা, ক্ষমতাকাঠামোয় ভারসাম্য আনা এবং দুর্নীতি রোধে আইনি সংস্কারসহ বিভিন্ন প্রস্তাবনা। সংক্ষেপে এর দৃশ্যপটটা এরকম সংবিধান সংস্কার কমিশনের আওতায় কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ) পৃথকীকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়ায় একটি স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের আওতায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, আইন অবকাঠামো এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি সংক্রান্ত সুপারিশ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার সংক্রান্ত সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রীয় পর্যায় এবং দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য মোট ৪৭টি সুপারিশ করেছে। সংস্কার প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও আইনি সংস্কারের বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক সংস্কার
পলাতক ফ্যাসিবাদী সরকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল এমন করে গড়ে তুলেছিল যে, ক্ষমতায় গিয়ে আর নামতে চায় না। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নয়- যেন টেনেহিঁচড়ে নামাতে হয়। সন্দেহ নেই যে, এদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অন্ধভক্ত আছে, যাদের আমরা নেতা-কর্মী-সমর্থক হিসেবে চিনি। এসব কর্মীরা প্রায় সবাই বেকার। এদের কাজ হচ্ছে বিরোধীপক্ষের সাথে মারামারি করা আর দল ক্ষমতায় এলে চাঁদাবাজি, মাস্তানি করা। এদের বিরাট একটা অংশ অশিক্ষিত, টোকাই। দল ক্ষমতায় এলে এরাই হয়ে যায় সমাজের হর্তাকর্তা। আর এসব তথাকথিত রাজনৈতিক নেতাদের একমাত্র যোগ্যতা হলো অসততা, মিথ্যাচার আর কর্মীদের যোগ্যতা হলো নেতাদের তোষামোদী করা। দেশের দলান্ধ, মূর্খ, লোভী, অসৎ, ধান্ধাবাজ, টোকাইদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে না পারলে এ দেশে কখনোই সুস্থ রাজনৈতিক ফিরে আসবে না। এসব লোক ক্ষমতা পেলেই কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার আভাস পেলেই এদের লোভের জিহ্বা লকলক করে ওঠে। লুণ্ঠন আর দখলবাজির চূড়ান্ত করে ফেলে। শীর্ষে থাকে অঢেল সম্পদের লুটেরাগণ। আর নিম্নে থাকে অন্যের গাছ বা গাছের ফল, খোঁয়াড়ের গরু; এমনকি ম্যানহোলের ঢাকনাও লোপাট করতে থাকে।
আরো সংস্কার প্রয়োজন যেখানে
এ তো গেলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কার আনার বিষয়। কিন্তু এর সঙ্গে আরো যে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার তথা ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি, সেটি ভাবনায় নিতে হবে। কিন্তু ব্যাপার এমন দাঁড়িয়েছে যে, প্রবাদের সেই বাণী- ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা মলম দেব কোথা!’
এর নিরাময় তো করতে হবে। সাধারণ পাঠে ‘সংস্কার’ বলতে বোঝায় কোনো কিছুকে উন্নত করা, সংশোধন করা বা উন্নত করার জন্য পরিবর্তন করা। এর বিভিন্ন অর্থ আছে। যেমন- সাধারণ অর্থে ভুল, দুর্নীতি বা অসন্তোষজনক এ জাতীয় বিষয়গুলোর প্রায়োগিক দিকের উন্নতি বা সংশোধন করাকে সংস্কার বলে। রাজনৈতিক অর্থে সরকার, আইন বা সংবিধানের পরিবর্তন আনাকে সংস্কার বলা হয়। যেমন- বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার কমিশনের উদ্দেশ্য হলো সংবিধানকে জনগণের আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।
কিন্তু সংস্কার বলতে আসলে কী বোঝায়? যেমন ‘সমাজ সংস্কার’ বলতে আমরা সাধারণভাবে জেনে আসছি যে, যখন সমাজের কোনো দিকের কিছু পরিবর্তন এনে কল্যাণকর অবস্থা ফিরিয়ে আনা। সমাজ সংস্কারের বিষয়গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সামাজিক কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন। সমাজে প্রচলিত ক্ষতিকর রীতিনীতি প্রথা, প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ- যেগুলো সমাজের জন্য অমঙ্গলজনক বলে বিবেচিত, সেগুলো অপসারণ করে তার স্থলে কল্যাণমূলক রীতিনীতি, প্রথা, প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ প্রভৃতি স্থাপন বা পরিবর্তন আনয়নকেই সমাজ সংস্কার বলা হয়।
আরো ব্যাপক অর্থে ‘সমাজ সংস্কার’ বলতে সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার, অন্যায্য প্রথা এবং ক্ষতিকর নিয়মকানুন দূর করে সমাজের উন্নতি ও মঙ্গলের জন্য নতুন নিয়মকানুন, প্রথা এবং মূল্যবোধ প্রবর্তন করাকে বোঝায়। সহজ ভাষায়, সমাজ সংস্কার মানে হলো সমাজের নেতিবাচক দিকগুলোর পরিবর্তন করে ইতিবাচক দিকে নিয়ে যাওয়া। এ সংস্কারের মূল ধারণা হলো, সমাজের প্রচলিত ভুল ধারণা, কুসংস্কার এবং অন্যায্য প্রথা দূর করা; সামাজিক বৈষম্য ও অবিচার দূর করে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা; সমাজের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা; শিক্ষার প্রসার ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজের উন্নতি ঘটানো, নতুন সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি করা, যা সমাজের মঙ্গলের জন্য সহায়ক হবে বলে মনে করা হয়।
ব্যক্তির মননে-আচরণে সংস্কার
প্রবাদ আছে, যে দেশের প্রজা যেমন, সে দেশের রাজাও তেমন। এজন্য কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্থায় পরিবর্তনের কথা বললেই হবে না- ব্যক্তির মন, মনন ও আচরণেও সংস্কার আনতে হবে। একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিপক্ষকে কোনো অবস্থাতেই ছাড় দিতে রাজি হয় না। কিন্তু এমন সময় এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যারা দেশকে পরিচালনা করবেন, তাদের মেধা ও আন্তর্জাতিক বিদ্যা-বুদ্ধির প্রমাণও চাচ্ছে। এ প্রমাণ দেয়ার মতো পরিস্থিতি এখন নিরন্তর হাজির হচ্ছে। এমতাবস্থায় মানুষ একই রকম মুখের দিকে তাকিয়ে ধৈর্য রাখতে পারবে কি না, তাতে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। একজন লেখকের মতে, মানুষের নৈতিকতা, বিদ্যা-বুদ্ধির যাচাই হয় তার জীবনযাপন প্রণালী দেখে। সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশে অনুসরণীয় কোনো রাজনৈতিক চরিত্র সৃষ্টি হতে পারছে না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অথচ অতীতে শত সত্যের মধ্যেও জনগণের একটি বিরাট অংশ তাদের অনুকরণ করে জীবনযাপন করতে উদ্যোগী হতো। অবশ্য ওইসব নেতৃত্বের মধ্যে ধর্মপ্রবণ মানুষই ছিল বেশি। আজ আর ধর্মীয় নেতৃত্বকে সেই ভূমিকায় পাওয়া যাচ্ছে না, বরং মিডিয়ার কল্যাণে ধার্মিক মানুষকে কোণঠাসা করে রাখার যে অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার হাত থেকে জনগণের একটা বিরাট অংশ অর্থাৎ তারুণ্যের কোনো মুক্তি নেই। তবে একই অবস্থা তরুণদের মধ্যে সবসময় সহনীয় থাকে না। তারা বিদ্রোহ করে, প্রশ্ন করে এবং কোনো না কোনোভাবে পরিণাম ডেকে আনে।
ওই লেখক মনে করেন, বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়ার চরম স্বাধীনতার পরিণাম এখন লাগামহীনতায় পর্যবসিত হয়েছে। এ অবস্থা সম্ভবত আর বেশিদিন স্বাধীনতাভোগীরা নিজেদের দখলে রাখতে পারবে না। ধার্মিক মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করার পরিণাম মানবতার প্রতি আস্থাহীনতা। এ আস্থাহীনতা শেষ পর্যন্ত সমাজের ভিতরে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট করে দিচ্ছে।
শিক্ষাঙ্গনের দিকেও মানুষ তাকিয়ে রয়েছে। বিশেষত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কর্মপ্রণালীর দিকে দৃষ্টি রাখছে। নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা হওয়া, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণা থাকা, নৈতিক মান বজায় রাখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, ঠিকাদারি, লাইসেন্সবাণিজ্য বন্ধ করা, নারী ও মাদককেন্দ্রিক কার্যকলাপ প্রভৃতি অপকর্মের মূলোৎপাটন করা না গেলে শিক্ষার লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে। ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক সিনিয়র-জুনিয়ার মানসিক পীড়ন বন্ধ হতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার রাজনীতিকরণ ও দলীয়করণ বন্ধ করা না গেলে মেধাকেন্দ্রিক শিক্ষার অপমৃত্যু ঘটবে। শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো হতে হবে মেধার চর্চা ও প্রতিভা বিকাশের কেন্দ্র। লাইব্রেরিগুলো হবে পাঠ ও গবেষণার কেন্দ্রস্থল। বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে ছাত্র সংসদ রয়েছে, সেগুলো যে মেধাবী ও চরিত্রবান নেতৃত্ব সাধারণ শিক্ষার্থীরা পছন্দ করতে চাচ্ছে তার প্রমাণ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের হাল
আমরা দৃশ্যপটে কী দেখছি? একটি উদাহরণ, একজন সয়াবিন তেল আমদানিকারক রমজান মাসের পূর্বে এক লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন তেল আমদানি করলেও যথাসময়ে বাজারে তা সরবরাহ করেননি। ফলে রমজানে বাজারে এর মূল্য বেড়ে যায় এবং ব্যবসায়ী প্রচুর মুনাফা অর্জন করেন। এমনিভাবে দেখা য়ায়, ওজনে কম দেয়া কিংবা বেশি নেয়া, পণ্যে ভেজাল দেয়া, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার মূল্য নির্ধারণ করে সাধারণ ক্রেতাদের জিম্মি করে রাখা এবং এর মধ্য দিয়ে ক্রেতার পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়। বিপুলভাবে অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয় পণ্যের মূল্য কয়েকশগুণ বেশি দেখিয়ে। এক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই থাকে না।
ব্যবসায় নৈতিকতাটা কেমন? এটি হলো একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুল এবং উচিত-অনুচিত দিকগুলো বিবেচনা করে সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল আচরণ করা। এর মধ্যে রয়েছে সঠিক মাপে পণ্য দেয়া, ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করা, ক্রেতাদের সাথে ভালো আচরণ করা এবং আইন ও সামাজিক নিয়ম মেনে চলা। দেখা যায় যে ব্যবসার মালিক ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত ‘ধার্মিক’ হিসেবে পরিচিত। তার লেবাস-পোশাক, ব্যক্তিগতভাবে খুবই ‘আমলদার’। কিন্তু ব্যবসা করেন হারাম পণ্যের। অথবা ব্যবসায় যেটি অবৈধ ও অনৈতিক, সেটির প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। এমনকি চোরাচালান বা চোরাই কারবারের মধ্যে তিনি আকুণ্ঠ নিমজ্জিত। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের অনেকেই ঘুষ নেয়া-দেয়াকে অতি মামুলি বিষয়ে পরিণত করেছেন।
অপরাধের সীমাহীন গতি
শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি, বালুমহল দখল, সম্পদ-সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়া, পদ ও চেয়ার দখল প্রভৃতি নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাজানি, ধর্ষণ, নারী ও পুরুষ নির্যাতনের মতো ঘটনা যেন অতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এছাড়া নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক, পরকীয়া, নারী নির্যাতন, তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি, জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ এবং এসবকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধ নিত্য ঘটে চলেছে। অপরাধপ্রবণতা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করে। শান্তিপ্রিয় মানুষ অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। সন্ত্রাস, মাদকাসক্তি, দুর্নীতি, কিশোর অপরাধ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। বিচার অঙ্গনেও অনৈতিকতার প্লাবন সৃষ্টি হয়েছে। মিথ্যাকে সত্যের মতো করে উপস্থাপন করা, সত্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, বিচারাঙ্গনে ‘উপরি’ এবং ‘চা খাওয়া’র নামে অবৈধ লেনদেন আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ভিতরে অনৈতিক লেনদেন নতুন কেনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক কারণে বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করার নিষ্ঠুর উদাহরণও তৈরি হয়েছে।
দেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বগ্রাসী অপরাধ জেঁকে বসেছে। বিগত দেড়-দুই দশকে শাসনক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের প্রতিটি অঙ্গ সংগঠন সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা পেয়েছে। গত কয়েক দশকে এ সংগঠন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্রয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, ধর্ষণ, দখল, নিয়োগ-বাণিজ্যসহ সর্বগ্রাসী রূপে আবির্ভূত হয়েছিল। স্কুল-কলেজ, সড়ক-মহাসড়কসহ প্রায় সব নির্মাণকাজ থেকেই চাঁদা উঠাতো তারা। চাকরি পাইয়ে দেয়া, বদলি-বাণিজ্যেও এদের আধিপত্য ছিল। দেশজুড়ে ছোট বাজার থেকে শুরু করে শত বা হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজেও হস্তক্ষেপ ছিল লীগের নেতাকর্মীদের। আর বিদেশে টাকা পাচার তো বহুল আলোচিত বিষয়। একটি ছোট্ট এবং দরিদ্র দেশ থেকে লাখোকোটি টাকা পাচার হওয়া জাতির সঙ্গে এক নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে। এর ধারাবাহিকতা যদি আগামীতেও অব্যাহত থাকে আমরা এক দুর্ভাগা জাতিতে পরিণত হবো।
একজন বিশ্লেষকের মতে, আমাদের প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে, যেসব মানুষের হাতে ক্ষমতা আছে, অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বায়ত্তশাসিত-আধাস্বায়ত্তশাসিত করপোরেশন, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যেসব কর্তৃপক্ষ চলে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ক্ষমতাবান ব্যক্তি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, কিছু লোক দুর্নীতিমুক্ত থাকতে পারে। একইভাবে রাজনীতিবিদ, সমাজপতি, সমাজের উঁচুপর্যায়ের লোকজন, যাদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাদের ক্ষেত্রেও বেশিরভাগ লোক দুর্নীতিপরায়ণ; অল্পসংখ্যক দুর্নীতিবহির্ভূত। এরা বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করে, তাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়ায়, সেখানে সম্পদ গড়ে। ব্যবসায়ীরা যে কর ফাঁকি দেয়, তা দিয়ে সম্পদ গড়ে দেশে ও বিদেশে।
সাধারণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এ সর্বগ্রাসী পরিস্থিতি থেকে বের হতে চায়। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? এজন্য এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন- যারা এ সর্বগ্রাস থেকে জাতিকে উত্তরণের পথ দেখাবে। তারা ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা’-এর নিরাময় করতে পারবে। আসন্ন নির্বাচন কি সেই পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণ করবে? সেই আশায় জাতি তাকিয়ে রয়েছে বলে মনে করি।